Art Exhibition

পথ দেখালেন যাঁরা...

এই পরিবেশে বেড়ে ওঠা সোহিনীর ছবিতে আজ‌ও সেই রোম্যান্টিক মনের‌ই ছাপ। আজকের সভ্যতার কালিমা তাঁকে যেন স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারেনি।

শমিতা বসু
শেষ আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৪
পথপ্রদর্শক: বিড়লা অ্যাকাডেমিতে শান্তিনিকেতনের কলাভবনের সতীর্থ শিল্পীদের প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম

পথপ্রদর্শক: বিড়লা অ্যাকাডেমিতে শান্তিনিকেতনের কলাভবনের সতীর্থ শিল্পীদের প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম

শান্তিনিকেতনের কলাভবনের সতীর্থ কিছু শিল্পী নিজেদের বিভিন্ন মাধ্যমের কাজ নিয়ে সম্প্রতি প্রদর্শনীর আয়োজন করলেন বিড়লা অ্যাকাডেমিতে। এই শিল্পীগোষ্ঠী কলাভবনে ছিলেন ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত। শান্তিনিকেতন ছেড়ে যাওয়ার চার দশক পরে এঁরা এই প্রথম দলীয় প্রদর্শনী করলেন। এই ঘনিষ্ঠ এবং বিশিষ্ট শিল্পী-পরিবার চিত্রশিল্প, গ্ৰাফিক্স এবং ভাস্কর্য নিয়ে এক সময়ে পড়াশোনা করেছেন। এঁদের মধ্যে অনেকেই এখন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। অনেকে আবার শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন।

এই প্রদর্শনীটি তাঁরা উৎসর্গ করেছেন তাঁদের শিক্ষক সম্প্রদায়ের স্মরণে। শ্রদ্ধা এবং ভালবাসার প্রতীক-উপাসনাস্বরূপ এই প্রদর্শনীর নাম দেওয়া হয়েছে— ‘সতীর্থ: আওয়ার ক্রিয়েটিভ সোজোঁ’। সহপাঠীদের সৃজনশীলতার সাময়িক আবাস। সতীর্থ শিল্পীদের বন্ধুত্ব বেশি গাঢ় হয়। তার কারণ, মাস্টারমশাইদের সঙ্গে সঙ্গে ছাত্র-ছাত্রীরা অধিকাংশই শিল্পচর্চার অনেক আগে নিজেদের খুঁজে পান। শিল্পের সহযাত্রীরা একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠেন।

প্রদর্শনীতে দেখা গেল সোহিনী ধরের কাজ। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘ দিন। কলাভবনের চাতালে, ছাতিম গাছের নীচে গানবাজনা, শিল্পচর্চার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা। শিক্ষক হিসেবে পেয়েছেন কে জি সুব্রহ্মণ্যম, শর্বরী রায়চৌধুরী, সনৎ কর এবং আরও অনেককে। এই পরিবেশে বেড়ে ওঠা সোহিনীর ছবিতে আজ‌ও সেই রোম্যান্টিক মনের‌ই ছাপ। আজকের সভ্যতার কালিমা তাঁকে যেন স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারেনি। শিল্পীর ছবি অত্যন্ত বর্ণময় এবং সুখপ্রদ। শৈশবে পাঠভবনে থাকাকালীন ওঁর স্থানীয় অভিভাবক শোভনলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের মুখে ‘বুড়ো আংলা’, ‘ক্ষীরের পুতুল’-এর গল্পগুলো ছোটবেলায় সোহিনীর মনে অদ্ভূত সব আনন্দের ভাবমূর্তি সৃষ্টি করেছিল। তারই প্রকাশ দেখা যায় তাঁর কাজে। ছবির গঠনে সামান্য মোগল মিনিয়েচারের ছোঁয়া। সম্পূর্ণ ভাবে দ্বিমাত্রিক, কিন্তু তাঁর নিজস্ব আঙ্গিকে চারটি উল্লম্ব কাগজে নরম প্যাস্টেলে আলট্রামেরিন নীল, লুমিনাস কমলা এবং হলুদ রঙে যেন এক স্বপ্নের জগৎ সৃষ্টি করেছেন। কোথাও পাহাড়ের উঁকি, কোথাও অনবদ্য পাহাড়ি নদীর উচ্ছ্বাসে অবতরণ— আশপাশে সুন্দরী অষ্টসখীর মতো রঙিন গাছপালার রাসলীলা যেন দর্শককে ছবির অন্দরমহলে আমন্ত্রণ জানায়।

অপর এক শিল্পী নিখিল রঞ্জন পাল। তিনি কলাভবনে শিক্ষালাভের পর দেশে-বিদেশে প্রচুর একক এবং দলীয় প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। এঁর ছবিতে নারী এবং শিশুদের প্রতি ভালবাসা চোখে পড়ে। একটি মেয়ে চেয়ারে উপবিষ্ট কিন্তু বিশেষ ভাবে লক্ষণীয় তাঁর মুখের অভিব্যক্তি। পেন অ্যান্ড ইঙ্কের কাজ। এ ছাড়াও তাঁর গোয়াশে করা দু’টি অপূর্ব ছবিতে ফিরে গিয়েছেন অন্য জীবনে। চারদিকে ছোট ছোট বাড়ি, প্রভূত গাছপালা, দৃষ্টি প্রসারিত মাঠঘাট পেরিয়ে আরও দূরে। ভারী সুন্দর এই ছবিটি। নগরজীবনের প্রতি শিল্পীর বিরাগ যেন সুস্পষ্ট।

শিল্পী নিসার হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। প্রদর্শনীতে তাঁর একটি অসাধারণ ছবির নাম ‘পানিশমেন্ট ফর জিনা’! ইসলামিক আইনে আছে, বিবাহের বাইরে কোনও রকম শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করলে, অপরাধীকে একশো চাবুকের বাড়ি খেতে হত এবং সমাজ-বহিষ্কৃত থাকতে হত এক বছরের জন্য। সেটাই জিনার শাস্তি। এ ছবি অ্যাক্রিলিকে করা, ক্যানভাসের উপরে। এখানে এক বীভৎস শাস্তির নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে। যেন পাতালপ্রবেশের দ্বার, ভীতিপ্রদ ও নারকীয়। বেশ বড় মাপের এই ক্যানভাসে রঙের পরিবেশনপদ্ধতি, ছবির গঠন, বিন্যাস, ড্রয়িং... সব কিছুই অতি উচ্চমানের।

শিল্পী পূর্ণেন্দু দে কলকাতা ছাড়াও দিল্লি, মুম্বই এবং ইংল্যান্ডে প্রদর্শনী করেছেন। কলকাতায় দুর্গাপুজোর সময়ে তাঁর করা দুর্গা মূর্তি এবং প্যান্ডেলের ডিজ়াইন তাঁর উদ্ভাবনীশক্তির পরিচয় দেয়। এখানে অন্যান্য কাজের মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য তাঁর উডকাটে করা একটি প্যানেল। গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কাঠের বোর্ডের উপরে ছুরি বা ধারালো কোনও যন্ত্রের আঁচড়ে কেটে কেটে ‘দ্য স্ক্রিম’ নামে একটি কাজ অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে দর্শকমনে। চলমান একটি গাড়ির আবদ্ধ পরিবেশে, শ্রেণি, জাতি, পেশা নির্বিশেষে কিছু মানুষ যেন মুক্তিকামী। কী হৃদয়স্পর্শী এদের সেই আর্তি! কাজটিতে বেশ ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্যের চরিত্র আনতে সক্ষম হয়েছেন শিল্পী।

দিল্লিবাসী শিল্পী আনন্দময় বন্দ্যোপাধ্যায় ছাপচিত্রের বিশেষ কৃতী ছাত্র। শিল্পীর একটি লিনোকাট এবং সেরিগ্ৰাফের কাজ, নাম ‘দ্য ওয়র্ল্ড আপসাইড ডাউন’-এ তিনি দেখিয়েছেন একটি মেয়ের দেহের নীচের অংশটি উল্টে আছে এবং সে নিজেই যেন নিজের দ্রষ্টা। এই ছবিতে লিনোকাট করে তার উপরে খুব হালকা সেরিগ্ৰাফ করা হয়েছে। অপর একটি ছবির নাম, ‘মাল্টিপল এনকাউন্টার্স সিক্স’। এখানে নৃত্যরত একাধিক ফিগার মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছে। সম্ভবত নৃত্যের অপার আনন্দ দেখাতে চেয়েছেন শিল্পী। এই ছবিতে নানা রঙের অনবদ্য ব্যবহার করেছেন শিল্পী, যেটা সেরিগ্রাফিতে সচরাচর দেখা যায় না এবং এটি প্রিন্টমেকিংয়ের দক্ষতার স্বাক্ষরবাহী।

সত্যেন্দ্র সিং বাওনি কলাভবনে পাঠের পরে এক বছর স্কলারশিপ নিয়ে ফ্রান্স ছাড়াও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে থেকেছেন। শান্তিনিকেতন, বারাণসী, ফ্রান্স ইত্যাদি সব জায়গার সংমিশ্রণে মুরাল সৃষ্টি করেছেন, স্যান্ড কাস্ট, টেরাকোটা, গ্লাস মোজ়েইক ইত্যাদি মাধ্যমে। এখানে দর্শক তাঁর জলরঙের ছবি দেখতে পেলেন। খুব অন্য রকম ছবি, যেখানে জলরঙের ব্যবহার এবং আঙ্গিকে তাঁর শৈল্পিক স্বাক্ষর স্পষ্ট। একটি মেয়ের মনের রহস্যময় অবচেতনের খেলা।‌

সুব্রত মণ্ডল কলাভবনের প্রিন্টমেকিংয়ের বিশিষ্ট ছাত্র ছিলেন। তাঁর দু’টি অসাধারণ কাজ আমরা দেখতে পেলাম। একটি ‘স্কেয়ারক্রো’ এবং অন্যটি ‘আরাবল্লী’। একটি পলিগ্ৰাফি, যেটি অতি আধুনিক জটিল ডিজ়াইনের পদ্ধতিতে করা, এবং অন্যটি প্ল্যাটোগ্ৰাফি। এ ছাড়াও ইঙ্ক অন পেপারে কচের একটি বিমূর্ত ড্রয়িং মুগ্ধ করে।

বাসুদেব বিশ্বাসের ব্রোঞ্জ ভাস্কর্যে লাস্যময়ী নারীর দীর্ঘায়িত আকাশচুম্বী গঠন আকর্ষক। তিনি এই সিরিজ়ে ডোকরার প্রথাগত লস্ট ওয়্যাক্স প্রণালী ব্যবহার করেছেন। তবে এর বাইরেও পিতল ও টেরাকোটা ছাড়া, বর্জিত (স্ক্র্যাপ) ধাতুর কাজের জন্য প্রসিদ্ধ।

এ ছাড়াও প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছিলেন দেবব্রত রায় বর্মণ এবং এস প্রণাম সিংহ। সব মিলিয়ে মনে রাখার মতো একটি প্রদর্শনী।

আরও পড়ুন