কংগ্রেস হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী পদে ইস্তফা দিয়েছেন সিদ্দারামাইয়া (যিনি কর্নাটকের রাজ্য রাজনীতিতে সিদ্দা নামেই পরিচিত)। বৃহস্পতিবার লোকভবনে গিয়ে কর্নাটকের ইস্তফাপত্র জমা দেন তিনি। তবে রাজ্যপাল থাওরচন্দ্র গহলৌত লোকভবনে না-থাকায় বৃহস্পতিবার তাঁর ইস্তফাপত্র গৃহীত হয়নি। শুক্রবার তা গ্রহণ করেছেন রাজ্যপাল। তবে সিদ্দারামাইয়া বৃহস্পতিবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছাড়লেও তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে থাকছেন।
সিদ্দারামাইয়ার সম্ভাব্য উত্তরসূরি ডিকে শিবকুমার। মনে করা হচ্ছে, সব কিছু ঠিক থাকলে তাঁকেই পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে পেতে চলেছেন কর্নাটকবাসী। ২০২৩ সালের মে মাসে কর্নাটকে বিধানসভা ভোটে জয়ের পরে সিদ্দারামাইয়াকে মুখ্যমন্ত্রী করার সময় কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্ব আশ্বাস দিয়েছিলেন, আড়াই বছর পর মুখ্যমন্ত্রী করা হবে বিদায়ী মন্ত্রিসভার উপমুখ্যমন্ত্রী ডিকে শিবকুমারকে। অর্থাৎ, পাঁচ বছরের মুখ্যমন্ত্রিত্ব সমান ভাবে ভাগ করে দেওয়া হবে দুই নেতার মধ্যে।
গত অক্টোবরে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে আড়াই বছরের মেয়াদ পূর্ণ করেন সিদ্দারামাইয়া। তার পরেই সেই ‘প্রতিশ্রুতির সম্মান’ রাখার দাবি তুলেছিলেন শিবকুমার-ঘনিষ্ঠেরা। অবশেষে বৃহস্পতিবার দুই নেতার প্রাতরাশ বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছাড়ার ঘোষণা করেন সিদ্দারামাইয়া।
তবে সিদ্দারামাইয়ার কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর এবং রাজ্যে নতুন নেতৃত্বের পথ প্রশস্ত করার সিদ্ধান্তের পরে লাভ হয়েছে ভারতের একটি প্রথম সারির খাদ্য এবং পানীয় প্রস্তুতকারী সংস্থার।
সেই সংস্থাটি হল ক্যাফে কফি ডে (সিসিডি)। ২৯ মে ভারতীয় বহুজাতিক কফিহাউস আউটলেটগুলি পরিচালনাকারী সংস্থা কফি ডে এন্টারপ্রাইজ়ের শেয়ারের দর ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু কেন?
সিসিডি সংস্থার প্রধান দফতর কর্নাটকের বেঙ্গালুরুতে। কর্নাটকে কংগ্রেস সরকার গঠন করার পর থেকেই, সিদ্দারামাইয়া এবং শিবকুমারের মধ্যে সম্ভাব্য পালা করে মুখ্যমন্ত্রীর পদ সামলানো নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা-কল্পনা চলছে।
সিদ্দারামাইয়া মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়ার পর মনে করা হচ্ছে ওই পদে বসতে চলেছেন শিবকুমার। আর তা নিয়ে জল্পনা তৈরি হওয়ার পরেই রমরমা বৃদ্ধি পেয়েছে সিসিডির।
বৈবাহিক সম্পর্কের সূত্রে সিসিডি পরিবারের সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত শিবকুমার। কারণ, তাঁর বড় মেয়ে ঐশ্বর্যা সিসিডির প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা ভিজি সিদ্ধার্থের পুত্রবধূ। সিদ্ধার্থের পুত্র অমর্ত্য হেগড়ের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে ঐশ্বর্যার।
আর সে কারণেই মনে করা হচ্ছে শিবকুমার যদি কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী পদে বসেন, তা হলে তাঁর আমলে সিসিডির রমরমা আরও বৃদ্ধি পাবে। আর সে কারণেই শুক্রবার সকালে সিদ্দারামাইয়ার পদত্যাগপত্র কর্নাটকের রাজ্যপাল গহলৌত গ্রহণ করার পর কফি ডে-র প্রতি শেয়ার ৩৪.৭৮ টাকায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ ছাড়াও, ক্যাফে চেইন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটি ২০২৬-এর ৩১ মার্চ সমাপ্ত চতুর্থ ত্রৈমাসিকের জন্য সব মিলিয়ে ১৩২.০৭ কোটি টাকার মুনাফা অর্জন করেছে, যা পূর্ববর্তী অর্থবর্ষের একই ত্রৈমাসিকের ১১৪.১৬ কোটি টাকার লোকসান থেকে একটি উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধার।
চা-প্রধান ভারতে নতুন প্রজন্মের ‘কফি পীঠস্থান’ হয়ে উঠেছে সিসিডি। মার্কিন সংস্থা ‘স্টার বাকস’-এর ভারতীয় সংস্করণ বলা হয় একে। যাঁর মানসসন্তান এই সংস্থা, সেই ভিজি সিদ্ধার্থের পারিবারিক পুরনো ব্যবসাই ছিল কফি ও কফি-বাগিচা সংক্রান্ত।
১৯৫৯ সালে সিদ্ধার্থের জন্ম কর্নাটকের চিকমাগালুর জেলার বর্ধিষ্ণু ব্যবসায়ী পরিবারে। তরুণ বয়স থেকেই কফি ব্যবসার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন সিদ্ধার্থ। তাঁর হাত ধরেই উত্তরণের দিশা দেখেছিল পরিবারের পুরনো কফি ব্যবসা। ১৯৯৪ সালে বেঙ্গালুরুর ব্রিগেড রোডে আত্মপ্রকাশ ‘ক্যাফে কফি ডে’-এর। সংস্থার ট্যাগলাইন ‘এ লট ক্যান হ্যাপেন ওভার এ কাপ অফ কফি’। বর্তমানে দেশে ও বিদেশে তাদের আউটলেট প্রায় দু’হাজার।
সিদ্ধার্থের স্বপ্ন ছিল, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার। মেঙ্গালুরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর সিদ্ধার্থ কিছু দিন মুম্বইয়ে ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কার হিসাবে কাজ করার পরে পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব নেন।
সিদ্ধার্থের পরিবারের কফির ব্যবসা প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো। ১৯৯৩ সালে সিদ্ধার্থ কফি ট্রেডিং সংস্থা ‘অ্যামালগ্যামেটেড বিন কোম্পানি’ বা ‘এবিসি’ প্রতিষ্ঠা করেন। সিদ্ধার্থের হাতে এই ব্যবসা দ্রুত আর্থিক বৃদ্ধির শিখরে ওঠে। সম্প্রতি এর বার্ষিক টার্নওভার ছিল ১ লক্ষ ৭২ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
দক্ষিণ ভারত জুড়ে দুশোটি এক্সক্লুসিভ আউটলেটে বিক্রি হয় ‘কফি ডে স্পেশ্যাল’ কফি গুঁড়ো। ব্যবসার পরিধি বাড়িয়ে সিদ্ধার্থ পা রাখেন তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রেও। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংস্থার নাম ‘গ্লোবাল টেকনোলজি ভেঞ্চার্স’। অর্থনৈতিক সংস্থা, উড প্রসেসিং সংস্থা ও হসপিটালিটি ব্যবসাও ছিল এই কফি ব্যারনের মালিকানায়।
সিসিডি-র আউটলেটের চাকচিক্য দেখে বোঝা না গেলেও মাঝখানে সিদ্ধার্থের ব্যবসায় আর্থিক মন্দা আসে। তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার শেয়ারের বড় অংশ বিক্রি করে দেন লারসেন অ্যান্ড টুবরো-কে। বিশাল ঋণভার থেকে কিছুটা মুক্তি পেতেই ছিল সেই পদক্ষেপ।
তার পরেও আর্থিক সমস্যা থেকেই গিয়েছিল সংস্থার। পাশাপাশি যুক্ত হয়েছিল আয়করজনিত সমস্যাও। ২০১৭ সালে সিদ্ধার্থের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ২০টি ভবনে তল্লাশি চালায় আয়কর দফতর। এর পর ২০১৯ সালের ৩১ জুলাই কর্নাটকের একটি নদীতে ভেসে ওঠে সিদ্ধার্থের দেহ। তার দু’দিন আগেই নদীর ব্রিজে হাঁটতে বেরিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন তিনি।
সিদ্ধার্থের মৃত্যুর পর একটি সুইসাইড নোটও উদ্ধার হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর দিন সিসিডির পরিচালন বোর্ডে সিদ্ধার্থের সই করা একটি চিঠি পৌঁছোয়। সেই চিঠিতে বিপুল আর্থিক দেনার জন্য তিনি আত্মহত্যা করছেন বলে উল্লেখ করেছিলেন সিদ্ধার্থ। আত্মহত্যার কারণ হিসাবে লিখেছিলেন, বিপুল দেনা, পাওনাদারদের চাপের কথা। পাশাপাশি কাউকে না জানিয়ে লেনদেনের কথাও উল্লেখ করেছিলেন তিনি। সব মিলিয়ে সিদ্ধার্থের মৃত্যু রয়ে গিয়েছিল রহস্যের মোড়কেই।
সিদ্ধার্থের রহসমৃত্যুতে আয়কর আধিকারিকদের বিরুদ্ধে তাঁকে হেনস্থা করারও অভিযোগ উঠেছিল। তবে আত্মহত্যার এক বছর পর সিসিডি মালিকের মৃত্যুতে নয়া মোড় আসে। দেশের সবচেয়ে বড় কফি চেনের আত্মঘাতী প্রাক্তন কর্ণধার সিদ্ধার্থ সংস্থা থেকে ২৭০০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছিলেন বলে উঠে এসেছিল। নিজের দেনা মেটানো, পরিবারের অন্যদের মাধ্যমে শেয়ার কেনা এবং আরও কিছু কারণে সংস্থা থেকে ওই টাকা তুলেছিলেন বলে সংস্থার তরফে জানানো হয়েছিল। সিসিডি কর্তৃপক্ষ ওই টাকা উদ্ধারের চেষ্টা চালাবে বলেও জানানো হয়েছিল বিবৃতিতে।
তবে সিদ্ধার্থের মৃত্যুর পরেও সিসিডির পথ চলা থামেনি। নিজের মতো করে ধীরে ধীরে এগিয়েছে সংস্থাটি। তবে কোটি কোটি টাকার ঋণের বোঝা সত্ত্বেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে ক্যাফে কফি ডে। শুধু ঘুরে দাঁড়ানোই নয়। বাড়িয়ে নিয়েছে মুনাফাও। মাঝে কয়েক বছর লাভের মুখ না দেখলেও সদ্যসমাপ্ত অর্থবর্ষে ১০০ কোটির বেশি মুনাফা করেছে সংস্থাটি। তার মধ্যেই সিদ্দারামাইয়ার কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফার পর সংস্থাটির শেয়ার দর বৃদ্ধি পেয়েছে।
সব ছবি: সংগৃহীত।