রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের ২২ দিন অতিক্রান্ত। ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা তৃণমূলকে সরিয়ে ক্ষমতায় বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে শুভেন্দু অধিকারী বসার পর একের পর এক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছেন রাজ্যবাসী। সরেছে পুরনো সরকারের আমলের একাধিক বেআইনি নির্মাণ। রাস্তা বা ফুটপাত জুড়ে অবৈধ হকার উচ্ছেদ অভিযানেও নেমেছে প্রশাসন।
এই তিন সপ্তাহে একের পর এক বেআইনি ও বিতর্কিত নির্মাণ নিয়ে প্রশাসনিক তৎপরতা নজরে পড়েছে কলকাতা জুড়ে। কী কী পরিবর্তন এল শহরের বুকে? তারই ঝলক তুলে ধরার চেষ্টা করা হল এই প্রতিবেদনে। রইল পূর্বের ও পরের ফোটো অ্যালবাম।
তৃণমূল সরকারের আমলে বিতর্ককে সঙ্গী করেই রাজ্যে চালু হয়েছিল ‘বিশ্ববাংলা ব্র্যান্ড’ লোগো। বিশ্ববাংলার ‘ব’ নকশায় বৃত্তাকার সেই লোগো। তুলনায় আয়তনে বেশ ছোট হয়ে গিয়েছিল অশোক স্তম্ভ। আকারে ছোট মাপের অশোক স্তম্ভ ব্যবহার করা হত সেই লোগোর সঙ্গেই।
সব সরকারি চিঠির মাথায় থাকত বিশ্ববাংলার ‘ব’ নকশাটি। সরকারি চিঠি, ব্যানার, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দফতরের বাইরেও স্থান পেয়েছিল বিশ্ববাংলা লোগো। রাজ্যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরে সেই লোগো সরতে শুরু করছে। সরকারি ভবনগুলি থেকে সরছে বিশ্ববাংলা লোগো। হৃতমর্যাদা ফিরে পাচ্ছে অশোক স্তম্ভ।
তৃণমূল সরকারের আমলে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের প্রবেশপথের ঠিক উপরে জ্বলজ্বল করত সবুজ রঙের বিশ্ববাংলা লোগো। স্টেডিয়ামে ঢোকার সময় দর্শকের নজর কাড়ত এই লোগোটি। সেই বিশাল লোগোটি সরিয়ে ফেলছে বিজেপি সরকার। বিশ্ববাংলার বদলে অশোক স্তম্ভ সম্বলিত একটি গোলাকার লোগো বসানোর কাজ চলছে সেখানে। সবুজের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে নীল ও গেরুয়া রং। অশোক স্তম্ভটি গেরুয়া রঙের। নীল রঙের নকশা সহযোগে লেখা পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
রাজ্যের শাসনভার দখল করতেই সরিয়ে ফেলা হয়েছে যুবভারতীর সামনে থাকা বিতর্কিত ফুটবল মূর্তিটি। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবনা এবং নকশায় তৈরি হয়েছিল এই মূর্তি। কোমর থেকে পা পর্যন্ত শরীরের উপর পৃথিবী এবং তার উপর বিশ্ববাংলার লোগো ছিল। দু’পায়ে ছিল দু’টি ফুটবল। ২০১৭ সালে যুব বিশ্বকাপের সময় এই বিতর্কিত মূর্তিটি বসানো হয় যুবভারতীতে।
আইএসএলের ডার্বি দেখতে গিয়ে মূর্তিটি সরিয়ে ফেলার কথা জানিয়েছিলেন রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক। সেইমতো কাজও হয়। গত শুক্রবার মধ্যরাতে মূর্তিটি সরানোয় হাত দেয় প্রশাসন। সমূলে উপড়ে না নিয়ে মূর্তির দু’পায়ের মোজার উপরের অংশ কেটে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখনও এক জোড়া মোজা এবং জুতোর সঙ্গে দু’টি বল থেকে গিয়েছে। ধীরে ধীরে সেগুলিও সরে যাবে বলে প্রশাসনিক সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে।
মূর্তি নিয়ে প্রথম থেকেই ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। ‘বিদঘুটে’ বলে তকমা জুটেছিল এটির। তুমুল সমালোচনা হলেও পূর্বতন সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। মূর্তি সরানোর সরকারি সিদ্ধান্তে ক্ষোভপ্রকাশ করেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফেসবুক লাইভে এসে তিনি জানান, সরকারের এ-হেন সিদ্ধান্তে অত্যন্ত মর্মাহত তিনি। তিনি বলেন, ‘‘আমার খুব খারাপ লেগেছে, এক জন আর্টিস্টকে দিয়ে করিয়ে ছিলাম। লোগোটা আমি এঁকেছিলাম।”
রাজ্যের প্রশাসনিক দায়িত্বভার নিয়েই অবৈধ নির্মাণ নিয়ে ‘জ়িরো টলারেন্স’ নীতির কথা ঘোষণা করেছিলেন শুভেন্দু। পশ্চিমবঙ্গে সরকারে পালাবদলের পর থেকেই হাওড়া ও শিয়ালদহ স্টেশনে অবৈধ হকার হঠানোর অভিযানের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে। বুলডোজ়ার চালিয়ে রাতারাতি হকার উচ্ছেদ হয়েছে। হাওড়া এবং শিয়ালদহে কম করে ৫০০-এর উপর দোকান ভেঙেছে প্রশাসন।
শিয়ালদহের প্ল্যাটফর্মের চিরচেনা চিত্রগুলি উধাও। কয়েক দিন আগেও প্ল্যাটফর্মগুলি ছিল হকারদের ‘দখলে’! নানা পসরা সাজিয়ে বসতেন বিক্রেতারা। কেউ নানা রকম খাবার বিক্রি করতেন, কেউ আবার বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এখন শিয়ালদহের দক্ষিণ শাখার সমস্ত প্ল্যাটফর্মগুলি খাঁ খাঁ করছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হকার-মুক্ত প্ল্যাটফর্মের ছবি ধরা পড়েছে ক্যামেরায়। স্টেশনের বাইরের চত্বরও হকার-মুক্ত। চলাফেরায় ফিরেছে স্বাচ্ছন্দ্য। স্বীকার করে নিয়েছেন নিত্যযাত্রীরাই।
একই ছবি দেখা গিয়েছে হাওড়ায়। স্টেশন চত্বরে বহু অস্থায়ী ঝুপড়ি এবং ছোট দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছে। অভিযোগ, বেশির ভাগ হকারই বেআইনি ভাবে দখল করে দোকান গড়ে তুলেছিলেন। সেই সমস্ত দোকানগুলি বুলডোজ়ার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে। হকারদের সকলেরই অভিযোগ ছিল একটাই, রেল আচমকা উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে। যদিও রেলের এই পদক্ষেপে খুশি যাত্রীদের একাংশ।
বুলডোজ়ার চলেছে চিনার পার্ক সংলগ্ন এলাকার অবৈধ নির্মাণগুলির উপরও। ফুটপাত ও রাস্তা বেদখল করে বসে থাকা দোকানপাট ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়েছে প্রশাসনিক তৎপরতায়।
দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়া শ্মশানের সামনের একটি সুলভ শৌচালয়ের সামনে ছিল কয়েকটি অদ্ভুতদর্শন মূর্তি। উলঙ্গ শিশুরা শৌচকর্ম করছে এমন মূর্তি। বিজেপি সরকারের আদেশে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সেই সমস্ত বিতর্কিত মূর্তি। গড়িয়া শ্মশানের সামনে থাকা শিশুদের নগ্ন মূর্তির যৌক্তিকতা নিয়ে বহু দিন ধরেই প্রশ্ন তুলেছিলেন নাগরিকেরা।
শৌচালয়ের পাশে নগ্ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে কোনও শিশু স্নান করছে। আবার একটি মূর্তি মূত্রত্যাগের ভঙ্গিমায় বসে রয়েছে। সেটিও উলঙ্গ। এই ধরনের মূর্তি কেন এমন জনসমক্ষে প্রদর্শন করা হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন জাগলেও প্রতিবাদ করতে পারেননি কেউই। কারণ শৌচালয়ের ফলকলিপিতে খোদাই করা ছিল এগুলি সবই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায়’ তৈরি। শৌচালয়টির উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন বিদ্যুৎ, আবাসন, যুবকল্যাণ ও ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস।
রাজ্যে পালাবদলের পরই সেই মূর্তিগুলি ভাঙার সিদ্ধান্ত নেয় বর্তমান সরকার। রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এই বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভপ্রকাশ করে জানিয়েছিলেন, শৌচাগারের পাশে শিশুদের এই ধরনের মূর্তি অত্যন্ত নিম্নরুচির। কোটি কোটি টাকা খরচ করে এ সব মূর্তি বসিয়েছে পূর্বতন সরকার। সমস্ত খরচের হিসাবনিকাশ খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানিয়েছেন অগ্নিমিত্রা।
তিন বছর আগে গড়িয়া মিতালী সংঘের সামনে একটি ঘড়ির টাওয়ার উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন তৃণমূল সরকারের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। ২০২৪ সালে কলকাতা হাই কোর্টে ক্লক টাওয়ারটির বিরুদ্ধে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছিল। ২০২৫ সালে আদালতের রায়ে ৫৬ ফুট উঁচু এই কাঠামোটিকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছিল। তৎকালীন শাসক দলের প্রবল বিরোধিতায় সেই আদেশ কার্যকর করা হয়নি।
অভিযোগ, বেআইনি ভাবে কার্যত গায়ের জোর দেখিয়ে সেই সময় ক্লক টাওয়ারটি তৈরি হয়েছিল। মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এই ক্লক টাওয়ারটি বসানোর বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছিলেন বলে অভিযোগ। অরূপ-ঘনিষ্ঠ কাউন্সিলর ও তাঁর দলবল আদালতের নির্দেশের বিরোধিতা করে আন্দোলন শুরু করেন। সে দিন সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস দেখাতে পারেননি স্থানীয় বাসিন্দারা। কারণ (তৎকালীন) শাসক দল এবং এক মন্ত্রী জড়িত ছিলেন।
তৃণমূল ক্ষমতা থেকে সরে যেতেই ‘বুলডোজ়ার অ্যাকশন’ শুরু করে পুরসভা। পুলিশ দিয়ে ঘিরে গত ১৪ মে ঘড়িঘরটি ভাঙতে শুরু করে প্রশাসন। একটি ক্রেন আনা হয়। কেএমসি-র এক আধিকারিক জানিয়েছিলেন এই অবৈধ নির্মাণটি ভাঙার কাজ শেষ হতে বেশ কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। এক সপ্তাহের মধ্যে সেই কাজ সম্পন্ন হয়েছে। গড়িয়া মিতালী সংঘের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ঘড়িঘরটি উধাও।
ছবি: অমিত দত্ত, সৌম্যজিৎ দে এবং সংগৃহীত।