জঙ্গিহামলায় ফের রক্তাক্ত বুরকিনা ফাসো। পশ্চিম আফ্রিকার ওই দেশে নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে কুখ্যাত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আল-কায়দা। সেই সঙ্গে আক্রমণের তেজ বাড়িয়েছে ইসলামিক স্টেট বা দায়েশ। তাদের সাঁড়াশি চাপে এ বার কুর্সি হারাবেন সাবেক ফরাসি উপনিবেশের সামরিক শাসক ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ট্রায়ো? না কি হামলাকারীদের বুটের তলায় পিষে দেবে তাঁর সেনা? ‘অন্ধকার মহাদেশে’ গরম হাওয়া পাক খেয়ে উঠতেই বাড়ছে জল্পনা।
২০২২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বুরকিনা ফাসোর ক্ষমতা দখল করেন ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম। কুর্সিতে বসেই শান্তি ও পরিকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলিতে জোর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। যদিও গত পাঁচ বছরে জঙ্গিহামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে তাঁর সরকার। এর সর্বশেষ উদাহরণ হিসাবে ফেব্রুয়ারির ঘটনাগুলির কথা বলা যেতে পারে, যাকে ইব্রাহিমের গদি নাড়িয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত বলেই মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা চার দিন বুরকিনা ফাসোর একাধিক জায়গায় হামলা চালায় কয়েকশো জঙ্গি। ক্যাপ্টেন ইব্রাহিমের শক্তির ভরকেন্দ্র সামরিক ছাউনিগুলিকে নিশানা করে তারা। সন্ত্রাসীদের অতর্কিত আক্রমণে প্রাণ হারান একগুচ্ছ অফিসার ও সৈনিক। ‘অপারেশন’ শেষে দ্রুত যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যায় জঙ্গিরা। সংশ্লিষ্ট হামলার দায় কেউ স্বীকার না করলেও নেপথ্যে আল-কায়দা ও দায়েশ, দুই কুখ্যাত গোষ্ঠীরই হাত আছে বলে মনে করা হচ্ছে।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি প্রথম হামলাটি হয় বুরকিনা ফাসোর পূর্ব দিকের বেলাঙ্গা সেনাছাউনিতে। ঠিক তার পরের দিন অন্য দু’টি সেনাঘাঁটিকে নিশানা করে সন্ত্রাসীরা। সেগুলির নাম চিটাও এবং তানজ়ারি। ১৫ তারিখ সর্বশেষ আক্রমণের ঘটনাটি ঘটে নারে এলাকার সেনাছাউনিতে। অফিসার ও সেনা ছাড়া জঙ্গিরা সেখানে কর্মরত স্বেচ্ছাসেবকদের বুকও গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয়। প্রাণ হারান সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলির নিরীহ নাগরিকেরাও।
জঙ্গিদের এই হত্যাকাণ্ডে মোট কত জনের মৃত্যু হয়েছে, তা অবশ্য স্পষ্ট করেনি বুরকিনা ফাসোর সরকার। যদিও স্থানীয় সূত্রে খবর, বেলাঙ্গার সেনাছাউনির হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। মোট মৃতের সংখ্যা ৪০ ছাড়াতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশটির উত্তরে রয়েছে মালি এবং পূর্বে নাইজ়ার। এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে আল-কায়দা এবং দায়েশের শক্ত ঘাঁটি বলা যেতে পারে। এ বারও সেখান থেকেই যে নাশকতার পরিকল্পনা হয়েছে, তা একরকম স্পষ্ট।
গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) মার্চে ইব্রাহিমের নির্দেশে সোলেনজ়ো শহরে ঝাঁপিয়ে পড়ে বুরকিনা ফাসোর সরকারি ফৌজ। তাঁদের সঙ্গে ছিল বেশ বড়সড় একটা ভাড়াটে বাহিনী। দুই সেনার যৌথ অভিযানে প্রাণ হারান কমপক্ষে ১৩০ জন বাসিন্দা। এই গণহত্যার খবর প্রথম বার প্রকাশ্যে আনে ‘হিউম্যান রাইট্স ওয়াচ’ নামের একটি নজরদার সংস্থা। বিবিসি-সহ একাধিক পশ্চিমি গণমাধ্যমে তা প্রকাশিত হতেই আফ্রিকা জুড়ে হইচই পড়ে যায়।
ইব্রাহিম সরকারের গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) ওই অভিযানে কপাল পোড়ে ফুলানি নামের একটি স্থানীয় জনজাতির। ইসলাম ধর্মাবলম্বী ওই গোষ্ঠী কয়েকশো বাসিন্দাকে রাতারাতি ঘরছাড়া হতে হয়। মাথার ছাদ থেকে শুরু করে দু’বেলা দু’মুঠো খাবার— এক ধাক্কায় সব কিছু হারিয়ে ফেলেন তাঁরা। ওই সময় আল-কায়দার সবচেয়ে বড় সমর্থক বলে ফুলানিদের দিকে আঙুল তুলেছিল বুরকিনা ফাসোর প্রশাসন, যাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই।
২০২৫ সালের এপ্রিল-মে মাস নাগাদ ইব্রাহিম সরকারের বিরুদ্ধে আরও এক বার গণহত্যার অভিযোগ তোলে ‘হিউম্যান রাইট্স ওয়াচ’। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই সময় ফুলানিদের একটি গ্রামে ঢুকে ২২৩ জনকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয় ক্যাপ্টেন ট্রায়োর ফৌজ। এর জেরে হইচই শুরু হলে অভিযুক্ত সেনা অফিসারদের কড়া শাস্তির মুখে পড়তে হয়। যদিও ‘হিউম্যান রাইট্স ওয়াচ’-এর ওই রিপোর্টকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেয় বুরকিনা ফাসোর প্রশাসন।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, ইব্রাহিম সরকার দায় স্বীকার না করলেও সরকারি বাহিনীর প্রত্যাঘাতে পশ্চিম আফ্রিকার দেশটির মাটি যে রক্ত ভিজেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক ছাউনিতে হামলা ২০২৫ সালের ঘটনাগুলির ‘বদলা’ হতেই পারে। তদন্তে সেই তত্ত্ব সামনে এলে গদিতে থাকা ট্রায়োর বাড়বে রক্তচাপ। তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে আল-কায়দা ও দায়েশ।
বুরকিনা ফাসোর অশান্তির নেপথ্যে আবার অন্য যুক্তিও রয়েছে। ১৮৯৬ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশটিতে উপনিবেশ গড়ে তোলে ফ্রান্স। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-’১৮) পরবর্তী সময়ে সেখান থেকে সম্পদ লুটের পরিমাণ বাড়িয়ে দেন প্যারিসের শাসকেরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-’৪৫) পর অবশ্য তাঁদের সেই নিয়ন্ত্রণ আর থাকেনি। ১৯৬০ সালের অগস্টে ইউরোপীয় দেশটির থেকে পুরোপুরি স্বাধীনতা পায় বুরকিনা ফাসো। যদিও সেখানে ফরাসি প্রভাব একেবারে মুছে যায়নি।
বুরকিনা ফাসো স্বাধীন হলেও এর ভিতরে একাধিক জায়গায় ছিল ফরাসি সামরিক ঘাঁটি। বাহিনী মোতায়েন থাকায় গত কয়েক দশকে আফ্রিকার দেশটির অভ্যন্তরীণ বহু ব্যাপারে প্যারিসের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ‘নাক গলাতে’ দেখা গিয়েছে। ইব্রাহিম ক্ষমতায় এসে ফ্রান্সের সঙ্গে এই সংক্রান্ত চুক্তি বাতিল করেন। ফলে ২০২৩ সালে সেখান থেকে ফৌজ সরাতে বাধ্য হয় ‘নেপোলিয়নের দেশ’, যা কখনওই ভাল চোখে দেখেননি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ।
ইব্রাহিম অবশ্য গোড়া থেকেই বুরকিনা ফাসোকে পশ্চিমি প্রভাব মুক্ত করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোভাব দেখিয়ে এসেছেন। এর জেরে সমর্থকেরা তাঁকে ‘আফ্রিকার চে গেভারা’ বলে উল্লেখ করে থাকেন। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাদেশটির বাইরেও তাঁর জনপ্রিয়তা রয়েছে। কেউ কেউ আবার তাঁকে মার্কসবাদী বিপ্লবী থমাস সাঙ্কারার উত্তরসূরি মনে করেন। এ-হেন পরিস্থিতিতে পুরনো জমি ফিরে পেতে ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিছোতে পারে ফ্রান্স, বলছেন বিশ্লেষকেরা।
বিশ্লেষকদের দাবি, দু’টি কারণে প্যারিসের পক্ষে বুরকিনা ফাসোর লোভ ছাড়া অসম্ভব। প্রথমত, ফ্রান্সের সঙ্গে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে রাশিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন ইব্রাহিম। ফলে মস্কোর বাহিনী মোতায়েন হয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার ওই দেশে। এর জেরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাদেশটির বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রভাব হারাতে বসেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ। আর তাই ইব্রাহিমকে গদিচ্যুত করতে পর্দার আড়ালে থেকে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলিকে মদত দিতে পারে তাঁর গুপ্তচরবাহিনী ডিজিএসই (দিরেক্সিওঁ জেনারেল দ্য লা সেক্যুরিতে এক্সতেরিয়্যর)।
দ্বিতীয়ত, আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদ সমৃদ্ধ দেশগুলির মধ্যে অন্যতম হল বুরকিনা ফাসো। সেখানে রয়েছে বেশ কয়েকটা সোনার খনি। ক্ষমতায় এসে সেগুলিকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফেলেন ইব্রাহিম। ফলে সংশ্লিষ্ট খনিগুলির মালিকানা পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হয় ফ্রান্সের। এর জেরে সেখানে দ্রুত ক্ষমতা বদল চাইছেন প্যারিসের রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
গত বছর ইব্রাহিমের ব্যাপারে গণমাধ্যমে মুখ খোলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ। তাঁর কথায়, ‘‘পশ্চিম আফ্রিকায় আশন্তি তৈরি করছেন ওই সামরিক শাসক। তাঁর স্বৈরাচারী মনোভাবের জন্য বহু নিরীহ বাসিন্দাকে প্রাণ দিতে হচ্ছে। ফ্রান্সের নিরাপত্তা সে দেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল। নিজের স্বার্থে প্যারিসের সঙ্গে সেই চুক্তি ভেঙেছেন তিনি। ফলে জঙ্গিহামলা আটকাতে আমরা বাহিনী মোতায়েন করতে পারছি না।’’
মাক্রোঁর ওই মন্তব্যের পরেও ৩৭ বছরের ইব্রাহিমের জনপ্রিয়তা কমেনি। কেনিয়ার মতো দেশের রাজনীতিবিদদের মুখেও বার বার উঠে এসেছে তাঁর কথা। ২০২৩ সালে রাশিয়া-আফ্রিকা শীর্ষ সম্মেলনে এক বিস্ফোরক বক্তৃতা করেন বুরকিনা ফাসোর এই রাষ্ট্রনেতা। বলেন, ‘‘পশ্চিমি সাম্রাজ্যবাদীদের কথায় আফ্রিকার নেতাদের নাচা এবং পুতুলের মতো আচরণ করা অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত।’’
বুরকিনা ফাসোর জনগণের একাংশের মতে, ইব্রাহিম ক্ষমতায় আসার পর পরিকাঠামোর দিক থেকে উন্নত হচ্ছে দেশ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবাকে নতুন ভাবে সাজানোর চেষ্টা করছেন তিনি। নিম্নবিত্তদের জন্য হাজারের বেশি আবাসন তৈরির একটি প্রকল্পে হাত দিয়েছে তাঁর সরকার, ২০৩০ সালের মধ্যে যা শেষ হবে বলে জানা গিয়েছে।
তা ছাড়া অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতার জন্যও প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ইব্রাহিম। আন্তর্জাতিক মুদ্রাভান্ডার বা আইএমএফের (ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড) আর্থিক সহায়তা প্রত্যাখ্যান করে দেশীয় সম্পদের মাধ্যমে স্বনির্ভর হওয়ার কথা বলেছেন তিনি। অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসাবে কৃষি, স্থানীয় শিল্প এবং উন্নয়নকেই নাকি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন বুরকিনা ফাসোর তরুণ নেতা।
গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) বুরকিনা ফাসোয় ২০০টি মসজিদ তৈরি করে দেওয়ার প্রস্তাব দেয় সৌদি আরব। কিন্তু রিয়াধের সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন ইব্রাহিম। তার বদলে দেশে স্কুল-হাসপাতাল তৈরি এবং কর্মসংস্থান হতে পারে এমন ব্যবসায় বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি। তাঁর এই সিদ্ধান্তের ব্যাপক প্রচার চালাতে দেরি করেনি রুশ গণমাধ্যম।
এত কিছুর পরেও অবশ্য ইসলামীয় সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করতে পারেননি ইব্রাহিম। উল্টে বর্তমানে বুরকিনা ফাসোর প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে আল-কায়দা ও দায়েশ। এই পরিস্থিতিতে ফরাসি মদত পেলে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে তারা। তখন কৃষ্ণবর্ণ ও পেটানো চেহারার দীর্ঘদেহী তরুণ সামরিক শাসকটির সৌভাগ্য-সূর্য অস্ত যায় কি না, সেটাই এখন দেখার।
সব ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।