মাথায় ৯ কোটি টাকা ঋণের বোঝা। জানিয়েছেন, কোনও ভাবেই তা শোধ করতে পারবেন না। বলিউডের প্রথম সারির কৌতুকাভিনেতা এ-ও জানিয়েছেন, ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি ‘বন্ধুহীন’। নিঃস্ব হয়ে শেষে তিহার জেল কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন রাজপাল যাদব।
নাটকের মঞ্চ থেকে হিন্দি ছবিতে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করে কেরিয়ার শুরু করেছিলেন রাজপাল। ২০০০ সালে ‘জঙ্গল’ ছবিতে নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসার্হ হয়েছিলেন তিনি। তার পর একের পর এক হিন্দি ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব পেতে শুরু করেন রাজপাল। তবে তিনি জনপ্রিয়তা পান কৌতুকাভিনেতা হিসাবে।
‘হাঙ্গামা’, ‘গরম মশালা’, ‘চুপ চুপ কে’, ‘মালামাল উইকলি’, ‘ফির হেরা ফেরি’, ‘ভাগম ভাগ’, ‘ভুল ভুলাইয়া’, ‘হলচল’-এর মতো বহু হিন্দি ছবিতে রাজপালের অভিনয় দর্শকমন ছুঁয়ে যায়। কিন্তু তাঁর মাথায় ছিল ঋণের মস্ত বোঝা। সেই ঋণ শোধের জন্যই নাকি বেশি করে অভিনয় করতেন রাজপাল।
২০০৭ সালে ‘ভুল ভুলাইয়া’ ছবিতে ছোট পণ্ডিতের চরিত্রে অভিনয় করে হাততালি কুড়িয়েছিলেন রাজপাল। ১৫ বছর পর মুক্তি পায় সেই ছবির সিক্যুয়েল ‘ভুল ভুলাইয়া ২’। সেই ছবিতে খুবই কম সময়ের জন্য দেখা গিয়েছিল রাজপালকে। কানাঘুষো শোনা যায়, অর্থের টানে অল্প সময়ের জন্য হলেও ‘ভুল ভুলাইয়া ২’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তিনি।
২০২৪ সালে ‘ভুল ভুলাইয়া ৩’, ‘চন্দু চ্যাম্পিয়ন’, ‘বেবি জন’-এর মতো গুটিকয়েক হিন্দি ছবিতে মুখ দেখিয়েছিলেন রাজপাল। গত বছরে মাত্র একটি হিন্দি ছবিতে দেখা গিয়েছিল রাজপালকে। সে ছবি আবার প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়নি। মুক্তি পেয়েছিল ওটিটির পর্দায়।
বেশ কয়েক বছর ধরেই রাজপালের কেরিয়ারের লেখচিত্র নিম্নগামী। অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনার ক্ষেত্রে বিচরণ করতে চেয়েছিলেন তিনি। সেই সিদ্ধান্তই অন্ধকার হয়ে নেমে আসে অভিনেতার জীবনে।
২০০৫ সালে রাজপাল এবং তাঁর স্ত্রী রাধা যাদব এক প্রযোজনা সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন। ২০১০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘কুস্তি’ ছবিতে অভিনয়ের পাশাপাশি সহ-প্রযোজনা করেন রাজপাল। ক্যামেরার পিছনে কাজ করতে আগ্রহী হয়ে পড়েন তিনি।
২০১২ সালে মুক্তি পায় রাজপাল অভিনীত ‘অতা পতা লাপতা’। এই ছবিতে অভিনেতার পাশাপাশি প্রযোজক এবং পরিচালকের আসনে দেখা গিয়েছিল রাজপালকে।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, কেরিয়ারের প্রথম পরিচালিত ছবির জন্য এক সংস্থার থেকে ৫ কোটি টাকা ধার নিয়েছিলেন রাজপাল। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ছবিমুক্তির কয়েক দিন পর সেই টাকা ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বক্সঅফিস মুখ তুলে চায়নি।
‘অতা পতা লাপতা’ ছবিটি বক্সঅফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। রাজপালের প্রযোজনা সংস্থা ভরাডুবির সম্মুখীন হয়। যে সংস্থার কাছে রাজপাল টাকা ধার নিয়েছিলেন, তাদের আর সময়মতো টাকা শোধ করতে পারেননি তিনি।
সংস্থার দাবি, রাজপাল এবং তাঁর স্ত্রীর থেকে পাওয়া একাধিক চেক বাউন্স করে। টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য সময় চেয়েছিলেন অভিনেতা। কিন্তু হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ সেই আপিল খারিজ করে দেয়। ২০১৩ সালে সেই কারণে চার দিন হাজতবাস করেছিলেন রাজপাল।
২০১৩ সালে ৩ ডিসেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলে ছিলেন রাজপাল। বছরের পর বছর সেই মামলা চলতে থাকে। এ দিকে বাড়তে থাকে সুদের পরিমাণও। টাকা শোধ না করতে পারায় ২০১৮ সালের নভেম্বরে রাজপালকে হেফাজতে নেয় দিল্লি পুলিশ।
২০১৮ সালে দিল্লির একটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চেক বাউন্স মামলায় রাজপাল এবং তাঁর স্ত্রীকে দোষী সাব্যস্ত করে। তিন মাসের হাজতবাসের নির্দেশও দেয় আদালত। আদালতের এই রায়ের পর রাজপালের কেরিয়ার থমকে যায়।
ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলে কান পাতলে শোনা যায়, ৯ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে রাজপালের। বার বার ঋণ পরিশোধ করার সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধ করতেন তিনি। কিন্তু সময়মতো টাকা দিতে পারেননি অভিনেতা।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, ২০২৫ সালে ৭৫ লক্ষ টাকা ফেরত দিয়েছিলেন রাজপাল। পরে আড়াই কোটি টাকার চেক বাউন্স হয়ে যায় অভিনেতার। তাঁর বিরুদ্ধে যে সাতটি মামলা চলছে, প্রতিটি মামলার জন্য ১.৩৫ কোটি টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল দিল্লি হাই কোর্ট। কিন্তু টাকা শোধ করতে ব্যর্থ হন রাজপাল।
ঋণ পরিশোধ করার জন্য রাজপাল সময়সীমা বৃদ্ধি করার আর্জি জানালে গত বুধবার তা খারিজ করে দেয় দিল্লি হাই কোর্ট। অভিনেতার আইনজীবী আদালতে জানিয়েছিলেন, তাঁর মক্কেল ৫০ লক্ষ টাকা জোগাড় করেছেন। বাকি টাকা শোধ করার জন্য আরও এক সপ্তাহ সময় চান। কিন্তু, রাজপালকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয় আদালত।
বৃহস্পতিবার বিকেলে দিল্লির তিহাড় জেল কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করেন রাজপাল। আত্মসমর্পণের আগে অভিনেতা বলেছিলেন, ‘‘আমি কী করব বুঝতে পারছি না। আমার কাছে টাকা নেই। এখানে আমরা সবাই খুবই একা। কোনও বন্ধু নেই। এই কঠিন সময়টা আমায় একাই পার করতে হবে।’’
তবে রাজপালের এই কঠিন সময়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন বলি অভিনেতা সোনু সুদ। সমাজমাধ্যমের পাতায় রাজপালের অভিনয়ের প্রশংসা করে সোনু লিখেছেন, ‘‘আপনজন যখন বিপদে পড়েন, তখন আমাদের উচিত তাঁদের পাশে দাঁড়ানো। তাঁরা যেন কখনও নিজেদের একা না ভাবেন।’’ রাজপালকে একটি ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সোনু।
সোনু একা নন, রাজপালকে সাধ্যমতো সাহায্য করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন টেলি অভিনেতা গুরমীত চৌধরিও। সমাজমাধ্যমের পাতায় পোস্ট করে গুরমীত লিখেছেন, ‘‘রাজপাল আমাদের অগুনতি হাসির কারণ। এই কঠিন সময়ে তাঁর পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। আমি অভিনেতা হিসাবে, মানুষ হিসাবে সাধ্যমতো তাঁকে সাহায্য করার চেষ্টা করব। ইন্ডাস্ট্রির সকলের কাছেও একই অনুরোধ করব।’’
লালুপ্রসাদ যাদবের জ্যেষ্ঠপুত্র এবং ‘জনশক্তি জনতা দল’-এর প্রধান তেজপ্রতাপ যাদবও কঠিন সময়ে রাজপালের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর তরফে অভিনেতাকে ১১ লক্ষ টাকা দিয়ে সাহায্য করা হবে বলে সমাজমাধ্যমে লিখে জানিয়েছেন তেজপ্রতাপ।
সব ছবি সংগৃহীত।