ইরান যুদ্ধে ইতি টানতে মরিয়া আমেরিকা। সেই রাস্তায় হুল ফোটাচ্ছে ইজ়রায়েল! শুধু তা-ই নয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যাবতীয় বিধিনিষেধ উড়িয়ে দিব্যি প্রতিবেশী লেবাননে আক্রমণ বজায় রেখেছে তেল আভিভ। এই লড়াইয়ের গোড়া থেকেই ইহুদিদের ‘হাতের পুতুল’ হয়ে থাকতে দেখা গিয়েছে ‘সুপার পাওয়ার’ ওয়াশিংটনকে। কিন্তু কেন? জবাব খুঁজছেন দুনিয়ার তাবড় সামরিক বিশ্লেষকেরা।
চলতি বছরের ১ জুন, সোমবার নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নাম করে একটি পোস্ট করেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি লেখেন, ‘‘আমার সঙ্গে ওঁর কথা হয়েছে। বেরুটে আর সেনা পাঠাবেন না বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।’’ এর কিছু ক্ষণের মধ্যেই ইহুদি আক্রমণ বন্ধ হচ্ছে বলে বিবৃতি দেয় ইরান মদতপুষ্ট লেবাননের প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী হিজ়বুল্লা।
কিন্তু, ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই ভেঙে যায় সেই যুদ্ধবিরতি। ২ জুন, মঙ্গলবার দক্ষিণ লেবাননে মুহুর্মুহু ড্রোন হামলা চালায় ইজ়রায়েলি ফৌজ। তাতে মৃত্যু হয় আট জনের। এই আবহে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ফোনে কথোপকথন নিয়ে বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের একটি জনপ্রিয় গণমাধ্যম। তাঁদের দাবি, ইরান ও লেবানন সংঘাত নিয়ে ইহুদি প্রধানমন্ত্রীর কড়া সমালোচনা করেছেন ‘তিতিবিরক্ত’ ট্রাম্প।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুকে ফোনে ট্রাম্প বলেন, ‘‘আপনি একজন বদ্ধ উন্মাদ। আমি না থাকলে এত দিন জেলে থাকতেন। আপনাকে এখন সকলে ঘৃণার চোখে দেখে।’’ সূত্রের খবর, এর জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কড়া কথা শোনাতে ছাড়েননি ইহুদি প্রধানমন্ত্রী। বিশ্লেষকদের দাবি, এর পরেও যুক্তরাষ্ট্রের উপরে তেল আভিভের রাশ আলগা হচ্ছে, এমনটা নয়।
এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে ইরান আক্রমণ করে বসে ইজ়রায়েল। যুদ্ধের প্রথম দিনেই শিয়া ধর্মগুরু তথা তেহরানের সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই-সহ একগুচ্ছ সেনা কমান্ডারকে উড়িয়ে দেয় তারা। পাল্টা প্রত্যাঘাত শানাতে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রাস্তা হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে সাবেক পারস্যের ফৌজ। পাশাপাশি, সক্রিয় হয় তাদের মদতপুষ্ট লেবাননের হিজ়বুল্লাও।
অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসারেরা মনে করেন, ইরান যুদ্ধে একরকম জোর করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে টেনে নামিয়েছেন সুচতুর নেতানিয়াহু। আমেরিকাকে সামনে রেখে দুটো কাজ সারতে চাইছেন তিনি। এক, তেহরানে ইহুদিদের পছন্দের সরকার গঠন। দুই, সাবেক পারস্যকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে না দেওয়া। দু’টি বিষয়ের সঙ্গেই তেল আভিভের স্বার্থ জড়িত, ওয়াশিংটনের নয়। এক কথায় এই লড়াই থেকে ট্রাম্পের কিছুই পাওয়ার নেই।
শুধুমাত্র ইরানের ব্যাপারেই যুক্তরাষ্ট্রের খোলা সমর্থন তেল আভিভের দিকে আছে, তা কিন্তু নয়। ১৯৪৮ সালে জন্মলগ্ন থেকে এই সুবিধা পেয়ে আসছে ইজ়রায়েল। ওই সময় তাঁদের স্বীকৃতি প্রদানকারী প্রথম দেশ ছিল আমেরিকা। পশ্চিম এশিয়ায় নবগঠিত ইহুদি রাষ্ট্রের ঘোষণা হওয়ার মাত্র ১১ মিনিটের (প্রায় ৬৬০ সেকেন্ড) মধ্যেই সেই কাজটি সেরে ফেলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান।
পশ্চিম এশিয়ায় ইজ়রায়েলের জন্ম পার্শ্ববর্তী কোনও আরব দেশই মেনে নিতে পারেনি। ফলে, ইহুদি রাষ্ট্রটিকে মানচিত্র থেকে মুছে দিতে চারদিক থেকে আক্রমণ শানায় তারা। ওই সময় তেল আভিভকে বাঁচাতে সরাসরি লড়াইয়ের ময়দানে না নামলেও তাদের হাতিয়ার ও আর্থিক সাহায্য দিতে কোনও রকম কার্পণ্য করেনি আমেরিকা। পাশাপাশি, ইহুদিদের ঢালাও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে যুক্তরাষ্ট্র।
১৯৪৮ সালের মে মাস থেকে শুরু করে ১৯৪৯ সালের মার্চ পর্যন্ত চলে প্রথম আরব-ইজ়রায়েল যুদ্ধ। তাতে এককাট্টা হয়ে ইহুদিদের আক্রমণ করে আরব লিগ। আজকের প্যালেস্টাইন ছাড়াও সংশ্লিষ্ট বাহিনীতে ছিল মিশর, জর্ডন, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, সৌদি আরব এবং ইয়েমেনের ফৌজ। গোড়ার দিকে দ্রুত গতিতে জ়েরুজালেমে ঢুকে পড়ে তারা। কিন্তু, মার্কিন সাহায্য থাকায় ধীরে ধীরে তাদের পিছু হটতে বাধ্য করে তেল আভিভ।
এর পর ইহুদি রাষ্ট্রটিকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পরবর্তী বছরগুলিতে পশ্চিম এশিয়ায় তাদের সঙ্গে হওয়া আরব রাষ্ট্রগুলির যাবতীয় চুক্তি কার্যকর করার দায়িত্ব নিজের থেকেই কাঁধে তুলে নেয় আমেরিকা। ১৯৭৯ সালে ক্যাম্প ডেভিড সমঝোতায় প্রথম আরব রাষ্ট্র হিসাবে তেল আভিভকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় মিশর। ১৯৯৪ সালে জর্ডন এবং ২০২০ সালে একই পথে হাঁটতে দেখা যায় সংযুক্ত আরব আমিরশাহিকে।
বিশ্লেষকদের দাবি, সংশ্লিষ্ট আরব রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে ইজ়রায়েলের ‘বন্ধুত্বের’ নেপথ্য কারিগর আমেরিকা। বর্তমানে সৌদি আরব, সিরিয়া, কুয়েত, কাতার বা ইরাক আনুষ্ঠানিক ভাবে তেল আভিভকে স্বীকৃতি না দিলেও পুরনো বৈরিতা আর নেই। অন্য দিকে এ ব্যাপারে ক্রমাগত তাদের চাপ দিয়ে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই আরব রাষ্ট্রগুলির প্রায় প্রতিটিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় সেনাঘাঁটি।
শুধু তা-ই নয়, বর্তমানে ইজ়রায়েলকে বছরে ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সাহায্য দিয়ে থাকে আমেরিকা। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেটা বেড়ে ২,১৭০ কোটি ডলার পর্যন্তও যেতে দেখা গিয়েছে। লোহিত সাগর বা ভূমধ্যসাগরের দিক থেকে ইহুদি ভূমিতে আক্রমণ ঠেকাতে সব সময় সেখানে বিমানবাহী রণতরীর নৌবহর মোতায়েন রাখে যুক্তরাষ্ট্র। তা ছাড়া লড়াই বাধলেই তেল আভিভে ক্ষেপণাস্ত্র, লড়াকু জেট, আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা পাঠিয়ে থাকে ওয়াশিংটন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ-হেন ইজ়রায়েল প্রেমের নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, খনিজ তেলের লোভেই আরব রাষ্ট্রগুলির উপর প্রভাব বজায় রাখতে চায় আমেরিকা। সেখানে তাঁদের তুরুপের তাস পশ্চিম এশিয়ার ওই ছোট্ট ইহুদি রাষ্ট্র। ওয়াশিংটন জানে, যত ক্ষণ তেল আভিভের ভয় কাজ করবে, তত ক্ষণই তাঁদের নিরাপত্তার ছাতার তলায় থাকতে চাইবে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত বা আমিরশাহি।
দ্বিতীয়ত, মার্কিন অর্থনীতির অনেকটাই খনিজ তেল ও হাতিয়ারের উপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে তরল সোনা আবার মূলত বিক্রি হয় ডলারে। দু’টি ক্ষেত্রেই ইজ়রায়েলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আরব রাষ্ট্রগুলির কেউ এই ব্যবস্থা ভাঙার চেষ্টা করছে কি না, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সেই হাঁড়ির খবর জোগাড় করে দিতে পারে একমাত্র ইহুদিরাই। আর তাই তেল আভিভকে বাদ দিয়ে পশ্চিম এশিয়ার বিদেশনীতি ঠিক করা ওয়াশিংটনের পক্ষে অসম্ভব।
সামরিক বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, ইজ়রায়েলের জন্যই সিরিয়ায় রুশ প্রভাবিত বাশার অল-আসাদের সরকারকে সরিয়ে ‘নিজেদের লোক’কে ক্ষমতায় আনতে পেরেছে আমেরিকা। একসময় খনিজ তেল বিক্রিতে মার্কিন ডলারকে চ্যালেঞ্জ করে বসেন ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেন। এর জেরে ২০০৩ সালে মার্কিন সেনা অভিযানে পতন হয় তাঁর। সেই চিত্রনাট্যের নেপথ্যেও যে ইহুদিদের হাত ছিল, তা বলাই বাহুল্য।
উল্টো দিকে এ ব্যাপারে ইজ়রায়েলের লাভও হচ্ছে ষোলো আনা। যুক্তরাষ্ট্রের মদত থাকায় গত ৭৮ বছরে নিজেদের এলাকা বহু গুণে বাড়াতে সক্ষম হয়েছে তেল আভিভ। সেটা আগামী দিনে বজায় থাকবে বলেই মনে করেন সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ। তাঁদের যুক্তি, আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইহুদিদের মারাত্মক প্রভাব রয়েছে। এর জোরে ওয়াশিংটনের বিদেশনীতিকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হচ্ছেন তাঁরা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) পরবর্তী সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় ব্যাঙ্ক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি নিয়ন্ত্রণ করছে ইহুদিরা। আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা, কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) এমনকি অত্যাধুনিক হাতিয়ারের প্রযুক্তি ও নকশা তৈরিতে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সেই কারণেই ওয়াশিংটনকে নিজের আঙুলে নাচাতে পারছে তারা।
আমেরিকার ঘরোয়া রাজনীতিতে সর্বাধিক প্রভাব রয়েছে ডেমোক্র্যাটিক এবং রিপাবলিকান পার্টির। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এই দুই দল থেকেই নির্বাচিত হন প্রেসিডেন্ট। ভোটে লড়া বা দল চালানোর জন্য তাঁদের যে টাকার প্রয়োজন, সেটা মূলত মিটিয়ে থাকেন সেখানে বসবাসকারী ইহুদিরা। অতীতে বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে তাঁদের বসতে দেখা গিয়েছে। উদাহরণ হিসাবে হাইনৎজ় আলফ্রেড কিসিংগারের কথা বলা যেতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং জেরাল্ড ফোর্ডের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ সচিব ছিলেন এই ইহুদি রাজনৈতিক নেতা। ১৯৬৯-’৭৫ সাল পর্যন্ত আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্বভারও সামলান কিসিংগার। বিশ্লেষকদের বড় অংশই মনে করেন, তাঁর তৈরি করা নীতির উপর ভিত্তি করেই আজও গোটা বিশ্বে নিজেদের প্রভাব বজায় রেখেছে ওয়াশিংটন।
এগুলিকে বাদ দিলে আরও একটি কারণে ইহুদিদের কথায় চলতে বাধ্য হচ্ছে আমেরিকা। সেটা হল, কোনও ইস্যুতে তাদের জনমত তৈরি করার দক্ষতা। উদাহরণ হিসাবে ইরাকের কথা বলা যেতে পারে। ওই সময় বাগদাদের কাছে গণবিধ্বংসী হাতিয়ার আছে বলে রটিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্লেষকদের দাবি, সেটা হল ইজ়রায়েলেরই মস্তিষ্কপ্রসূত। দু’দশক পর সেই একই তত্ত্ব ইরানের বিরুদ্ধেও ব্যবহার করছে তারা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তেহরানের যুদ্ধ থামাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান। এ ব্যাপারে প্রবল আপত্তি আছে ইজ়রায়েলের। ইসলামাবাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে ইহুদিরা। তা ছাড়া লড়াই থামানোর অন্যতম শর্ত হিসাবে ইরান মদতপুষ্ট বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলিকে পুরোপুরি শেষ করতে বদ্ধপরিকর তেল আভিভ। আর তাই মার্কিন নিষেধ সত্ত্বেও হিজ়বুল্লাকে ক্রমাগত নিশানা করছে তাঁরা।
ছবি: সংগৃহীত ও প্রতীকী।