গত বছরে বক্সঅফিস কাঁপিয়েছে আদিত্য ধর পরিচালিত ‘ধুরন্ধর’। অভিনয়ের পাশাপাশি সেই ছবিতে পুরনো গানের ব্যবহারও দর্শকের মন কেড়েছে। বিশেষ ভাবে প্রশংসা পেয়েছে ‘রম্ভা হো’ গানটি। বন্দুকের লড়াইয়ের দৃশ্যে গানটি ব্যবহার হলেও এই গানটির নেপথ্যে ছিলেন ‘সাহসী’ নৃত্যশিল্পী কল্পনা আইয়ার। বলিউডে তিনি যেমন রাতারাতি জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন, ঠিক তেমন ভাবেই ‘উধাও’ হয়ে যান।
১৯৮১ সালে আনন্দ সাগরের পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘আরমান’ নামের একটি হিন্দি ছবি। রাজ বব্বর, শম্মী কপূর এবং শক্তি কপূর অভিনীত এই ছবিতে ‘রম্ভা হো’ গানটি ব্যবহার করা হয়। ঊষা উত্থুপের কণ্ঠে গানটি জনপ্রিয় হয়। গানের দৃশ্যে অভিনয় করেছিলেন কল্পনা।
১৯৫৬ সালের জুলাইয়ে মুম্বইয়ে জন্ম কল্পনার। বাবা-মা দু’জনেই ছিলেন সিনেমাপ্রেমী। বলি অভিনেতা দেব আনন্দের অনুরাগী ছিলেন তাঁরা। কানাঘুষো শোনা যায়, দেব আনন্দের একটি ছবি থেকেই মেয়ের নাম কল্পনা রেখেছিলেন তাঁরা।
কল্পনার পরিবার আর্থিক ভাবে তেমন সচ্ছল না থাকায় সংসার চালানোর দায়িত্ব খুব কম বয়স থেকেই কাঁধে নিয়ে নেন কল্পনা। কোনও রকম প্রশিক্ষণ ছাড়া নাচ করতে শুরু করেন তিনি। ১২ বছর বয়স থেকে হিন্দি গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচতেন কল্পনা। এমনকি, মঞ্চেও নৃত্য পরিবেশন করতেন তিনি।
স্কুলের এক অনুষ্ঠানে কল্পনার নাচ দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন মুকেশ শর্মা নামের এক ব্যক্তি। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন তিনি। কল্পনার আত্মীয়ও ছিলেন মুকেশ। কল্পনাকে বড় মঞ্চে নাচের প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি।
আত্মীয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান কল্পনা। বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে নাচ করে প্রশংসা পেতে শুরু করেন তিনি। সেখান থেকেই সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার ইচ্ছা জাগে তাঁর। কিন্তু অর্থাভাবে দামি জামা-জুতো অথবা মেকআপের সামগ্রী কিছুই কিনতে পারতেন না তিনি।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, অন্যদের কাছ থেকে জামা-জুতো ধার নিয়ে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতেন কল্পনা। ১৯৭৮ সালে জনপ্রিয় এক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় চূড়ান্ত পর্ব পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন তিনি। একই বছর একটি আন্তর্জাতিক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন কল্পনা। চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছোতে না পারলেও প্রথম ১৫ জনের মধ্যে নাম লিখিয়ে ফেলেছিলেন তিনি।
মডেলিং থেকে ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব পান কল্পনা। আশির দশকে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘লুটমার’ ছবিতে নৃত্যশিল্পী হিসাবে অভিনয় করেন তিনি। কেরিয়ারের প্রথম ছবি। তার উপর আবার বাবা-মায়ের প্রিয় অভিনেতা দেব আনন্দের ছবিতে কাজ করার সুযোগ। আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলেন কল্পনা।
আশি থেকে নব্বইয়ের দশকে ‘প্যারা দুশমন’, ‘হম সে বড়কর কৌন’, ‘কুদরত’, ‘সত্তে পে সত্তা’, ‘ডিস্কো ডান্সার’, ‘লাডলা’, ‘রাজা হিন্দুস্তানি’, ‘অঞ্জাম’-এর মতো বহু ছবিতে অভিনয় করতে দেখা যায় কল্পনাকে। নৃত্যশিল্পী হিসাবে অধিকাংশ ছবিতে অভিনয় করলেও কিছু কিছু ছবিতে পার্শ্বচরিত্র অথবা অতিথিশিল্পী হিসাবেও দেখা যায় তাঁকে।
‘হরি ওম হরি’, ‘জব ছায়ে মেরা জাদু’, ‘রম্ভা হো’র মতো একাধিক জনপ্রিয় গানের দৃশ্যে অভিনয় করে নজর কাড়েন কল্পনা। বলিপাড়ার অনেকে আবার তাঁকে ‘সাহসী’ তকমাও দিয়ে বসেন। কিন্তু রাতারাতি জনপ্রিয়তাই কাল হয় তাঁর।
একটা সময় পর আর কাজের প্রস্তাব পেতেন না কল্পনা। অভিনেত্রীর কথায়, ‘‘সবাই ভাবতেন আমি সাহসী। কিন্তু আমি খুবই সাধারণ। আমায় সব সময় ভুল বোঝা হত।’’ নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ছোটপর্দার কয়েকটি ধারাবাহিকেও অভিনয় করেছিলেন কল্পনা।
১৯৯৯ সালে ‘হম সাথ সাথ হ্যায়’ ছবিতে শেষ বারের মতো অভিনয় করতে দেখা গিয়েছিল কল্পনাকে। তার পর অভিনয়জগৎ থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ১৯৯৯ সালে দুবাইয়ে চলে যান কল্পনা।
পাঁচ বছরের বিরতি নিয়ে আবার অভিনয়জগতে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেও তা আর হয়ে ওঠেনি। বলিপাড়া থেকে যেন উধাও হয়ে যান কল্পনা। ‘ধুরন্ধর’ ছবিতে ‘রম্ভা হো’ গানটির ব্যবহারে কল্পনার কথা মনে পড়ে অনেকের। নতুন ভাবে আলোচনায় আসেন তিনি।
বর্তমানে দুবাইয়ে একটি রেস্তরাঁ চালান কল্পনা। বন্ধুর ছেলের বিয়ে উপলক্ষে শিলিগুড়িতে গিয়েছিলেন তিনি। বিয়ের অনুষ্ঠানে ‘রম্ভা হো’ গানটি বেজে উঠতেই স্মৃতি ভেসে ওঠে কল্পনার। মঞ্চে নাচ করতে শুরু করে দেন তিনি। সেই ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমের পাতায় ছড়িয়ে পড়ে।
কল্পনা এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘‘আমি ভাবতে পারিনি যে, ৭০ বছর বয়সে এসেও আমি আবার চর্চায় আসতে পারি। আমার খুব ভাল লাগছে। হয়তো এর ফলে আমি নতুন কোনও সুযোগ পাব। স্টুডিয়োর গন্ধ আজও আমার নাকে লেগে রয়েছে।’’
স্মৃতির সাগরে ভেসে গিয়ে কল্পনা বলেন, ‘‘পায়ে গুরুতর আঘাত পেয়েছিলাম ‘রম্ভা হো’ গানটির শুটিং চলাকালীন। তা সত্ত্বেও, আমি শুটিং বন্ধ করিনি। এমনকি ‘রাজা হিন্দুস্তানি’ ছবিতেও আঘাত নিয়ে খালি পায়ে নাচ করেছি। আমাদের সময় অভিযোগ করার কোনও সময় ছিল না। কেরিয়ার গড়তে খুব পরিশ্রম করতাম।’’
নৃত্যকে কেবল পরিবেশনার ক্ষেত্র হিসাবে দেখেন না কল্পনা। বরং একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন হিসাবে দেখেন। আধুনিক প্রজন্মের শিল্পীদের প্রসঙ্গে কথা উঠতে তিনি বলেন, ‘‘এক যুগের সঙ্গে অন্য যুগের তুলনা করা অন্যায়। আমি বিশ্বাস করি, আজকের অভিনেত্রী এবং নৃত্যশিল্পীদেরও কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। এখন নাচের খুঁটিনাটি বিষয়েও বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়। শিল্পীদের প্রস্তুতি, পোশাক, চেহারা এবং উপস্থাপনায় প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগ করেন প্রযোজকেরা।’’
‘রম্ভা হো’’ গানটি ঘিরে একটি পুরনো গুজবও উড়িয়ে দেন কল্পনা। বলিপাড়ার একাংশের অনুমান ছিল, এই গানটির শুটিং গোয়ায় হয়েছিল। কিন্তু তা অসত্য। কল্পনা জানান, মুম্বইয়ের বিখ্যাত প্রযোজক রামানন্দ সাগরের অফিসের বিপরীতে নটরাজ স্টুডিয়োয় এই গানের শুটিং হয়েছিল। বয়স ৭০ পেরিয়ে গেলেও এখনও বড়পর্দায় ফিরতে আগ্রহী কল্পনা।
সব ছবি: সংগৃহীত।