কৃষক বিদ্রোহে উত্তাল ইউরোপ। ট্র্যাক্টর নিয়ে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভে শামিল হয়েছেন ফ্রান্স ও জার্মানির ‘অন্নদাতা’রা। অন্য দিকে, পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় খণ্ডযুদ্ধে জড়াতে দেখা গিয়েছে বেলজিয়ামের বিক্ষুদ্ধ চাষিদের। নতুন বছরের গোড়ায় ইউরোপীয় কৃষকদের খেপে ওঠার নেপথ্যে রয়েছে একটি মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি বা এফটিএ (ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট)। তাঁদের এ-হেন বিক্ষোভের সঙ্গে হুবহু মিল রয়েছে ছ’বছর আগের উত্তর ভারতের কৃষক আন্দোলনের, যার মূলে ছিল কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের চালু করা তিনটি ‘বিতর্কিত’ আইন।
চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি প্যারাগুয়ের রাজধানী আসানসিয়নে মারকোসুর গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ফলে ব্রাজ়িল, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে এবং উরুগুয়ের জন্য খুলে গিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ভুক্ত ২৭টি দেশের কৃষিবাজার। গত বছরের (২০২৫ সালের) ডিসেম্বরে এই সমঝোতার ইঙ্গিত পান ফ্রান্স, জার্মানি ও বেলজিয়ামের ‘অন্নদাতা’রা। সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট চুক্তির ব্যাপারে আপত্তি জানান তাঁরা। কিন্তু তার পরেও এফটিএ সই হওয়ায় দানা বাঁধে বিক্ষোভ।
ইইউ-মারকোসুর মুক্ত বাণিজ্যচুক্তিতে ইউরোপ জুড়ে কৃষক বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠার নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। ফ্রান্স ও জার্মানির বিক্ষোভকারী চাষিদের দাবি, এর জেরে গোমাংস, মুরগির মাংস, চিনি, ইথানল এবং মধুর মতো খাদ্যদ্রব্যের বাজার পুরোপুরি ভাবে চলে যাবে লাটিন (দক্ষিণ) আমেরিকার দেশগুলির দখলে। অন্য দিকে, তাঁদের পক্ষে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ব্রাজ়িল, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে বা উরুগুয়ের ঘরোয়া বাজারে পণ্য বিক্রি করা বেশ কঠিন হবে। সেই আতঙ্ক থেকেই এই আন্দোলন বলে জানা গিয়েছে।
মারকোসুর-ভুক্ত দেশগুলির সঙ্গে এফটিএ-র ব্যাপারে সর্বাধিক আগ্রহ দেখিয়েছে জার্মানি। পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির দাবি, বার্লিনের পীড়াপীড়িতেই শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সমঝোতায় রাজি হয় ফ্রান্স ও পোল্যান্ড। তার পরও মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি হওয়ার মুখে এই নিয়ে বিবৃতি দিয়ে সরকারের উপর চাপ বাড়ান ফরাসি কৃষিমন্ত্রী অ্যানি জেনেভার্ড। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘নিজেদের পেটে গামছা বেঁধে এফটিএ-তে সই করা অর্থহীন। লাভ-লোকসানের যাবতীয় সূক্ষ্ম হিসাব সেরে তার পর এই ধরনের সমঝোতা করা উচিত।’’
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গত ২৫ বছর ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছিল মারকোসুর। কিন্তু, লাটিন (দক্ষিণ) আমেরিকার দেশগুলির সামনে কৃষিবাজার খুলতে কখনওই রাজি হয়নি ইইউ। তাই বার বার বৈঠক হওয়া সত্ত্বেও এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সমঝোতায় আসতে পারছিল না কোনও পক্ষ। তবে গত বছরের (২০২৫ সাল) জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসাবে দ্বিতীয় বারের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প শপথ নেওয়ার পর যাবতীয় পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। তাঁর চাপিয়ে দেওয়া শুল্ক থেকে বাঁচতে আরও কাছাকাছি আসে ইইউ ও মারকোসুর।
গত বছরের (২০২৫ সাল) এপ্রিলে নতুন ‘পারস্পরিক শুল্ক’ নীতি চালু করেন ট্রাম্প, যার জেরে ইইউ ও লাটিন (দক্ষিণ) আমেরিকার দেশগুলির পণ্যের উপর মোটা অঙ্কের কর চাপায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন। এর জেরে বাণিজ্যিক লোকসানের আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এই দুই গোষ্ঠী। সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যচুক্তিকে এরই অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসাবে গণ্য করেছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। ব্রাজ়িল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে এবং প্যারাগুয়ের সঙ্গে হওয়া এই এফটিএ ২০৪০ সাল পর্যন্ত চালু থাকবে বলে ঘোষণা করেছে ইইউ।
মারকোসুরের সঙ্গে সদ্য সই হওয়া এফটিএ-কে ‘গেম চেঞ্জার’ বলে উল্লেখ করেছে জার্মানি। বার্লিনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দাবি, এর জেরে ৫০ হাজার কোটি ডলারের অতিরিক্ত বাণিজ্য পাবে ইউরোপের বাজার। সংশ্লিষ্ট সমঝোতায় কৃষিপণ্যের পাশাপাশি আমদানি-রফতানির যাবতীয় সামগ্রীর ৯০ শতাংশের উপর থেকে শুল্ক সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে রাজি হয়েছে দু’পক্ষ। বিবাদের বীজ সেখানেই পোঁতা আছে, বলছেন আন্দোলনকারী ইইউয়ের ‘অন্নদাতা’রা।
কৃষক বিদ্রোহে অংশ নেওয়া চাষি ও পশুপালকদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির জেরে প্রতি বছর ৯৯ হাজার টন গোমাংস ইউরোপের ২৭টি দেশের বাজারে পাঠাতে পারবে ব্রাজ়িল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে এবং প্যারাগুয়ে। দামের নিরিখে তা বেশ সস্তা। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের দোহাই দিয়ে মাংস বিক্রির উপর নানা রকম কড়া আইন ও বিধিনিষেধ চালু রেখেছে ইইউয়ের পার্লামেন্ট। মারকোসুর-ভুক্ত দেশগুলিতে এর কোনও বালাই নেই। ফলে সস্তায় বিপুল মাংস উৎপাদন করতে পারছে তারা।
একই কথা মুরগি প্রতিপালন, চিনি, ইথানল এবং মধু উৎপাদনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এগুলি বিক্রির ক্ষেত্রেও ইইউ-ভুক্ত দেশগুলিতে বেশ কিছু কড়া নিয়ম রয়েছে, যার জেরে সস্তায় সংশ্লিষ্ট খাদ্যদ্রব্যগুলি ঘরোয়া বাজারে সরবরাহ করতে পারছেন না ইউরোপীয় ‘অন্নদাতা’রা। বিষয়টি নিয়ে তাই গণমাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছেন ফ্রান্সের কৃষিখামার সংগঠনের সভাপতি হোসে পেরেজ়। তাঁর কথায়, ‘‘এই মুক্ত বাণিজ্যচুক্তিতে আমাদের কোনও লাভ নেই। ক্ষমতাবানদের কানে সেই কথা পৌঁছে দেওয়াই এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।’’
বিশ্লেষকদের একাংশ অবশ্য ইইউ-মারকোসুর এফটিএ ‘একমুখী’ মানতে নারাজ। তাঁদের দাবি, এর জেরে লাভবান হবে ইউরোপীয় শিল্পগোষ্ঠী। ব্রাজ়িল, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে এবং উরুগুয়ের মতো দেশগুলিতে গাড়ি, বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম-সহ অন্যান্য শিল্পপণ্য বিক্রির সুযোগ থাকবে তাদের হাতে। বর্তমানে তা পুরোপুরি দখল করে রেখেছে চিন। মারকোসুরের মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি লাটিন (দক্ষিণ) আমেরিকার বাজারে বেজিংকে পিছনে ফেলতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে।
যদিও এই যুক্তি আন্দোলনরত ইউরোপীয় কৃষকদের মন ভোলাতে পারেনি। উল্টে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে পাল্টা স্লোগান দিতে দেখা গিয়েছে তাঁদের। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির সর্বাধিক মুনাফা আগামী দিনে ঘরে তুলবে জার্মানি। কারণ গাড়ি বিক্রির বিরাট বাজার হাতে পেয়ে গিয়েছে বার্লিন। সেই কারণেই কৃষক এবং পশুপালকদের কথা ভাবছে না তারা।
এ বছরের গোড়া থেকেই ফ্রান্স, পোল্যান্ড এবং বেলজিয়ামের মতো দেশগুলিতে কৃষক আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। অধিকাংশ জায়গাতেই ট্র্যাক্টর দিয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে শামিল হন সেখানকার ‘অন্নদাতা’রা। চুক্তি হয়ে যাওয়ার খবর আসার পর অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে প্যারিস ও ব্রাসেলসের মতো শহর। সেখানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন আন্দোলনকারীরা। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটাতে হয় উর্দিধারীদের।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির একাংশের দাবি, কৃষক বিদ্রোহ তীব্র আকার নেওয়ায় ইউরোপীয় দেশগুলিতে পণ্য পরিবহণ কঠিন হয়েছে। বহু জায়গাতেই সমুদ্রবন্দরে রফতানি সামগ্রী নিয়ে যেতে দেননি আন্দোলনকারী ‘অন্নদাতা’রা। হাইওয়েতে অবস্থান বিক্ষোভের সময় হাতে প্ল্যাকার্ড ধরা ছিল তাঁদের। বিক্ষুব্ধ চাষিদের দাবি, সংশ্লিষ্ট মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির জেরে খাদ্য স্বনির্ভরতা হারাবে ইইউ। আগামী দিনে লাটিন (দক্ষিণ) আমেরিকার দেশগুলির উপর নির্ভর করতে হবে তাদের, পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যা কখনওই কাম্য নয়।
সম্প্রতি, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে ওয়াশিংটনের। সুমেরু সাগর সংলগ্ন পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপটিকে কব্জা করতে একরকম মরিয়া হয়ে উঠেছেন ট্রাম্প। অবস্থানগত দিক থেকে গ্রিনল্যান্ড কানাডার প্রতিবেশী হলেও এর প্রকৃত মালিক ডেনমার্ক। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দাবি মেনে ওই দ্বীপটিকে তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার ব্যাপারে প্রবল আপত্তি আছে কোপেনহেগেনের, যার শাস্তি হিসাবে ইউরোপের আটটি দেশের উপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছেন ট্রাম্প।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের রোষের মুখে পড়েছে ব্রিটেন, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, জার্মানি, ফিনল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ডস্, যার বদলা হিসাবে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করতে পারে ইইউ। গত বছর (২০২৫ সাল) ওয়াশিংটনের সঙ্গে ওই সমঝোতা করে ইউরোপের ২৭টি দেশের সংগঠন। সেখানে তাদের পণ্যে ১৫ শতাংশের বেশি শুল্ক নেওয়া হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। চুক্তিটির চূড়ান্ত অনুমোদন অবশ্য এখনও মেলেনি।
বিশ্লেষকদের দাবি, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের শুল্কবাণে যথেষ্ট ক্ষতবিক্ষত হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এর পর লাটিন (দক্ষিণ) আমেরিকার দেশগুলির সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি করা ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প কোনও রাস্তা খোলা ছিল না। যদিও গোড়া থেকেই তার বিরোধী ছিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকরঁ। মারকোসুরের সঙ্গে এফটিএ ইইউ-ভুক্ত দেশগুলির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় বদল আনতে পারে, বলছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
লাটিন (দক্ষিণ) আমেরিকার দেশগুলির পাশাপাশি ভারতের সঙ্গেও দ্রুত মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি সেরে ফেলতে মরিয়া ইইউ। সম্প্রতি ব্রাসেলস সফরে গিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য ও আর্থিক নিরাপত্তা বিষয়ক কমিশনার মারোস সেফকোভিচের সঙ্গে দেখা করেন বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল। সূত্রের খবর, সেই বৈঠকে অমীমাংসিত বিষয়গুলি মিটিয়ে ফেলার ব্যাপারে জোর দিয়েছে দু’পক্ষ।
২০২০ সালে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার তিনটি কৃষি আইন চালু করলে রাস্তায় নামে পঞ্জাব ও হরিয়ানা-সহ এ দেশের চাষিদের একাংশ। রাজধানী দিল্লির কাছে সিঙ্ঘু সীমান্তে টানা ১৮ মাস আন্দোলন চালান তাঁরা। এর পরই পিছু হটে প্রশাসন। তিনটি কৃষি আইন বাতিল করে দেন প্রধানমন্ত্রী। এ বার কি সেই দশা হতে চলেছে ইইউ-মারকোসুর মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির? বিক্ষোভ তীব্র হতেই তুঙ্গে উঠছে সেই জল্পনা।
সব ছবি: সংগৃহীত।