অনেক ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক সম্পর্কযুক্ত প্রথম সারির সিদ্ধান্ত নেন পুরুষরা। কিন্তু ঘরকন্নার কাজ যেখানে অর্থ দিয়ে মূল্যায়ন নেই, সেই সিদ্ধান্ত নেন মেয়েরা। ছবি: সর্বজিৎ সেন।
সমাজে চিরকাল মেয়েদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মত দেওয়া, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ক’জন মেয়ের আছে?
সাম্প্রতিক সময়ের একটি জনপ্রিয় সিরিজ় ‘পঞ্চায়েত’, আবার বলা যেতে পারে এই সময়ের দলিলও যেন সিরিজ়টি। এখানে মঞ্জু দেবী পঞ্চায়েত প্রধান। কিন্তু পঞ্চায়েত অফিসে তার দেখা মেলে না। বরং পঞ্চায়েত সম্পর্কিত যাবতীয় কাজ সামলায় তার স্বামী ব্রিজভূষণ দুবে। এ ক্ষেত্রে এটা চিত্রনাট্যমাত্র। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ জায়গায় এটাই বাস্তব চিত্র। পঞ্চায়েত নির্বাচনে মহিলা প্রার্থী জিতলেও তাঁর হয়ে কাজ সামলান তাঁর স্বামী। সারা গ্রাম তা জেনেও সেটাই দস্তুর মেনে চলে।
প্রান্তিক অঞ্চলে মহিলাদের পোস্টিং হলে, আজও তাঁদের সাড়া দিতে হয় ‘স্যর’ সম্বোধনে। কারণ সেখানে চেয়ারটাই স্যর। একটি গ্রামীণ ব্যাঙ্কের এক মহিলা ব্রাঞ্চ ম্যানেজার বলছিলেন, প্রায় দু’বছর তিনি ওই ব্রাঞ্চে রয়েছেন। কিন্তু এখনও স্থানীয়রা ও ব্যাঙ্কের কর্মীরা তাঁকে ‘স্যর’ বলে ডাকেন। কারণ তাঁদের কাছে ওই চেয়ারটার দাবিদার ‘স্যর’। কর্মক্ষেত্রে যখন এই ছবি, বাড়ির অন্দরমহলে যে মেয়েদের মতামত ও কণ্ঠস্বর চাপা পড়বে তা অনুমেয়।
বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়ির পছন্দমতো রান্না করতে করতে কত মেয়ে তো ভুলেই যায় তার পছন্দের খাবার কী। সে নিজে রান্না করলেও সকলকে খেতে দিয়ে শেষে হয়তো নিজের খাবারটা বেড়ে নেয়। পরিবারের সদস্যরা তার থালা সাজিয়ে দিচ্ছে, এ দৃশ্য বিরল। অনেকে আবার বরের পছন্দ নয় বলে নিজের প্রিয় রঙের জামাটা, শাড়িটাও কেনে না। ছেলে বা মেয়ে কোন স্কুলে ভর্তি হবে, সে বিষয়ে বাচ্চাটির বাবা, দাদু, ঠাকুমার মত বিচার্য হলেও শিশুটির মায়ের মত শোনা হয় ক’টি বাড়িতে? মেয়েদের কণ্ঠরোধ নতুন নয়, বরাবরই হয়ে এসেছে। এর পিছনে রয়েছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ, সেই সমাজকে রক্ষা করে চলার গোঁড়া মানসিকতা। কিন্তু মেয়েদের কণ্ঠরোধ কি সমগ্র সমাজের কণ্ঠরোধ নয়?
মেয়েরাই পিতৃতন্ত্রেরধারক-বাহক
সমাজতত্ত্ববিদ ও অধ্যাপক অনিরুদ্ধ চৌধুরী বললেন, “রাজস্থানের একটি গ্রামে একবার সার্ভে করার সময়ে গার্হস্থ হিংসার বিষয় সামনে আসে। সেই পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে গেলে মেয়েটির শাশুড়ি জানায়, ‘আমার ছেলে তো কিছুই মারে না। আমার স্বামী যা মারত, সেখানে আমার ছেলে অনেক ভাল।’ অর্থাৎ সে নিজে এতটাই নিপীড়িত যে এটা তার কাছে স্বাভাবিক। আবার অনেক সময়ে পুত্রবধূরা যে সমস্যায় পড়েন, দেখা যায় তিনি নিজে শাশুড়ি হওয়ার পরেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করছেন। অর্থাৎ একটি মহিলাকে পুরুষদের তুলনায় পিতৃতন্ত্রের ধ্বজাধারী মহিলাদের সম্মুখীন বেশি হতে হয়। পিতৃতন্ত্রের সূতিকাগার হল এই পরিবারগুলো। এখানে মেয়েদের মতামত দেওয়ার কোনও জায়গা নেই। মেয়েটির স্বামী, শ্বশুর বা ছেলে থাকলে সে-ই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। এই পরিবারের শিশুরা ছোট থেকে সেটা দেখেই বড় হয়। ফলে বাচ্চাটির কাছে এটাই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়।”
কলকাতাবাসী এক পুত্রবধূ জানালেন, রোজ তাঁকে রুটি করতে হয়। সম্প্রতি টেনিস এলবোর সমস্যা দেখা দেওয়ায় রুটি করার লোক রাখা যায় কি না জিজ্ঞাসা করায় শাশুড়ি তা নাকচ করে দেন। বাইরের লোকের হাতে করা রুটি তিনি খাবেন না। এমনকি মেয়েটির বরও তাঁর পাশে দাঁড়ায় না। এ দিকে মেয়েটির কাজও কেউ করে দিচ্ছেন না। অর্থাৎ যিনি কাজ করবেন, তাঁর মত বা সিদ্ধান্ত এখানে গৌণ। এখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মেয়েটির হাতে থাকছেই না।
এ দিকে পরিবারে তাঁর শ্রমও মূল্য পায় না। গৃহবধূরা বাড়িতে যে যে কাজ করেন, প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে বেতনহীন শ্রম থেকে যাচ্ছে। সেই কাজই বাইরে থেকে করাতে গেলে অনেক টাকা খরচ হত। এই প্রসঙ্গে সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট কমলা ভাসিন এক আলোচনায় বলেছিলেন, “একজন পুরুষ মানুষ বাড়ি ফিরে যে ভাবে গা ছেড়ে বসে পড়তে পারেন, একজন মহিলা কখনওই পারেন না। উল্টে সেই পুরুষ মানুষটিকে খাইয়ে, যত্ন করে আর একটা দিন কাজে যাওয়ার জন্য তৈরি করে দেন সেই গৃহবধূই।” শুধু কর্মরতা মহিলাদের ‘ডাবল ইঞ্জিন’ বলে মশকরা করে, গৃহবধূদের ‘ডাবল ইঞ্জিন’ ভাবতে না পারাটা আসলে এই ধরনের মানসিকতার দৈন্য।
কিন্তু সমস্যা আরও গভীরে। লকডাউনের সময়ে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে সমাজমাধ্যমে, যেখানে এক মহিলা রান্নাঘরে নাকে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে রুটি করছেন। কিন্তু তিনি বলছেন না যে কাজটি করতে পারবেন না। এর পিছনে মেয়েদের অনেক দিনের মগজধোলাই রয়েছে। দশভুজা রূপে মেয়েদের প্রায় দেবীত্বে স্থাপন করা হয়। ফলে এটাই তাঁর আশু কর্তব্য বলে ধরে নেয় মেয়েরা। নিজেই নিজেকে দশভুজা ভাবতে শুরু করেন। তাঁকে দেখতে দেখতে বড় হওয়া পরবর্তী প্রজন্মও তাই নিজের মতপ্রকাশ করাটা আর শিখে উঠতে পারে না। সেই চক্রব্যূহে তারাও ঢুকে পড়ে। অনেকে মনে করেন, গৃহবধূরাই এমন সমস্যার সম্মুখীন হন, অর্থনৈতিক ভাবে স্বাধীন মেয়েদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকে।
—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কিকণ্ঠস্বর স্পষ্ট করে?
উত্তরটা সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট ‘না’। অনেক ক্ষেত্রেই কর্মরতা মেয়েরাও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে স্বামীর উপরে নির্ভরশীল। ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ়ের সহকারী অধ্যাপক সুপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, “অনেক সার্ভেতেই দেখা গিয়েছে, রোজগেরে মহিলারাও মাইনে তুলে দিচ্ছেন স্বামীর হাতে। অনেক ক্ষেত্রে মাইনে তুলে না দিলেও তাঁর টাকা কোথায় ইনভেস্ট করা হবে, কোথায় খরচ হবে, সে সব তাঁর স্বামী বলে দেন। বাড়িতে কী রান্না হবে, সেটা হয়তো বাড়ির মেয়েরা সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু সেখানেও পুরুষদের পছন্দ প্রাধান্য পায়। তবুও রান্নার সিদ্ধান্তটুকু মেয়েদের হাতে থাকে। কিন্তু যখন সেই খাওয়াদাওয়াটা বাইরে হচ্ছে অর্থাৎ রেস্তরাঁয়, সেখানে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তাঁর স্বামী। কোন রেস্তরাঁয় যাবেন, কী খাওয়া হবে, সেটা গৃহকর্তা ঠিক করছেন।” এই বৈষম্য শুধু প্রান্তিক অঞ্চলে নয়, শহুরে উচ্চশিক্ষিত পরিবারেও আকছার দেখা যায়।
দিনকতক আগে রন্ধনশিল্পী ও খাদ্য উদ্যোগপতি আসমা খান ফুড ইন্ডাস্ট্রির বৈষম্যের কথা বলছিলেন। যেখানে ভারতের ৯৯ শতাংশ বাড়ির হেঁশেলেই মেয়েরা রোজ রান্না করেন, সেখানে ফুড ইন্ডাস্ট্রিতে মহিলা-শেফের সংখ্যা নগণ্য। যখনই কাজটার সঙ্গে অর্থনৈতিক মূল্য যুক্ত হচ্ছে, মেয়েরা সেখানে দ্বিতীয় সারিতে। সুবর্ণাও সহমত, “আসলে বাড়িতে হোক বা কর্মক্ষেত্রে যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সম্পর্কযুক্ত প্রথম সারির সিদ্ধান্ত পুরুষরাই নেন। কিন্তু ঘরকন্নার কাজ বা যে কাজে অর্থ দিয়ে মূল্যায়ন নেই, সেখানে অর্থাৎ দ্বিতীয় সারির সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন মেয়েরা। তবে চা-বাগানে দেখেছি, কাজের জায়গার নিয়মগুলো মেয়েদের সুরক্ষা দেয়। এখন অবশ্য সব দিকেই নারীদের নিয়ে অনেক কর্মসূচি হয়। আমরাও যখন মহিলাদের নিয়ে কাজ করি, তাঁদের কথা শোনার চেষ্টা করি। এই শোনার অভ্যাসটা করতে হবে। তাঁদের বলতে দিতে হবে। তা হলে সমস্যাগুলোর গভীরে যাওয়া যাবে।”
সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক যে ইতিহাসের পাতায় চোখ রেখে আমরা বড় হয়েছি, সেগুলো আসলে পিতৃতান্ত্রিক ব্যাখ্যা। ইতিহাস বা তার ব্যাখ্যা বদলানো তো সোজা নয়। তাই এখনও মেয়েদের লড়াই অনেক বাকি। আর্থিক স্বাধীনতা এলেই যে মেয়েদের কণ্ঠস্বর স্পষ্ট হবে, তাঁদের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া হবে, এতটাও বদলায়নি আমাদের সমাজ। কিন্তু আশা এটুকুই যে, আণুবীক্ষণিক হলেও অনেক পরিবারেই বদল লক্ষণীয়।
অনিরুদ্ধ মনে করিয়ে দিলেন, এখন অন্তত রাত বারোটার পরে গাড়ি করে মেয়েরা বাড়ি ফিরলে পড়শিরা গসিপ করেন না। তাঁরা বুঝতে শিখেছেন মেয়েটি শিফট ডিউটি করে ফিরছে। কিছু পরিবারে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ব্যাঙ্কেও এখন মহিলারা অ্যাকাউন্ট খুলতে যাচ্ছেন। সেটা শহুরে উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির শুধু নয়, গ্রামের, প্রান্তিক শ্রেণির মহিলারাও তাঁদের রোজগার থেকে টাকা বাঁচিয়ে ব্যাঙ্কে রাখছেন। হয়তো একদিন সেই টাকা নিজের ইচ্ছেমতো খরচ করতে পারবেন। অন্ধকার পথে এই বিন্দু বিন্দু আলোও তো কম নয়।
মডেল: বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায়, প্রিয়ম, দীপান্বিতা হাজারি, পার্থপ্রতিম হাজারি,
ছবি: সর্বজিৎ সেন,
মেকআপ: সোনম জয়সওয়াল,
মেন'স কস্টিউম ও স্টাইলিং: দীপ কর্মকার,
শাড়ি: সন্ধ্যারাগ বুটিক,
লোকেশন ও হসপিটালিটি: ওহ! ক্যালকাটা