কৃত্রিম মেধা কি সত্যিই থাবা বসাচ্ছে চাকরির বাজারে? এই ভয় চেপে বসেছে বিশ্ব জুড়ে। আশঙ্কা ছড়িয়েছে, বিশ্ব জুড়ে অনেক কাজ কেড়ে নেবে এআই। এর প্রভাব পড়বে কম-বেশি সব দেশেই। মনে করা হচ্ছে, কৃত্রিম মেধা দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে বহু সংস্থাই কর্মীসঙ্কোচনের পথে হাঁটবে।
বর্তমানে চারদিকে চাকরি গেল গেল রব। অনেকেই মনে করছেন, চাকরির বাজারে ভবিষ্যতে ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই। কৃত্রিম মেধার আগ্রাসী প্রসারের কারণে বিভিন্ন সংস্থা মানবসম্পদের বোঝা কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর হতে চাইছে। তেমন আশঙ্কার কথা উঠে আসছে বার বার।
চাকরির বাজারে বিগত কয়েক বছর ধরে এ নিয়ে বিভিন্ন রকম আশঙ্কা-উদ্বেগ চলছেই। এআই বিশেষজ্ঞেরাও সতর্ক করেছেন, কৃত্রিম মেধার দ্রুত অগ্রগতি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক আগেই কর্মক্ষেত্রকে নতুন করে রূপ দিতে পারে।
বিশ্ব জুড়ে যখন কৃত্রিম মেধার বাড়বাড়ন্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তখন সেই এআইয়ের বিরুদ্ধে মুখ খুললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এআই ব্যবস্থাকে মুহূর্তে নিষ্ক্রিয় করার জন্য কিল সুইচ-এর প্রয়োজনীয়তার পক্ষে কথা বলতে শোনা গিয়েছে তাঁকে।
ট্রাম্পের দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) একটি ‘কিল সুইচ’ থাকা উচিত। এর মাধ্যমে এআই-এর দ্রুত অগ্রগতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে এবং নিশ্চিত করা যাবে যে এই অগ্রগতি এমন কোনও পরিস্থিতি তৈরি না করে, যেখানে মানবজাতির অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে পড়বে।
বুধবার প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এ-ও মন্তব্য করেছেন, এআইয়ের সাহায্যে ব্যাঙ্কিংয়ের মতো ক্ষেত্রকে আরও সুরক্ষিত এবং কার্যকর করে উন্নত করার সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমন তা নিয়ে যথেষ্ট ঝুঁকিও রয়েছে।
ফক্স বিজনেস নেটওয়ার্কের সঙ্গে আলোচনার সময় ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, এআই ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে কি না। তিনি ঝুঁকিগুলো স্বীকার করে বলেন, ‘‘হ্যাঁ, সম্ভবত। তবে এটি এমন এক প্রযুক্তিও হতে পারে যা ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে আরও উন্নত, নিরাপদ এবং সুরক্ষিত করে তুলবে।’’
ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, এআই প্রযুক্তির জন্য সরকারি সুরক্ষাব্যবস্থা থাকা উচিত, যার মধ্যে একটি সম্ভাব্য ‘কিল সুইচ’ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। মঙ্গলবার ‘মর্নিংস উইথ মারিয়া’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন।
এখন প্রশ্ন হল কী এই ‘কিল সুইচ’? এটি সফ্টঅয়্যারচালিত একটি বিশেষ ধরনের ডিভাইস। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসেও এই যন্ত্র সক্রিয় করা যেতে পারে এবং এই সুইচে চাপ দিলে সঙ্গে সঙ্গে কাজ করা থামিয়ে দেবে এআই। ফলে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে কৃত্রিম মেধা। ধারণা তেমনটাই।
যদিও এই মুহূর্তে এমন একটি সুইচ কী ভাবে কার্যকর হবে বা আদৌ কার্যকর হবে কি না এবং হলেও তা কখন হবে, সে সম্পর্কে আর কোনও বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি। এআই সংস্থা অ্যানথ্রোপিকের নতুন এআই মডেল, ‘ক্লড মিথোস’ সম্পর্কে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ‘কিল সুইচ’ নিয়ে মন্তব্য করেছেন।
বিশেষজ্ঞেরা সতর্ক করেছেন, ‘ক্লড মিথোস’ জটিল সাইবার আক্রমণকে আরও শক্তিশালী করতে পারে, যা ব্যাঙ্কিংয়ের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। অ্যানথ্রোপিক এই সতর্কবার্তাগুলি নিয়ে এখনও কোনও মন্তব্য করেনি। তবে জানিয়েছে, ‘ক্লড মিথোস’ সকলের জন্য সহজলভ্য হবে না।
মনে করা হচ্ছে অ্যানথ্রোপিকের এআই ‘ক্লড মিথোস’ প্রযুক্তিগত দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী। ইতিমধ্যেই অ্যানথ্রোপিক ৪০টিরও বেশি সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করেছে যারা এই নতুন এআই মডেলটি ব্যবহার করতে পারবে।
‘ক্লড মিথোস’-এর প্রধান ব্যবহার হল, বিভিন্ন সফ্টঅয়্যারের সে সব ত্রুটি শনাক্ত করা যা সেগুলিকে যে কোনও সাইবার আক্রমণের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এটি এখনও জনসাধারণের নাগালের বাইরে। তবে অ্যানথ্রোপিকের প্রকাশ্যে আনা তথ্য থেকে বোঝা যায়, এটি ‘প্রিভিউ’ অবস্থাতেও বিপুল ক্ষমতার অধিকারী। উদাহরণস্বরূপ, এটি একটি সফ্টঅয়্যারে ২৭ বছরের পুরোনো সমস্যা খুঁজে বার করতেও সক্ষম হয়েছে।
একই সঙ্গে ওপেন ও ক্লোজ়ড-সোর্স সফ্টঅয়্যারে বহু সমস্যা শনাক্ত করেছে ‘ক্লড মিথোস’। সমাজমাধ্যমের দৌলতে এমনটাও ছড়িয়েছে যে, মিথোস দৃশ্যত যে কোনও সফ্টঅয়্যার হ্যাক করতে সক্ষম।
যদিও মার্কিন সরকার বর্তমানে অ্যানথ্রোপিককে ‘ঝুঁকি’ হিসাবে চিহ্নিত করার কারণে সে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি এর পরিষেবা নেওয়া বন্ধ করেছে। অ্যানথ্রোপিকের প্রতিষ্ঠাতা তথা ওপেনএআই-এর প্রাক্তন সহ-প্রতিষ্ঠাতা দারিও আমোদি সরকারের দেওয়া এই নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে লড়ছে।
কৃত্রিম মেধার দৌড়ে থাকার তাগিদ স্যাম অল্টম্যানের ওপেনএআই-এর মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও মিথোসের নিজস্ব সংস্করণ চালু করতে উৎসাহিত করছে। ওপেনএআই এটিকে ‘জিপিটি ৫.৪-সাইবার’ বলছে, যা মূলত ‘জিপিটি ৫.৪’-এর একটি উন্নত সংস্করণ এবং বিশেষ ভাবে সফ্টঅয়্যারের ত্রুটি ধরার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
সব ছবি: সংগৃহীত।