‘অপারেশন সিঁদুর’-এর নায়ক। নাম শুনলেই আতঙ্কে কাঁপে গোটা পাকিস্তান। কিন্তু, বছর ঘুরতেই ঘোর সঙ্কটে ভারতীয় সেনাবাহিনীর গর্বের সেই ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র! কারণ, বিপুল সংখ্যায় কর্মীবদলির জেরে বর্তমানে ৫০ শতাংশ কমে গিয়েছে সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটির উৎপাদন। ফলে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে অস্ত্রের অভাবে এ দেশের নৌবাহিনীকে যে বিশেষ করে ভুগতে হবে, তা বলাই বাহুল্য।
মাত্র এক বছরের মধ্যে কী ভাবে এতটা হ্রাস পেল ব্রহ্মসের উৎপাদন? বিষয়টি নিয়ে সরকারি ভাবে কোনও বিবৃতি দেয়নি কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। তবে সূত্রের খবর, গত কয়েক মাসে অন্তত ৫৬ জন গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীকে বিভিন্ন কারখানায় বদলি করেছে ‘সুপারসনিক’ (শব্দের চেয়ে গতিশীল) ক্ষেপণাস্ত্রটির নির্মাণকারী সংস্থা। এর ফলে কর্মীমহলে তৈরি হয় ঘোর অসন্তোষ, যার জেরে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন তাঁদের একাংশ। উৎপাদন মার খাওয়ার নেপথ্যে এই ডামাডোলকে চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
ভারত-রাশিয়া যৌথ উদ্যোগে তৈরি বিশ্বের দ্রুততম ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রটির নির্মাণকারী সংস্থা হল ব্রহ্মস অ্যারোস্পেস লিমিটেড। এ দেশে তাঁদের দু’টি মূল উৎপাদনকেন্দ্র রয়েছে, তেলঙ্গানার হায়দরাবাদ এবং উত্তরপ্রদেশের লখনউ। এ ছাড়া ব্রহ্মসের শরীরের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ মহারাষ্ট্রের নাগপুর এবং রাজস্থানের পিলানিতে তৈরি হয়। সূত্রের খবর, উৎপাদন বৃদ্ধি করতে এই চার কেন্দ্রের কর্মীদের এ দিক-ও দিকে বদল করে নির্মাণকারী সংস্থা। আর তাতেই হয়েছে হিতে বিপরীত।
সূত্রের খবর, মাস্টার টেকনিশিয়ান, সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার, সিনিয়র টেকনিশিয়ান, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার, সিনিয়র সিস্টেম ম্যানেজার, এগ্জ়িকিউটিভ অফিসার এবং সিনিয়র এগ্জ়িকিউটিভ পদাধিকারীরাই বেশি করে বদলির নির্দেশ পেয়েছেন। ব্রহ্মস উৎপাদনের সবচেয়ে পুরনো কেন্দ্রটি তেলঙ্গানার হায়দরাবাদে অবস্থিত। এই ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপারে সেখানকার কর্মীদের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি। অভিযোগ, তাঁদের একাংশকেই এ বছরের ১৩ এপ্রিলের মধ্যে লখনউ, নাগপুর এবং পিলানির ইউনিটে যাওয়ার নির্দেশ দেয় নির্মাণকারী সংস্থা।
এ ছাড়া লখনউ, নাগপুর এবং নয়াদিল্লি থেকেও পিলানিতে কর্মীদের বদলি করেছে ব্রহ্মস অ্যারোস্পেস লিমিটেড। এর ফলে কর্মচারী মহলে দানা বাঁধে ক্ষোভ। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খোলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংস্থার এক পদস্থ কর্তা। তাঁর কথায়, ‘‘এই বদলি যুক্তিহীন। দক্ষ কর্মীরা অন্যত্র চলে যাওয়ায় হায়দরাবাদের কেন্দ্রের উৎপাদন প্রক্রিয়া মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’’ বাহিনীকে হাতিয়ার সরবরাহ প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেননি তিনি।
ভারতীয় নৌবাহিনীর ‘ডেস্ট্রয়ার’ শ্রেণির রণতরীগুলির মূল হাতিয়ার হল ব্রহ্মস। প্রথাগত বিস্ফোরকের পাশাপাশি পরমাণু হাতিয়ার বহনের সক্ষমতা রয়েছে এই ক্ষেপণাস্ত্রের। শুধু তা-ই নয়, সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ মনে করেন, ব্রহ্মস থাকার কারণেই আরব সাগর এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় দাপিয়ে বেড়াতে পারছেন এ দেশের জলযোদ্ধারা। আগামী দিনে চিনের ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ নৌসেনাকে রুখতে এই হাতিয়ার কার্যকরী ভূমিকা নেবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
এ সব জানা সত্ত্বেও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের অভিজ্ঞ কর্মীদের কেন বদলি করল ব্রহ্মস অ্যারোস্পেস লিমিটেড? এর নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) লখনউয়ে ব্রহ্মস উৎপাদনের নতুন কারখানার উদ্বোধন করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ। সেখানে বছরে তৈরি হবে ৮০-১০০টি ক্ষেপণাস্ত্র। কিন্তু, অভিজ্ঞ কর্মীদের ছাড়া ওই লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছোনো সম্ভব নয়। আর তাই তড়িঘড়ি বদলির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে ব্রহ্মসের নির্মাণকারী সংস্থা।
দ্বিতীয়ত, ২০২১ সালের মার্চে এই ক্ষেপণাস্ত্রের একটি হালকা অথচ উন্নত শ্রেণি তৈরির পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিআরডিও (ডিফেন্স রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজ়েশন)। নতুন যুগের হাতিয়ারটির নাম দেওয়া হয় ‘ব্রহ্মস এনজি’ (নিউ জেনারেশন)। বিশেষজ্ঞদের দাবি, মূলত মিগ-২৯ এবং তেজ়স মার্ক ১-এর মতো হালকা লড়াকু জেটের কথা মাথায় রেখে এর নকশা তৈরি করা হচ্ছে। অত্যধিক ওজনের কারণে বর্তমানে সংশ্লিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রটিকে নিয়ে উড়তেই পারে না এই সমস্ত যুদ্ধবিমান।
চলতি বছরেই ‘ব্রহ্মস এনজি’র পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের কথা রয়েছে। মূল ক্ষেপণাস্ত্রটির চেয়ে অর্ধেক ওজনের সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটি লম্বায় তিন মিটার ছোট হতে যাচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। তবে কমবে না গতিবেগ। অর্থাৎ, শব্দের চেয়ে তিন গুণ গতিতেই ছুটতে পারবে ১,২০০ কেজি ওজনের ‘ব্রহ্মস এনজি’। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে লখনউয়ে এর গবেষণা এবং পরীক্ষাকেন্দ্রের উদ্বোধন করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ। যদিও সেখানে কাজ শুরু করার অনুমোদন এখনও দেয়নি কেন্দ্র।
লখনউয়ের গবেষণাকেন্দ্রে ‘ব্রহ্মস এনজি’র গবেষণা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ চালাতে হলে চাই একগুচ্ছ অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার। সেই কারণে ক্ষেপণাস্ত্রটির মূল উৎপাদনকেন্দ্র থেকে তাঁদের সরিয়ে সেখানে আনা হচ্ছে। তা ছাড়া গত কয়েক বছরে ব্রহ্মসের প্রযুক্তি চুরি করার কম চেষ্টা করেনি পাক গুপ্তচর সংস্থা ‘ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স’ বা আইএসআই, যার জেরে এর একটি উৎপাদনকেন্দ্রে দীর্ঘ দিন কোনও কর্মীকে রাখা নির্মাণকারী সংস্থা ও কেন্দ্রের জন্য একেবারেই স্বস্তিজনক নয়।
২০২৩ সালের মে মাসে পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ডিআরডিওর এক বিজ্ঞানীকে গ্রেফতার করে মহারাষ্ট্রের জঙ্গিদমন শাখা বা এটিএস (অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াড)। তদন্তকারীদের দাবি, আইএসআইকে বিভিন্ন ধরনের হাতিয়ারের গোপন তথ্য পাচার করেছেন ওই ব্যক্তি। এর জন্য পদের অপব্যবহারও করেন তিনি। ইসলামাবাদের এক হ্যান্ডলারের সঙ্গে পুণেয় যোগাযোগের সময় তাঁকে হাতেনাতে গ্রেফতার করেন এটিএসের গোয়েন্দারা।
এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর চাইছে না কেন্দ্র। এর ফলে অভিজ্ঞ কর্মীদের বিভিন্ন কেন্দ্রে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিয়েছে ব্রহ্মস অ্যারোস্পেস লিমিটেড। সূত্রের খবর, এর ফলে অতি সহজেই তাঁদের গতিবিধির উপর নজর রাখতে পারবেন গোয়েন্দারা। এর পরেও কেউ পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির চেষ্টা করলে তাঁর ঠাঁই যে শ্রীঘরে হবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
১৯৯৮ সালে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় ভারত। সেই লক্ষ্যে ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি চুক্তিতে সই করে নয়াদিল্লি ও মস্কো। ঠিক হয় সংশ্লিষ্ট হাতিয়ার নির্মাণে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে রুশ প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা এনপিও মাশিনোস্ট্রোয়েনিয়ার। পাশাপাশি, এর নকশা তৈরিতে যুক্ত থাকবে ডিআরডিও। পরবর্তী বছরগুলিতে ক্ষেপণাস্ত্রটির উৎপাদন সংস্থা হিসাবে জন্ম হয় ব্রহ্মস অ্যারোস্পেস লিমিটেডের।
উত্তর-পূর্ব ভারতের ব্রহ্মপু্ত্র এবং রাশিয়ার মস্কোভা নদীর নাম মিলিয়ে ‘ব্রহ্মস’ শব্দটি তৈরি করা হয়েছে। হাতিয়ারটির প্রযুক্তির ব্যাপারে ডিআরডিও এবং এনপিও মাশিনোস্ট্রোয়েনিয়ারের অংশীদারির পরিমাণ ৫০-৫০ শতাংশ। বর্তমানে এ দেশের বাহিনী যে ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে, তার চারটি শ্রেণিবিভাগ রয়েছে। স্থল, রণতরী, যুদ্ধবিমান এবং ডুবোজাহাজ থেকে একে ছোড়া যায়। সূত্রের খবর, ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪,৯০০ কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারে ব্রহ্মস।
২০০৫ সালের নভেম্বর থেকে এই ব্রহ্মাস্ত্র ব্যবহার করা শুরু করে ভারতীয় সেনার তিন বাহিনী। এর পাল্লার রকমফের রয়েছে। প্রায় সাড়ে আট মিটার লম্বা ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র ৩০০ কেজি বিস্ফোরক বহনে সক্ষম। এক একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ওজন তিন হাজার কেজি। মারণাস্ত্রটি হাইপারসনিক শ্রেণিতে বদলে গেলে এর পাল্লা বেড়ে দাঁড়াবে দেড় হাজার কিলোমিটার। বর্তমানে সেই গবেষণার কাজ চলছে বলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে মিলেছে খবর।
ভারতীয় সেনা এবং নৌবাহিনী যে ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে, তার পাল্লা ৮০০ কিলোমিটার। অন্য দিকে, এ দেশের বিমানবাহিনীর হাতে থাকা এই হাতিয়ার ৪৫০-৫০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে পাক মদতপুষ্ট জঙ্গি হামলায় প্রাণ হারান ২৬ জন নিরীহ পর্যটক। নির্বিচারে তাঁদের উপর গুলি চালায় বেশ কয়েক জন সন্ত্রাসী। এর পরই ইসলামাবাদকে শিক্ষা দিতে আসরে নামে এ দেশের ফৌজ।
২০২৫ সালের ৭-১০ মে পাক অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীর (পিওজেকে) এবং পাকিস্তানের ভিতরে সামরিক অভিযান চালায় ভারতীয় সেনা, যার সাঙ্কেতিক নাম ‘অপারেশন সিঁদুর’ রাখে এ দেশের বাহিনী। গোড়ায় সেখানকার জঙ্গিঘাঁটিগুলিকে নিশানা করে ফৌজ। কিন্তু, সন্ত্রাসীদের বাঁচাতে ইসলামাবাদ ড্রোন হামলা শুরু করলে তাদের ১১টি বিমানঘাঁটিকে গুঁড়িয়ে দেয় নয়াদিল্লি। এর মধ্যে নুর খান, সারগোদা, মুরিদকে, রহিম ইয়ার খান এবং জাকোবাবাদের ছাউনি উল্লেখযোগ্য।
সূত্রের খবর, ওই সময় ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্রেই ওই সমস্ত ঘাঁটিগুলিকে নিশানা করে এ দেশের সেনা। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটিকে চিহ্নিতই করতে পারেনি পাক ফৌজের আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা। ফলে তড়িঘড়ি ভারতীয় সেনার ডিজিএমও-র (ডিরেক্টর জেনারেল অফ মিলিটারি অপারেশন) সঙ্গে কথা বলে সংঘর্ষবিরতি করে নেয় ইসলামাবাদ। লড়াই থামলেও আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাজারে বাড়তে থাকে ব্রহ্মসের চাহিদা।
২০২২ সালে ব্রহ্মস কিনতে কেন্দ্রের মোদী সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে ফিলিপিন্স। এর জন্য ৩৭ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার পেয়েছে নয়াদিল্লি। এর ঠিক দু’বছরের মাথায় সংশ্লিষ্ট মারণাস্ত্রের নির্মাণকারী সংস্থাকে ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য ২২০টি ব্রহ্মসের মেগা বরাত দেয় কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। এ বছর সংশ্লিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রটি আমদানির ব্যাপারে নয়াদিল্লির সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করেছে ইন্দোনেশিয়া।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি ক্ষেত্রে সরবরাহ শৃঙ্খল ঠিক রাখতে হলে উৎপাদনের গতি কমালে চলবে না। আর তাই বদলি সংক্রান্ত সমস্যার দ্রুত সমাধানের পথ খুঁজছে ব্রহ্মস অ্যারোস্পেস লিমিটেড। এ ব্যাপারে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের হস্তক্ষেপ করার ষোলো আনা সম্ভাবনা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত যাবতীয় চ্যালেঞ্জ ব্রহ্মস কাটিয়ে উঠতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার।
ছবি: সংগৃহীত ও প্রতীকী।