সরু একফালি সামুদ্রিক রাস্তা। সেটা বন্ধ করে রাতারাতি যুদ্ধের গতি পাল্টে দিয়েছে ইরান। সাবেক পারস্যের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি-র এ-হেন রণকৌশলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজ়রায়েলের মতো জোড়া শক্তির লেজেগোবরে দশা। তাদের উপর জোরালো প্রত্যাঘাত শানাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনকে ভূগর্ভস্থ শহরে মজুত রেখেছে তেহরান। আগামী দিনে চিন-পাকিস্তানকে জবাব দিতে শিয়া মুলুকের কায়দায় লড়াই করবে ভারতীয় ফৌজ? ডুবোজাহাজের গুপ্তঘাঁটি নির্মাণে নয়াদিল্লি জোর দেওয়ায় ইতিমধ্যেই তুঙ্গে উঠেছে সেই জল্পনা।
অন্ধ্রপ্রদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী গ্রাম রামবিল্লি। পূর্বঘাট পর্বতের কোলের ওই শান্ত জনপদে রাত-দিন এক করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে নৌবাহিনীর প্রকৌশলী বিভাগের একটি দল। উদ্দেশ্য, ভূগর্ভে ডুবোজাহাজের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি নির্মাণ। এর পোশাকি নাম ‘আইএনএস বর্শা’। এর জন্য সমুদ্র থেকে ‘মহেন্দ্র’ পর্বতের পেট চিরে কাটা হয়েছে সুড়ঙ্গ। সেখানে উঁকিঝুঁকি মারা গুপ্তচর কৃত্রিম উপগ্রহের পক্ষেও দুঃসাধ্য। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সংশ্লিষ্ট ঘাঁটি থেকেই আগামী দিনে সামরিক অভিযান পরিচালনা করবে পরমাণু হামলায় সক্ষম ভারতের ‘নিঃশব্দ ঘাতক’-এর দল।
ভারতীয় নৌবাহিনীর পরমাণু ডুবোজাহাজের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে চলা ‘আইএনএস বর্শা’র কৌশলগত অবস্থানও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমে রয়েছে নৌসেনার পূর্ব কমান্ডের সদর দফতর। সেখান থেকে রামবিল্লির দূরত্ব মেরেকেটে ৫০-৭০ কিলোমিটার। সারদা ও বরাহ নদীর সঙ্গমস্থলে একে গড়ে তোলা হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ ছাউনিটির খুব কাছেই থাকবে আণবিক গবেষণাকেন্দ্র বার্কের (ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টার) একটি দফতর।
সূত্রের খবর, ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ‘আইএনএস বর্শা’কে গড়ে তুলছে এ দেশের নৌবাহিনী। সেখানে একসঙ্গে থাকবে কমপক্ষে ১০টি ডুবোজাহাজ। তার জন্য পূর্বঘাট পর্বতের মধ্যে কাটা হচ্ছে অসংখ্য সুড়ঙ্গ। পাশাপাশি, ভূগর্ভস্থ বড় বড় জেটি, পরমাণু ডুবোজাহাজের মেরামতি, নৌসৈনিকদের বিশ্রামের জায়গা-সহ অন্যান্য পরিকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা থাকবে সেখানে। গোটা প্রকল্পটির ব্যয়বরাদ্দ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য অবশ্য পুরোপুরি গোপন রেখেছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার।
তবে ইরান যুদ্ধের থেকে শিক্ষা নিয়ে অন্ধ্রের রামবিল্লিতে ভূগর্ভস্থ পরমাণু ডুবোজাহাজের ঘাঁটি তৈরিতে নয়াদিল্লি হাত লাগিয়েছে, এ কথা ভাবলে ভুল হবে। কারণ, ২০০৫ সালের গোড়ার দিকে ‘আইএনএস বর্শা’র নীলনকশা ছকে ফেলে ভারতীয় নৌসেনা। সেইমতো কিছু দিনের মধ্যেই শুরু হয় এর নির্মাণকাজ। ‘দ্য ইউরেশিয়ান টাইমস’-এর মতো গণমাধ্যমগুলির দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে ৩৭৫ কোটি ডলার খরচ করতে চলেছে মোদী প্রশাসন। ভারতীয় মুদ্রায় অঙ্কটা প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
কেন হঠাৎ ‘আইএনএস বর্শা’র মতো ভূগর্ভস্থ পরমাণু ডুবোজাহাজ ঘাঁটির প্রয়োজন হল ভারতীয় নৌবাহিনীর? এর নেপথ্যে একাধিক কারণের কথা বলেছেন সাবেক সেনাকর্তারা। তাঁদের দাবি, আধুনিক সময়ে সর্ব ক্ষণ সামরিক ছাউনিতে নজরদারি চালায় শত্রুর গুপ্তচর উপগ্রহ। ফলে অভিযান শুরু করতে চলা পরমাণু ডুবোজাহাজের হাঁড়ির খবর খুব সহজেই হাতে পেয়ে যেতে পারে তারা। সেখানে ঢাল হিসাবে সংশ্লিষ্ট ঘাঁটিটিকে ব্যবহার করতে পারবেন এ দেশের জলযোদ্ধারা।
যে কোনও সামরিক অভিযানে বেরোনোর আগে বা অভিযান শেষে ঘরে ফেরার সময় জলের উপরে উঠে আসে ডুবোজাহাজ। সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, সেই সময় অনায়াসে তার গতিবিধির ছবি তুলে ফেলতে পারে শত্রুর গুপ্তচর উপগ্রহ। ‘আইএনএস বর্শা’র নির্মাণকাজ শেষ হলে কোনও ভাবে সেই সুযোগ পাবে না চিন বা পাকিস্তান। কারণ, ‘নিঃশব্দ ঘাতক’-এর তখন জলের উপর উঠে আসার কোনও প্রয়োজন নেই। সুড়ঙ্গের গলি বেয়ে দিব্যি ঘাঁটিতে ঢুকতে ও বেরোতে পারবে তারা।
চলতি বছরের ৩ এপ্রিল ভারতীয় নৌবাহিনীর বহরে পরমাণু অস্ত্রবাহী তৃতীয় ডুবোজাহাজ শামিল করেন কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ। এর সাঙ্কেতিক নাম ‘আইএনএস অরিদমন’। ফৌজি পরিভাষায় এই ধরনের ডুবোজাহাজগুলিকে বলে ‘সাবমার্সিবল শিপ ব্যালেস্টিক মিসাইল নিউক্লিয়ার’ বা এসএসবিএন। এই শ্রেণির প্রথম হাতিয়ারটি ২০১৬ সালে হাতে পায় ভারতীয় নৌসেনা, নাম ‘আইএনএস অরিহন্ত’। আর ২০২৪ সাল থেকে কাজ করছে দ্বিতীয় এসএসবিএন ‘আইএনএস অরিঘাত’।
৭,০০০ টনের পরমাণু ডুবোজাহাজ ‘অরিদমন’ একসঙ্গে আটটি ৩,৫০০ কিলোমিটার পাল্লার কে-৪ ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা ২৪টি ৭৬০ কিলোমিটার পাল্লার কে-১৫ (সাগরিকা) ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম, যা আগের দুই ‘নিঃশব্দ ঘাতক’-এর তুলনায় দ্বিগুণ। এই তালিকায় প্রথম ডুবোজাহাজটির নাম ‘অরিহন্ত’ হওয়ায়, নৌবাহিনীতে তার নামে গোটা শ্রেণিটিকে চিহ্নিত করার চল রয়েছে। সূত্রের খবর, সংশ্লিষ্ট ডুবোজাহাজগুলির আকার, ক্ষেপণাস্ত্র বহনের ক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ক্রু সদস্যদের কথা মাথায় রেখে কৌশলগত ঘাঁটি ‘আইএনএস বর্শা’কে গড়ে তুলছে নয়াদিল্লি।
‘প্রকল্প ৭৫(১)’ কর্মসূচির মাধ্যমে তিনটি পরমাণু অস্ত্রবাহী ডুবোজাহাজ হাতে পেয়েছে ভারতীয় নৌসেনা। পরবর্তী পর্যায়ে ‘প্রকল্প ৭৬’-এর মাধ্যমে আরও ১২টি ‘নিঃশব্দ ঘাতক’কে বাহিনীর বহরে শামিল করার পরিকল্পনা আছে কেন্দ্রের। সাবেক সেনাকর্তাদের দাবি, সেই কারণেই একান্ত ভাবে ‘আইএনএস বর্শা’র প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। সেখানে এসএসবিএন-এর পাশাপাশি হামলাকারী আণবিক শক্তিচালিত এসএসএন (সাবমার্সিবল শিপ নিউক্লিয়ার) শ্রেণির ডুবোজাহাজও থাকবে বলে জানা গিয়েছে।
ভারতীয় নৌবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সদর দফতর বিশাখাপত্তনমের ঘাঁটিতে একসঙ্গে ৫০টি রণতরী নোঙর করার সুবিধা রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হল, ওই ছাউনি সংলগ্ন পোতাশ্রয়ে অহরহ আসা-যাওয়া করে মালবাহী জাহাজ। ফলে বন্দরে ঢোকা বা বেরোনোর সময় প্রায়ই যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে যুদ্ধজাহাজ ও ডুবোজাহাজকে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সেটা এড়াতে দীর্ঘ দিন ধরেই পৃথক গুপ্ত ঘাঁটি তৈরির উপর জোর দিচ্ছিলেন নৌকমান্ডারেরা। তাঁদের কথা মেনে ‘আইএনএস বর্শা’য় সবুজ সঙ্কেত দেয় কেন্দ্র।
সূত্রের খবর, ‘মহেন্দ্র’ পর্বতে নৌবাহিনীর এই গুপ্তঘাঁটিতে রিয়্যাল-টাইম সমন্বয়ের জন্য তৈরি করা হচ্ছে একটি অত্যাধুনিক কমান্ড ও কন্ট্রোল সিস্টেম। শুধু তা-ই নয়, এর সুড়ঙ্গে গোলা-বারুদ সংরক্ষণের জন্য সর্বাধুনিক পরিকাঠামো নির্মাণে জোর দিয়েছে কেন্দ্র। পাশাপাশি, ভূগর্ভস্থ ছাউনিটির আসল অবস্থানকে এমন ভাবেই লুকিয়ে রাখা হচ্ছে যে, সেটা খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। সেখানে সংবেদনশীল সম্পদও সুরক্ষিত রাখতে পারবে সরকার। সামরিক বিশ্লেষকদের বড় অংশেরই অনুমান, এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে চিনকে খোলা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারবে ভারত।
প্রায় ৮.৩৯ লক্ষ বর্গমাইল বিশিষ্ট বঙ্গোপসাগরে এ দেশের নৌবাহিনীর একছত্র আধিপত্য রয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। যদিও গত কয়েক বছরে বহু বার সেখানে ‘অনধিকার প্রবেশের’ চেষ্টা চালিয়েছে চিন। ২০২৪ সাল থেকে বঙ্গোসাগরীয় এলাকায় বেজিঙের ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ নৌবাহিনীর গুপ্তচর জাহাজগুলির বেড়েছে আনাগোনা। কখনও সমুদ্রের তলদেশের মানচিত্র তৈরি, কখনও আবার সেখানকার সম্পদের খোঁজ করতে দেখা গিয়েছে তাদের।
ডুবোজাহাজের সংখ্যার নিরিখে ভারতের থেকে অনেকটাই এগিয়ে আছে চিন। আর তাই গত কয়েক বছর ধরেই ‘নিঃশব্দ ঘাতক’-এর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে নয়াদিল্লি। বঙ্গোপসাগরকে বাদ দিলে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাতেও প্রভাব বিস্তারের মরিয়া প্রচেষ্টা রয়েছে বেজিঙের। সেখানকার তাইওয়ান বা ফরমোজ়া (রিপাবলিক অফ চায়না), জাপান, ফিলিপিন্স থেকে শুরু করে একাধিক দ্বীপরাষ্ট্রের জলসীমায় ঢুকে প্রায়ই ‘দৌরাত্ম্য’ চালাতে দেখা যায় পিএলএ নৌবাহিনীকে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সেখানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে ‘আইএনএস বর্শা’। আগামী দিনে চিনকে আটকাতে ভারতের সঙ্গে আরও সামরিক ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপিন্সের মতো দেশ। তখন কৌশলগত গুপ্তঘাঁটিতে ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলির ডুবোজাহাজকে আশ্রয় দিতে পারে নয়াদিল্লি। সংঘাত পরিস্থিতিতে সেখান থেকে শুরু করা অভিযান নিমেষে যে ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠতে পারে, তা বলাই বাহুল্য।
গত ১৩ এপ্রিল ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা সমঝোতায় সই করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর পোশাকি নাম ‘বৃহৎ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অংশীদারি’ চুক্তি। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এর জেরে মলাক্কা প্রণালীতে বাড়তি নজরদারির অধিকার পাবে আমেরিকার ফৌজ। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরের এই সঙ্কীর্ণ জলপথটিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পণ্য চলাচলের ‘লাইফলাইন’ বলা চলে। সেখানে নজর দেওয়ার নেপথ্যে ওয়াশিংটনের একাধিক কারণ রয়েছে।
মলাক্কা প্রণালীর উত্তরে আছে মালয় উপদ্বীপ। দক্ষিণে সাবেক সুমাত্রা বা ইন্দোনেশিয়া। এই দুইয়ের মাঝ দিয়ে চলা সরু একফালি সামুদ্রিক রাস্তাটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত পথ হিসাবে পরিচিত। বিশ্ব অর্থনীতির এক-চতুর্থাংশ পণ্যের আমদানি-রফতানি হয় এই পথে। আন্দামান সাগর এবং দক্ষিণ চিন সাগরকে সংযুক্ত করেছে এই প্রণালী। এর ঠিক মাথার উপরে রয়েছে নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। ফলে সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক পথে সিংহভাগ জ্বালানি এবং অন্যান্য পণ্য ঘরের মাটিতে আনে বেজিং।
সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, বেজিঙের সঙ্গে সংঘাত বাড়লে মলাক্কা প্রণালী পুরোপুরি ভাবে বন্ধ করার রাস্তায় হাঁটতে পারে ভারত। তখন গুপ্তঘাঁটিতে থাকা ডুবোজাহাজগুলিকে নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের আশপাশে মোতায়েন করতে হবে নয়াদিল্লিকে। অতীতে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ যুদ্ধে নিজেদের শক্তি দেখিয়েছিল নৌবাহিনী। পাকিস্তানের করাচি বন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তারা। ‘আইএনএস বর্শা’র কল্যাণে সেই ছবি ফের এক বার দেখতে পাওয়া যাবে কি না, তার উত্তর দেবে সময়।
ছবি: সংগৃহীত, প্রতীকী ও এআই সহায়তায় প্রণীত।