ছদ্মবেশে অভিযান চালিয়ে হায়দরাবাদের পাবে যৌন চক্রের পর্দাফাঁস করলেন তরুণী আইপিএস অফিসার। হায়দরাবাদের সাইবারাবাদ এলাকার অন্তর্গত কুকাতপল্লির একটি জনপ্রিয় পাবে অনৈতিক কার্যকলাপ এবং একাধিক নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনার অভিযোগ পাওয়ার পরেই সেখানে অভিযান চালান ওই তরুণী আইপিএস কর্তা।
ওই তরুণী আইপিএসের নাম রীতি রাজ। ২০১৮ ব্যাচের তেলঙ্গানা ক্যাডারের কর্মকর্তা তথা কুকাতপাল্লির ডিসিপি তিনি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রবিবার গভীর রাতে ‘কিংস অ্যান্ড কুইনস পাব’— যা স্থানীয় ভাবে ‘ক্লাব মস্তি’ নামে পরিচিত, সেখানে ছদ্মবেশে আকস্মিক অভিযান চালান রীতি।
সূত্র জানিয়েছে, পাবের ভিতরে সন্দেহজনক কার্যকলাপ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পরই পুলিশ এই অভিযান পরিচালনা করে। পুলিশ সূত্রে খবর, ওই প্রতিষ্ঠানে মহিলাদের অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়া এবং যৌনচক্রের মতো কর্মকাণ্ড চলছিল।
তদন্তকারীরা পাবে গিয়ে আরও দেখতে পান যে, মদ্যপান বা মদ পরিবেশনের স্থানে অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রবেশ রোধে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থাও গ্রহণ করেননি পাব কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া অনুমোদিত সময়ের বাইরে পাব চালানো, নিয়ম লঙ্ঘন করে খাবার এবং মদ পরিবেশন ও পুলিশের বৈধ অনাপত্তিপত্র বা ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি)’ ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে জনপ্রিয় ওই পাবটির বিরুদ্ধে।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক প্রমাণ অনুযায়ী, পুরুষ গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে এবং অনৈতিক উপায়ে বাড়তি বিল তৈরি করার উদ্দেশ্যে অবৈধ ভাবে তরুণীদের ব্যবহার করছিলেন পাব কর্তৃপক্ষ। তদন্তকারীদের আরও সন্দেহ, পাব কর্তৃপক্ষ অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করছিলেন এবং গ্রাহকদের যৌনচক্রের দিকে চালিত করছিলেন।
অভিযান চলাকালে চার জন মহিলা এবং পাঁচ জন পুরুষ-সহ পাবের মোট ন’জন কর্মীকে আটক করা হয় এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের জন্য তাদের কেপিএইচবি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পাবটির বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তবে তা সত্ত্বেও পাবে লাগাতার নিয়ম লঙ্ঘন চলছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
রবিবারের অভিযানের পর বর্তমানে বিএনএস এবং ‘প্রিভেনশন অফ ইমমরাল ট্রাফিকিং অ্যাক্ট’-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে পাব কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযানের সময় সংগৃহীত প্রমাণের ভিত্তিতেই এই তল্লাশি চালানো হয়। এ বিষয়ে আরও তদন্ত চলছে।
এই অভিযানের পর হইচই পড়েছে তরুণী আইপিএস কর্তা রীতিকে নিয়ে। তাঁর প্রশংসার পাশাপাশি তিনি কে তা জানতে কৌতূহলী হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষ।
রীতি তেলঙ্গানা ক্যাডারের ২০১৮ ব্যাচের একজন আইপিএস কর্তা। বর্তমানে তিনি সাইবারাবাদ মেট্রোপলিটন পুলিশের অধীনে কুকাতপল্লি জ়োনের ডিসিপি হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কুকাতপল্লির ডিসিপি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি সাইবার অপরাধ দমন শাখা এবং হায়দরাবাদের সাইবারাবাদের মাধোপুর জ়োনের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়াও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বান্দি সঞ্জয় কুমারের ছেলে বান্দি ভগীরথ সাইয়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্তের জন্য গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দলের নেতৃত্বও দিচ্ছেন তিনি।
পটনার দিল্লি পাবলিক স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রী রীতি। দিল্লির নামী ‘ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটি’ থেকে স্নাতক হন তিনি। কলেজ জীবনে তিনি একটি ল ফার্মে (আইনি প্রতিষ্ঠানে) স্বল্প সময়ের জন্য শিক্ষানবিশ হিসাবে কাজ করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বুঝতে পারেন যে, কর্পোরেট আইনি পেশা তাঁর কেরিয়ার হতে পারে না।
এর পরেই জনসেবায় যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রীতি। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন। তাঁর যাত্রাপথের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল, তিনি প্রথম প্রচেষ্টাতেই ইউপিএসসি উত্তীর্ণ হন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০১৮ সালে আইপিএস হিসাবে কাজে যোগ দেন।
আইপিএস নির্বাচিত হওয়ার পর হায়দরাবাদের ‘সর্দার বল্লভভাই পটেল ন্যাশনাল পুলিশ অ্যাকাডেমি’তে পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ শুরু করেন রীতি। তাঁর প্রশিক্ষণের মধ্যে ছিল বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন এবং মাওবাদী-বিরোধী বিশেষ বাহিনী ‘গ্রে হাউন্ডস’-এর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা। এই দায়িত্বগুলি তাঁকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিশেষ পুলিশি অভিযান— উভয় বিষয়েই অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ এনে দিয়েছিল।
কুকাতপল্লি জ়োনের দায়িত্ব গ্রহণের আগে তেলঙ্গানা পুলিশের অধীনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন রীতি। কঠোর ভাবে আইন প্রয়োগ এবং সক্রিয় তদারকির জন্য পরিচিত একজন কর্মঠ পুলিশকর্তা হিসাবে ইতিমধ্যেই সুনাম অর্জন করেছেন তিনি।
সব ছবি: সংগৃহীত এবং প্রতীকী।