ইরান-ইজ়রায়েল যুদ্ধে রক্তাক্ত পশ্চিম এশিয়া। লড়াইয়ের মধ্যেই বেছে বেছে সাবেক পারস্য দেশের সেনা অফিসার এবং পরমাণু বিজ্ঞানীদের নিকেশ করছে ইহুদি গুপ্তচরবাহিনী মোসাদ। তাঁদের সঙ্গে কিছুতেই এঁটে উঠতে পারছে না শিয়া মুলুকের গোয়েন্দারা। সূত্রের খবর, তেহরানের ভিত নাড়িয়ে দিতে সেখানে এক তরুণী গুপ্তচরকে পাঠিয়েছে তেল আভিভ। বর্তমানে সেই ‘লেডি কিলার’কে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে ইরানি সেনা ও পুলিশ।
চলতি বছরের ১৩ থেকে ২১ জুনের মধ্যে ইজ়রায়েলি হামলায় অন্তত ১০ জন পরমাণু বিজ্ঞানীকে হারিয়েছে তেহরান। সাবেক পারস্য দেশের আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসির সর্বাধিনায়ককেও উড়িয়ে দিয়েছে ইহুদি ফৌজ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাড়ি বা গাড়িতে থাকাকালীন ক্ষেপণাস্ত্র বা বোমায় নিশানা করা হয়েছে তাঁদের। তেল আভিভের আক্রমণ এতটাই নিখুঁত ছিল যে আশপাশের কোনও কিছু সে ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
ইরানি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইহুদিদের ‘টার্গেট কিলিং’য়ের ধরন দেখে সন্দেহ হয় তেহরানের গুপ্তচর সংস্থা ‘মিনিস্ট্রি অফ ইনটেলিজেন্স অফ দ্য ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরান’ বা এমওআইএসের। পার্সি ভাষায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাটির নাম ভাজা। ফলে সঙ্গে সঙ্গে খুনগুলির ব্যাপারে তদন্তে নামে তারা। আর সেখানেই উঠে আসে এক ইজ়রায়েলি গুপ্তচরের নাম, ক্যাথরিন পেরেজ শেকড। যদিও তাঁর নাগাল পায়নি শিয়া মুলুকটির গুপ্তচরেরা।
ইরানি গোয়েন্দা সূত্রে খবর, আদ্যন্ত ফরাসি ক্যাথরিন মোসাদের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর সোজা চলে আসেন তেহরান। সেখানে পৌঁছে শিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তিনি। এর পর বিশ্বাস অর্জনের জন্য সাবেক পারস্য দেশের সরকার এবং সেনার প্রতি আনুগত্য দেখাতে থাকেন তিনি। ফলে অচিরেই আইআরজিসির উচ্চপদস্থ কমান্ডারদের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে তাঁর।
প্রাথমিক তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, ইরানি সেনা অফিসারদের একাংশের বাড়িতে ছিল তাঁর অবাধ যাতায়াত। ফলে কিছু দিনের মধ্যেই তাঁদের গতিবিধি চলে যায় ক্যাথরিনের নখদর্পণে। ফলে যুদ্ধ বাধতেই তরুণী গুপ্তচরের থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতে চলে আসে মোসাদের। ওই তথ্যের উপর ভিত্তি করেই শিয়া কমান্ডারদের নিকেশ করার নীল নকশা ছকে ফেলে ইজ়রায়েল।
গত ১৩ জুন ইরানের একাধিক পরমাণুকেন্দ্র এবং সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায় ইহুদি বায়ুসেনা। তাঁদের অতর্কিত আক্রমণে ওই দিনই প্রাণ হারান আইআরজিসির প্রধান তথা চিফ অফ স্টাফ মহম্মদ হোসেন বাগেরি এবং কমান্ডার-ইন-চিফ হোসেন সালামি। দু’জনেই ছিলেন মেজর জেনারেল পদমর্যাদার অফিসার। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, শিয়া ধর্মগুরু তথা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা (পড়ুন সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এই আইআরজিসি।
শিয়া ফৌজের এই দুই শীর্ষকর্তার মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দ্বিতীয় বার ধাক্কা খায় তেহরান। জানা যায়, আইআরজিসির ডেপুটি কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলাম আলি রশিদ ও রেভলিউশনারি গার্ড অ্যারোস্পেস ফোর্সের প্রধান মেজর জেনারেল আমির আলি হাজিজ়াদের মৃত্যু হয়েছে ইজ়রায়েলি বিমানবাহিনীর আক্রমণে। ফলে ইরানি সেনার মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বাগেরির মৃত্যুর পর গত ১৪ জুন তাঁর জায়গায় আলি শাদমানিকে নিয়োগ করেন আলি খামেনেই। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল থেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন তিনি। আইআরজিসির মূল সদর দফতর ‘খতম আল-আম্বিয়া’র দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। কিন্তু, ঠিক তিন দিনের মাথায় (পড়ুন ১৭ জুন) রাতের অন্ধকারে ওই ভবনেই আক্রমণ শানায় ইহুদি বায়ুসেনা। তাতে প্রাণ হারান নবনিযুক্ত সেনাপ্রধান শাদমানি। যদিও তাঁর মৃত্যু নিয়ে কোনও বিবৃতি দেয়নি তেহরান।
এ ছাড়াও প্রাণ হারিয়েছেন শিয়া ফৌজের গুপ্তচর বাহিনীর উপপ্রধান গোলাম রাজা মেহরবি এবং ডেপুটি অফ অপারেশন্স মেহেদি রব্বানি। ১৫ জুন ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান মহম্মদ কাজ়েমিকে উড়িয়ে দেয় ইজ়রায়েল। ফলে বাধ্য হয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ খাদেমিকে নতুন গোয়েন্দাপ্রধান নিযুক্ত করে তেহরান। দায়িত্ব নিয়েই মোসাদের ‘লেডি কিলার’ ক্যাথরিনের খোঁজে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তিনি।
এর পর ইহুদিদের ‘টার্গেট কিলিং’ বন্ধ করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ করে ইরান। আইআরজিসির কমান্ডারদের মোবাইল ফোনের ব্যবহার বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। বাড়ানো হয় তাঁদের সুরক্ষা। যদিও তাতে লাভ তেমন হয়নি। ২১ জুন খামেনেইয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাহিনীর আরও দুই কমান্ডারের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করে ইজ়রায়েল। তাঁদের নাম সইদ ইজ়াদি এবং বেনহ্যাম শরিয়ারি।
ইহুদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজ়রায়েল কাট্জ়ের দেওয়া বিবৃতি অনুযায়ী, ইরানের কুম প্রদেশে একটি বহুতলে হামলা চালায় তারা। সেখানেই ছিলেন আইআরজি-র সিনিয়র কমান্ডার ইজ়াদি। শিয়া ফৌজের বিদেশি শাখার প্যালেস্টাইন কোরের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। তাঁর বাহিনীর নাম ছিল কুড্স ফোর্স। অন্য দিকে শরিয়ারি পশ্চিম তেহরানে একটি গাড়িতে ছিলেন। সেখানে আক্রমণ শানিয়ে তাঁকে নিকেশ করা হয়েছে বলে দাবি তেল আভিভের।
আইআরজি-র সিনিয়র কমান্ডার শরিয়ারির মৃত্যুকে বড় সাফল্য হিসাবে দেখছে ইজ়রায়েল। কারণ, লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজ়বুল্লা, ইয়েমেনের সশস্ত্র সংগঠন হুথি এবং প্যালেস্টাইনপন্থী সশস্ত্র সংগঠন হামাসকে ক্রমাগত রকেট এবং ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছিলেন তিনি। এই দুই শীর্ষ সেনা অফিসারের মৃত্যু অবশ্য সরকারি ভাবে স্বীকার করেনি তেহরান।
সেনা অফিসারদের পাশাপাশি ইজ়রায়েল ডিফেন্স ফোর্স বা আইডিএফের আক্রমণে প্রাণ হারানো পরমাণু বিজ্ঞানীদের মধ্যে রয়েছেন ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থার প্রাক্তন প্রধান ফেরেউদুন আব্বাসি। ২১ জুন সাবেক পারস্য দেশের সরকার নিয়ন্ত্রণ সংবাদমাধ্যম ‘তেহরান টাইমস’ জানায়, পরমাণু বিজ্ঞানী সইদ ইসার তাবাতাবায়েইর বাড়িতে আছড়ে পড়েছে ইজ়রায়েলি বোমা। সঙ্গে সঙ্গে গোটা বাড়িটি গুঁড়িয়ে যাওয়ায় মৃত্যু হয় তাঁর। হামলার প্রাণ হারিয়েছেন তাঁর স্ত্রীও।
ক্যাথরিনের মতো মহিলা গুপ্তচরদের ব্যবহারের প্রথা নতুন নয়। সেই তালিকায় প্রথমেই আসবে ভারতীয় বংশোদ্ভূত নুর ইনায়েত খানের কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁকে নাৎসি জার্মানি অধিকৃত ফ্রান্সে পাঠায় ব্রিটিশ গোয়েন্দাবাহিনী। যুদ্ধের সময় নুর থাকতেন প্যারিসে। ১৯৪৩ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে বহু তথ্য মিত্রবাহিনীকে গোপনে পাচার করেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে ধরে ফেলে নাৎসিরা। ১৯৪৪ সালে মৃত্যুদণ্ড হয় তাঁর।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) ‘ঠান্ডা লড়াই’য়ে জড়িয়ে পড়ে আমেরিকা। ওই সময়ে ইয়োনা মন্টেগ নামের এক মহিলাকে মস্কোর হাঁড়ির খবর জোগাড় করতে পূর্ব ইউরোপে পাঠায় মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ (সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি)। চরবৃত্তির জন্য সেখানকার একাধিক ব্যাঙ্কে চাকরি নেন মন্টেগ। প্রায় ১৫ বছর সোভিয়েত ইউনিয়নের নাকের ডগায় বসে ওয়াশিংটনে খবর সরবরাহ করতেন তিনি।
১৯৯৩ সালে কাজ থেকে অবসর নেন ইয়োনা। কোনও দিনই তাঁর টিকি ছুঁতে পারেনি মস্কো। ১৯৭৩ সালে আরব-ইজ়রায়েল যুদ্ধের সময় হেবা সেলিম নামের এক মহিলাকে দিয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করিয়েছিল মোসাদ। ইহুদিদের এই তুরুপের তাস ছিলেন জন্মসূত্রে মিশরীয়। কায়রোর এক আধিকারিককে বিয়ে করেন তিনি। এর পর তেল আভিভে তথ্য পাচার করতে তাঁর তেমন সমস্যা হয়নি। ১৯৭৪ সালে হেবাকে গ্রেফতার করে মিশরীয় পুলিশ। স্বামীর সঙ্গেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় তাঁকে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়া ইস্তক সেখানে জমানা পরিবর্তনের কথা বলে এসেছে ইজ়রায়েল। ইহুদিদের দাবি, কুর্সি বদল হলেই পরমাণু হাতিয়ার তৈরির পরিকল্পনা থেকে সরে আসবে তেহরান। ওই ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ সাবেক পারস্য দেশের হাতে থাকুক তা কোনও অবস্থাতেই চায় না তেল আভিভ। পরে অবশ্য সেই অবস্থান বদল করে ইজ়রায়েলের বিদেশমন্ত্রী জিডিয়ন সার বলেছেন, ‘‘ওখানকার শাসক বদল নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।’’
যদিও পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির একাংশের দাবি আলি খামেনেইকে নিকেশ করতে বর্তমানে উঠেপড়ে লেগেছে মোসাদ। এই পরিস্থিতিতে বাঙ্কারে বসেই নিজের উত্তরসূরি বাছার কাজ শুরু করে দিয়েছে তেহরানের বছর ৮৬-র ‘সর্বোচ্চ নেতা’। ইহুদি গুপ্তচরেরা এতে সফল হলে ফের ক্যাথরিন খবরের শিরোনামে আসবেন, তা বলাই বাহুল্য।
সব ছবি: সংগৃহীত ও রয়টার্স এবং গ্রাফিক্স সহয়তা: এআই।