আগাম জামিন নিয়েও স্বস্তিতে নেই বিহারের পটনার নামজাদা শিক্ষক ও ইউটিউবার খান স্যার। তাঁর বিরুদ্ধে একে একে জমছে অভিযোগের পাহাড়। এ বার তাঁর বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ আনলেন খান স্যারের ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী রোশন আনন্দ। জ্ঞান বিন্দু অ্যাকাডেমির পরিচালক তিনি।
বিহারের পটনাস্থিত দুই কোচিং সেন্টারের মধ্যে অশান্তির কারণে গ্রেফতার হন রোশন। খান স্যারের কোচিং সেন্টার খান গ্লোবাল স্টাডিজ় ও পার্শ্ববর্তী জ্ঞান বিন্দু জিএস অ্যাকাডেমি কোচিং সেন্টারের বিবাদের ঘটনার জল বহু দূর গড়িয়েছে। সেই ঘটনায় আপাতত গ্রেফতারি এড়াতে পেরেছেন খান স্যার।
আদালতে জামিনের আবেদনের শুনানির পর অন্তবর্তিকালীন সুরক্ষা পেয়েছেন খান স্যার। অন্য দিকে বেশ কয়েক দিন জেলে থাকার পর জামিনে মুক্ত হয়েছেন রোশন স্যারও। খান স্যারের কোচিং ইনস্টিটিউটে ভাঙচুর ও পাথর ছোড়ার ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষক পটনা আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর নতুন করে এক বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন খান স্যারের বিরুদ্ধে।
একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রোশন সরাসরি তাঁর ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী খান স্যারের দিকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন। সংবাদমাধ্যমে রোশন স্যার দাবি করেন, ‘‘আমি জেলে থাকাকালীন আমাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। খান স্যারের রক্ষীরা কারাগারের ভিতরে আমায় খুন করার চক্রান্ত করেছিলেন।’’
রোশনের বিরুদ্ধে খান স্যারের কোচিং সেন্টারে হামলার পরিকল্পনা করা এবং এক নিরাপত্তাকর্মীকে মারধরের অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে বেউর জেলে পাঠায়। ১২ দিন হেফাজতে থাকার পর জামিনে মুক্ত হয়েছেন রোশন।
শুনানির সময় রোশনের আইনজীবী রমাকান্ত শর্মা আদালতে যুক্তি দেন যে, তাঁর মক্কেল এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। খুনের চেষ্টার ধারাটি এই মামলায় অন্যায় ভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন রোশনের আইনজীবী। কারণ তাঁর মতে মামলাটিতে অভিপ্রায়, জ্ঞান এবং ঘটনাস্থলে অভিযুক্তের উপস্থিতির মতো আইনত প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর অভাব ছিল। অভিযোগ, রোশনের সুনাম নষ্ট করার জন্য খান স্যার তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করেছেন।
গ্রেফতারি থেকে সাময়িক স্বস্তি পেলেও দেশ জুড়ে খ্যাতি পাওয়া খান স্যারের জন্য সময়টা কঠিন। কারণ ইতিমধ্যেই আরও একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর নাম জড়িয়ে গিয়েছে। সদ্য জামিন পাওয়া শিক্ষক রোশনের ভাই প্রিন্স যাদবের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে ১৩ জুন। খান স্যারের কোচিং সেন্টারে ভাঙচুরের ঘটনায় তাঁর নাম উঠে এসেছিল।
ছয় বন্ধুর সঙ্গে নেপালে ছিলেন তিনি। শনিবার রাতে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। দুই কোচিং সেন্টারের দীর্ঘ দিনের বিরোধের আবহে প্রিন্সের মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ২০২১ সালেও খান স্যারের কোচিং সেন্টারে হামলা হয়। সেই হামলার অভিযোগ ওঠে রোশন স্যারের ভাইয়ের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, সে সময় খান স্যারের কোচিং সেন্টারে ঢুকে তাণ্ডব চালান প্রিন্স। সাম্প্রতিক ঘটনায় গ্রেফতারের ভয়ে প্রিন্স বিহার ছেড়ে নেপালে চলে গিয়েছিলেন বলে দাবি তোলেন স্থানীয়েরা।
রোশনের মৃত ভাই প্রিন্সের চোখের উপরে এবং দেহের একাধিক জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। আর এখান থেকেই সন্দেহ বাড়ছে তদন্তকারী আধিকারিকদের। নেপাল পুলিশ যদিও এ বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ। ময়নাতদন্তের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা ছাড়া গতি নেই। তার পরই স্পষ্ট হবে কী ভাবে মৃত্যু হয় প্রিন্সের।
যদিও ভাইয়ের মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছেন রোশন। ভাইয়ের মৃত্যুর সিবিআই তদন্ত, পুনরায় ময়নাতদন্ত এবং নিজের নার্কো টেস্টের দাবিও জানিয়েছেন রোশন। পটনার সিভিল কোর্টে জামিন পাওয়ার পর রোশন প্রকাশ্যে একাধিক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ করে জানান, তাঁর কোচিং সেন্টারকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই খান স্যার এমন ষড়যন্ত্র করছেন।
বিহারের পটনার মুসল্লপুর কোচিং হাবে রয়েছে জ্ঞান বিন্দু কোচিং সেন্টার এবং খান গ্লোবাল স্টাডিজ়। নামকরা দুই কোচিং সেন্টারের এই বিবাদ অবশ্য আজকের নয়। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জেরে একাধিক বার সংঘাতের নজির রয়েছে।
প্রিন্সের মৃত্যু নিয়ে মুখ খুলেছেন বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদের ত্যাজ্যপুত্র তেজপ্রতাপ যাদবও। প্রিন্সের মৃত্যুর নেপথ্যে খান স্যারের হাত রয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনিও। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তেজপ্রতাপ জানান, এই ঘটনায় যদি কেউ দোষী হন তবে তিনি খান স্যারই। তাঁর নির্দেশেই এই হত্যার ষড়যন্ত্র রচিত হয়েছিল। প্রিন্স হত্যার সঠিক ও যথাযথ তদন্তের দাবি তুলেছেন পরিবার থেকে বিতারিত লালু-পুত্রও।
যদিও প্রিন্সের মৃত্যুর খবর শুনে এক ভিডিয়োবার্তায় শোকপ্রকাশ করতে দেখা গিয়েছে খান স্যারকে। উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়ে খান স্যার বলেন, ‘‘দুই কোচিং সেন্টারে বিবাদের সুযোগ নিয়ে একটি তৃতীয় পক্ষ এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে।” তৃতীয় পক্ষ জড়িত থাকলে বা তাতে ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া গেলে তা নিরপেক্ষ ভাবে ও পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে তদন্ত করা উচিত বলে মনে করেন ইউটিউবার ও শিক্ষক।
এই মামলার সঙ্গে জড়িত কোনও সম্ভাবনাই উপেক্ষা করা উচিত নয় বলে দাবি করছেন খান স্যার। যদি এই মামলায় কোনও ব্যক্তির জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বলে ভিডিয়োবার্তায় জানিয়েছেন খান স্যার।
পরিবার সূত্রে খবর, নেপাল পুলিশ পাঁচ জনকে আটক করেছে। জানা গিয়েছে, জেলা পরিষদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কথা ছিল প্রিন্সের। সহরসার সৌরবাজার থেকে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কিন্তু তার মধ্যেই প্রিন্সের রহস্যজনক মৃত্যুতে নানা রকম জল্পনা জোরালো হতে শুরু করেছে।
পটনার মুসল্লপুরের কিসান কোল্ড স্টোরেজ নামের একটি এলাকা জুড়ে রয়েছে একাধিক ছোট-বড় কোচিং সেন্টার। কিসান কোল্ড স্টোরেজ দীর্ঘ দিন ধরেই একটি কোচিং হাব হিসাবে পরিচিত। আর এই কোচিং হাবকে ঘিরেই যত বিবাদ। দেশজোড়া বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে এই এলাকাটি।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, খান স্যার ও রোশনের মধ্যে বিবাদের সূত্রপাত বিহার পুলিশ নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফলকে ঘিরে। দু’টি কোচিং সেন্টারই বিপুল সংখ্যক সফল প্রার্থীর কৃতিত্ব দাবি করেছিল। একটি সেন্টার দাবি করে ১২,০০০ পরীক্ষার্থী সফল এবং অন্যটি ১০,০০০ পরীক্ষার্থী। উভয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা একে অপরের পোস্টার ছিঁড়ে ফেললে উত্তেজনা চরমে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত হাতাহাতিতে গড়ায়।
ফয়জ়ল খান ওরফে খান স্যারের কোচিং সেন্টার এবং জ্ঞান বিন্দু কোচিংয়ের মধ্যে ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জেরে প্রথমে হাতাহাতি, পরে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। গত ২ জুন খান স্যারের কোচিং ইনস্টিটিউট এবং জ্ঞান বিন্দু কোচিংয়ের সদস্যদের মধ্যে অশান্তির ঘটনায় ইতিমধ্যেই দুই নিরাপত্তারক্ষীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পুলিশে এফআইআর দায়ের করা হয় খান স্যারের বিরুদ্ধে।
জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর রোশনের কোচিং সেন্টারের ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিষ্ঠানের বাইরে জড়ো হয়ে খান স্যারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। ফলে এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে মনগড়া ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন রোশন।
সব ছবি: সংগৃহীত, পিটিআই।