গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে বিক্ষোভ চলছে ইরানে। প্রাথমিক ভাবে মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। ক্রমে তা দেশের ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের অপসারণ চাইছেন ইরানের মানুষ।
ইরানের বিক্ষোভের আঁচ রাজধানী তেহরান ছাড়িয়ে ইতিমধ্যেই দেশের অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভকারীদের দমন করতে কঠোর হয়েছে ইরানি প্রশাসন। নির্বিচারে প্রতিবাদীদের উপর গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সংবাদসংস্থার রিপোর্টে দাবি, ইরানে নিহতের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি। গুলিবিদ্ধ রোগীতে উপচে পড়ছে হাসপাতালগুলি।
বিক্ষোভ দমন করতে গত কয়েক দিন ধরে ইরানে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইরানের বিক্ষোভের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। তিনি জানিয়েছেন, ইরানে ইন্টারনেট চালু করার জন্য তিনি ইলন মাস্কের সঙ্গে কথা বলবেন। পাশাপাশি এক আন্দোলনকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না-করার জন্য তেহরানের উপর চাপ বাড়িয়েছেন তিনি।
তবে এই প্রথম নয়, গত কয়েক বছরে কখনও হিজাব-বিরোধী আন্দোলন, কখনও মূল্যবৃদ্ধি, কখনও ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধাচারণ— বার বার গর্জে উঠেছেন ইরানের সাধারণ মানুষ।
যদিও আজ থেকে পাঁচ দশক আগেও সরকারকে নিয়ে তটস্থ থাকতে হত না ইরানের সাধারণ মানুষদের। বরং সেই সময়ের ছবি কিন্তু অন্য কথাই বলে।
১৯৭৯ সালে রাজতন্ত্র-বিরোধী বিপ্লবের সাক্ষী হন ইরানের মানুষ। পহলভি রাজবংশের শাসক শাহ মহম্মদ রেজ়া পহলভিকে সরিয়ে আয়াতোল্লাহ রুহুল্লাহ খোমিনির নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে ইসলামিক রিপাবলিক সরকার।
ইরান থেকে রাজপরিবারকে উৎখাত করার এই বিপ্লবকে সমর্থন জুগিয়েছিল বিভিন্ন বামপন্থী এবং ইসলামপন্থী সংগঠনও। ইতিহাসের পাতায় এই ঘটনা ইরানি বিপ্লব বা ইসলামিক বিপ্লব নামেও পরিচিত।
রাজপরিবারের উৎখাতের সঙ্গে সঙ্গেই পাল্টে যায় ইরানের সামাজিক পরিস্থিতি এবং রীতিনীতি। কিন্তু ইরানে ক্ষমতার হাতবদলের আগে কেমন ছিল সে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি? ইসলামিক বিপ্লবের আগে, হিজাবের বদলে পাশ্চাত্যের পোশাকশৈলীর প্রতিও বিশেষ আকর্ষণ দেখা গিয়েছিল ইরানের মহিলাদের।
ইসলামিক বিপ্লবের আগে ইরানের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির ছবি সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। হিজাব পরার পাশাপাশি জিন্স, মিনি স্কার্ট এবং শর্ট-হাতা টপ পরেও ইরানের রাস্তায় স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়াতে পারতেন সেই দেশের মহিলারা। সমুদ্রসৈকতে বিকিনি পরেও ঘুরতে দেখা যেত তাঁদের।
সেই সময় ইরানের শহরের মহিলাদের বাহারি জুতো পরতেও দেখা যেত। চোখে থাকত বিভিন্ন ধরনের রোদচশমা। ১৯৭৭ সালের আগে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন সে দেশের বহু মহিলা। শিক্ষার মানের দিক থেকেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ নাম ছিল। বিপ্লব শুরুর সময় সে দেশের বহু মহিলা উচ্চশিক্ষিত ছিলেন।
ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের ভর্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। গ্রামে বসবাসকারী রক্ষণশীল পরিবারের মেয়েরা যাতে বাড়ি থেকে দূরে পড়াশোনা করার সুযোগ পান, তা নিয়ে উদ্যোগী হতেন কর্তৃপক্ষ।
ইসলামিক বিপ্লব হওয়ার আগে শেষ কয়েক বছরে ইরানে পরিবার এবং বন্ধুদের নিয়ে প্রতি শুক্রবার একত্রিত হওয়ার প্রবণতাও ছিল। সবাই মিলে এক হয়ে পিকনিকে যেত ইরানের বহু পরিবার। পিকনিক ইরানি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। মধ্যবিত্তদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় ছিল এটি।
বিপ্লবের পরেও এই নিয়মের কোনও পরিবর্তন হয়নি। তবে বর্তমানে এই সব পিকনিকে মহিলাদের উপস্থিতি অনেক কমেছে। কমেছে পিকনিকে গিয়ে পুরুষ এবং মহিলাদের রাজনীতি বা আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনাও।
ইরানের রাজপরিবারের পতনের আগে তেহরানের বুকে দেখা যেত মহিলাদের সেলুনও। খোলা চুলে দিব্যি সেলুনে যাতায়াত করতে পারতেন তাঁরা। ইসলামিক বিপ্লবের পর সেলুন থাকলেও, সে সব সেলুনে মহিলাদের আনাগোনা প্রায় নেই।
শীতের সময় তেহরানের বরফঢাকা রাস্তায় হাঁটার জন্য একসময় ইরানি মহিলাদের ভিড় লেগে যেত। কিন্তু বর্তমানে সেই দৃশ্যও খুব একটা চোখে পড়ে না। এমনকি সে সময় মহিলারা সাধারণ পোশাকেই ফুটবল খেলতে পারতেন।
পুরুষদের সঙ্গেও অবাধে মেলামেশার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল মহিলাদের। ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইরানের মহিলারা ভোটাধিকার পান এবং পরবর্তী কালে সংসদে নির্বাচিত হন। হিজাবের বদলে ইরানীয় মহিলাদের আধুনিক পশ্চিমি পোশাক পরার বিষয়েও উৎসাহিত করা হয়েছিল।
১৯৭৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪০ বছর ধরে ইরানের পশ্চিমপন্থী শাসক রেজ়া পহলভির আমলে ইরানের অর্থনীতি এবং শিক্ষার সুযোগও প্রসারিত হয়েছিল। দেশবাসীকে ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক রীতিনীতি গ্রহণে জোর করতেন তিনি। বলা হয়, পহলভির শাসনকালে নাকি সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাও ছিল ইরানে।
তবে পহলভির আমলে পশ্চিমপন্থী উদারীকরণের নীতি বিশেষ প্রসারিত হয়নি। বরং শাসকের রীতিনীতি নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন যাঁরা, তাঁরা রোষের মুখে পড়েন। ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী পদক্ষেপ এবং বহুদলীয় শাসনের অবসানে ইসলামিক বিপ্লবের সূচনা করেছিল।
ইরানের বিপ্লবকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এটি রাজনৈতিক ইসলামের একটি নতুন রূপের রূপরেখা তৈরি করে এবং একটি গভীর রক্ষণশীল ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সূচনা করে যা আজও বিদ্যমান।
ক্ষমতায় আসার পরই ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ রুহুল্লাহ খোমিনি আদেশ দেন, জাতিধর্মনির্বিশেষে দেশের সব মহিলাকে হিজাব পরে থাকতে হবে। এর বিরুদ্ধে সেই সময়েও পথে নামতে দেখা গিয়েছিল সে দেশের মহিলাদের।
১৯৭৯ সালের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারীদিবসের দিন সমাজের সর্ব স্তরের হাজার হাজার মহিলা খোমিনির এই নয়া নির্দেশের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন। দেশের সর্বোচ্চ নেতার থেকে এ-ও আদেশে আসে যে, ইরানের মহিলারা বাড়ির ভিতরে যা খুশি পরিধান করতে পারেন, কিন্তু বাইরে বেরোলে তাঁদের ‘সংযত’ ভাবেই বেরোতে হবে।
নমাজ পড়ার ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম জারি করা হয়। নির্দেশ দেওয়া হয়, মহিলা এবং পুরুষদের একই ঘরে নমাজ পড়া যাবে না। মহিলাদের প্রার্থনা করার জায়গা হতে হবে পুরুষদের প্রার্থনা করার জায়গা থেকে দূরে। ধীরে ধীরে সমাজে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য আরও বাড়তে থাকে।
ইসলামিক বিপ্লবের পরে সমু্দ্রসৈকত মহিলাদের সাঁতারের পোশাক পরাও নিষিদ্ধ করা হয়। ইরানে মহিলা এবং পুরুষদের একসঙ্গে ফুটবল ম্যাচ দেখার উপর আনুষ্ঠানিক ভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি না করা হলেও বর্তমানে সে দেশের মহিলাদের প্রায়ই স্টেডিয়ামে প্রবেশ করার মুখে আটকানো হয়।
ইরানের রাজবংশের পতনের পর বহু বছর পেরিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও কমেছে সে দেশের মহিলাদের সামাজিক অধিকার। তবে এই নিয়ে বিপ্লব কখনও থেমে থাকেনি। আবার নতুন বিপ্লবে উত্তাল সাবেক পারস্য। নির্বিচারে মরলেও পিছু হটছে না জনতা।
সব ছবি: সংগৃহীত।