এ শহরে ক্রিকেট নিষিদ্ধ। ক্রিকেট খেললেই মোটা জরিমানা। খেলাধুলোর জগতে এ দেশ অবশ্য পরিচিত ফুটবলখেলিয়ে হিসাবেই। চার বার বিশ্বকাপ জিতেছে তারা। ক্রিকেট বিশ্বকাপে প্রথম বার যোগ্যতা অর্জন করেছে ২০২৫ সালে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও খেলছে দেশটি। তা সত্ত্বেও দেশটির একটি বিশেষ শহরের জনজীবন থেকে কার্যত বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে ২২ গজের খেলাকে।
ইটালিতে ক্রিকেটের চল যে সদ্য হয়েছে এমন ভাবাটা ভুল। সে দেশে ক্রিকেটের পা পড়েছিল ফুটবলেরও আগে। ব্রিটিশ নাবিক, আমলা, ব্যবসায়ীদের হাত ধরে ইউরোপের দেশে ক্রিকেট পৌঁছেছিল। কিন্তু এই খেলা জনপ্রিয়তা পায়নি। ফুটবলের কাছে পিছিয়ে পড়েছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী তা সীমাবদ্ধ ছিল দেশের কিছু এলাকায়।
ক্রিকেট খেলতে হলে শহরের বাইরে বা উপকণ্ঠে একটি নির্দিষ্ট কংক্রিটের পিচের উপরই ভরসা করতে হবে। শহরটির নাম মনফ্যালকন। ইটালির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর। মেয়রের আদেশে সেখানে ক্রিকেট ব্রাত্য। শহরে প্রকাশ্যে পার্কে বা ময়দানে ক্রিকেট খেলতে দেখলেই করা হয় জরিমানা।
মনফ্যালকনের ভিতরে খোলা জায়গায় ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে পা রাখলে এখন ১০০ ইউরো (১০,৭৩৮ টাকা) পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন মেয়র আনা মারিয়া সিসেন্ট। তাঁর এই সিদ্ধান্ত এই বন্দর শহরটিকে ‘ক্রিকেটশূন্য শহর’ বলে পরিচিত করে তুলেছে। ক্রিকেটপ্রেমী (মূলত বাংলাদেশি) জনতাকে তাই যেতে হয় ত্রিয়েস্তে বিমানবন্দরের কাছে।
ত্রিয়েস্তে বিমানবন্দরের কাছে একটি ছোট কংক্রিটের এলাকায় প্রচণ্ড রোদ সহ্য করে ক্রিকেট অনুশীলন করেন একদল বাংলাদেশি তরুণ। সংবাদসংস্থা বিবিসি-র সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দলটি জানিয়েছে, মেয়রের নিষেধাজ্ঞার কারণে মনফ্যালকনে খেলা এড়িয়ে চলতে হয় তাঁদের। পুলিশের চোখে পড়লেই খেলা ভন্ডুল, উপরন্তু মোটা জরিমানা।
মনফ্যালকনে ৩০ হাজারেরও বেশি লোক বাস করেন। কিন্তু এর বাসিন্দাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিদেশি নাগরিক। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে বাংলাদেশের নাগরিক। ১৯৯০ সালের শেষের দিকে ইউরোপের বৃহত্তম ক্রুজ় নির্মাতা ফিনকান্তিয়েরি শিপইয়ার্ডে কাজ করার জন্য এসেছিলেন এঁরা। তার পর থেকে পাকাপাকি ভাবে অনেকেই এখানে রয়ে গিয়েছেন।
শিপইয়ার্ডে কাজ করতে আসা পরিযায়ী শ্রমিকেরা জাঁকিয়ে বসার ফলে শহরের চেহারা ধীরে ধীরে পাল্টাতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শহরের দৃশ্যপট, খাদ্যাভ্যাস এবং সামাজিক জীবন বদলে গিয়েছে। শহরের মেয়র আনা মারিয়া সিসিন্টের মতে, এই রূপান্তর প্রয়োজনের তুলনায় কিছুটা বেশিই হয়েছে।
কট্টর ডানপন্থী দলের সদস্য আনা অভিবাসনের বিরুদ্ধে তাঁর দৃঢ় অবস্থানের কারণেই মূলত তাঁর পদ অর্জন করেছিলেন। ক্রিকেট নিষিদ্ধ করার সপক্ষে তাঁর যুক্তি, মনফ্যালকনের সাংস্কৃতিক পরিচয় ক্ষয়িষ্ণু হয়ে উঠছে। মনফ্যালকন শহরের ইতিহাস মুছে ফেলা হচ্ছে। বাংলাদেশি মুসলিম সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা স্থানীয় মানুষদের জীবনযাত্রার সঙ্গে একেবারেই খাপ খায় না।
অভিবাসনবিরোধী মনোভাবের ওপর ভর করে ক্ষমতায় এসেছিলেন মেয়র আনা। তিনিই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, শহরের বাসিন্দারা অভিবাসীদের সংস্কৃতির চাপে নিজস্ব ঐতিহ্য ভুলে যাচ্ছেন এবং পরিবর্তনের ফলে মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে। মেয়র হিসাবে দ্বিতীয় বারের জন্য ক্ষমতায় এসে আনা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যা স্থানীয় বাংলাদেশি সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করেছে। যেমন শহরের চত্বর থেকে বেঞ্চ সরিয়ে ফেলা যেখানে তাঁরা একত্রিত হতেন।
বাংলাদেশি অভিবাসীদের উদ্দেশে তাঁর মনোভাব প্রকাশে কোনও লুকোছাপা করেননি আনা। তাঁর যুক্তি, এই শহরের জন্য অভিবাসীদের অবদান শূন্য। এখানে বসবাস করে জীবিকা নির্বাহ করলেও তাঁরা এই শহরকে ও সম্প্রদায়কে নাকি কিছুই দেনযনি। উল্টে স্থানীয় সংস্কৃতির উপর ‘মৌলবাদী’ প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছেন।
ক্রিকেট খেলা নিয়ে নিষেধাজ্ঞার কথা বলতে গিয়ে অবশ্য অর্থ ও স্থান সঙ্কুলানের বিষয়টিই উল্লেখ করেছেন মেয়র। তাঁর দাবি, নতুন পিচ তৈরির জন্য কোনও জায়গা বা অর্থ আপাতত মনফ্যালকনের প্রশাসনের হাতে নেই। এ ছাড়াও ক্রিকেটের শক্ত বল জনসাধারণের জন্য নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করে বলে দাবি করেছেন তিনি। তাই ‘জননিরাপত্তার স্বার্থে’ তিনি শহরের ভিতরে ক্রিকেটকেই নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। মনফ্যালকনে বাংলাদেশিদের ক্রিকেট খেলতে না দিলেও, শহরের বাইরে ক্রিকেট খেলার স্বাধীনতায় কোনও হস্তক্ষেপ করা হবে না বলে জানিয়েছেন শহরের প্রশাসনিক প্রধান আনা।
ইউরোপের সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বের অন্যতম বড় শিপইয়ার্ড ফিনক্যান্টিয়েরি। এই সংস্থাটির বিরুদ্ধেও ক্ষোভ উগরে দিয়েছিন মেয়র। সংস্থাটি কম মজুরিতে কাজ করার জন্য পূর্ব এশিয়ার দেশ থেকে শ্রমিকদের কাজে লাগায়। কারণ জাহাজ নির্মাণকারী সংস্থাটি এত কম বেতন দেয় যে কোনও ইটালীয় সেই অর্থের বিনিময়ে কাজ করতে চাইবেন না। মেয়রের অভিযোগ নস্যাৎ করে দিয়ে সংস্থার পরিচালন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, সংস্থা এবং এর ঠিকাদারেরা শ্রমিকদের যে বেতন দেন তা ইটালীয় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইটালির শিপইয়ার্ডে কাজ করতে চাওয়া প্রশিক্ষিত কর্মীর অভাবের ফলেই সংস্থাটি বিদেশি কর্মীদের (মূলত বাংলাদেশি) উপর আস্থা রাখতে বাধ্য হয়েছে। সংস্থার এক আধিকারিক বলেন, ‘‘ইটালিতে শিপইয়ার্ডে কাজ করতে আগ্রহী তরুণদের খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন।’’ দেশটিতে শ্রমিকের ঘাটতি আছে এই সত্যিটাও অস্বীকার করার উপায় নেই। পরিসংখ্যান অনুসারে, ইটালিতে শ্রমিকের অভাব পূরণের জন্য ২০৫০ সাল পর্যন্ত বছরে ২ লক্ষ ৮০ হাজার বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজন হবে।
ইউরোপের মধ্যে ইটালির জন্মহার সবচেয়ে কম। বয়স্কদের সংখ্যাবৃদ্ধি এবং শিশুদের জন্মের হার অত্যন্ত কম হওয়ায় ইটালির জনসংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। গত বছর দেশটিতে মাত্র ৩,৭৯,০০০ শিশু জন্মগ্রহণ করেছে। গড় সন্তান জন্মের হার ১.১৮। টানা কয়েক দশক ধরেই এই হার তলানিতে।
টাউন কাউন্সিলের এই নিষেধাজ্ঞার পর স্থানীয় বাংলাদেশিরা আদালতের দ্বারস্থ হন। আনার আদেশ বাতিল করে আঞ্চলিক আদালত। ইটালিতে প্রায় ২০ লক্ষ মুসলমান বসবাস করলেও সারা দেশে মাত্র আটটি মসজিদ রয়েছে। সেই তুলনায় ফ্রান্সে মসজিদ রয়েছে দু’হাজারের বেশি।
মনফ্যালকনের বাংলাদেশিরা জানাচ্ছেন, মেয়রের সিদ্ধান্ত মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে রাস্তায় অভিবাসীদের হয়রানি সহ্য করতে হয় বলেও অভিযোগ। তাঁদের দাবি, সরকারকে নির্দিষ্ট কর দেন তাঁরা। ‘ইটালির ইসলামিকরণের’ কোনও পরিকল্পনাই নেই তাঁদের। তাঁরা শুধু নিজেদের কাজটুকুই করে যেতে চান।
বাংলাদেশি-বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করার জন্য প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল মেয়র আনাকে। তাতেও বিচলিত নন তিনি। ২৪ ঘণ্টা সুরক্ষার ঘেরাটোপের মধ্যে থাকলেও মনফ্যালকনের মেয়র ইটালির বাইরেও ‘ইউরোপের ইসলামিকরণের’ বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ ও প্রচার চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যও নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
সব ছবি: সংগৃহীত।