নাটকের একটি দৃশ্য।
গত ২২ মার্চ অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের প্রেক্ষাগৃহে মঞ্চস্থ হল উষ্ণিক নাট্যগোষ্ঠীর নবতম প্রযোজনা ‘ইতি ছন্দা’। নাট্যরচনা ও নির্দেশনা ঈশিতা মুখোপাধ্যায়ের। এই নাটক এককালের প্রখ্যাত অভিনেত্রী ছন্দা চট্টোপাধ্যায়ের জীবন ঘিরে আবর্তিত। আজ থেকে অর্ধ শতাব্দী পূর্বে, সত্তরের দশকে ছন্দা চট্টোপাধ্যায় দাপিয়ে কাজ করেছেন বাংলার রঙ্গমঞ্চে। উৎপল দত্তের ‘টিনের তলোয়ার’ নাটকের ময়না তিনি, আবার পেশাদার যাত্রায় তাঁর নামের আগে টাইটেল বসত— ‘মর্ত্যের উর্বশী’। যাত্রা করে সে কালে তাঁর বাৎসরিক আয় ছিল পাঁচ লক্ষ টাকা। কিন্তু কালস্রোতে সে সব দিন গিয়েছে। আজকের নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি কিছুটা অচেনা, দূরের মানুষ। দ্রুত বিস্মরণের যুগে বিগত কালের কত মহিমা অপসৃত হয়! আর ঠিক এই জায়গা থেকেই শুরু হয়েছে এই নাটক।
নাট্যকার এমন ভাবে নাটকটি রচনা করেছেন যাতে নতুন প্রজন্মের দর্শকেরা ছন্দা চট্টোপাধ্যায়ের দীর্ঘ ও উত্থানপতনময় জীবনের কথা জানতে পারে তাঁরই মুখে। নাট্য-নির্দেশক হিসেবে ঈশিতা মুখোপাধ্যায়ের এই প্রয়োগ অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য। নিজের অসংখ্য অভিজ্ঞতার কথা যখন অভিনেত্রী নিজমুখেই বলেন, তখন তা নাটকের অধিক কিছু হয়ে উঠে দর্শকের হৃদয়ে আঘাত করে। নাটকটিতে ছন্দা চট্টোপাধ্যায়ের অন্তর্জীবনের পাশাপাশি উঠে এসেছে সেই সব প্রসিদ্ধ মানুষের কথা, যাঁদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়েছিল। এই নাটক তার ন্যারেটিভ ও সংলাপের মাধ্যমে ধারণ করে রয়েছে একটি বিগত যুগ ও সময়খণ্ডের ইতিহাস। নাট্যকার দক্ষতার সঙ্গে গোটা নাটকটিকে বয়ন করেছেন।
‘ইতি ছন্দা’ নাটকের আখ্যানভাগ সামান্য। এই যুগের দুই নাট্যকর্মী অরুণিকা আর অরিন্দম এসেছে ছন্দার বাড়ি। সেখানে তিনি আজ একা। নিঃসঙ্গ। কথা থেকে কথা শুরু হয়। স্মৃতির আকাশে ফুটে উঠতে শুরু করে একের পর এক পুরাতন নক্ষত্র। সাত বছর বয়সে অভিনয়ে হাতে খড়ি ছন্দার। সেই থেকে টানা সাত দশকেরও বেশি সময় জুড়ে ঠাকুরদাস মিত্র থেকে অহীন্দ্র চৌধুরী, পাহাড়ি সান্যাল, বিকাশ রায়, সরযূবালা, মলিনা দেবী, উত্তমকুমার, উৎপল দত্ত, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়— সকলের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। ছন্দার কথায় উঠে এসেছেন তাঁরা। উঠে এসেছে তাঁর পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনের কথা। কখন কোথায় ঘটে গেল ছন্দপতন, সে কথাও বলেছেন তিনি।
রঙ্গমঞ্চে আমরা দেখতে পাই একজন অশীতিপর তরুণীর প্রাণবন্ত উপস্থাপনা। কখনও তিনি নাচছেন, কখনও গাইছেন। কখনও আনন্দে উদ্বেল, কখনও যন্ত্রণায় করুণ। কোনও চরিত্রের আড়াল নেই, তিনি নিজের কথা বলছেন। দর্শকরা যেন তাঁর ঘরের লোক। তিনি অকপটে তাদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছেন নিজের জীবন। কখনও উঠে এসেছে তাঁর ‘ক্রাফট’-এর কথা, কখনও বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করার সময়ে তাঁর প্রস্তুতির কথা, কী ভাবে হারমোনিয়াম বাজিয়ে উত্তমকুমার তাঁকে গান তুলিয়েছিলেন, কী ভাবে পুরুষশাসিত জগতে প্রয়োজনে তিনি প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করেছিলেন— উঠে এসেছে সে সব কথাও। যে যাত্রায় তিনি ‘মর্ত্যের উর্বশী’ হয়ে উঠেছিলেন এক সময়ে, সেই যাত্রার হাত ধরেই এল সর্বনাশ। স্বামীর হঠকারিতায় বিপুল ঋণের বোঝা চাপল মাথায়। সেই ঋণ শোধ করলেন ছন্দা, দিনের পর দিন অমানবিক পরিশ্রম করে। ছন্দার কথা শুনতে শুনতে তাঁর জীবনের ঘটনাগুলো ভেসে উঠছিল সাদা কালো ছায়াছবির দৃশ্যের মতো। এই বয়সেও শুধু কথা বলে তিনি দর্শকদের সম্মোহিত করে রাখতে পারেন। নাটকের শেষে নিঃসঙ্গ নীরবতায় ছন্দা চট্টোপাধ্যায় যখন গেয়ে ওঠেন অতুলপ্রসাদের ‘আমি বাঁধিনু তোমার তীরে তরণী আমার’, তখন বুকে ধাক্কা লাগে।
‘ইতি ছন্দা’ নাটকে অরুণিকা দে এবং অরিন্দম রায়কে খুবই প্রাণোচ্ছল ও স্বতঃস্ফূর্ত লেগেছে। এই নাটকে গোপাল পোদ্দারের মঞ্চ, সৌমেন চক্রবর্তীর আলো, আবলু চক্রবর্তীর আবহ ও দেবজিৎ ভট্টাচার্যের রূপসজ্জা পরিমিত। পরিশেষে বলা প্রয়োজন যে, ছন্দা চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে ঈশিতা মুখোপাধ্যায় এই যে নাটকটি মঞ্চস্থ করলেন, এটি নতুন প্রজন্মের নট-নটী ও দর্শকরা দেখলে ঋদ্ধ হবেন। এ তো শুধু একজন অভিনেত্রীর জীবনকথা নয়, এ ইতিহাসও বটে। এই নাটকটি সুসম্পাদিত। নির্দেশক এই নাটকটিকে দীর্ঘায়িত করেননি, কথার ভারে ভারাক্রান্ত করেননি।
অনুষ্ঠান
অনুষ্ঠানে ছাত্রীরা