সিকে নাইড়ু থেকে শুভমন গিল। মাঝে কেটে গিয়েছে ৯৩ বছর। ১৯৩২ সালে সিকে নাইড়ুর নেতৃত্বে প্রথম বার টেস্ট খেলে ভারত। তার পর অধিনায়কত্বের ব্যাটন গিয়েছে ৩৬ জন ক্রিকেটারের হাতে। দেশের ৩৭তম টেস্ট অধিনায়ক হলেন শুভমন গিল। তাঁর নেতৃত্বে ইংল্যান্ড সফরে গিয়েছে তরুণ ভারতীয় দল। কেমন ছিল এই ৯৩ বছরের সফর? কোন ৩৭ জনের হাতে ছিল টেস্ট ক্রিকেটের অধিনায়কত্ব? এঁদের মধ্যে সবচেয়ে সফল কে? এক নজরে দেখে নেওয়া যাক কার নেতৃত্বে ক’টা টেস্ট খেলেছে ভারত এবং কার নেতৃত্বে সবচেয়ে বেশি জয় পেয়েছে দেশ।
সিকে নাইড়ু: ১৯৩২ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত ভারতের টেস্ট অধিনায়ক ছিলেন কোট্টারি কানাকাইয়া নাইড়ু। ৪টি টেস্টে দেশকে নেতৃত্ব দেন তিনি। এর মধ্যে ৩টি টেস্টে হেরে যায় ভারত। অন্য ম্যাচটি ড্র হয়।
বিজয়নগরের মহারাজ: আসল নাম বিজয় আনন্দ গণপতি রাজু। তবে ক্রিকেটের মাঠে তিনি বিজয়নগরের মহারাজ নামেই পরিচিত। ১৯৩৬ সালে তাঁর নেতৃত্বে ৩টি টেস্ট খেলে ভারত। এর মধ্যে দু’টিতেই হারতে হয় দলকে। অন্য ম্যাচটি ড্র হয়।
ইফতিকার আলি খান পটৌডি: ১৯৪৬ সালে তিনিও তিনটি টেস্টে ভারতকে নেতৃত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্বেও জয় পায়নি ভারত। দু’টি টেস্ট ড্র হয় এবং একটিতে হারতে হয় সিনিয়র পটৌডির ভারতকে।
লালা অমরনাথ: ছেলের হাত ধরে প্রথম বার বিশ্বকাপ জেতে ভারত। মহিন্দর অমরনাথের বাবা লালা অমরনাথের হাত ধরে প্রথম টেস্ট জয় পায় ভারত। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত দেশকে ১৫টি টেস্টে নেতৃত্ব দেন তিনি। এর মধ্যে দু’টি টেস্টে জয় পায় ভারত। ড্র হয় সাতটি ম্যচ। ছ’টি টেস্টে হারতে হয় ভারতকে।
বিজয় হজারে: দেশের পঞ্চম টেস্ট অধিনায়ক ছিলেন বিজয় হজারে। তাঁর নেতৃত্বেও একটি টেস্ট জেতে ভারত। তবে হারতে হয় পাঁচটি ম্যাচ। ড্র হয় আটটি ম্যাচ। হজারের নেতৃত্বে ভারত ইংল্যান্ডকে ইনিংস ও ৮ রানে হারায়। দুই ইনিংস মিলিয়ে ১২টি উইকেট নেন বিনু মাঁকড়। শতরান করেন পঙ্কজ রায় এবং পলি উমরিগর।
বিনু মাঁকড়: ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত ছ’টি টেস্টে দলকে নেতৃত্ব দেন ভারতের এই প্রবাদপ্রতিম অলরাউন্ডার। তবে তাঁর নেতৃত্বে টেস্ট জেতেনি ভারত। পাঁচটি ড্র এবং একটিতে হারতে হয় মাঁকড়র ভারতকে।
গুলাম আহমদ: ভারতের সপ্তম টেস্ট অধিনায়ক গুলাম আহমদও মাঁকড়ের সঙ্গে প্রায় একই সময়ে দলকে নেতৃত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্বে দু’টি টেস্টে হারে দল, হারে একটি টেস্টে।
পলি উমরিগর: সমসাময়িক সময়ে আরও এক অধিনায়ককে পেয়েছিল ভারত। তিনি পলি উমরিগর। তাঁর হাত ধরেও দু’টি টেস্টে জয় পায় ভারত।
হেমু অধিকারী: উমরিগরের পর ভারতকে একটি টেস্টে নেতৃত্ব দেন হেমু অধিকারী। ব্যাটে-বলে তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ওই টেস্ট ড্র করে ভারত। সেই সিরিজে তিনি ছিলেন ভারতের চতুর্থ অধিনায়ক।
দত্তা গায়কোয়াড়: ১৯৫৯ সালে ভারতকে ৪টি টেস্টে নেতৃত্ব দেন দত্তা গায়কোয়াড়। তবে তাঁর নেতৃত্বে সব ক’টি টেস্টেই হেরে যায় দল।
পঙ্কজ রায়: দত্তার পর একটি টেস্টে ভারতকে নেতৃত্ব দেন পঙ্কজ রায়। তবে সেই টেস্টেও হেরে যায় ভারত। দুই ইনিংস মিলিয়ে মাত্র ১৫ রান করেন বাঙালি ওপেনার।
গুলাবরাই রামচন্দ: পঙ্কজের হাত থেকে ব্যাটন নেন গুলাবরাই রামচন্দ। তিনি ভারতকে পাঁচটি টেস্টে নেতৃত্ব দেন। এর মধ্যে একটিতে জয় পায় ভারত। দু’টি টেস্টে হারের মুখ দেখতে হয়। বাকি দু’টি টেস্ট ড্র হয়।
নরি কন্ট্রাক্টর: ১৯৬০ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এক ডজন টেস্টে নেতৃত্ব দেন নরি কন্ট্রাক্টর। এর মধ্যে আটটি ম্যাচ ড্র হয়। বাকি চারটি ম্যাচের দু’টিতে জয় পায় ভারত।
মনসুর আলি খান পটৌডি: এর পর অধিনায়ক নির্বাচিত হন ইফতিকর আলির ছেলে মনসুর আলি খান পটৌডি। দীর্ঘ ১৩ বছর দেশকে নেতৃত্ব দেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে ৪০টি টেস্ট খেলে ভারত। এর মধ্যে ১৯টি টেস্ট হারলেও ন’টি টেস্টে জেতে ভারতীয় দল।
চন্দু বোর্ডে: পটৌডি জমানার মাঝেই একটি টেস্টে দলকে নেতৃত্ব দেন চন্দু বোর্ডে। তবে সেই টেস্টে হেরে যায় ভারত।
অজিত ওয়াড়েকর: পটৌডি জমানার মাঝে একাধিক টেস্টে নেতৃত্ব দেন অজিত ওয়াড়েকর। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ১৬টি টেস্টে নেতৃত্ব দেন তিনি। এর মধ্যে চারটি করে টেস্ট জেতে এবং হারে ভারত।
শ্রীনিবাসরাঘবন ভেঙ্কটরাঘবন: এর পর ভেঙ্কটরাঘবনের নেতৃত্বে পাঁচটি টেস্ট খেলে ভারত। তবে তাঁর নেতৃত্বে একটিও টেস্ট জেতেনি ভারত।
সুনীল গাওস্কর: ১৯৭৬ সালে ভারতের অষ্টাদশ অধিনায়ক নির্বাচিত হন সুনীল গাওস্কর। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত নেতৃত্ব দেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে ৪৭টি টেস্ট খেলে ভারত। এর মধ্যে ৩০টি ড্র হলেও ন’টিতে জেতে ভারত।
বিষেণ সিংহ বেদী: এই সময়ে টেস্ট অধিনায়ক হিসাবে অভিষেক হয় বিষেণ সিংহ বেদীরও। তবে তাঁর নেতৃত্বে খেলা ২২টি টেস্টের মধ্যে ১১টিতেই হেরে যায় ভারত। জেতে মাত্র ছ’টিতে।
গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ: এই সময়ে দু’টি টেস্টে ভারতকে নেতৃত্ব দেন গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ। তবে ওই দুই টেস্টের একটিতেও জিততে পারেনি দল।
কপিল দেব: ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত ৩৪টি টেস্টে দেশকে নেতৃত্ব দেন ‘হরিয়ানা হ্যারিকেন’। দেশকে প্রথম বার বিশ্বকাপ এনে দিলেও টেস্ট অধিনায়ক হিসাবে তেমন সফল ছিলেন না কপিল। তাঁর নেতৃত্বে মাত্র চারটি টেস্টে জয় পায় ভারত। হারতে হয় সাতটি ম্যাচ।
দিলীপ বেঙ্গসরকর: ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত ১০টি টেস্টে নেতৃত্ব দেন ডানহাতি মুম্বইকর। এর মধ্যে পাঁচটি টেস্টে হারে ভারত। জেতে মাত্র দু’টিতে।
রবি শাস্ত্রী: এই সময়ে রবি শাস্ত্রীও একটি ম্যাচে দেশকে নেতৃত্ব দেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সেই টেস্ট জেতে ভারত। তবে সেই টেস্ট স্মরণীয় হয়ে আছে নরেন্দ্র হিরওয়ানির ১৬ উইকেটের জন্য।
কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত: ১৯৮৯ সালে শ্রীকান্তের নেতৃত্বে চারটি টেস্ট খেলে ভারত। অমীমাংসিত থাকে চারটি টেস্টই।
মহম্মদ আজ়হারউদ্দিন: ভারতের ২৫তম টেস্ট অধিনায়ক মহম্মদ আজ়হারউদ্দিন। ১৯৯০-’৯৯ পর্যন্ত ৪৭টি টেস্টে ভারতকে নেতৃত্ব দেন আজ়হার। তাঁর নেতৃত্বে ১৪টি টেস্ট জেতে ভারত, হারেও সমপরিমাণ টেস্টে।
সচিন তেন্ডুলকর: এর পর অধিনায়কত্বের ব্যাটন যায় সচিন তেন্ডুলকরের হাতে। ২৫টি টেস্টে দেশকে নেতৃত্ব দেন ‘মাস্টার ব্লাস্টার’। এর মধ্যে দল জেতে মাত্র চারটি ম্যাচে। হেরে যায় ন’টি ক্ষেত্রে।
সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়: ভারতের ২৭তম টেস্ট অধিনায়ক হন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। ৪৯টি টেস্টে ভারতকে নেতৃত্ব দেন তিনি। এর মধ্যে ২১টি টেস্টে জয় আসে। দল হারে ১৩টি ম্যাচে। ২০০০ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দেশকে নেতৃত্ব দেন তিনি।
রাহুল দ্রাবিড়: সৌরভের পর নেতৃত্বের ব্যাটন যায় রাহুল দ্রাবিড়ের হাতে। ২৫টি টেস্টে দেশকে নেতৃত্ব দেন তিনি। এর মধ্যে আটটি টেস্ট জেতে ভারত, হারে ছ’টিতে।
বীরেন্দ্র সহবাগ: দ্রাবিড়ের পর অধিনায়ক হন বীরেন্দ্র সহবাগ। তবে একটানা অধিনায়কত্ব করেননি তিনি। ২০০৫ থেকে ২০১২ পর্যন্ত চারটি টেস্টে নেতৃত্ব দেন তিনি। এর মধ্যে ভারত জয় পায় দু’টি টেস্টে। হারে একটিতে।
অনিল কুম্বলে: ভারতের ৩০তম টেস্ট অধিনায়ক অনিল কুম্বলে। ২০০৭-’০৮ মরসুমে দেশকে নেতৃত্ব দেন ‘জাম্বো’। তবে তেমন সাফল্য পাননি তিনি। কুম্বলের নেতৃত্বে ১৪টি টেস্টের মধ্যে পাঁচটিতে হেরে যায় ভারত। জেতে মাত্র তিনটি টেস্টে।
মহেন্দ্র সিংহ ধোনি: ২০০৮ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ভারতের টেস্ট অধিনায়ক ছিলেন মহেন্দ্র সিংহ ধোনি। ৬০টি টেস্টের মধ্যে ২৭টিতে তাঁর নেতৃত্বে জয় পায় দেশ। হেরে যায় ১৮টি ম্যাচ।
বিরাট কোহলি: দেশের ৩২তম টেস্ট অধিনায়ক হন বিরাট কোহলি। সম্প্রতি টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন তিনি। ২০১৪ থেকে ২০২২ পর্যন্ত টেস্ট অধিনায়ক ছিলেন তিনি। দেশকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ম্যাচে (৬৮) নেতৃত্ব দেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বেই সবচেয়ে বেশি টেস্ট (৪০) জেতে ভারত।
অজিঙ্ক রাহানে: এই সময়ের মধ্যে আরও দুই টেস্ট অধিনায়ক পায় ভারত। ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ছ’টি টেস্টে নেতৃত্ব দেন অজিঙ্ক রাহানে। এর মধ্যে চারটি টেস্টেই জেতে ভারত। ড্র হয় বাকি দু’টি টেস্ট। রাহানের নেতৃত্বে একটিও টেস্ট হারেনি ভারত।
লোকেশ রাহুল: এই সময়ে তিনটি টেস্টে অধিনায়কত্ব করেন লোকেশ রাহুলও। এর মধ্যে দু’টি টেস্টে জেতে ভারত, হারে একটিতে।
রোহিত শর্মা: কোহলির পর নেতৃত্বের ব্যাটন যায় রোহিত শর্মার হাতে। তাঁর নেতৃত্বে ২৪টি টেস্ট খেলে ভারত, জয় পায় ১২টিতে।
জসপ্রীত বুমরাহ: রোহিতের পর তিনটি টেস্টে দেশকে নেতৃত্ব দেন জসপ্রীত বুমরাহ। তবে এর মধ্যে দুই ক্ষেত্রে হেরে যায় ভারত। জেতে একটিতে।
শুভমন গিল: চলতি ইংল্যান্ড সফরে ভারতের অধিনায়ক নির্বাচিত হয়েছেন শুভমন গিল। তিনি দেশের ৩৭তম টেস্ট অধিনায়ক। তরুণ নেতার হাত ধরে তরুণ ভারতীয় দল কেমন খেলে, নজর এখন সে দিকে।
সব ছবি: সংগৃহীত।