ফের রক্তাক্ত পাকিস্তানের বালোচিস্তান। সেখানকার বিদ্রোহী গোষ্ঠী বালোচ লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়েছে ইসলামাবাদের ফৌজ। রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলদের দাবি, এখনও পর্যন্ত ১৪৫ জন বিদ্রোহীকে নিকেশ করেছেন তাঁরা। অন্য দিকে, প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করে জওয়ান ও অফিসার মিলিয়ে ১৫০ পাক সৈনিককে খতম করার খবর দিয়েছে বিএলএ। গোটা ঘটনার নেপথ্যে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব খাড়া করে ভারতের দিকে আঙুল তোলে পশ্চিমের প্রতিবেশী, যা পত্রপাঠ উড়িয়ে দিতে সময় নেয়নি নয়াদিল্লি।
পাক গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বালোচিস্তান। সেখানকার বিভিন্ন প্রদেশের সেনাঘাঁটি ও পুলিশ চৌকিতে অতর্কিতে আক্রমণ চালাতে থাকে বিএলএ। কোথাও কোথাও হয় আত্মঘাতী বিস্ফোরণও। এর পরই পাল্টা প্রত্যাঘাতে নামে ইসলামাবাদের ফৌজ, ১ ফেব্রুয়ারি যা নিয়ে মুখ খোলেন বালোচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ় বুকতি। তাঁর দাবি, ৪০ ঘণ্টা ধরে দু’পক্ষের মধ্যে টানা চলেছে গুলির লড়াই। আর তাতে ১৭ জন সৈনিক ও ৩১ জন সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের প্রতিরক্ষাদাবি, বালোচিস্তানের বিদ্রোহের জন্য ধীরে ধীরে গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। সেনাবাহিনী থেকে রাজনৈতিক দল, ইসলামাবাদে যে সরকারই থাকুক না কেন, তার প্রতি আমবালোচদের মনে বাড়ছে বিদ্বেষ। এর জেরে স্বাধীনতা চেয়ে বর্তমানে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র তুলে নিয়েছেন তাঁদের একাংশ। বাকিরা অহিংস পদ্ধতিতে চালাচ্ছেন আন্দোলন। বিদ্রোহের সেই আগুনকে বুটে পিষে নিবিয়ে দিতে বার বার তৎপর হতে দেখা গিয়েছে রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলদের।
বালোচিস্তানের এই বিদ্রোহের নেপথ্যে রয়েছে একাধিক আর্থিক ও রাজনৈতিক কারণ। পাকিস্তানের চারটি প্রদেশের মধ্যে আয়তনে বালোচিস্তানই সবচেয়ে বড়। পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশটির প্রায় ৪৪ শতাংশ জমি নিয়ে গড়ে উঠেছে ওই প্রদেশ। কৌশলগত দিক থেকে এর গুরুত্ব অপরিসীম। বালোচিস্তানের দক্ষিণে আরব সাগর উপকূলে রয়েছে পাক নৌসেনার তিনটি ঘাঁটি। পাশাপাশি, ওই এলাকা আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যের অন্যতম প্রধান পথ হিসাবে ব্যবহার করে ইসলামাবাদ। পাহাড় ও মরুভূমিতে ঘেরা এই প্রদেশটির পশ্চিমে ইরান ও উত্তরে আফগানিস্তান।
এ-হেন পাক প্রদেশ বালোচিস্তানে রয়েছে বিপুল খনিজ সম্পদ। সেখানে আছে সোনা ও ইউরেনিয়ামের খনি। ১৯৯৯ সালে এখানেই পরমাণু বোমার পরীক্ষা করেছিল ইসলামাবাদ। সাধারণত, সমুদ্র উপকূলবর্তী ও খনি সম্বলিত এলাকাগুলির দ্রুত আর্থিক সমৃদ্ধি ঘটে। কিন্তু বালোচিস্তানের ক্ষেত্রে সেই হিসাব একেবারেই মেলেনি। বর্তমানে এখানকার ৭০ শতাংশ বাসিন্দা দারিদ্রসীমার নীচে রয়েছেন। আর ১৫ শতাংশ বালোচ ভুগছেন হেপাটাইটিস বি এবং সি-তে।
দুনিয়াখ্যাত সমীক্ষক সংস্থাগুলির দাবি, বালোচিস্তানের প্রায় ১৮ লাখ শিশু স্কুলে পড়ার সুযোগই পায় না। সেখানকার পাঁচ হাজার বিদ্যালয়ে রয়েছে একটি মাত্র ক্লাসরুম। পাকিস্তানের মৃত্যুহার যেখানে প্রতি এক লক্ষে ২৭৮, সেখানে বালোচিস্তানে তা ৭৮৫। মৃত্যুহারের এই পার্থক্যের পিছনে রয়েছে অত্যন্ত নিম্নমানের স্বাস্থ্য পরিষেবা।
১৯৫৮ সালের অক্টোবরে প্রথম বার পুরোপুরি সেনাশাসনে চলে যায় পাকিস্তান। ওই সময় প্রদেশভিত্তিক ভেদাভেদও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আন্দোলন শুরু করেন বালোচ নেতারা। জেনারেল ইয়াহিয়া খান কুর্সিতে এসে সেই নিয়ম বদল করেন। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে জুলফিকর আলি ভুট্টো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলে ‘হায়দরাবাদ ষড়যন্ত্র’-এর নাম দিয়ে বালোচিস্তানের সমস্ত রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতার করেন।
বালোচ নেতারা ধরা প়ড়তেই গোটা এলাকায় ব্রিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। তাঁদের সঙ্গে গেরিলা যুদ্ধে এঁটে উঠতে পারেনি পাক সেনা। বাধ্য হয়ে ইরানের সাহায্য নেয় ইসলামাবাদ। তেহরান থেকে পাথুরে মরুভূমি এলাকাটির উপর লাগাতার চলে কপ্টার ও যুদ্ধবিমানে হামলা। ১৯৭৭ সালে ভুট্টোকে সরিয়ে জেনারেল জিয়াউল হক ফের পাকিস্তানে সেনাশাসন শুরু করার আগে পর্যন্ত বার বার রক্তাক্ত হয়েছে বালোচিস্তান।
জেনারেল জিয়ার শাসনকালে তুলনামূলক ভাবে শান্ত ছিল পাকিস্তানের এই প্রদেশ। কিন্তু, ২১ শতকের গোড়ার দিকে নতুন করে সেখানে বিদ্রোহ দানা বাঁধতে শুরু করে। ওই সময় সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল পারভেজ মুশারফ। ফৌজের বুটের তলায় বালোচ বিদ্রোহীদের পিষে দেওয়ার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন তিনি।
সময় থেকেই বিদ্রোহ দমনের নামে পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের (ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিমুশারফেরজেন্স) বিরুদ্ধে বালোচ যুবকদের অপহরণের অভিযোগ উঠতে শুরু করে। ২০১৩ সালে বেজিংয়ের সঙ্গে মিলে চায়না পাকিস্তান ইকোনমিক করিডরের (সিপিইসি) কাজ শুরু করে ইসলামাবাদ। বালোচিস্তানের গ্বদর বন্দর থেকে চিনের শিনজিয়াং প্রদেশের কাশগড় পর্যন্ত প্রায় দু’হাজার কিলোমিটার লম্বা রাস্তা তৈরির কথা বলা হয়েছে এই প্রকল্পে।
প্রাথমিক ভাবে সিপিইসিতে স্থানীয় বালোচ যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ, বেজিং বা ইসলামাবাদ, কেউই সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি। উল্টে গ্বদরে নতুন বন্দর তৈরি করায় সেখানে মৎস্য শিকারের অধিকার হারিয়েছেন বালোচেরা, যা নতুন করে গোটা প্রদেশটির স্বাধীনতার দাবিকে জোরদার করেছে।
বালোচিস্তানের সুই এলাকায় মেলে প্রাকৃতিক গ্যাস। সেই প্রাকৃতিক সম্পদের কানাকড়িও পৌঁছোয় না আমবালোচদের কাছে। পাইপলাইন মারফত লাহৌর, মুলতান, ইসলামাবাদ বা রাওয়ালপিন্ডিতে ওই গ্যাস সরবরাহ করছে পাক সরকার। এ ছাড়া সেখানকার জনজাতির জমি দখলেরও অভিযোগ রয়েছে পশ্চিম পারের প্রতিবেশী দেশটির সেনাবাহিনীর উপর।
গত বছর (২০২৫ সাল) ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর বেশ কয়েক বার যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনান্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেন পাকিস্তানের সেনা সর্বাধিনায়ক (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। বালোচিস্তানে বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজ আছে বলে পোটাসকে বোঝাতে সক্ষম হন তিনি। এর পরই ইসলামাবাদের খনি প্রকল্পে লগ্নি বৃদ্ধি করে ওয়াশিংটন। মুনিরের এই পদক্ষেপে ক্ষোভ বেড়েছে বালোচ বিদ্রোহীদের। তাঁদের দাবি, এর মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করার ফন্দি রয়েছে রাওয়ালপিন্ডির ফিল্ড মার্শালের।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বাধীনতার দাবিতে পাক সেনা ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন হেরফ’ নামের একটি অভিযানে নামে বালোচ লিবারেশন আর্মি। প্রথমেই জ়াফর এক্সপ্রেসকে নিশানা করে তারা। বিদ্রোহীদের সেই হামলায় একগুচ্ছ সৈনিক হারায় ইসলামাবাদ। ওই ঘটনার পর থেকে ক্রমাগত সেনা ও আধা সেনার কনভয়কে নিশানা করেছে সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী। শুধু তা-ই নয়, বালোচিস্তানের অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সমর্থনও বিএলএ পাচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
গত বছর শুরু করা ওই ‘অপারেশন হেরফ’ এখনও বন্ধ করেনি বালোচ লিবারেশন আর্মি। সূত্রের খবর, তাঁদের এ বারের আক্রমণ অনেক বেশি প্রাণঘাতী হওয়ায় পাক সেনার মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ১ ফেব্রুয়ারি বিএলএ-র আক্রমণ নিয়ে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খোলে ইসলামাবাদের ফৌজের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ দফতর বা আইএসপিআর (ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস)। একটি বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, বালোচিস্তানের কোয়েটা, নুশকি, মাসটাং, ডালবান্দিন, খারান, পাঞ্জগুর এবং গ্বদরে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
অন্য দিকে দুই তরুণী আত্মঘাতী হামলাকারীর (সুইসাইড বম্বার) ছবি প্রকাশ করে পাল্টা প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বিএলএ। সশস্ত্র গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, এ বারের সামরিক অভিযানের প্রায় পুরোটারই নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁরা। আত্মঘাতী হামলাকারীদের একজন বছর ২৪-এর আসিফা মেঙ্গল। ২১ বছরের জন্মদিনে তিনি মাজ়িদ ব্রিগেডে যোগ দেন বলে দাবি করেছে বিএলএ। ৩১ জানুয়ারি নুশকিতে আইএসআইয়ের দফতরে আঘাত হানেন তিনি। হামলাকারী দ্বিতীয় তরুণীর একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করেছে বালোচ বিদ্রোহীরা। যদিও তাঁর নাম জানা যায়নি।
আত্মঘাতী হামলার ঠিক আগে দ্বিতীয় তরুণীর একটি ভিডিয়ো রেকর্ড করে বিএলএ। সেখানে অন্য এক জনের সঙ্গে তাঁকে কথা বলতে দেখা গিয়েছে। হাতে বন্দুক নিয়ে হাসতে হাসতে তিনি বলেছেন, ‘‘ওরা (পাক সরকার) আমাদের মা-বোনেদের দমিয়ে রাখতে শুধু গায়ের জোর দেখায়। সরাসরি আমাদের মুখোমুখি হতে পারে না। সেই ক্ষমতা নেই। আমাদের জাগতে হবে।’’
বালোচিস্তানের হামলা প্রসঙ্গে পাক সেনাবাহিনীর অভিযোগ, যাবতীয় ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে ভারতের হাত। সেখানকার জঙ্গিদের মদত দিচ্ছে নয়াদিল্লি। বালোচিস্তানের শান্তি বিঘ্নিত করার চেষ্টা করছে বিদেশি শক্তি। যদিও এই দাবির সমর্থনে কোনও প্রমাণ দেখাতে পারেনি ইসলামাবাদ। এই নিয়ে শোরগোল পড়তেই জবাব দেয় ভারতের বিদেশ মন্ত্রক।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘‘আমরা পাকিস্তানের ভিত্তিহীন দাবিগুলি প্রত্যাখ্যান করছি। নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা থেকে মনোযোগ সরাতে এই কৌশল নিয়েছে তারা। কোনও সহিংস ঘটনা ঘটলে তা তুচ্ছ বলে দাবি করে ইসলামাবাদ। সেই দাবি থেকে বিরত থেকে ওই অঞ্চলের জনগণের দীর্ঘকালীন দাবি পূরণের দিকে মনোনিবেশ করলে ভাল হবে।’’
সব ছবি: সংগৃহীত।