২৯৪টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৩টি আসনে ফল প্রকাশিত। গেরুয়া ঝড়ে ফিকে হয়ে গেলেন তৃণমূলের প্রায় অধিকাংশ মন্ত্রী ও নেতা। এদের কেউ দুঁদে, পোড়খাওয়া রাজনীতিক, কেউ আবার সদ্য পা রেখেছেন নির্বাচনী লড়াইয়ে। আবার কেউ দল বদলে নির্বাচনী লড়াইয়ে টিকিট আদায় করেছেন। কারও গায়ে লেগেছে দুর্নীতির কালির ছিটে। তাঁদের মধ্যে কেউ হেরেছেন, আবার কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়েছেন।
ভোটের আগে শাসকদল ছেড়ে বিরোধী শিবিরের পতাকা তুলে নিয়েছিলেন অনেকে। আবার বিরোধী দলে সুবিধা না করতে পেরে ফিরেছেন পুরনো দলের ছত্রছায়ায়। রাজনৈতিক রং উল্টেপাল্টেও শেষমেশ ভোটবাক্সে লাভের মুখ দেখেছেন বহু ‘দলবদলু’। এমন নেতা-নেত্রীদের তালিকা সংক্ষিপ্ত হলেও ধারে ও ভারে তাঁরা হেভিওয়েট। আনন্দবাজার ডট কম এমন কয়েক জন প্রার্থীকে বেছেছে যাঁরা বিভিন্ন বিতর্ক, পরাজয়ের গ্লানি ঝেড়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে সেরা কামব্যাকের তালিকায় নাম তুলে ফেলেছেন।
কুণাল ঘোষ: বেলেঘাটা বিধানসভা কেন্দ্রের আর এক ‘হেভিওয়েট’ তৃণমূল প্রার্থী কুণাল ঘোষ। একাধারে সাংবাদিক, লেখক, অভিনেতা। তৃণমূলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ সামলেছেন। সাংসদও ছিলেন একদা। কিন্তু এ বার প্রথম বারের জন্য বিধানসভার ময়দানে নেমেছিলেন তিনি। নিজের কেন্দ্রে তিনি ২৮ হাজারের বেশি ভোটে জিতেছেন।
বেলেঘাটায় তাঁর নতুন চ্যালেঞ্জ। তবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পিছপা হন না কুণাল ঘোষ। ভোটের হিসাব-নিকাশ, অঙ্ক কষে আগেভাগেই জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। নিজের জয় নিয়েও নিঃসংশয় ছিলেন হয়েওছে তাই। বিজেপির পার্থ চৌধুরী, কংগ্রেসের সাহিনা জাভেদ এবং সিপিএমের পারমিতা রায়কে হারিয়ে জয় সুনিশ্চিত করেছেন কুণাল। তাঁকে দেখে বলা যেতেই পারে এ ভাবেও ফিরে আসা যায়।
মদন মিত্র: উত্তর ২৪ পরগনার কামারহাটি থেকে ভোটের ময়দানে তৃণমূলের ‘রঙিন নেতা’ ৭১ বছরের মদন মিত্র। ইডি-সিবিআই থেকে থানা-পুলিশ, সব মিলিয়ে ছ’টি বিচারাধীন মামলা রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সারদা মামলায় জেল খাটতে হয়েছে। মন্ত্রী ছিলেন। পরে মন্ত্রিত্ব গিয়েছে।
এ বার ঘরের মাঠে স্বমহিমায় বিরোধীদের বলে বলে গোল দিয়েছেন। বিরোধীদের ধরাশায়ী করে জয় সুনিশ্চিত করেছেন। বিজেপির তরফে এ বার তাঁর বিরুদ্ধে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন অরূপ চৌধুরী। কংগ্রেস দাঁড় করিয়েছিল কল্লোল মুখোপাধ্যায়কে। সিপিএমের হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কামারহাটির প্রাক্তন বিধায়ক মানস মুখোপাধ্যায়। সকলকেই হারিয়ে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি ধরে রেখেছেন এমএম।
বাইরন বিশ্বাস: ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের অন্যতম ‘বর্ণময়’ চরিত্র, বাইরন বিশ্বাস। কংগ্রেস প্রার্থী হিসাবে ২০২৩ সালের উপনির্বাচনে সাগরদিঘি থেকে বাইরনকে জেতানোর নেপথ্য কারিগর ছিলেন অধীর চৌধুরী। জয়ের তিন মাসের মধ্যেই দলবদল। তৃণমূলে যোগদান। বাইরনের দল বদলে অনেকে নীতির প্রশ্নও তুলেছিলেন। তবে সমালোচনায় কান দেননি তিনি। এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদের সেই সাগরদিঘি থেকে তাঁকে প্রার্থী করেছিল তৃণমূলও। তাঁর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ছিলেন বিজেপির তাপস চক্রবর্তী এবং কংগ্রেসের মনোজ চক্রবর্তী। জিতেছেন বাইরনই।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবি ঘটে বাম ও কংগ্রেসের। ভোটে এক জন প্রার্থীও জিততে পারেনি তাঁদের। কিন্তু, সাগরদিঘির বিধায়ক সুব্রত সাহার মৃত্যু হলে, ২০২৩ সালে উপনির্বাচন হয় সেখানে। তাতে কংগ্রেসের টিকিটে জেতেন বাইরন। কয়েক দিনের মধ্যেই তৃণমূলে যোগ দেন তিনি। ফলে বিধানসভায় ফের শূন্য হয়ে যায় বাম-কংগ্রেস। এ বারের ভোটের সময় অবশ্য দলবদলকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে উল্লেখ করে ‘অনুতাপ’ করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।
হুমায়ুন কবীর: বাংলার রাজনীতিতে হুমায়ুনকে ‘দলবদলু’ বললে অত্যুক্তি হবে না। গত ১৫ বছরে কংগ্রেস, তৃণমূল এবং বিজেপি তিনটি দলেই ঘুরেছেন তিনি। ২০১২ সালে দেশের শতাব্দীপ্রাচীন দল ছে়ড়ে তৃণমূলে যোগ দেন হুমায়ুন। কিন্তু প্রকাশ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনা করার জন্য ২০১৫ সালে ছ’বছরের জন্য হুমায়ুনকে বহিষ্কার করে ঘাসফুল শিবির। ২০১৮ সালে বিজেপিতে যোগ দেন। তবে ২০২১ সালে ফের তৃণমূলে ফিরে আসেন হুমায়ুন।
তৃণমূলে থাকাকালীন একাধিক বার শোকজ় ও সাসপেন্ড হন হুমায়ুন কবীর। ফলে দলের সঙ্গে বাড়তে থাকে দূরত্ব। গত বছরের (২০২৫ সাল) একেবারে শেষের দিকে বীতশ্রদ্ধ হয়ে নতুন দল করেন হুমায়ুন। তার পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতাচ্যুত করার হুমকি দিতে শোনা যায় তাঁকে। মুর্শিদাবাদের নওদা ও রেজিনগর, দু’টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন হুমায়ুন। দু’টিতেই জিতেছেন তিনি। নওদায় তাঁর জয়ের ব্যবধান ২৭,৯৪৩। অন্য দিকে রেজিনগরে ৫৮,৮৭৬ ভোটে জিতেছেন তিনি।
রুদ্রনীল ঘোষ: কলকাতার কোনও কেন্দ্র নয়, এ বার পিতৃভূমি থেকে ভোটে লড়েছেন অভিনেতা রাজনীতিক রুদ্রনীল ঘোষ। হাওড়া শিবপুরে বিজেপির প্রার্থী তিনি। ২০২১ সালে ভবানীপুর কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী ছিলেন। তৃণমূলের শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে পরাজিত হন। দ্বিতীয় বারের লড়াইয়ে ঘরের ছেলেকে নিরাশ করল না শিবপুরের জনতা। তৃণমূল শিবিরের প্রতিদ্বন্দ্বী চিকিৎসক ও বালির বিদায়ী বিধায়ক রানা চট্টোপাধ্যায়কে ঘরের মাঠে হারালেন ‘রুডি’। ১৬০৫৮ ভোটে জিতেছেন তিনি।
২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে হেরেও রাজনীতির ময়দান ছেড়ে যাননি রুদ্রনীল। হাওয়া বুঝে দল বদলে ফেলেছিলেন কেবলমাত্র। ছাত্রজীবনে ছিলেন সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআই-এর নেতা। তৃণমূল সরকারে আসার পর ক্রমশ ঘাসফুল শিবিরের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন রাজনীতিক-অভিনেতা। পরে ২১-এর নির্বাচনের আগে দিল্লিতে অমিত শাহের বাড়ি গিয়ে বিজেপিতে যোগ দেন রুদ্রনীল। ২১-এ ব্যর্থ হলেও ’২৬ সালে এসে মিলল সুযোগ। শিবপুরে নিজের ঘরের মাঠেই লড়াই করার সুযোগ পেলেন। গত নির্বাচনের নিরিখে এখানে তৃণমূলের আধিপত্য থাকলেও পদ্মফুল ফোটালেন রুদ্র।
সজল ঘোষ: বাবা প্রদীপ ঘোষ ছিলেন কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতা। রাজনৈতিক শিবির বদলে প্রথমে তৃণমূলে, তার পর বিজেপিতে যোগ দেন। বাবার দেখানো পথেই হেঁটেছেন পুত্র সজল ঘোষ। তৃণমূলে থাকাকালীন ‘কম্পালসারি ওয়েটিং’-এর অভিযোগ তুলেছিলেন। উত্তর কলকাতায় সিটি কলেজে পড়াশোনা করার সময়ই ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেন সজল। তার পর ছাত্র পরিষদের জেলা সভাপতি হন। পরবর্তী কালে বাবার সঙ্গেই তিনি কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন। কলকাতা পুরসভার ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে উপনির্বাচনে কাউন্সিলর পদে লড়েছিলেন। দলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ায়, আবার কংগ্রেসে ফিরে গিয়েছিলেন বাবার সঙ্গে। তার পর ফের ২০১২ সালে তৃণমূলে ফিরে আসেন সজল। প্রদীপ ঘোষ তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন।
ঠিক তার পর পরই বাবাকে অনুসরণ করেছিলেন সজল। দেড় বছর আগে উপনির্বাচনে বরাহনগর কেন্দ্রে হেরেছিলেন সজল। উপনির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন সজল-সায়ন্তিকা। এ বারও বরাহনগরে বিজেপি প্রার্থী করেছিল সজল ঘোষকে। এ বার তাঁর লড়াই ছিল তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সিপিএমের সায়নদীপ মিত্রের বিরুদ্ধে। প্রচারে নজর কাড়লেও মমতা-ম্যাজিক কাজ করেনি এই আসনে। এই কেন্দ্রে শেষ হাসি হাসলেন বিজেপির দুঁদে নেতা সজলই। প্রায় ১৭ হাজার ভোটে জিতেছেন তিনি।
রীতেশ তিওয়ারি: বছর চারেক আগে দলবিরোধী মন্তব্যের জন্য বিজেপি থেকে সাময়িক ভাবে বরখাস্ত হয়েছিলেন। এ বার সেই রীতেশ তিওয়ারিকেই টিকিট দিয়েছে দল। কাশীপুর-বেলগাছিয়া কেন্দ্রে হেভিওয়েট প্রার্থী অতীন ঘোষের বিরুদ্ধে লড়ে জয় ছিনিয়ে এনেছেন রীতেশ। সেই লড়াইয়ে পরাজিত অতীন। ১৬৫১ ভোটে হেরে গিয়েছেন তিনি।
ছবি: সংগৃহীত