পরিবেশনায় শ্রীরাধা।
সম্প্রতি প্রসার ভারতী এবং ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রক দ্বারা যৌথ ভাবে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী আকাশবাণী সঙ্গীত সম্মেলনের ৬৭তম অধিবেশন আশুতোষ জন্মশতবর্ষ হলে উদ্যাপিত হল। দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানটিতে একত্রিত হয়েছিলেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নানা গুণী শিল্পী এবং গুণমুগ্ধ শ্রোতা। উদ্বোধনী দিনটিতে যন্ত্র এবং কণ্ঠসঙ্গীতের সমমেল এক অপার্থিব সাঙ্গীতিক অভিজ্ঞতার জন্য মঞ্চ প্রস্তুত করে দেয়।
প্রথম সন্ধ্যা শুরু হয় প্রখ্যাত বাঁশরি বাদক পণ্ডিত সুদীপ চট্টোপাধ্যায়ের হিন্দুস্তানি ধ্রুপদী বাঁশির সুরে। উদ্বোধনী সঙ্গীত হিসেবে, তিনি ‘বন্দে মাতরম’-এর মনোরম পরিবেশনা দিয়ে তাঁর অনুষ্ঠান শুরু করেন। গত বছর এই গানটি প্রকাশের সার্ধশতবার্ষিকী হওয়ায় শিল্পীর এই সঙ্গীতচয়ন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এর পর পরিবেশিত হয় রাগ বেহাগ। শিল্পী প্রথমে বিলম্বিত একতালে একটি বড় খেয়াল, তারপরে মধ্যলয় তিনতালে পণ্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ রচিত বন্দিশ ‘ঝুম ঝাম ধুম ধাম’ এবং সবশেষে দ্রুত তিনতালে পান্নালাল ঘোষ ঘরানার এক বহুশ্রুত রচনা দিয়ে শেষ করেন। শিল্পীর বাঁশরি বাদনে অনুভূত হচ্ছিল তাঁর প্রজ্ঞা, এক অননুকরণীয় ঘরানাদারি এবং বেহাগের চরিত্রগত রোম্যান্টিসিজ়ম। শিল্পীকে তবলায় যথাযথ সঙ্গত করলেন দিলীপ মুখোপাধ্যায়। তবে মাইক্রোফোনে এবং শব্দ প্রক্ষেপণে কিছু অসঙ্গতির কারণে পরিবেশনার অভিপ্রেত ফল পেতে শিল্পীকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে।
পরবর্তী পরিবেশনা ছিল সাবিনা মমতাজ ইসলামের খেয়াল। তিনি শুরু করেন রাগ শ্রী-তে বিলম্বিত তিনতালের বন্দিশ ‘সাঁঝ ভয়ী আয়ো রে’ দিয়ে, তার পরে তিনি দ্রুত তিনতালের একটি বন্দিশ
দিয়ে শেষ করেন প্রথম পরিবেশনা। এর পর তিনি পঞ্চম সে গাড়ায় একটি ঠুমরি— ‘কোয়ি যাও সইয়াঁকো লে আও’ পরিবেশন করেন, যার আবেগপূর্ণ সূক্ষ্মতা
তুলে ধরে তার আগরা ঘরানার তালিম। এর পর মিশ্র মাণ্ড-এ রচিত একটি দাদরা— ‘শ্যাম তোহে নজর’ দিয়ে শিল্পী অনুষ্ঠান শেষ করেন। তাঁর সঙ্গে হারমোনিয়ামে ছিলেন রূপশ্রী ভট্টাচার্য এবং তবলায় অশোক মুখোপাধ্যায়। উভয়েই সংবেদনশীল এবং দক্ষ সঙ্গত করে অনুষ্ঠানকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলেন।
এ দিন সন্ধ্যার শেষ শিল্পী ছিলেন ইমদাদখানী ঘরানার সেতারবাদক পণ্ডিত অসীম চৌধুরী। তাঁর অনুষ্ঠান শুরু হয় রাগ রাগেশ্রীর একটি বিস্তৃত আলাপ দিয়ে। তার পরে জোড় ও ঝালা, যেখানে তিনি রাগেশ্রীর শান্ত অথচ জটিল প্রকৃতি তুলে ধরেন দীর্ঘ মীড়, সুচিন্তিত গমক এবং পরিমিত জমজমার ব্যবহারে। এর পর শিল্পী বিলম্বিত তিনতালের একটি গৎ বাজান, যার সমাপ্তি ঘটে একটি দ্রুত তিনতাল গতে, যা লয়কারি এবং সুরের উপরে তাঁর নিয়ন্ত্রণকে তুলে ধরে। চৌগুণের তানে কিঞ্চিৎ অস্পষ্টতা থাকলেও শিল্পীর রাগদারিতে তা ঢাকা পড়ে যায়। সব শেষে রাগ ভৈরবীতে শিল্পীর একটি মর্মস্পর্শী ঠুমরি ‘বাঁট চলত নহি চুনর রং ডারি’ দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
দ্বিতীয় দিনের সন্ধ্যা শুরু হয় অগ্নিভ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রসঙ্গীত দিয়ে। শিল্পীর গানের ডালিতে ছিল ‘বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা’, ‘আসা যাওয়ার মাঝখানে’, ‘সুখের মাঝে তোমায় দেখেছি’ ইত্যাদি রবীন্দ্রসঙ্গীত। পরিবেশনায় রবীন্দ্রনাথের রচনার ঐতিহ্যকে বহন করেও শিল্পী পরিমিত উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রদর্শন করেছেন, যা অতীতের প্রতি যেমন শ্রদ্ধাশীল, বর্তমান সম্পর্কে ততটাই ওয়াকিবহাল।
এর পর শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপরিচিত আধুনিক বাংলা গান ‘ইমন রাগের গান’, ‘বাঁশিটার একটাই দোষ’, ‘কেউ বলে ফাল্গুন’ ইত্যাদি গেয়ে শ্রোতাদের মনোরঞ্জন করেন।
শেষ পর্বে সোমা দাস মণ্ডল এবং কার্তিক দাস বাউল উপস্থিত ছিলেন, যাঁরা ভারতীয় লোকসঙ্গীতের বৈচিত্রপূর্ণ জগৎকে তুলে ধরেন। সোমা দাস মণ্ডল গোয়ালপারিয়া, ঝুমুর, লালনগীতি পরিবেশন করেন এবং কার্তিক দাস বাউল লালনগীতি, ভবা পাগলার গান গেয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন। তাঁদের দ্বৈত পরিবেশনায় সন্ধ্যা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। শ্রোতাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও উৎসাহের মধ্য দিয়ে দুই দিনব্যাপী উত্তর এবং পূর্ব ভারতীয় সঙ্গীতের এই সফরের সমাপ্তি ঘটে।
অনুষ্ঠান
অমিত কুমার।