বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির এক মাসের মাথায় আনুষ্ঠানিক ভাবে ভাঙন ধরল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলে। বুধবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হলেন তৃণমূল থেকে ‘বহিষ্কৃত’ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়! তিন সহকারী দলনেতার তালিকায় ঠাঁই পেলেন আর এক বিদ্রোহী সন্দীপন সাহা। তৃণমূল বিধায়কদের ‘সই-জালিয়াতি’র কথা স্পিকারকে লিখিত ভাবে জানানোর ‘অপরাধে’ সোমবার তাঁদের বহিষ্কার করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। ৪৮ ঘণ্টা পরে দেখা গেল, সংখ্যাগরিষ্ঠ তৃণমূল বিধায়কের সমর্থনই রয়েছে ঋতব্রত-সন্দীপনদের দিকে!
বুধবার ৫৮ জন তৃণমূল বিধায়কের সমর্থনের চিঠি নিয়ে বিধানসভায় হাজির হন বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত। একে একে অন্য বিধায়কেরাও পৌঁছোন। বিদ্রোহী বিধায়কেরা বিধানসভার কাউন্সিল চেম্বারে বৈঠক করেন। ঘণ্টা দেড়েকের বৈঠকের পর স্পিকারের ঘরে যান তাঁরা। ঋতব্রত এবং তাঁর শিবিরের তৃণমূল বিধায়কদের যুক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে স্পিকার নতুন বিরোধী দলনেতা এবং অন্য পদাধিকারীদের স্বীকৃতি দেন। নতুন বিরোধী দলনেতার জন্য বিধানসভার ঘর খুলে দেওয়া হয়। সেই ঘরে বসেই সাংবাদিক বৈঠক করেন বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়কেরা।
ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসাবে চেয়ে বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুকে চিঠি দিয়েছিলেন তৃণমূলের বিদ্রোহীরা। ঋতব্রত এবং সন্দীপন ছাড়া ওই চিঠিতে ৫৮ জন বিধায়কের সই রয়েছে। সেখানে শুধু বিরোধী দলনেতা নন, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় কারা তৃণমূলের উপদলনেতা হবেন, তা-ও উল্লেখ করা হয়েছিল। ছিল সন্দীপন, জাভেদ খান, সাবিনা ইয়াসমিন এবং শিউলি সাহার নাম। মুখ্যসচেতক হিসাবে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল আখরুজ্জামানের নাম। যদিও চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘সভানেত্রী’ বলেই উল্লেখ করেন বিদ্রোহীরা।
নতুন বিরোধী দলনেতা হওয়ার পরে ঋতব্রত জানিয়েছেন, তৃণমূলের টিকিটে জয় পাওয়া দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়কই ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। তাঁরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। বিধানসভায় শাসক বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করবেন বলেও দাবি তাঁর। তিনি বলেন, ‘‘আপাতত ৫৮ জন। আরও দু’জন আছেন। তাঁরা এখন রাজ্যের বাইরে আছেন। তাঁদেরও সম্মতি রয়েছে। তাঁদের সমর্থন এলে এই সংখ্যা ৬০ হবে।’’ পাশাপাশি, তৃণমূলনেত্রী মমতাকে পরামর্শদাতা হওয়ার আবেদন করেন ঋতব্রত। তবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁদের দূরদূরান্তের সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের ‘ভাল কাজ’ সমর্থনের ঘোষণাও করেছেন তাঁরা।
পরিষদীয় দলের ভাঙনের প্রভাব পড়েছে তৃণমূলের সাংগঠনিক অবয়বেও। রাজ্যে দলের সমস্ত কমিটি ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল। দলে ভাঙন-আশঙ্কা রুখতেই তৃণমূল নেতৃত্ব এই কৌশলী পদক্ষেপ করলেন কি না, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, নির্বাচনে দলের শোচনীয় পরাজয় এবং তার পরেই ভাঙন-সম্ভাবনার আবহে ছাত্র, যুব, শ্রমিক, মহিলা সংগঠনকে নতুন করে সাজাতে চাইছেন তৃণমূলনেত্রী। তাই এই পদক্ষেপ।
মমতার হাত ধরে রাজ্যে উত্থান, শাসক দলের তকমা লাভ থেকে সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভরাডুবি, দলে ভাঙন— কেমন ছিল তৃণমূলের পথচলা? শুরু ১৯৯২ সালের নভেম্বর মাসে। মমতা তখন লোকসভা সাংসদ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। যুব কংগ্রেসের রাজ্য সভানেত্রীও বটে। কলকাতায় ব্রিগেডে বিশাল সমাবেশ করে সিপিএমকে নির্মূল করার অঙ্গীকার নেন তিনি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্ব ছেড়ে রাজ্যে আন্দোলনের ঘোষণাও করেন মমতা। তবে সে বছরই প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি পদের লড়াইয়ে সোমেন মিত্রের কাছে ২৭ ভোটে হেরে গিয়েছিলেন মমতা।
এর পর ১৯৯৭ সালের অগস্ট মাস। নেত্রী সনিয়া গান্ধীর উপস্থিতিতে নেতাজি ইনডোরে কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন। কিন্তু কংগ্রেসের সঙ্গে তত দিনে দূরত্ব বেড়েছে মমতার। নেতাজি ইনডোরে কংগ্রেসের সম্মেলনের সময় গান্ধী মূর্তির পাদদেশে আলাদা সভা করেন তিনি। এর কয়েক মাস পরেই ডিসেম্বরে মমতাকে দল থেকে বহিষ্কার করে কংগ্রেস।
তবে তত দিন আটঘাট বেঁধে ফেলেছেন মমতা। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন নতুন দল খোলার। ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে মমতার দল, তৃণমূল। তার আগেই নির্বাচন কমিশনের কাছে দলের নাম নথিভুক্ত করিয়েছিলেন তিনি।
প্রথমে তৃণমূলের নাম ছিল পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেস। পরে নাম বদলে করা হয় সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস। দল খুলেই মমতা ঘোষণা করেন ধর্মনিরপেক্ষতাই হবে দলের প্রাথমিক দর্শন। কংগ্রেসের অনেক নেতাই যোগ দিয়েছিলেন মমতার তৃণমূলে।
যে বিজেপির সঙ্গে লড়াইয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে দলের ভরাডুবি, ১৯৯৮ সালে বামেদের সঙ্গে লড়তে সেই বিজেপির সঙ্গেই জোট বেঁধেছিল তৃণমূল। জোট বেঁধেছিলেন মমতা। ফলও মেলে। লোকসভায় জয় হয় সাতটি আসনে।
এর পরের বছর লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যের আটটি আসনে জয়ী হয় তৃণমূল। কেন্দ্রের অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের মন্ত্রীও হন মমতা। এর পরের বছর, অর্থাৎ ২০০০ সালে তৃণমূলের উত্থান প্রকৃত অর্থে নজর কেড়েছিল রাজ্যবাসীর। কলকাতা পুরসভার নির্বাচনে জয়লাভ করে তৃণমূল।
২০০১ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ত্যাগ করেন মমতা। কেন্দ্রের বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট সরকারের বিরুদ্ধে তহলকা ঘুষকাণ্ডের অভিযোগ উঠতেই ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। ওই বছরই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন ছিল। সেই আবহে দূরত্ব কমিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধে তৃণমূল। নির্বাচনে জয় মেলে ৬০টি আসনে।
এর পর ২০০৪ সালে আবার কংগ্রেসের হাত ছেড়ে বিজেপির সঙ্গে জোট বাঁধে তৃণমূল। তবে জিতেছিলেন শুধু মমতা। এর পরের বছর ২০০৫ সালে আবার ধাক্কা খায় তৃণমূল। হাতছাড়া হয় অনেক কষ্টে অর্জিত কলকাতা পুরসভা।
এর পর ২০০৬ সালে আবার অনুষ্ঠিত হয় পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। সেই নির্বাচনে মাত্র ৩০টি আসনে জিতেছিল তৃণমূল। তবে সে বছর থেকেই মমতা শুরু করেন সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন, যা আবার লড়াইয়ে এনে দিয়েছিল তাঁকে। ভাগ্য ফিরিয়েছিল তৃণমূলেরও। ২০০৯ সালের কংগ্রেস এবং এসইউসি-র সঙ্গে জোট বেঁধে লোকসভা নির্বাচনে লড়েছিল তৃণমূল। জয় লাভ করে ১৯টি আসনে।
এর পর আসে ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচন। ফের কংগ্রেস, এসইউসির সঙ্গে জোট বাঁধেন মমতা। ৩৪ বছরের বাম শাসনের পতন ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গড়ে তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা।
২০১১ সালের পর থেকে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে পর্যন্ত কোনও ভোটই চিন্তায় ফেলেনি মমতাকে। ২০১৬ এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কারও সঙ্গে জোট না বেঁধেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জয়ী হয়েছিল তৃণমূল। এর মাঝে পঞ্চায়েত, পুরসভা, লোকসভা নির্বাচনেও লাগাতার ভাল ফল করে দল।
এর মধ্যেই ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে রাজ্যে ধীরে ধীরে আন্দোলনের ঝাঁজ বাড়াতে থেকে তৎকালীন বিরোধী বিজেপি শিবির। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে নন্দীগ্রাম থেকে হারিয়ে দেন তৎকালীন বিরোধী নেতা শুভেন্দু। এর পর থেকে পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন বিষয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে মাঠেঘাটে নেমে লড়াই করতে দেখা গিয়েছে বিজেপিকে।
২০২৬ সালের ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর দেখা যায় বিজেপির কাছে ভরাডুবি হয়েছে তৃণমূলের। রাজ্যে মাত্র ৮০টি আসন পেয়েছে তৃণমূল। ভবানীপুরে আবার শুভেন্দুর কাছে হার হয় মমতার।
তার পর থেকে এক মাস তৃণমূলে কেবল ভাঙনই দেখা গিয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় চমক দেখা গিয়েছে বুধবার। ৫৮ জন তৃণমূল বিধায়ক দলের সিদ্ধান্ত না মেনে ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা করতে চেয়ে চিঠি দেন স্পিকারের কাছে। বিধায়কদের চিঠিতে ‘সভানেত্রী’ হিসাবে মমতার নামোল্লেখ থাকলেও দল দু’ভাগে টুকরো হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এর পরে দলের সব কমিটি ভেঙে দেন মমতা।
সব ছবি: পিটিআই, সংগৃহীত, ফাইল থেকে।