Rajesh Export Scam

‘কারচুপি’র গন্ধে ১০ বছর ছায়া মাড়ায়নি কোনও মিউচুয়াল ফান্ড, লগ্নি বাড়িয়েছে শুধু এলআইসি! বিখ্যাত স্বর্ণসংস্থার আড়ালে অন্য খেলা?

আর্থিক গরমিলের অভিযোগ ওঠা রাজেশ এক্সপোর্টস লিমিটেডে গত ১০ বছরে লগ্নি করেনি কোনও দেশীয় মিউচুয়াল ফান্ড। মুখ ফিরিয়ে থেকেছে বেসরকারি বিমা সংস্থাও। একমাত্র ব্যতিক্রম রাষ্ট্রায়ত্ত এলআইসি। কিন্তু কেন?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬ ১৭:২৬
০১ ১৮
Mutual Funds did not invest in Rajesh Export for last 10 years, while LIC stake holding increases 5 times

আয়ের হিসাবে কোটি কোটি টাকা গরমিলের অভিযোগ। রাজেশ এক্সপোর্টস লিমিটেডের বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে সিকিউরিটিজ় অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া বা সেবি। বাজার নিয়ন্ত্রক কেন্দ্রীয় সংস্থার এ-হেন পদক্ষেপে দালাল স্ট্রিটে হুলস্থুল! হুড়হুড়িয়ে স্বর্ণালঙ্কার প্রতিষ্ঠানটির স্টক বিক্রিতে ঝাঁপিয়েছেন লগ্নিকারীরা। ফলে হু-হু করে পড়েছে এর শেয়ারের দাম। সেই সঙ্গে ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে তাদের বাজারমূল্যও।

০২ ১৮
Mutual Funds did not invest in Rajesh Export for last 10 years, while LIC stake holding increases 5 times

প্রায় তিন দশক আগে ১৯৯৫ সালে স্টকের দুনিয়ায় পা রাখে রাজেশ এক্সপোর্টস। স্বর্ণালঙ্কার সংস্থাটির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, গত ১০ বছর ধরে তাদের শেয়ার কেনা-বেচা করেনি কোনও দেশীয় প্রতিষ্ঠানিক লগ্নিকারী। সেবির অভিযোগ, ২০২০-’২১ থেকে ২০২৪-’২৫ আর্থিক বছরের মধ্যে নজিরবিহীন ভাবে বেড়েছে তাদের রাজস্বের অঙ্ক। সেই অসঙ্গতির পরিমাণ ১৫.১৫ লক্ষ কোটি টাকা বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে।

০৩ ১৮
Mutual Funds did not invest in Rajesh Export for last 10 years, while LIC stake holding increases 5 times

চলতি বছরের ৩ জুন, বুধবার রাজেশ এক্সপোর্টসের বিরুদ্ধে ১০৯ পাতার একটি অন্তর্বর্তী আদেশ জারি করে সেবি। তখনই জানা যায় স্বর্ণালঙ্কার সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা তথা সিইও (চিফ এক্‌জ়িকিউটিভ অফিসার) রাজেশ মেহতার স্টকে লেনদেনের উপর জারি হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ২০১৬ সালের মার্চ থেকে রাজেশ এক্সপোর্টসের শেয়ারে লগ্নির ব্যাপারে একরকম বিরত থেকেছে প্রায় সমস্ত মিউচুয়াল ফান্ড।

Advertisement
০৪ ১৮
Mutual Funds did not invest in Rajesh Export for last 10 years, while LIC stake holding increases 5 times

ব্রোকারেজ ফার্মগুলির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে স্বর্ণালঙ্কার প্রতিষ্ঠানটির স্টকে আর্থিক তহবিলগুলির বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ০.৫ শতাংশ। পরবর্তী বছরগুলিতে সেটা আরও কমে শূন্যে নেমে আসে। শুধু তা-ই নয়, বর্তমানে রাজেশ এক্সপোর্টসের অংশীদারদের তালিকায় নাম নেই কোনও বেসরকারি বিমা সংস্থার। সেখানে একমাত্র ব্যতিক্রম ‘লাইফ ইনশিয়োর‌্যান্স কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া’ বা এলআইসি।

০৫ ১৮
Mutual Funds did not invest in Rajesh Export for last 10 years, while LIC stake holding increases 5 times

২০১৬ সালের মার্চে রাষ্ট্রীয় মালিকানার জীবন বিমা সংস্থাটির হাতে ছিল রাজেশ এক্সপোর্টসের ১.৯৯ শতাংশ স্টক। ২০২২ সালের মার্চে প্রায় ছ’গুণ বেড়ে সেটা দাঁড়ায় ১১.২২ শতাংশ। এ বছরের (২০২৬ সাল) ৩১ মার্চ পর্যন্ত হিসাবে স্বর্ণালঙ্কার প্রতিষ্ঠানটির ১০.৮ শতাংশ শেয়ারের অংশীদার এলআইসি। স্রোতের বিপরীতে হেঁটে কেন এই সিদ্ধান্ত? সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটির থেকে মেলেনি তার জবাব।

Advertisement
০৬ ১৮
Mutual Funds did not invest in Rajesh Export for last 10 years, while LIC stake holding increases 5 times

গত তিন বছরে রাজেশ এক্সপোর্টসের স্টক কেনা থেকে মুখ ফিরিয়ে থেকেছেন বিদেশি লগ্নিকারীরাও। ২০১৬ সালের মার্চের স্বর্ণালঙ্কার সংস্থাটির ১৫.৮৭ শতাংশের অংশীদার ছিলেন তাঁরা। ২০২৩ সালের মার্চে এই অঙ্ক বেড়ে ১৭.৭০ শতাংশে গিয়ে পৌঁছোয়। কিন্তু, এ বছরের (২০২৬ সাল) ৩১ মার্চের মধ্যে সেটাই কমে ১৪.২০ শতাংশে নেমে এসেছে।

০৭ ১৮
Mutual Funds did not invest in Rajesh Export for last 10 years, while LIC stake holding increases 5 times

ব্রোকারেজ ফার্মগুলি জানিয়েছে, বর্তমানে মাত্র দু’টি বিদেশি সংস্থার সামান্য কিছু লগ্নি রয়েছে রাজেশ এক্সপোর্টসের স্টকে। সেগুলি হল, ব্রিজ় ইন্ডিয়া ফান্ড এবং শোয়াব ফান্ডামেন্টাল মার্কেট ইকুইটি ইটিএফ। প্রথমটি স্বর্ণালঙ্কার সংস্থাটির ৮.৪৬ শতাংশের অংশীদার। দ্বিতীয়টির হাতে আছে মাত্র ২.৭০ শতাংশ শেয়ার। বিপদের আঁচ করেই বিদেশি লগ্নিকারী থেকে মিউচুয়াল ফান্ডগুলি যে এতে টাকা ঢালেনি, তা স্পষ্ট।

Advertisement
০৮ ১৮
Mutual Funds did not invest in Rajesh Export for last 10 years, while LIC stake holding increases 5 times

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিউচুয়াল ফান্ড সংস্থার এক সিইও বলেন, ‘‘সেবির পদক্ষেপ একেবারেই আশ্চর্যজনক নয়। রাজেশ এক্সপোর্টসের বিপুল লেনদেন এবং স্বল্প মুনাফার ব্যাপারটা কোনও যুক্তিতেই বোঝা যাচ্ছিল না। সেই কারণে প্রায় কেউই তাদের শেয়ারের উপর আস্থা রাখতে পারেনি।’’ স্বর্ণ রফতানিকারী একটি সংস্থা আবার জানিয়েছে, প্রচারবিমুখ মেহতার আর্থিক বৃদ্ধির সূচক রকেটগতিতে বাড়ছিল, যা হয়তো টাইটানকেও পিছনে ফেলে দিত।

০৯ ১৮
Mutual Funds did not invest in Rajesh Export for last 10 years, while LIC stake holding increases 5 times

রাজেশ এক্সপোর্টস নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয় ২০২৪ সালের ১১ মার্চ। ওই দিন সেবির কাছে অভিযোগ করেন সংস্থার এক অংশীদার। সেখানে অস্বাভাবিক বড় অঙ্কের বাণিজ্যিক পাওনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। অভিযোগে আরও বলা হয়, দু’বছরের বেশি সময় ধরে ওই টাকা বকেয়া রয়েছে। এই ধরনের দেনা প্রায়শই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, কারণ এগুলি অর্থ আদায়ে অসুবিধা বা সম্ভাব্য হিসাবরক্ষণের অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়।

১০ ১৮
Mutual Funds did not invest in Rajesh Export for last 10 years, while LIC stake holding increases 5 times

এই অভিযোগ পাওয়ার পরই নড়েচড়ে বসে সেবি। ২০২৪ সালের অক্টোবরে একটি তদন্তকারী নিয়োগ করে তারা। পরে সংস্থার হিসাবপত্র পরীক্ষা করতে এবং ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর দেওয়া আর্থিক তথ্য যাচাই করার জন্য ‘ফরেন্সিক অডিটর বিডিও’-ও নিযুক্ত করে সংশ্লিষ্ট বাজার নিয়ন্ত্রণকারী কেন্দ্রীয় সংস্থা। সেখানেই উঠে আসে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য।

১১ ১৮
Mutual Funds did not invest in Rajesh Export for last 10 years, while LIC stake holding increases 5 times

চলতি বছরের (২০২৬ সাল) ৩ জুন রাজেশ এক্সপোর্টসের শেয়ারবাজারে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে সেবি। কেন্দ্রীয় সংস্থটির দাবি, ২০২১-’২৫, এই পাঁচ বছরে স্বর্ণালঙ্কার প্রতিষ্ঠানটির প্রায় সমস্ত সমন্বিত রাজস্ব এসেছে তাদের বিদেশি সহায়ক সংস্থাগুলো থেকে। মোট ঘোষিত বিক্রয়ে এর অবদান ৯৭ থেকে ৯৯ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক সংস্থাটি ছিল ‘ভ্যালক্যাম্বি এসএ’।

১২ ১৮
Mutual Funds did not invest in Rajesh Export for last 10 years, while LIC stake holding increases 5 times

সুইস সংস্থা ‘ভ্যালক্যাম্বি এসএ’ প্রকৃতপক্ষে একটি স্বর্ণ শোধনাগার। বহু বছর আগে তা রাজেশ এক্সপোর্টস অধিগ্রহণ করেছিল। ফলে ভ্যালক্যাম্বি এবং অন্য সহায়ক প্রতিষ্ঠানগুলির নথি পরীক্ষা শুরু করে তদন্তকারী দল। সূত্রের খবর, সেখানেও একাধিক গরমিল খুঁজে পেয়েছে তারা। সেবির অভিযোগ, ব্যাবসায়িক গোষ্ঠীর সমন্বিত ভাবে দেখানো রাজস্বের পরিমাণ, সহায়ক সংস্থাগুলোর নথি থেকে যাচাইযোগ্য প্রকৃত রাজস্বের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।

১৩ ১৮
Mutual Funds did not invest in Rajesh Export for last 10 years, while LIC stake holding increases 5 times

এর পরই পাঁচ বছরে মোট ১৫.১৫ লক্ষ কোটি টাকার কারচুপির অভিযোগ ওঠে রাজেশ এক্সপোর্টসের বিরুদ্ধে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এ কথা শেষ পর্যন্ত সত্যি প্রমাণিত হলে এটি ভারতের কর্পোরেট খাতে রাজস্ব জালিয়াতির সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসাবে গণ্য হবে। স্বর্ণালঙ্কার সংস্থাটি তদন্তে সহযোগিতা করছে না বলেও জানিয়েছে সেবি।

১৪ ১৮
Mutual Funds did not invest in Rajesh Export for last 10 years, while LIC stake holding increases 5 times

রাজেশ এক্সপোর্টসের রাজস্ব সংক্রান্ত অভিযোগগুলোই সেবির চিন্তার একমাত্র বিষয় নয়। সংস্থাটির তরফে আফ্রিকায় অবস্থিত সোনার খনি সম্পদে ১,০৩৫ কোটি টাকার একটি বিনিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কেন্দ্রীয় সংস্থা। অন্তর্বর্তিকালীন আদেশ অনুযায়ী, সংস্থাটি এই বিনিয়োগগুলোর অস্তিত্ব এবং মূল্যায়নের সমর্থনে পর্যাপ্ত নথি সরবরাহ করতে পারেনি।

১৫ ১৮
Mutual Funds did not invest in Rajesh Export for last 10 years, while LIC stake holding increases 5 times

এ ছাড়া রাজেশ এক্সপোর্টের বিরুদ্ধে অ্যাফ্লুয়েন্স শেয়ার্স অ্যান্ড স্টকস প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে সম্পর্কিত লেনদেনেরও অভিযোগ রয়েছে। সেবির মতে, স্বর্ণালঙ্কার সংস্থাটি এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ১১,৪৮৭ কোটি টাকার বিক্রয় এবং ১১,৪৮৮ কোটি টাকার ক্রয় নথিভুক্ত করেছে। সে কথা অস্বীকার করেছে অ্যাফ্লুয়েন্স। তদন্তকারীদের তারা জানায়, রাজেশ এক্সপোর্টস কখনওই তাদের গ্রাহক ছিল না। এই ধরনের কোনও চুক্তিও হয়নি তাদের।

১৬ ১৮
Mutual Funds did not invest in Rajesh Export for last 10 years, while LIC stake holding increases 5 times

সেবির অন্তর্বর্তী আদেশে রাজেশ এক্সপোর্টসের তহবিল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সংস্থাটির অভিযোগ, রাজেশ মেহতার সঙ্গে যুক্ত অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তরিত করে সংশ্লিষ্ট স্বর্ণালঙ্কার সংস্থা। পরবর্তী কালে সেই অর্থই ব্যক্তিগত ডেরিভেটিভ ট্রেডিংয়ের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এর পরিমাণ ৭.৪ কোটি টাকা হতে পারে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

১৭ ১৮
Mutual Funds did not invest in Rajesh Export for last 10 years, while LIC stake holding increases 5 times

বাজার নিয়ন্ত্রণকারী কেন্দ্রীয় সংস্থাটি জানিয়েছে, ডেভিভেটিভ ট্রেডিংয়ের পর ওই টাকা ফের সংস্থার অ্যাকাউন্টে ফেরান রাজেশ। যদিও স্বর্ণালঙ্কার প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন পর্ষদ এই লেনদেনের অনুমতি দেয়নি। অন্য দিকে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার পর রাজেশ এক্সপোর্টসে তাদের বিনিয়োগকে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিতে ফেলেছে কানারা ব্যাঙ্ক। সেখানে তাদের বকেয়া ঋণের পরিমাণ ৫০৯ কোটি টাকা বলে জানা গিয়েছে।

১৮ ১৮
Mutual Funds did not invest in Rajesh Export for last 10 years, while LIC stake holding increases 5 times

সেবির তোলা যাবতীয় অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছে রাজেশ এক্সপোর্টস। একটি বিবৃতিতে স্বর্ণালঙ্কার সংস্থাটি জানিয়েছে, রাজস্ব নিয়ে কোনও অতিরঞ্জিত তথ্য দেওয়া হয়নি। সেবির সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতিতে বিভ্রান্তি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। অবিলম্বে সমস্ত নথি জমা করা হবে।

ছবি: সংগৃহীত ও প্রতীকী।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
আরও গ্যালারি