নৃত্যানুষ্ঠানের অংশ।
সম্প্রতি দর্পণী প্রযোজিত দু’দিন ব্যাপী ‘মর্দালা মঞ্জিরা’ নৃত্যোৎসব অনুষ্ঠিত হল জ্ঞানমঞ্চ প্রেক্ষাগৃহে। এ বছরের নৃত্যোৎসবের প্রধান আকর্ষণ ছিল পদ্মবিভূষণ গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন। প্রথম দিন অনুষ্ঠানের সূচনা হয় গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে। সম্মানীয় অতিথিবৃন্দ এবং অতিথি নৃত্যশিল্পীদের বরণ করে নেন দর্পণীর কর্ণধার অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়। মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় গুরু রঞ্জনা গৌহরের ‘কুরু যদুনন্দন’ নৃত্য দিয়ে। মিশ্র কাফি রাগ ও যতি তালে নিবদ্ধ ‘গীতগোবিন্দ’ থেকে নেওয়া এই নৃত্যাংশে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার মিলনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। গুরু রঞ্জনা তাঁর সুন্দর শৃঙ্গার ভাবরস দ্বারা রাধাকৃষ্ণের যুগল মিলনের রূপকে ফুটিয়ে তুলেছেন। পরবর্তী শিল্পী গুরু রঞ্জনা গৌহরের শিষ্যা বৃন্দা চাড্ডা। তাঁর পরিবেশনা ‘রাধারানী সঙ্গে নাচে মুরলীপানি’। প্রাণোচ্ছল পরিবেশনা।
সে দিন সন্ধ্যার শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ ছিল আরুশি মুদগলের নৃত্য পরিবেশনা। যেমন সুন্দর তাঁর ভাবের ব্যঞ্জনা, তেমনই সুন্দর নৃত্যমূর্ছনা। ওড়িশি নৃত্যশৈলীর ভঙ্গিগুলি যখন ব্যবহার করছেন— মনে হচ্ছে, কোনও ভাস্করের শিল্পকার্য! তিনি পরিবেশন করেন ‘কমলা’ ও ‘ঘনামধুনা’। যৌথ ভাবে গুরু মাধবী মুদগলের সঙ্গে পরিবেশন করেন ‘দ্বিধা’— যেখানে নিখুঁত ভাবে ‘যতি’ ও ‘বোল’ ব্যবহৃত হয়েছে। পরবর্তী শিল্পীদ্বয় রাজশ্রী প্রহরাজ এবং গুরু কেলুচরণের পৌত্রী প্রীতিশা মহাপাত্র। তাঁদের নিবেদন ‘রামচন্দ্র’। এখানে সঞ্চারী ভাবের মাধ্যমে শিল্পীরা ফুটিয়ে তুলেছেন ‘হরধনুভঙ্গ’ এবং ‘সীতা স্বয়ম্বরা’ অভিনয়। রাম-রাবণের যুদ্ধের দৃশ্যে রামরূপী প্রীতিশা এবং রাবণরূপী রাজশ্রীর অভিনয় অনন্যসাধারণ। ওই সন্ধ্যার শেষ শিল্পীদ্বয় গুরু রতিকান্ত মহাপাত্র এবং বিদুষী সুজাতা মহাপাত্র। তাঁদের নিবেদনে ছিল ‘জটায়ু মোক্ষ’। জটায়ুর ভূমিকায় গুরু রতিকান্ত মহাপাত্রের অনবদ্য অভিনয় দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল। রাবণরূপী এবং রামরূপী সুজাতা মহাপাত্রের দৃপ্ত বলিষ্ঠ ভঙ্গিমা ছিল সুন্দর। ওই সন্ধ্যায় দর্পণী পরিবেশন করে ‘শিবরঞ্জনী পল্লবী’ ও ‘শিবতাণ্ডব’। নৃত্যাংশ দু’টির পরিকল্পনা ও পরিচালনা গুরু অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়ের। মঞ্চ জুড়ে দর্পণীর শিল্পীদের সমবেত নৃত্য পরিবেশনা অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে।
নৃত্য পরিবেশনে শিল্পী
দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠান সাজানো হয়েছিল দর্পণীর ছাত্রছাত্রীদের নৃত্য পরিবেশনা দিয়ে। ছোট ছাত্রছাত্রীদের নিষ্ঠাপূর্ণ নৃত্য পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকবৃন্দকে অভিভূত করে। কয়েক জন ছাত্রী যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। এঁরা হলেন সৌমিলী সাধুখাঁ, কস্তুরী চক্রবর্তী, ঈশানী মুখোপাধ্যায়, সুহানী সরকার, স্নেহা হাজরা। তাঁদের নৃত্য পরিবেশনা, মুদ্রার প্রয়োগ, ভাব এবং ছন্দের মূর্ছনা সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন। সেই সন্ধ্যার শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ ছিল দর্পণী প্রযোজিত ও গুরু অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায় পরিকল্পিত ও পরিচালিত ‘অনন্ত’। এই উপাখ্যানের বিষয়বস্তু পৌরাণিক। বেদ ও উপনিষদ থেকে গৃহীত। গোটা বিশ্বে আদি ও অন্ত রূপে আছে পঞ্চভূত অর্থাৎ বায়ু, জল, অপার্থিব, ভূমি ও অগ্নি। পঞ্চভূত হতেই তার সৃষ্টি, আবার পঞ্চভূতেই সে বিলীন হয়ে যায়। পঞ্চভূতের এই ভাবনাকে দর্পণীর শিল্পীরা পরিপূর্ণ ভাবে মঞ্চস্থ করেছেন। স্পষ্ট মুদ্রা প্রয়োগ ও বলিষ্ঠ নৃত্যশৈলীতে ফুটিয়ে তুলেছেন পঞ্চভূতের ভাবনা, সৃষ্টি ও বিনাশ।
নৃত্য পরিকল্পনা, সমবেত পরিবেশনা, পোশাকের ব্যবহার আকর্ষক। দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সোহম দে, অনুস্মিতা ভট্টাচার্য, অনয়া ঘোষ এবং নিকিতা দাস। সুন্দর এই প্রযোজনার কৃতিত্ব দর্পণীর কর্ণধার গুরু অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়ের। এই নৃত্যাংশে তাঁর পরিবেশনায় পরিলক্ষিত হয় নিখুঁত স্নিগ্ধসুন্দর নৃত্যভঙ্গিমা, স্পষ্ট মুদ্রা প্রয়োগ ও ওড়িশি নৃত্যশৈলীর লালিত্য। এককথায় ‘অনন্ত’ একটি বলিষ্ঠ উপস্থাপনা। সে দিনের সন্ধ্যার তিন অতিথি নৃত্যশিল্পী রীনা জানা, নন্দিনী ঘোষাল ও কাকলি বসুর নৃত্য পরিবেশনা দর্শককে আনন্দ দেয়। বহু দিন পরে সুন্দর একটি শাস্ত্রীয় নৃত্যানুষ্ঠানের সাক্ষী থাকলেন দর্শকবৃন্দ।
অনুষ্ঠান
রুদ্রপ্রসাদ, দেবশঙ্কর, জয় ও রেজ়ওয়ানা।