ভেনেজ়ুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে খোদ দেশের প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে যাওয়া। ‘চিরশত্রু’ রাশিয়ার তেলবাহী জাহাজ আটক করা। কিংবা ঘরোয়া কোন্দলকে কেন্দ্র করে ইরানকে ক্রমাগত হুমকি-হুঁশিয়ারি। নতুন বছরের গোড়াতেই মার্কিন ‘দৌরাত্ম্যে’ ত্রাহিমাম অবস্থা বিশ্বের একাধিক দেশে। এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের উপর পাল্টা প্রত্যাঘাত শানাতে জোট বাঁধল ‘ব্রিকস প্লাস’ ভুক্ত চারটি দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের ‘লাল চোখ’কে উপেক্ষা করে যৌথ সামরিক মহড়ায় নেমেছে তাদের নৌবাহিনী। এর জেরে আটলান্টিকে ‘ক্ল্যাশ অফ টাইটানস’-এর আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকেই।
চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি থেকে সাউথ আফ্রিকার কেপটাউন উপকূলে শুরু হয়েছে সপ্তাহব্যাপী যৌথ নৌমহড়া। এতে যোগ দেওয়া বাকি তিনটি দেশ হল রাশিয়া, গণপ্রজাতন্ত্রী চিন (পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না) এবং ইরান। এই যুদ্ধাভ্যাসের পোশাকি নাম ‘উইল ফর পিস ২০২৬’। বর্তমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট মহড়াকে ‘অপরিহার্য’ বলে উল্লেখ করেছে অংশগ্রহণকারী ‘ব্রিকস প্লাস’-এর ওই চার ‘বন্ধু’। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, কয়েক দিন আগেই উত্তর আটলান্টিকে রুশ তেলবাহী জাহাজ মেরিনেরাকে ‘অপহরণ’ করে মার্কিন ফৌজ। ঠিক তার পরেই শুরু হল এই যুদ্ধাভ্যাস।
চার ‘মহারথী’র ‘উইল ফর পিস ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন সাউথ আফ্রিকার যৌথ টাস্ক ফোর্সের কমান্ডার ক্যাপ্টেন নন্দওয়াখুলু থমাস থামাহা। সেখানে তিনি বলেন, ‘‘এই নৌমহড়়া আর পাঁচটা সাধারণ যুদ্ধাভ্যাস নয়। এটা ব্রিকস প্লাস গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির সম্মিলিত সঙ্কল্পের একটা প্রদর্শন। ক্রমবর্ধমান জটিল সামুদ্রিক পরিবেশে এই ধরনের সহযোগিতার কোনও বিকল্প নেই, বরং এটা অপরিহার্য। ‘উইল ফর পিস’ সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নিশ্চিত করবে।’’
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মহড়ায় যোগ দিয়েছে চিন ও ইরানের ডেস্ট্রয়ার শ্রেণির রণতরী। অন্য দিকে কেপটাউনে করভেট শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে রাশিয়া। এ ছাড়া আছে সাউথ আফ্রিকার ফ্রিগেট। যুদ্ধাভ্যাসের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশগুলির নৌকমান্ডারদের বৈঠক করতেও দেখা গিয়েছে। সমাজমাধ্যমে সেই ছবি পোস্ট হতেই নড়েচড়ে বসেছেন দুনিয়ার তাবড় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা। তাঁদের দাবি, আগামী দিনে আটলান্টিকে ‘বড় কিছু’ হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। এর সলতে পাকানোর কাজটা এখন থেকেই শুরু করে দিয়েছে রাশিয়া ও চিন।
এ-হেন ‘উইল ফর পিস’কে গুরুত্ব দেওয়ার নেপথ্যে অবশ্য রয়েছে একাধিক কারণ। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের বড় অংশ মনে করেন, রুশ তেলবাহী জাহাজ মেরিনেরার ‘অপহরণ’-এর পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে যথেষ্ট আতঙ্কে রয়েছে ‘ব্রিকস’ গোষ্ঠীর অধিকাংশ দেশ। তাদের আশঙ্কা, আগামী দিনে আটলান্টিক মহাসাগরে হয়তো তাদের আর ঢুকতেই দেবে না আমেরিকা। তখন লাটিন (দক্ষিণ) আমেরিকা এবং পশ্চিম ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক লেনদেন চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। সেই ভয় থেকেই এককাট্টা হয়েছে মস্কো, বেজিং, তেহরান এবং কেপটাউন।
দ্বিতীয়ত, ক্ষমতায় আসার প্রথম দিন থেকেই ‘ব্রিকসের’ কর্মকাণ্ডকে দু’চক্ষে দেখতে পারেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক এক করে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রতিটা দেশকে নিশানা করেছেন তিনি। রাশিয়ার উপর আছে যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমি দুনিয়ার ১৬ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞা। চিনের সঙ্গে একপ্রস্ত শুল্কযুদ্ধ লড়ে নিয়েছেন ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস)। শিয়া ধর্মগুরুদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইরানের ক্ষমতা বদলের জন্য ক্রমাগত উস্কানি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া ‘ব্রিকসের’ অন্য সদস্যদের মধ্যে ব্রাজ়িলের প্রেসিডেন্ট লুইজ় ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা এবং সাউথ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার সরকারের পতনও চান ট্রাম্প। এই দুই দেশের কুর্সিতে নিজের পছন্দসই রাজনৈতিক ব্যক্তিকে বসানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। তাঁর শর্ত মেনে বাণিজ্যচুক্তিতে নয়াদিল্লি রাজি না হওয়ায় ভারতের উপরেও বিরক্ত ‘পোটাস’। আর তাই আগামী দিনে এ দেশের পণ্যে ওয়াশিংটন ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক চাপাবে বলে ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে।
গত ২ জানুয়ারি মধ্যরাতে (স্থানীয় সময় রাত ২টো নাগাদ) ভেনেজ়ুয়েলায় আক্রমণ শানায় মার্কিন ফৌজ। ওই সময় রাজধানী কারাকাসে ঢুকে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে যায় আমেরিকার ডেল্টা ফোর্স। এই সামরিক অভিযানের কোড নাম ছিল ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজ়লভ’ বা চরম সংকল্প। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের এই দুঃসাহসিক পদক্ষেপ ‘ব্রিকস’ গোষ্ঠীর রাষ্ট্রনেতাদের মনে আতঙ্ক তৈরি করেছে। এর জেরে নৌমহড়ার মাধ্যমে কাছাকাছি আসার চেষ্টা করেছেন তাঁরা।
২০২৫ সালের মে মাসে মার্কিন সফরে গিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন সাউথ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা। ওই সময়ে রাজধানী ওয়াশিংটনের ঐতিহ্যবাহী ‘শ্বেত প্রাসাদ’-এ (হোয়াইট হাউস) বৈঠক চলাকালীন নজিরবিহীন ভাবে তাঁকে অপমান করেন ‘পোটাস’। শুধু তা-ই নয়, কেপটাউনের বিরুদ্ধে শ্বেতাঙ্গদের উপর অত্যাচার করার অভিযোগও তোলে ওয়াশিংটন। বিশেষজ্ঞদের দাবি, তাঁর অবস্থাও যে মাদুরোর মতো হতে পারে তা ভালই জানেন রামাফোসা। তাই মহড়ার মাধ্যমে ‘বন্ধু’ খোঁজার কাজটা সেরে রাখছেন তিনি।
গত বছরের নভেম্বরে কেপটাউনের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট নৌমহড়া হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, ওই সময়ে জ়োহানেসবার্গে জি২০-ভুক্ত দেশগুলির রাষ্ট্রনেতাদের বৈঠক থাকায় ‘উইল ফর পিস’-এর মতো যুদ্ধাভ্যাস স্থগিত রাখেন রামাফোসা। তাতেও অবশ্য ট্রাম্পের মন গলেনি। শ্বেতাঙ্গ নির্যাতনের কথা বলে ওই অনুষ্ঠান এড়িয়ে যান তিনি। এর পর নৌমহড়ার আয়োজন করতে আর দেরি করেনি সাউথ আফ্রিকা। এতে পর্যবেক্ষক হিসাবে যোগ দিয়েছে ইথিয়োপিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ব্রাজ়িল।
সাবেক সেনাকর্তাদের কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন, এই সামরিক মহড়ার কোনও বাড়তি গুরুত্ব নেই। কারণ, ‘ব্রিকস প্লাস’-এর এই দেশগুলি মোটেই আটলান্টিকে মার্কিন নৌসেনাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর শক্তিসম্পন্ন নয়। তা ছাড়া মস্কো, বেজিং, তেহরানের আলাদা সমস্যা আছে। সে সব কাটিয়ে ওয়াশিংটনের মতো ‘সুপার পাওয়ার’-এর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাতে যাওয়া তাদের পক্ষে বেশ কঠিন।
উদাহরণ হিসাবে রাশিয়ার কথা বলা যেতে পারে। গত প্রায় চার বছর ধরে ইউক্রেনের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে মস্কো। তার পরেও কিভের পতন ঘটাতে পারেনি ক্রেমলিন। এই অবস্থায় আমেরিকার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে ‘আত্মহত্যার’ শামিল। সেই বাড়তি ঝুঁকি অবশ্যই নিতে চাইবেন না তিনি। কারণ, তখন পশ্চিমি শক্তি একযোগে ক্রেমলিনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। তখন মস্কোর পক্ষে ‘প্রাণ বাঁচানো’ যে কঠিন হবে, তা বলাই বাহুল্য।
তা ছাড়া গত কয়েক বছরে একের পর এক ‘বন্ধু’ হারিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কার্যত একা হয়ে পড়েছে রাশিয়া। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় ক্ষমতাচ্যুত হন বাশার আল-আসাদ। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ভেনেজ়ুয়েলায় ঢুকে সেখানকার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে তুলে এনেছে মার্কিন ফৌজ। দু’টি জায়গাতেই নিজেদের তাঁবেদার সরকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে আমেরিকা, ক্রেমলিনের কাছে যা একেবারেই স্বস্তিজনক নয়।
অন্য দিকে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জেরে প্রায় কোমায় চলে গিয়েছে ইরানের অর্থনীতি। এর জেরে গণবিক্ষোভের আগুনে পুড়ছে সাবেক পারস্য দেশ। পরিস্থিতি অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণে না এলে ক্ষমতা হারাতে পারেন তেহরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা ‘সুপ্রিম লিডার’ আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। সে ক্ষেত্রে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ওই উপসাগরীয় রাষ্ট্রেও নিজেদের পছন্দসই সরকার গঠন করতে পারে আমেরিকা।
সংখ্যার নিরিখে বিশ্বের সবচেয়ে বড় নৌবহর আছে চিনের কাছে। অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্তারা মনে করেন, তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানোর সাহস নেই বেজিঙের। ড্রাগনভূমির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের মূল মাথাব্যথা প্রশান্ত মহাসাগরের সাবেক ফরমোজ়া বা তাইওয়ানকে (রিপাবলিক অফ চায়না) নিয়ে। এই এলাকাকে চিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করেন তিনি। আর তাই দীর্ঘ দিন ধরেই সংশ্লিষ্ট দ্বীপটিকে কব্জা করার ছক কষছেন তিনি।
এ-হেন ‘আগ্রাসী’ চিনের হাত থেকে তাইওয়ানকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে আমেরিকা। এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের থেকে কয়েক কোটি ডলারের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র পাওয়ার কথা আছে সাবেক ফরমোজ়া দ্বীপের। বিশেষজ্ঞদের দাবি, সেই কারণেই আটলান্টিকের লড়াইয়ে নাক গলাতে নিমরাজি বেজিং। বরং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে চাইছে ড্রাগনের ‘পিপলস লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ-র নৌবাহিনী।
‘ব্রিকস’-এর সদস্য হয়েও কোনও সামরিক জোটে যাওয়ার ব্যাপারে আপত্তি আছে ভারতের। ট্রাম্প জমানায় শুল্কসংঘাত থাকলেও আমেরিকার সঙ্গে এখনও সম্পর্ক খারাপ করেনি নয়াদিল্লি। উল্টে জোট নিরপেক্ষ ভাব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। আর তাই আমন্ত্রণ সত্ত্বেও কেপটাউনের সামরিক মহড়ায় যোগ দেয়নি এ দেশের নৌবাহিনী।
২০১০ সালে তৈরি হওয়া ‘ব্রিকস’ গোষ্ঠীর অন্যতম লক্ষ্য হল যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমি দুনিয়াকে সরিয়ে রেখে একটা বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ডলারভিত্তিক অর্থনীতির গোড়ায় কুড়ুল মারতে এই গোষ্ঠীর একটি পৃথক মুদ্রা তৈরির প্রস্তাবও দিয়েছেন পুতিন। যদিও সেটা এখনও বাস্তবের মুখ দেখেনি। তবে ট্রাম্পের ‘দাপাদাপি’ আরও বাড়লে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই তাঁর বিরুদ্ধে ফ্রন্ট খুলতে পারে রাশিয়া, চিন ও ইরান। সেই জায়গা থেকে এই ধরনের নৌমহড়ার যে বাড়তি গুরুত্ব আছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
সব ছবি: সংগৃহীত।