সমুদ্রের বুকে একটা নীল গর্ত। আর সেটিকে কেন্দ্র করে ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য। কী আছে ওই গর্তের অন্দরে? কোনও অদৃশ্য শক্তি কি সেখানে পাহারা দিচ্ছে যকের ধন? গর্তটির ভিতরে অক্সিজেন ফুরিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলতেই এই নিয়ে তুঙ্গে ওঠে জল্পনা। বিজ্ঞানীদের থেকে অবশ্য এ ব্যাপারে একাধিক তত্ত্ব সামনে এসেছে।
দক্ষিণ চিন সাগরের ওই গর্তটির নাম ‘সানশা ইয়ংলে’। সমুদ্র বিজ্ঞানীদের কাছে অবশ্য সেটি ড্রাগন হোল বা ড্রাগনের গর্ত নামে বেশি পরিচিত। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে এটিকে নিয়ে চলছে গবেষণা। তাতে রহস্য দূর হওয়া তো দূরে থাক, উল্টে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও বেড়েছে। গর্তটার গভীরতা নিয়েও যথেষ্ট অস্পষ্টতা রয়েছে।
গবেষকদের কথায়, সমুদ্রের তলদেশে এই ধরনের গর্ত তৈরি হওয়া একেবারেই আশ্চর্যজনক নয়। কারণ, প্রবাল প্রাচীর বা ছোট টিলায় ধাক্কা খেয়ে প্রায়ই সেখানকার জলে তৈরি হয় ঘূর্নি। খুব ছোট এলাকা জুড়ে সেটা গোল হয়ে ঘুরতে থাকলে ওই ধাক্কায় জন্ম নেয় ছোট ছোট বর্তুলাকার গর্ত। কিছু কিছু জায়গায় সেগুলি বেশ অগভীর। আবার কয়েকশো মিটার নীচে চলে যাওয়া গর্তও রয়েছে।
দক্ষিণ চিন সাগরে ড্রাগন হোল বা ড্রাগনের গর্তের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার পর এর রহস্য উদ্ঘাটনে বিজ্ঞানীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল। গোড়ার দিকে একে পৃথিবীর গভীরতম নীল গর্ত বলে মনে করেছিলেন তাঁরা, যেটা প্রায় ৩০১ মিটার নীচে চলে গিয়েছে। যদিও পরবর্তীকালে মেক্সিকো উপসাগরে আরও গভীর সামুদ্রিক গর্তের হদিস মেলে।
দুনিয়ার তাবড় নীল গর্তগুলির মধ্যে শীর্ষস্থান হারালেও গঠন শৈলীর দিক থেকে ড্রাগন হোল কিন্তু অনন্য। বিজ্ঞানীরা কখনওই একে শুধুমাত্র রেকর্ডের তালিকায় থাকা কোনও প্রাকৃতিক ঘটনা হিসাবে দেখননি। বরং জলবায়ু পরিবর্তন এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কী ভাবে সেটা প্রাকৃতিক ভাবে সংরক্ষণ পেল, সেটা বোঝার চেষ্টা করেছেন তাঁরা।
সমুদ্রের বুকে তৈরি হওয়া নীল গর্তকে সাধারণ ভাবে উল্লম্ব খাদ বলা যেতে পারে। কিন্তু ড্রাগন হোল একেবারেই সে রকম নয়। বিস্তারিত জরিপে দেখা গিয়েছে, যত নীচে নেমেছে, ততই কাত হয়ে গিয়েছে ওই গর্ত।
দক্ষিণ চিন সাগরের ড্রাগন গর্তটির আরও কয়েকটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর উপরের অংশটা প্রশস্ত। কিন্তু যত গভীরে নামা হবে, ততই সেই রাস্তা সঙ্কুচিত হয়ে যায়। অর্থাৎ গর্তটিকে দেখতে কতকটা বাঁকানো ফানেলের মতো বললে অত্যুক্তি হবে না। সাধারণ ভাবে সামুদ্রিক গর্তগুলির মধ্যে এই ধরনের কাঠামো বেশ বিরল।
২০১৭ সালে ড্রাগন হোলের রহস্য উদ্ঘাটনে কোমর বেঁধে লেগে পড়েন বিজ্ঞানীরা। সামুদ্রিক দিকনির্ণয়কারী সরঞ্জাম এবং উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন রোবট নামিয়ে সংশ্লিষ্ট গর্তটির ত্রিমাত্রিক এক মানচিত্র তৈরির চেষ্টা করেন তাঁরা। তাঁদের পরিশ্রম বৃথা যায়নি। মানচিত্র তৈরির ব্যাপারে অনেকটাই সাফল্য পায় ওই গবেষকদের দল।
সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের দাবি, গর্তটির সঠিক গভীরতা হল ৩০১.১৯ মিটার। ড্রাগন হোলের ভিতরের দেওয়াল বাঁকানো এবং এর ভিতরে খাড়া কৌণিক বিন্দুতে কঠিন পাথুরে জমি রয়েছে। তা ছাড়া গর্তটির ভিতরে কিছু কিছু জায়গায় ধসের চিহ্ন মিলেছে। গবেষকেরা মনে করেন, ড্রাগন হোল একেবারেই নতুন গজিয়ে ওঠা গর্ত নয়। এর জন্মের ইতিহাস বেশ পুরনো।
ড্রাগন হোলের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা বিজ্ঞানীদের কাছে একেবারেই সহজ ছিল না। গোড়ার দিকে এতে সামুদ্রিক দিকনির্ণয়কারী যন্ত্র নামিয়েছিলেন তাঁরা। এ ছাড়া গর্তটার মধ্যে পাঠানো হয়েছিল উচ্চ শক্তিসম্পন্ন ক্যামেরা। খুব ধীরে ধীরে ভিতরের দিকে যাচ্ছিল সেগুলি। কিন্তু, হেলে পড়া দেওয়ালের জন্য হঠাৎ করেই খেই হারিয়ে ফেলে ওই সমস্ত যন্ত্র।
দ্বিতীয় পর্যায়ে ড্রাগন হোলে অত্যাধুনিক ডুবো রোবট নামায় গবেষকদের দল। তার গায়ে আবার দিক নির্ণয়ের একাধিক সরঞ্জাম লাগানো ছিল। রোবটটি খুব দ্রুত নীল গর্তটির ভিতরে ঢুকে যায়নি। বরং ধীরেসুস্থে, কিছুটা সন্তর্পণে এগিয়েছে বলা যেতে পারে। ওই ডুবো রোবটের পাঠানো তথ্যের উপর ভিত্তি করে ত্রিমাত্রিক মানচিত্র আঁকতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা।
তবে মানচিত্র তৈরি হলেও ড্রাগন হোলের রহস্যভেদ যে করা গিয়েছে, এমনটা নয়। কারণ গবেষকদের দাবি, গর্তটির ভিতরে রয়েছে অসংখ্য সুরু খাঁজ ও ঘরের মতো জায়গা। হাজার হাজার বছর আগে সেগুলি কী ভাবে তৈরি হল, তা নিয়ে যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ড্রাগন হোলের ভিতরে সিঁড়ির ধাপের মতো একটা জায়গা রয়েছে। সেটা কিছুটা এঁকেবেঁকে নীচের দিকে নেমে গিয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলি প্রাচীন সমুদ্রপৃষ্ঠের সঙ্গে সারিবদ্ধ, যেটা শীতকালে তৈরি হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
ড্রাগন গর্তের উপরের দিকে জীবাশ্ম এবং প্রবাল পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছে। গবেষকদের অনুমান, একটা সময় গর্তটির ভিতরে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে এর আকার বাড়তে শুরু করলে সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব লোপ পায়। জলের স্তরে হ্রাস-বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর ভিতরের দেওয়াল মোটা বা সরু হয়েছে। গর্তটির ভিতরের দেওয়ালে চুনাপাথরের হদিস পেয়েছেন তাঁরা।
দক্ষিণ চিন সাগরের ওই গর্তটির সবচেয়ে রহস্যজনক বিষয় হল এর রসায়ন। ড্রাগন হোলের উপরের দিকের ৯০ থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত অক্সিজেন রয়েছে। ফলে এখনও সেখানে সামুদ্রিক জীবের অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু, তার চেয়ে নীচে নামলে আর সেটা পাওয়া যায় না। ফলে সেখানে কোনও প্রাণের অস্তিত্ব নেই।
ড্রাগন হোলের গভীরতম স্তরে হাইড্রোজ়েন সালফাইডের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা। এটি জীবন ধারণকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে। গর্তটির ভিতরের জলস্তরের মধ্যেও একাধিক রাসায়নিক জটিলতা রয়েছে, যা অন্যান্য সামুদ্রিক নীল গর্তে প্রায় বিরল, বলছেন বিশ্লেষকেরা।
সব ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।