নতুন বছরের প্রথম দিনেই মুক্তি পেয়েছে ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’-এর অন্তিম পর্ব। ১০ বছর ধরে চলা জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ়টি শেষ হওয়ায় ভক্তদের মধ্যে মনখারাপের অন্ত নেই। সিরিজ়টি নতুন করে আসবে কি না বা ইলেভেন, মাইক, ডাস্টিন, লুকাস, উইলদের পর্দায় আবার দেখা যাবে কি না, তা খোলসা করেননি নির্মাতারাও।
১ জানুয়ারি ভোরবেলা ভারতে মুক্তি পেয়েছে ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’-এর পঞ্চম সিজ়নের ৮ নম্বর পর্ব। সেটিই ছিল সিরিজ়ের শেষ পর্ব। এই পর্বেই সব রহস্যের সমাধান হয়েছে। কী ভাবে ভেকনা এবং মাইন্ড ফ্লেয়ারকে হারিয়ে হকিন্স-সহ সমগ্র পৃথিবীকে রক্ষা করল এল, মাইকেরা— সেই গল্পই উঠে এসেছে। ১০ বছর ধরে দর্শকের মনে তৈরি হওয়া একাধিক প্রশ্নেরও উত্তর মিলেছে।
‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’ ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সের ওয়েব সিরিজ়। শুধু তা-ই নয়, নেটফ্লিক্সের সবচেয়ে বড় শো সেটি। প্রায় এক দশক ধরে চলা এই ‘সায়েন্স ফিকশন’ সিরিজ়টি এখন বিশ্বের সবচেয়ে চর্চিত ওয়েব সিরিজ়।
‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’-এর পঞ্চম সিজ়নের প্রথম খণ্ডের পর্বগুলিই ১২০ কোটিরও বেশি বার দেখা হয়েছে বিশ্ব জুড়ে। সামগ্রিক ভাবে নেটফ্লিক্স দেখা যায় এমন ৯৩টি স্ট্রিমিং দেশের মধ্যে ৯০টিতে ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’-এর শেষ সিজ়নটি সপ্তাহের সর্বাধিক দেখা সিরিজ় হিসাবে স্থান পেয়েছে।
‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’-এর পাঁচ নম্বর সিজ়নের অন্তিম পর্ব মুক্তির পর সমাজমাধ্যমেও সিরিজ়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পর দর্শকদের মধ্যে সিরিজ়টি নিয়ে আগ্রহও বেড়েছে। বিশেষ কিছু সিরিজ় নিয়েও হইচই রয়েছে। ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’-এর আগে দর্শকের মধ্যে এই উত্তেজনা ছিল ‘গেম অফ থ্রোনস’ নিয়ে।
তবে কিছু বিশেষ কারণে অনন্য ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’। ২০১৬ থেকে শুরু হওয়া সিরিজ়র পাঁচটি সিজ়ন তৈরি করতে নেটফ্লিক্সের খরচ হয়েছে ৩.৫-৪.৫ হাজার কোটি।
কিন্তু এই শো নাকি আমেরিকার অর্থনীতিতে অবদান রেখেছে ১৪০ কোটি ডলারের। অর্থাৎ, ভারতীয় মুদ্রায় সেই অঙ্ক ১২ হাজার কোটিরও বেশি।
২০১৬ সাল থেকে আমেরিকায় আট হাজারের বেশি কর্মসংস্থানও তৈরি করেছে সিরিজ়টি! অন্তত তেমন তথ্যই উঠে এসেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে।
ভারতে নেটফ্লিক্সে ন্যূনতম ১৯৯ টাকা দিলেই এই শো দেখা যায়। তা হলে এত টাকা কী ভাবে আয় করল সিরিজ়টি? জানা গিয়েছে, ওয়েব সিরিজ়টি দেখার জন্য দর্শকদের সাবস্ক্রিপশন থেকেই এ বার সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আয় করেছে নেটফ্লিক্স।
শুধু সাবস্ক্রিপশন নয়, আয় হয়েছে আরও অনেকে উপায়ে। সিরিজ়টির জনপ্রিয়তা দেখে নির্মাতারা সিরিজ়ের নামে জামাকাপড়, খেলনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকম ‘মার্চেন্ডাইজ় গুডস’ বাজারে এনেছিল। সেগুলি বিক্রিও হয়েছে ঝড়ের গতিতে। মোটা টাকা ঢুকেছে নেটফ্লিক্সের পকেটে।
শুধু ‘মার্চেন্ডাইজ় গুডস’ই নয়, সিরিজ়টির নামে ভিডিয়ো গেমও বার করেছিল নেটফ্লিক্স। সেই গেম বিক্রি করেও উপার্জন হয়েছে নির্মাতাদের।
এ ছাড়াও সিরিজ়টির জন্য আমেরিকায় ‘এগোস’ নামে একটি খাবারের জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়েছে। সিরিজ়ের প্রধান চরিত্র ইলেভেনের প্রিয় খাবার ছিল এই ‘এগোস’।
‘এগোস’ আসলে একটি হিমায়িত ওয়াফেল। সেটি গরম করে খেতে হয়। অনুষ্ঠানটির হঠাৎ জনপ্রিয়তার পর মূল সংস্থা ‘কেলোগস’ ২০১৭ সালের চতুর্থ ত্রৈমাসিকে ‘এগোস’-এর বিক্রি ১৪ শতাংশ বৃদ্ধির কথা জানিয়েছিল, যা ২০২০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এখনও সেই খাবারের জনপ্রিয়তা আমেরিকায় কমেনি।
পাশাপাশি, সিরিজ়ে প্রধান চরিত্র মাইক, উইল, ডাস্টিন এবং লুকাসদের জনপ্রিয় খেলা ‘ডাঞ্জিয়ন্স অ্যান্ড ড্রাগনস’ নামে বোর্ড গেমের প্রতিও দর্শকের আগ্রহ ৬৭৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সিরিজ়টির অন্তিম সিজ়ন প্রকাশের আগে ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’-এর থিমযুক্ত ‘চিপস আহয়’ নামে একটি কুকি বাজারে এনেছিল নাবিস্কো। সিরিজ়ে জনপ্রিয় এই খাবারের বিক্রিও হু হু করে বৃদ্ধি পেয়েছে আমেরিকায়।
চলতি বছরে আমেরিকার জর্জিয়ার পর্যটনশিল্প ফুলেফেঁপে উঠেছে। তার নেপথ্যেও রয়েছে ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’। কারণ, নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় শোটির শুটিং হয়েছে সেই শহরেই, জর্জিয়ার জিডিপিতে যার অবদান প্রায় ছ’হাজার কোটি ডলার।
পাশাপাশি, ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনীতিতেও প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটির অবদান স্ট্রেঞ্জার থিংসের। শোয়ের জন্য জনপ্রিয় জিনিসপত্র তৈরি, বিক্রি, পর্যটনের জন্য বহু মানুষের কর্মসংস্থানও করেছে ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’। হিসাব বলছে সেই সংখ্যা প্রায় আট হাজার।
মজার বিষয় হল, প্রায় চার দশক আগে মুক্তি পাওয়া ‘রানিং আপ দ্যাট হিল’ গানটি নেটফ্লিক্সের এই অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হওয়ায় সেটি আমেরিকার সেরা ১০টি হিট গানের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। চার নম্বর সিজ়নে ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হয়েছে গানটি। সিরিজ়ে ভেকনার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ম্যাক্সকে এই গান শোনাত লুকাস।
২০২৫ সালের শেষের দিকে ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’-এর পঞ্চম সিজ়ন ওটিটি পর্দায় মুক্তি পাওয়ার পর তার প্রভাব নেটফ্লিক্সের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। অনলাইনে গান শোনার প্ল্যাটফর্ম ‘স্পটিফাই’য়ের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিরিজটি মুক্তি পাওয়ার পর সিরিজ়ে ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি গানের জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়েছে।
সেই গানগুলির মধ্যে রয়েছে ডায়ানা রসের ‘আপসাইড ডাউন’ (১৯৮০) এবং টিফানির ‘আই থিঙ্ক উই’র অ্যালোন নাউ’ (১৯৮৭)। সংস্থাটি জানিয়েছে গান দু’টির স্ট্রিমিং বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ১,২৫০ শতাংশ এবং ৮৮০ শতাংশ। একই ভাবে, ‘মিস্টার স্যান্ডম্যান’ এবং ‘ফার্নান্দো’ নামে দু’টি পুরোনো গানও আবার চর্চায় উঠে এসেছে সিরিজ়টির দৌলতে।
সব ছবি: সংগৃহীত।