গোধরা। গুজরাতের শহরটি তার জটিল সাম্প্রদায়িক হিংসার ইতিহাসের জন্য পরিচিত। এ বার ২০২৬ সালের পুর নির্বাচনে সামাজিক সম্প্রীতির এক শক্তিশালী বার্তা দিল সেই গোধরাই।
গোধরা পুরসভা নির্বাচনে ৭ নম্বর ওয়ার্ড থেকে বিপুল ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন নির্দল হিন্দু মহিলা প্রার্থী অপেক্ষাবেন নয়নেশভাই সোনি। উল্লেখযোগ্য ভাবে, ওই নির্বাচনী এলাকার ১০০ শতাংশ ভোটারই মুসলিম সম্প্রদায়ের। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই অপেক্ষাবেনের জয়কে ঐতিহাসিক জয় এবং সম্প্রীতির বার্তা হিসাবেই দেখছেন ভোট বিশেষজ্ঞেরা।
অপেক্ষাবেন সোনির জয় গোধরার ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক আখ্যানকে মৌলিক ভাবে বদলে দিয়েছে। ৭ নম্বর ওয়ার্ডের নিবন্ধিত ভোটার না হওয়া সত্ত্বেও তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।
মুসলিম ভোটারদের জোরালো সমর্থনের ফলেই অপেক্ষাবেনের এই জয় সম্ভব হয়েছে। প্রচলিত ধর্মীয় ও জাতিভিত্তিক ভোটদানের রীতির ঊর্ধ্বে উঠে তাঁরা এমন এক জন প্রার্থীকে নির্বাচিত করেছেন যাঁকে তাঁরা স্থানীয় ভাবে এলাকার উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করেছেন।
এই ফলাফলকে গোধরার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক বলে প্রশংসা করা হচ্ছে, যা সাম্প্রদায়িক ভ্রাতৃত্ব এবং সামাজিক সংহতির এক বিরল উদাহরণ হিসাবে কাজ করছে।
রাজনীতিকদের একাংশ মনে করছেন, মুসলিম অধ্যুষিত ৭ নম্বর ওয়ার্ডে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে এক হিন্দু মহিলাকে নির্বাচিত করার মাধ্যমে গোধরার ভোটারেরা এমন এক রায় দিয়েছেন, যা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ঊর্ধ্বে ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও স্থানীয় আস্থাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ‘গোধরা মডেল’ ভবিষ্যতে গ্রামীণ ও আধা-শহুরে গুজরাতের স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা পদ্ধতিতে একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।
গুজরাতের শহরাঞ্চলে প্রায় সম্পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করে বিজেপি ১৫টি পুরনিগমের (মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন) সব ক’টিতেই জয় নিশ্চিত করেছে। শুধু অহমদাবাদেই ১৯২টি আসনের মধ্যে ১৫৮টিতে জয়লাভ করেছে বিজেপি। কংগ্রেস সেখানে পেয়েছে মাত্র ২২টি আসন।
সুরতেও ১২০টি আসনের মধ্যে ১১৫টি আসনে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে বিজেপি। প্রতিদ্বন্দ্বী আম আদমি পার্টি বা আপ জিতেছে মাত্র চারটি আসনে। কংগ্রেস একটিতে।
রাজকোট এবং বডোদরাতেও একই চিত্র। দু’টি পুরসভাতেই ৬৫টি করে আসন দখল করেছে বিজেপি। অন্য দিকে, কংগ্রেসকে দুই অঙ্কের আসনসংখ্যা পেতেও হিমশিম খেতে হয়েছে।
ভোটারতালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) পরে পুর নির্বাচনই ছিল গুজরাতের প্রথম ভোট। আগামী বছর বিধানসভা নির্বাচনের আগে ১৫টি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের নির্বাচনকে তাই ‘সেমিফাইনাল’ হিসাবে দেখছিলেন রাজনীতিকেরা।
ফলাফলে ১৫টি পুরনিগমের সব ক’টিতে বিজেপি জিতে যাওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহেরা। অন্য দিকে, অতীতে নিজেদের অন্যতম শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলেও এ বার বহু পুরসভায় খাতা খুলতে ব্যর্থ হয়েছে আপ। আপ খাতা খুলতে ব্যর্থ হয়েছে পোরবন্দর, নবসারী, গান্ধীধাম, নডিয়াদ, করমসদ-আনন্দ, ভাবনগর, রাজকোটের মতো শহুরে এলাকায়।
গত রবিবার গুজরাতের ১৫টি পুরনিগম ছাড়াও ৮৪টি পুরসভা, ৩৪টি জেলা পঞ্চায়েত ও ২৬০টি তালুকে পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়। আগামী বছর বিধানসভা নির্বাচনের আগে শহর ও গ্রামীণ এলাকায় জনসমর্থন কতটা গেরুয়া শিবিরের পক্ষে, তা মেপে নেওয়ার সুযোগ ছিল বিজেপির কাছে।
ফলাফলে দেখা গিয়েছে জামনগর, পোরবন্দর, নবসারী, বাপী, সুরত, সুরেন্দ্রনগরের মতো ১৫টি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বিজেপি। এর মধ্যে মোরবী পুরসভার ৫২টি আসনের সব ক’টিতে জিতেছে বিজেপি। পোরবন্দরেও ৫২টি আসনে জিতেছে বিজেপি। অন্য দিকে, সুরেন্দ্রনগরে ৫১টি আসনে বিজেপি ও একটি আসনে জিতেছে কংগ্রেস।
এ বারের নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ১৮ লক্ষেরও বেশি। ভোটারতালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কারণে আগের চেয়ে ভোটার বেশ কিছুটা কমেছে বলেই জানিয়েছিল কমিশন। ফলে ভোটদানের হার ছিল অতীতের চেয়ে কম। কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুরনিগমে ৫৫.১ শতাংশ, পুরসভায় ৬৫.৫৩ শতাংশ, জেলা পঞ্চায়েতে ৬৬.৬৪ শতাংশ এবং ব্লক পঞ্চায়েতে ৬৭.২৬ শতাংশ ভোট পড়েছে।
সব মিলিয়ে গোটা রাজ্যে ৯৯০০টি আসনে ভোট হয়েছে, তাতে বিজেপি জিতেছে ৬৪৭২টি আসন। কংগ্রেস পেয়েছে ১৪১২টি আসন, আপ পেয়েছে ৫৯৭টি আসন। আসাদুদ্দিন ওয়েইসির দল পেয়েছে ছ’শোর কাছাকাছি আসন।
গুজরাতে পুর নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সমাজমাধ্যমে লেখেন, ‘‘গুজরাতের মানুষের সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক আরও মজবুত হল। মানুষ রাজ্য সরকারের ভাল কাজ দেখে স্বচ্ছ প্রশাসনের লক্ষ্যে ভোট দিয়েছেন।’’
সব ছবি: পিটিআই, এক্স, সংগৃহীত, ফাইল।