India-US Diplomacy

কূটনীতিককে বিবস্ত্র করে তল্লাশি, প্রতিবাদে দিল্লির কড়া পদক্ষেপ! মার্কিন হামলায় ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যুতে চর্চায় ১৩ বছর আগের স্মৃতি

দেবযানী খোবরাগাড়কে তাঁর মেয়ের স্কুলের বাইরে হাতকড়া পরানো হয়। ইউএস মার্শাল সার্ভিসের মাধ্যমে তাঁকে বিবস্ত্র করে তল্লাশি (স্ট্রিপ সার্চ) চালানো হয়। শরীরের অভ্যন্তরীণ অংশে তল্লাশির (ক্যাভিটি সার্চ) শিকার হতে হয় তাঁকে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ ০৮:০০
০১ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

১৩ বছর আগের স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে ২০২৬। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে, সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় এক প্রকাশ্য কূটনৈতিক বিরোধে জড়িয়ে পড়েছিল ভারত এবং আমেরিকা। ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল, নিউ ইয়র্কে ভারতের ডেপুটি কনসাল জেনারেল দেবযানী খোবরাগাড়ের গ্রেফতারিকে কেন্দ্র করে। গৃহকর্মীর ভিসা জালিয়াতির অভিযোগে ওয়াশিংটন থেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন ভারতীয় ওই কূটনীতিক। তাঁকে গ্রেফতার করেছিলেন মার্কিন ফেডারেল এজেন্টরা।

০২ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

দেবযানীর গ্রেফতারিতে শুরু হয় ভারত-মার্কিন কূটনৈতিক চাপানউতর। গ্রেফতারির জবাবে ভারতে মার্কিন কূটনীতিকদের সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে ওবামা প্রশাসন দেবযানীকে ভারতে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

০৩ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

সেই ঘটনার জেরে ২০১৪ সালের ১০ জানুয়ারি ভারত সরকার মার্কিন কূটনীতিক ওয়েন মে-কে বহিষ্কারের নির্দেশ দেয়। দেশে ফেরেন দেবযানীও। এরই মধ্যে বিদেশি কূটনীতিকদের পরিচারক-পরিচারিকার আলাদা নথিবদ্ধকরণ বাধ্যতামূলক ঘোষণা করে ওবামা প্রশাসন। দেবযানী-কাণ্ডের কোনও রকম উল্লেখ না করেই হোয়াইট হাউস জানায়, আমেরিকায় পৌঁছোনোর সঙ্গে সঙ্গেই এ বার থেকে কূটনীতিকদের পরিচারক-পরিচারিকাদের নথিবদ্ধকরণ করতে হবে।

Advertisement
০৪ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

অন্য দিকে দেবযানী পরিচারিকা নিগ্রহের অভিযোগে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ জমা পড়েছিল তাতে বলা হয়েছিল, নিউ ইয়র্কে ম্যানহাটনের বাড়িতে বাচ্চাদের দেখাশোনা ও বাড়ির কাজের জন্য যে পরিচারিকা নিয়োগ করেছিলেন তিনি, তাঁকে সপ্তাহে ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় খাটানো হত। ২০১২ সাল থেকে দেবযানীর বাড়িতে কাজ করতেন ওই পরিচারিকা। অভিযোগ, ছিল না সাপ্তাহিক কোনও ছুটি। অসুস্থ হলেও মিলত না ছুটি। চিকিৎসার খরচের ভয়ে পরিচারিকাকে সর্বদা সুস্থ থাকতে বলতেন দেবযানী। মাসের শেষে পরিচারিকাকে বেতন বাবদ দিতেন মাত্র ৫৭৩ ডলার।

০৫ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

এ তো গেল ঘটনাপ্রবাহ। কিন্তু আইনি বিরোধ থেকে ভারত-আমেরিকার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে ফাটল ধরানোর পর্যায়ে পৌঁছোনোর মূল কারণ দেবযানীর গ্রেফতারি ছিল না। যে ভাবে তাঁকে গ্রেফতার করেছিলেন মার্কিন তদন্তকারীরা, সেই পদ্ধতিই ছিল এর জন্য দায়ী।

Advertisement
০৬ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

দেবযানীকে তাঁর মেয়ের স্কুলের বাইরে হাতকড়া পরানো হয়। ইউএস মার্শাল সার্ভিসের মাধ্যমে তাঁকে বিবস্ত্র করে তল্লাশি (স্ট্রিপ সার্চ) চালানো হয়। শরীরের অভ্যন্তরীণ অংশে তল্লাশির (ক্যাভিটি সার্চ) শিকার হতে হয় তাঁকে। সাধারণ অপরাধী এবং মাদকাসক্তদের সঙ্গে একই কক্ষে রাখা হয়েছিল দেবযানীকে।

০৭ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

পরবর্তী কালে আমেরিকা যখন নিশ্চিত করে যে, দেবযানীকে গ্রেফতারির নির্ধারিত সাধারণ এবং প্রথাগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছিল, তখন ভারতীয়দের একাংশের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। দেশবাসীর অপমানবোধকে আরও তীব্র করে তোলে আমেরিকার সেই ব্যাখ্যা।

Advertisement
০৮ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

তার পরেই ভারত-আমেরিকার কূটনৈতিক সম্পর্ক কার্যত তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। নয়াদিল্লি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এবং দৃঢ়তার সঙ্গে দেবযানীর গ্রেফতারি এবং তার পদ্ধতি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানায়। তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) শিবশঙ্কর মেনন প্রকাশ্যে এই আচরণকে ‘ঘৃণ্য ও বর্বরোচিত’ বলে অভিহিত করেন।

০৯ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

সরকার মার্কিন দূতাবাসের কর্মীদের বিমানবন্দরে প্রবেশাধিকার এবং কূটনৈতিক বিশেষ সুবিধা বাতিল করে। চেন্নাই, হায়দরাবাদ, মুম্বই এবং কলকাতায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের কর্মীদের পরিচয়পত্র ফেরত নিয়ে নেওয়া হয় এবং নয়াদিল্লিতে অবস্থিত আমেরিকান দূতাবাস স্কুলের কর্মীদের ভিসা সংক্রান্ত বিষয়গুলো যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করে।

১০ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

সবচেয়ে প্রতীকী পদক্ষেপগুলোর একটি নেওয়া হয়েছিল খাস রাজধানীতেই। নয়াদিল্লিতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের প্রধান প্রবেশপথের বাইরে থাকা কংক্রিটের নিরাপত্তা ব্যারিকেডগুলো সরিয়ে ফেলে ভারত। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও একই মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন। সফররত মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ বা আলোচনায় অস্বীকৃতি জানানো ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন নরেন্দ্র মোদী, যিনি তখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

১১ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

২০১৩ সালে দেওয়া বার্তাটি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। জাতীয় মর্যাদা এবং কূটনৈতিক রীতিনীতি লঙ্ঘিত হয়েছে বলে মনে হলে ভারত পদক্ষেপ করতে এবং কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত। এর এক দশকেরও বেশি সময় পর, একটি ভিন্ন সঙ্কট সেই আগের দৃঢ় অবস্থান বা কঠোর মনোভাব এখনও অটুট আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

১২ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

২০২৬ সালের জুনে ওমান উপসাগরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হামলায় ভারতের তিন জন বাণিজ্যিক নাবিক— আদিত্য শর্মা, শিবানন্দ চৌরাসিয়া এবং পাটনালা সুরেশ নিহত হন। ইরানের তেল পরিবহণের ওপর ওয়াশিংটনের নৌ-অবরোধ কার্যকর করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর উপর ওই হামলা চালানো হয়েছিল।

১৩ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

এই মৃত্যুর ঘটনায় শোকের পাশাপাশি ক্ষোভেরও জন্ম দিয়েছে ভারতে। ঘটনার পরে অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমে এক নৌকর্মীর পরিবারের সদস্যেরা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁর ছবি তুলে ধরেন। নিহত নাবিক আদিত্যের দাদা জানান, ঘটনার প্রকৃত সত্য জানতে চান তাঁরা। তাঁর পরিবারের মন ভেঙে গিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

১৪ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

ভারতের বিদেশ মন্ত্রক মার্কিন ‘চার্জ ডি’অ্যাফেয়ার্স’ জেসন মিকসকে তলব করে এবং তিনি ভারতীয় অসামরিক জাহাজের উপর প্রাণঘাতী হামলার ঘটনাকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘মর্মান্তিক এবং এড়ানো সম্ভব ছিল এমন’ বলে অভিহিত করেন। ১২ জুন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর মার্কিন বিদেশমন্ত্রী মার্কো রুবিয়োর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং ভারতের পক্ষ থেকে ওই ঘটনার ‘কঠোর প্রতিবাদ’ জানান। জয়শঙ্কর যুক্তি দেন, বাণিজ্যিক জাহাজের উপর প্রাণঘাতী পদক্ষেপ কোনও ভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। অথচ, এই কথোপকথন নিয়ে মার্কিন বিদেশ মন্ত্রকের আনুষ্ঠানিক বিবৃতির সুর এবং গুরুত্ব ছিল ভিন্ন।

১৫ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

জয়শঙ্করের ওই আলোচনার বিষয়টি প্রকাশ্যে জানানোর ১৮ ঘণ্টারও বেশি সময় পর প্রকাশিত বিবৃতিতে ভারতের প্রতিবাদের কথা বা তিন জন নাবিকের মৃত্যুর বিষয়— কোনও কিছুরই উল্লেখ ছিল না বলে জানা গিয়েছে। এর পরিবর্তে রুবিয়ো জোর দিয়ে বলেন যে হরমুজ় প্রণালীতে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলিকে অবশ্যই মার্কিন বাহিনীর নির্দেশ মেনে চলতে হবে এবং তিনি সতর্ক করে দেন, অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা হলে তা বরদাস্ত করা হবে না।

১৬ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

এই পার্থক্য ভারতে সমালোচনার জন্ম দেয়। কংগ্রেস সাংসদ শশী তারুর মার্কিন বিবৃতিটিকে ‘অত্যন্ত মর্মান্তিক’ বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যে দেশ নিজেকে ভারতের বন্ধু এবং কৌশলগত অংশীদার বলে দাবি করে, তারা কী ভাবে এতটা ‘গভীর ভাবে অসংবেদনশীল’ আচরণ করতে পারে।

১৭ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

তারুর এ-ও উল্লেখ করেছেন যে, ওই জলপথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিক এবং কর্মীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভারতীয় নাগরিক। তাই এই বাস্তবতার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

১৮ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

প্রাক্তন বিদেশ সচিব নিরুপমা রাও ঘটনাটিকে আরও বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিচার করেছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, সমসাময়িক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ, শুল্ক ও জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপের ভাষাই ক্রমশ প্রাধান্য পাচ্ছে। কূটনীতিকে কেবল এর পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।

১৯ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

এই মুহূর্তটির মধ্যে এক ধরনের ঐতিহাসিক সমান্তরাল চিত্রও রয়েছে। ২০১৩ সালে দেবযানী-কাণ্ডের সময় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপড়েন নিরসনে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসাবে জয়শঙ্কর নিজেই ওয়াশিংটনে গিয়েছিলেন। এক দশকেরও বেশি সময় পর, বিদেশে ভারতীয় নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনায় ভারতের কূটনৈতিক পদক্ষেপের নেতৃত্ব এখন তাঁর হাতেই।

২০ ২০
India's 2013 Retaliation Against the US Embassy Back in Discussion After 2026 Diplomatic Tensions

২০১৩ সালে ভারত যখন মার্কিন দূতাবাসের প্রধান প্রবেশপথের ব্যারিকেড সরিয়ে নিয়েছিল, তখন সেই পদক্ষেপের বার্তাটি সবাই বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে প্রশ্ন উঠছে— শক্তি এবং কৌশলগত হিসাব-নিকাশ দ্বারা চালিত আজকের বিশ্বে কেবল কূটনৈতিক প্রতিবাদের কি আদৌ তেমন কোনও প্রভাব বা গুরুত্ব রয়েছে?

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
আরও গ্যালারি