প্রতীক্ষার অবসান। ভারতের সঙ্গে নাকি বাণিজ্যচুক্তি সেরে ফেলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে লম্বা পোস্ট করে ইতিমধ্যেই সে কথা ঘোষণা করেছেন আমেরিকার বর্ষীয়ান প্রেসি়ডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে খনিজ তেল থেকে শুরু করে কৃষিপণ্যের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। ফলে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যচুক্তিতে কতটা লাভ হচ্ছে নয়াদিল্লির, না কি মুনাফার চেয়ে ভারী হল লোকসানের পাল্লা, এই সমস্ত প্রশ্নে উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে এ দেশের ঘরোয়া রাজনীতি।
চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি ভারত-মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি বলেন, ‘‘রাশিয়ার থেকে খনিজ তেল কেনা বন্ধ করতে রাজি হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। পরিবর্তে আমেরিকার থেকে বেশি করে তরল সোনা কিনবে নয়াদিল্লি।’’ পাশাপাশি, ভেনেজ়ুয়েলার তেলও ভারত কিনতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। তাঁর ওই মন্তব্যের কিছু ক্ষণের মধ্যেই এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) একটি পোস্ট করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। সেখানে রুশ উরাল ক্রুড কেনা বন্ধ করার ব্যাপারে একটি শব্দও খরচ করেননি তিনি। ফলে এই ইস্যুতে তীব্র হচ্ছে ধোঁয়াশা।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, ট্রাম্পের কথা মেনে মস্কো থেকে তরল সোনা আমদানি বন্ধ করলে আখেরে লোকসান হবে নয়াদিল্লির। কারণ, গত চার বছর ধরে অত্যন্ত সস্তা দরে উরাল ক্রুড সরবরাহ করে আসছে ক্রেমলিন। সেখানে আমেরিকার খনিজ তেলের দাম অনেকটাই বেশি। দ্বিতীয় বিকল্প হিসাবে ট্রাম্প যে ভেনেজ়ুয়েলার তরল সোনার কথা বলেছেন, তা অবশ্য সস্তায় পেতে পারে কেন্দ্র। তবে ওই তেলের পরিশোধন খরচ অনেক বেশি। তা ছাড়া কারাকাসের তরল সোনা পেট্রল-ডিজ়েলে বদলাতে গেলে মাত্রাতিরিক্ত পরিবেশ দূষণের মুখে পড়বে ভারতের বেশ কিছু এলাকা।
আর তাই ট্রাম্পের ওই পোস্টের পর চুপ করে থাকেনি রাশিয়া। ৩ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মুখ খোলেন ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেশকভ। তাঁর কথায়, ‘‘মস্কোর উরাল ক্রুড কেনা বন্ধ করার ব্যাপারে নয়াদিল্লির তরফে কোনও বার্তা আসেনি। ভারতের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারি গড়ে তোলার ব্যাপারে আমরা সব সময়েই আগ্রহী। রাশিয়া বরাবরই ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্ককে মূল্যবান বলে মনে করে। আমরা দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত অংশীদারি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।’’
খনিজ তেলকে বাদ দিলে বাণিজ্যচুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৃষিপণ্যের বাজার আংশিক খুলতে চলেছে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘‘আগামী দিনে আমেরিকার থেকে ৪৫ লক্ষ ২৫ হাজার ৬২২ কোটি টাকার পণ্য কিনবে বলে কথা দিয়েছে ভারত।’’ সংবাদসংস্থা রয়টার্স সূত্রে খবর, সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যসমঝোতায় ওয়াশিংটনের থেকে আমদানি করা আপেল, ব্লুবেরি ও ব্ল্যাকবেরির মতো বাদাম জাতীয় ফল এবং নির্বাচিত প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের (যার মধ্যে দুগ্ধজাত পণ্য রয়েছে) শুল্ক কমাতে রাজি হয়েছে নয়াদিল্লি।
আর্থিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এ দেশের কৃষিপণ্যের বাজার আংশিক ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে খুলে গেলেও আখেরে লোকসান হবে নয়াদিল্লির। কারণ, সে ক্ষেত্রে ঘরোয়া দুগ্ধজাত সামগ্রীর উৎপাদনকারীদের প্রবল প্রতিযোগিতার মুখে পড়ার আশঙ্কা থাকছে। ফলে এই ইস্যুতে ফের দানা বাঁধতে পারে কৃষক আন্দোলন। ইতিমধ্যেই এ ব্যাপারে সুর চড়াতে শুরু করেছে কংগ্রেস-সহ অন্যান্য বিরোধী দল। যদিও দেশের ‘অন্নদাতাদের’ আশ্বস্ত করতে পাল্টা বিবৃতি দিয়েছেন কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল।
৩ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক বৈঠকে ভারত-মার্কিন বাণিজ্যচুক্তির ব্যাখ্যা দেন পীযূষ। সেখানে তিনি বলেন, ‘‘কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের স্বার্থের সঙ্গে কোনও সমঝোতা না করেই আমরা এই চুক্তি করেছি। আমাদের প্রতিযোগীদের তুলনায় এই চুক্তি অনেকটাই ভাল।’’ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মুখে এ কথা বললেও দেশের প্রাক্তন বিদেশসচিব তথা রাজ্যসভার রাষ্ট্রপতি মনোনীত সাংসদ হর্ষবর্ধন শ্রীংলা কার্যত রয়টার্সে প্রকাশিত খবরের সত্যতা স্বীকার করে নিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘কিছু জিনিস আমেরিকা থেকে আসবে। কিন্তু সেগুলি আমাদের কৃষিক্ষেত্রের জন্য ক্ষতিকর নয়। এর ফলে চাষিরা সমস্যায় পড়বেন না।’’
তৃতীয়ত, ট্রাম্পের পোস্ট অনুযায়ী আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে ভারতকে দিতে হবে ১৮ শতাংশ শুল্ক। অন্য দিকে বিনাশুল্কে এ দেশে যাবতীয় সামগ্রী সরবরাহ করতে পারবে ওয়াশিংটন। কংগ্রেস-সহ যাবতীয় বিরোধী দলগুলির দাবি, সে ক্ষেত্রে অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন ঘরোয়া উৎপাদনকারীরা, যা একেবারেই কাম্য নয়। কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ অবশ্য বলেছেন, ‘‘বিরোধীরা দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। তাঁদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব স্পষ্ট লক্ষ করা যাচ্ছে।’’
তবে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যচুক্তিতে ভারতের যে শুধুই লোকসান হবে, এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই। ট্রুথ সোশ্যালে করা পোস্টে নয়াদিল্লির উপর থেকে শুল্ক হ্রাসের কথা ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। বর্তমানে তা রয়েছে ৫০ শতাংশ। সেটা ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনার ব্যাপারে সবুজ সঙ্কেত দিয়েছেন তিনি, এশিয়ার অন্য অনেক দেশের উপর চাপানো শুল্কের তুলনায় যা অনেকটাই কম। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে ভারতীয় পণ্য যে অনেকটা এগিয়ে থাকবে, তা বলাই বাহুল্য।
বর্তমানে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশ এবং ভিয়েতনাম উভয় দেশের পণ্যের উপরেই ২০ শতাংশ করে শুল্ক চাপানো রয়েছে। এই দুই দেশই বস্ত্র রফতানিতে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী। এত দিন নয়াদিল্লির পণ্যে ট্রাম্প প্রশাসন ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে রাখার ফলে দুই দেশই মার্কিন বাজারে কিছুটা সুবিধা পাচ্ছিল। এ বার নতুন শুল্ক ব্যবস্থায় ফের ওয়াশিংটনের পুরনো বাজার ফিরে পেতে পারেন এ দেশের বস্ত্র ব্যবসায়ীরা।
যদিও এর উল্টো যুক্তি রয়েছে। আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্যিক সমঝোতা হওয়ার কথা রয়েছে। ওই চুক্তিতে ঢাকার উপর শুল্কের হার কমাতে পারে ট্রাম্প প্রশাসন। তখন আবার যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে ভারতীয় বস্ত্র। এ ছাড়া বস্ত্র রফতানিতে নয়াদিল্লির অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হল চিন। বেজিঙের উপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে রেখেছেন পোটাস (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস)।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লির উপর শুল্ক হ্রাস হওয়ায় চিনা বস্ত্রকে মার্কিন বাজার থেকে দূরে সরিয়ে ফেলার সুযোগ পাবেন এ দেশের কাপড় ব্যবসায়ীরা। তা ছাড়া পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া এবং তাইল্যান্ডের মতো দেশগুলিতে ১৯ শতাংশ শুল্ক বজায় রেখেছেন ট্রাম্প। ফলে আপাতত আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে ভারত যে সুবিধাজনক জায়গায় থাকছে, তা বলাই বাহুল্য।
তবে ট্রাম্পের শুল্কহ্রাসের সিদ্ধান্তে নয়াদিল্লির আদৌ কতটা সুবিধা হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বণিকমহলের একাংশ। কারণ, ভারতের সকল প্রতিবেশী দেশ এবং এশিয়ায় কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ আমেরিকায় পণ্য রফতানিতে বিশেষ ‘ছাড়’ পায়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুসারে, উন্নত দেশগুলি উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশগুলির কিছু পণ্য আমদানির উপর শুল্কে ছাড় দেয়। এটিকে বলা হয় ‘জেনারালাইজ় সিস্টেম অফ প্রেফারেন্স’ (জিএসপি)। অতীতে এই ছাড় পেত ভারতও।
২০১৭-’২১ সাল পর্যন্ত প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ট্রাম্প। ওই সময় ২০১৯ সালের জুনে ভারতের উপর থেকে জিএসপির সুবিধা প্রত্যাহার করেন তিনি। সেটা ফিরিয়ে দেওয়ার কোনও ইঙ্গিত এখনও পর্যন্ত দেয়নি হোয়াইট হাউস। এ বছর পোটাসের চিনসফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। বেজিঙের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সেরে ফেলার ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে তাঁর। ফলে ১৮ শতাংশ শুল্ক আগামী দিনে কেন্দ্রের মোদী সরকারকে কতটা স্বস্তি দেবে, তার আঁচ পাওয়া এখনই সম্ভব নয়।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ভারত-মার্কিন বাণিজ্যচুক্তির কথা ঘোষণা হতেই এ দেশের শেয়ার বাজারে দেখা গিয়েছে তাঁর প্রভাব। ৩ ফেব্রুয়ারি সকালে সাড়ে তিন হাজার পয়েন্টেরও বেশি উঠে যায় বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের (বিএসই) সূচক সেনসেক্স। ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের (এনএসই) সূচক নিফটিও। সংশ্লিষ্ট সমঝোতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভারতমুখী করতে পারে, বলছেন আর্থিক বিশ্লেষকেরা।
২ ফেব্রুয়ারি রাতে মোদীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ট্রাম্প। তার পরই দু’তরফে বাণিজ্যচুক্তির কথা ঘোষণা করে দেন তিনি। সংশ্লিষ্ট সমঝোতার খসড়া এখনও প্রকাশ করেনি কেন্দ্র। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ জানিয়েছেন, বাণিজ্যিক সমঝোতা চূড়ান্ত হলেও এর খসড়া এখনও তৈরি করা হয়নি। প্রায় একই কথা বলতে শোনা গিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক কর্তাদের।
এ ব্যাপারে সিএনবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেছেন, ‘‘আমরা চুক্তির নথিপত্র তৈরির কাজ শেষ করেছি। ভারত তাদের কৃষিপণ্যের জন্য কিছু সুরক্ষাবলয় রাখছে। আমরা এর সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলি জানি।’’ এই আবহে যুক্তরাষ্ট্র সফর রয়েছেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। আমেরিকার বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো এবং রাজস্বসচিব স্কট বেসান্তের সঙ্গে বৈঠক সারতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, সমাজমাধ্যমে ট্রাম্প পোস্ট করলেও সংশ্লিষ্ট চুক্তির নথিতে সই করেনি দুই দেশ। সেই প্রক্রিয়ার সময় আস্তিনে লুকোনো তাস সামনে আনতে পারে নয়াদিল্লি। প্রধানমন্ত্রীর পোস্টে যার ইঙ্গিত মিলেছে। সেখানে মোদী লিখেছেন, ‘‘মানুষ শুল্কের সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু আমরা ধৈর্য ধরে ছিলাম। তার ফলাফলই এখন দৃশ্যমান।’’ আমেরিকা এবং ভারতের বাণিজ্য সমঝোতাকে অবশ্য ‘ঐতিহাসিক’ বলেও বর্ণনা করেছেন তিনি।
সব ছবি: সংগৃহীত।