গ্রিনল্যান্ড দখলে মরিয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্য দিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে এক ইঞ্চিও জমি ছাড়তে নারাজ নেটো-ভুক্ত তাঁর ইউরোপীয় ‘বন্ধু’রা। কী ভাবে তাঁকে আটকাবে ব্রিটেন-ফ্রান্স-জার্মানি? ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে কী কী তাস লুকিয়ে রেখেছে এককালের দুনিয়াকাঁপানো এই সমস্ত পশ্চিমি শক্তি? এই নিয়ে জল্পনার মধ্যেই উঠে এসেছে মার্কিন বন্ডের প্রসঙ্গ। বর্তমান পরিস্থিতিতে তা পশ্চিম ইউরোপের জন্য ‘কিল সুইচ’ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
দীর্ঘ দিন ধরেই বিপুল ঘাটতিতে চলছে আমেরিকার অর্থনীতি। ফলে সরকার চালাতে ক্রমাগত অন্যান্য দেশের থেকে ধার নিতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে। এত দিন আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড বিক্রি করে দিব্যি সেই অর্থ সংগ্রহ করে আসছিল যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজ়ারি দফতর (ডিপার্টমেন্ট অফ ট্রেজ়ারি)। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্প পারদ চড়ানোয় সেটাই এ বার ‘বুমেরাং’ হতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ মার্কিন বন্ডের ২৫ শতাংশের উপর রয়েছে পশ্চিম ইউরোপীয় ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলির সরকারের দখলদারি।
গোদের উপর বিষফোড়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রীয় বন্ডের হেজ তহবিল, বিমা এবং পেনশনের মতো ক্ষেত্রগুলিতে সর্বাধিক লগ্নি করেছে ব্রিটেন, ফ্রান্স বা জার্মানির মতো দেশ। কারণ, এত দিন ডলারে বিনিয়োগকে সবচেয়ে সুরক্ষিত বলে মনে করা হচ্ছিল। আর্থিক বিশ্লেষকদের দাবি, পশ্চিম ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলির কাছে ডলার ও বন্ড সমার্থক হওয়ায়, দ্বিতীয়টিতে দেদার লগ্নি করেছে তারা। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ঋণ পাওয়ার বিষয়টিকেও নিশ্চিত করতে পেরেছে আমেরিকার নেটো ‘বন্ধু’রা।
এ-হেন মার্কিন বন্ড পশ্চিম ইউরোপের কাছে ‘সুরক্ষিত স্বর্গ’ (সেফ হেভেন) হয়ে ওঠায় বিপদ বেড়েছে আমেরিকার। বিশেষজ্ঞদের কথায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্রিনল্যান্ডের ব্যাপারে ট্রাম্প নাছোড়বান্দা অবস্থান নিলে ওই সমস্ত বন্ড বিক্রি করে বাজার থেকে টাকা তোলা শুরু করতে পারে ব্রিটেন, ফ্রান্স বা জার্মানির মতো দেশ। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির মাথায় বাজ পড়বে বললে অত্যুক্তি হবে না। ট্রেজ়ারি বন্ডের থেকে পশ্চিম ইউরোপ পুরোপুরি মুখ ফেরালে দেউলিয়া হতে পারে ওয়াশিংটন।
বিশ্লেষকেরা অবশ্য মনে করেন, ট্রাম্পকে শিক্ষা দিতে কখনওই সরাসরি বন্ড বিক্রির রাস্তায় হাঁটবে না তাঁর নেটো ‘বন্ধুরা’। কারণ, আর্থিক দিক থেকে তাতে লোকসানের আশঙ্কা অনেক বেশি। সে ক্ষেত্রে তিনটি রাস্তা নিতে পারে ওই সমস্ত পশ্চিম ইউরোপীয় দেশ। সংশ্লিষ্ট বিকল্পগুলির প্রথমেই রয়েছে নতুন করে মার্কিন বন্ডে লগ্নি না করা। এর বদলে ইউরো বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে তারা। তা হলেই হু-হু করে বাড়তে থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া ঋণের সুদের অঙ্ক।
দ্বিতীয়ত, মার্কিন বন্ডকে ঝুঁকিপূর্ণ তকমা দিয়ে প্রচার চালাতে পারে পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলির সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। সে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে আমেরিকার বন্ড বিক্রি করা শুরু করবে আতঙ্কিত লগ্নিকারীরা। তৃতীয়ত, ট্রাম্প জমানায় ডলার দুর্বল হওয়ায় লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে জার্মান বন্ডের চাহিদা। সে দিকেও নজর দিতে পারেন তাঁর নেটো ‘বন্ধুরা’। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাটির দাম যে আরও পড়বে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তবে ঠিক কত পরিমাণ মার্কিন বন্ড পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলির সরকারের কাছে আছে, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলির একাংশের দাবি, নেটো-ভুক্ত ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলির হাতে আছে দু’লক্ষ কোটি ডলার মূল্যের ট্রেজ়ারি বন্ড। সেই তালিকায় কানাডাকে যুক্ত করলে সংখ্যাটা তিন লক্ষ কোটি ডলার বা আরও কিছুটা বেশি হতে পারে। এ ব্যাপারে সরকারি ভাবে কোনও তথ্য প্রকাশ করেনি ওয়াশিংটনের ট্রেজ়ারি দফতর।
সম্প্রতি সুইৎজ়ারল্যান্ডের দাভোসে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে (ডব্লিউইএফ) সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মুখ খোলেন ট্রাম্প। সেখানে ফক্স বিজ়নেস নেটওয়ার্কের ‘মর্নিংস উইথ মারিয়া’ অনুষ্ঠানে লম্বা সাক্ষাৎকার দেন তিনি। ওই সময় হুমকির সুরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘‘ইউরোপীয় দেশগুলি যদি মার্কিন ট্রেজ়ারি বন্ডের মূল হোল্ডিংগুলি ছেড়ে দেয়, তা হলে বড় ধরনের প্রতিশোধ নেবে আমেরিকা।’’ এ ব্যাপারে তাঁদের হাতেও তাস আছে বলে স্পষ্ট করেন ট্রাম্প।
তবে মুখে হম্বিতম্বি করলেও বিষয়টি যে একেবারেই সহজ নয়, তা বকলমে স্বীকার করে নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। একটি প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘ইউরোপীয় বন্ধু দেশগুলির সরকারের কাছে বিপুল সংখ্যায় আমেরিকার ট্রেজ়ারি বন্ড রয়েছে।’’ ফলে সেগুলিকে সামনে রেখে ওয়াশিংটনকে ঝামেলায় ফেলার সুযোগ যে তারা পাবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সেই কারণেই ট্রাম্পকে আগাম হুমকি দিতে শোনা যাচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
এ বছরের জানুয়ারির গোড়া থেকেই গ্রিনল্যান্ড কব্জা করতে চেয়ে সুর চড়ান ট্রাম্প। এই ইস্যুতে পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলির সঙ্গে বিরোধ তীব্র হলে, তাদের শুল্ক-হুমকি দিতে শুরু করেন তিনি। বলেন, ‘‘আটটি ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রের পণ্যের উপর এ বার অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর চাপাবে মার্কিন প্রশাসন।’’ এর পরই যুক্তরাষ্ট্রের উপর ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ প্রয়োগ করে বসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ২৭ দেশের সংগঠনটি জানিয়ে দেয়, ওয়াশিংটন শুল্ক-বাণ প্রয়োগ করলে ‘বাজ়ুকা’য় জবাব দেবে তারা।
কী এই ‘বাজ়ুকা’? কেন এর ভয়ে ‘থরহরি কম্প’ দশা হচ্ছে সুপার পাওয়ার দেশের প্রেসিডেন্টের? এক কথায় বলতে গেলে, ‘বাজ়ুকা’ একটি আর্থিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা। আপৎকালীন পরিস্থিতিতে তা চালু করতে পারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্ট। নিয়ম অনুযায়ী, যে দেশের বিরুদ্ধে ‘বাজ়ুকা’ প্রয়োগ করা হয়, তার সঙ্গে আর্থিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ করে দেয় সংশ্লিষ্ট সংগঠনের ২৭টি রাষ্ট্র। সে ক্ষেত্রে বিপুল লোকসানের মুখে পড়তে পারে আমেরিকা।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, আমেরিকার উপর এই অমোঘ অস্ত্রটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রয়োগ করলে যথেষ্ট বেকায়দায় পড়বেন ট্রাম্প। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ২০ শতাংশই চলে ইইউ-এর সঙ্গে। সাড়ে সাত লক্ষ কোটি ডলারের আমদানি-রফতানির মধ্যে দেড় লক্ষ কোটি ডলারের পণ্য ইউরোপের ওই ২৭টি দেশের সংগঠন থেকে কেনাবেচা করে থাকে ওয়াশিংটন।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘বাজ়ুকা’ চালু করলে রাতারাতি শূন্যে নেমে আসবে ১.৬৮ লক্ষ কোটি ডলারের মার্কিন বাণিজ্য। সে ক্ষেত্রে ঘরোয়া বাজারে তৈরি হতে পারে বিপুল ঘাটতি। সেটা পূরণ করার মতো কোনও বিকল্প তাস আপাতত হাতে নেই ট্রাম্পের। তবে ‘সবুজ দ্বীপের’ দাবি যে তিনি সহজে ছাড়ছেন না, তা বুঝিয়ে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষীয়ান প্রেসি়ডেন্ট। সুইৎজ়ারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অনুষ্ঠানে গ্রিনল্যান্ডকে ‘আমাদের অঞ্চল’ বলে উল্লেখ করতে শোনা গিয়েছে তাঁকে।
যদিও ইইউ-এর ওই হুঁশিয়ারির পর পিছু হটেন ট্রাম্প। আট ‘বন্ধু’ দেশের পণ্যে শুল্ক চাপানো হচ্ছে না বলে তড়িঘড়ি ঘোষণা করেন তিনি। পাশাপাশি, ‘সবুজ দ্বীপ’-এর ব্যাপারেও যথেষ্ট নরম অবস্থান নিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। পাশাপাশি, সুইৎজ়ারল্যান্ডের দাভোসে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে (ডব্লিউইএফ) সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মুখ খোলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বলেন, ‘‘অনেকেই ভেবেছিলেন, আমি বলপ্রয়োগ করব। কিন্তু সেটা আমাকে করতে হবে না। আমি বলপ্রয়োগ করতে চাই না। আমি বলপ্রয়োগ করব না।’’
দাভোসে ট্রাম্পের মুখে গ্রিনল্যান্ডের ব্যাপারে এ-হেন মন্তব্য শোনার পর দুনিয়া জুড়ে পড়ে যায় শোরগোল। আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, ‘বাজ়ুকা’র ভয়ে আগামী দিনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উপর থেকে যাবতীয় শুল্ক প্রত্যাহার করবেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষীয়ান প্রেসিডেন্ট। গত বছরের জুলাইয়ে হওয়া বাণিজ্যচুক্তিতে সহমতের ভিত্তিতে যা ধার্য করে ওয়াশিংটন। এর অঙ্ক ১৫ শতাংশ ঠিক করা হয়েছিল।
গত বছরের এপ্রিলে হঠাৎ করেই পুরনো নিয়ম ভেঙে ‘পারস্পরিক শুল্ক’ নীতি চালু করেন ট্রাম্প। ফলে ইউরোপীয় দেশগুলির পণ্যের উপর চড়া হারে কর চাপিয়ে দেয় ওয়াশিংটন। এর পর কিছুটা বাধ্য হয়েই জুলাইয়ে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সেরে ফেলে ইইউ। সেখানে কিছু পণ্যে ১৫ শতাংশ শুল্ক ধার্য করে উভয় পক্ষ। বাকি ক্ষেত্রগুলিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিনা শুল্কে বাণিজ্যের ব্যাপারে সম্মত হয় ২৭ রাষ্ট্রের ওই সংগঠন।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে আমেরিকার সঙ্গে হওয়া বাণিজ্যচুক্তিকে এখনও অনুমোদন দেয়নি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্ট। গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্প সুর চড়াতেই সেই প্রক্রিয়া স্থগিত করে তারা। সেই সঙ্গে ‘বাজ়ুকা’ চালু করার পাল্টা হুমকি দেয় ২৭ দেশের ওই সংগঠন। ইইউ সেই পর্যন্ত সেই পদক্ষেপ করলে ইউরোপের বিস্তীর্ণ বাজার হারাবেন যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পপতিরা। সেই চাপেই কি ডিগবাজি খেতে দেখা গেল মার্কিন প্রেসিডেন্টকে? উঠছে প্রশ্ন।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, গ্রিনল্যান্ড দখল করতে শেষ পর্যন্ত সামরিক অভিযানের রাস্তাই বেছে নেবেন ট্রাম্প। তখন ‘বাজ়ুকা’ না কি মার্কিন বন্ড বিক্রি, কোন অস্ত্রে তাঁকে থামাবে পশ্চিম ইউরোপীয় ‘বন্ধুরা’? তার উত্তর দেবে সময়।