পশ্চিম এশিয়ায় ঘনাচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ। জন্মলগ্নের ‘বন্ধু’ই আজ তেলের সম্পদ হাতাতে ঘিরে ধরছে সাবেক পারস্যভূমিকে। গত দু’সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে গোঁড়া ধর্মীয় শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ চলছে ইরানে। এই সুবর্ণসুযোগ হাতছাড়া করতে চাইছে না আমেরিকা। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের প্রশাসনকে উৎখাত করার ‘নীলনকশা’ ছকে ফেলেছে ওয়াশিংটন।
ইরানের নির্বাসিত যুবরাজ রেজ়া পহলভীকে দেশে ফিরিয়ে আনার তোড়জোড় শুরু করেছেন খামেনেই-বিরোধীরা। ইরানে গণপ্রতিবাদে রাস্তায় নামেন হাজার হাজার মানুষ। পাহলভির মসনদে ফেরা নিয়ে মুখ না খুললেও লাগাতার খামেনেই সরকারের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়ে চলেছেন মার্কিন প্রেসিডন্ট ট্রাম্প। খামেনেই-বিরোধী বিক্ষোভে প্রকাশ্যে সমর্থন জুগিয়েছেন তিনি। ইরানে গণবিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা নিয়েও উষ্মা প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। নিন্দকদের মতে, সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ওই উপসাগরীয় রাষ্ট্রেও নিজেদের পছন্দসই ক্রীড়নককে বসিয়ে সরকার গঠন করতে পারে আমেরিকা।
ইরানের পরমাণু কার্যক্রম নিয়েও আমেরিকা তাদের আপত্তি জানিয়ে আসছে বহু দিন ধরে। ট্রাম্প সরকার নরমে-গরমে তেহরানকে চাপ দিচ্ছে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের জন্য। ইরানে পরিস্থিতি অশান্ত হতেই আমেরিকার রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনও পৌঁছে গিয়েছে পশ্চিম এশিয়া লাগোয়া সমুদ্রে। রণতরী নিয়ে ইরানের দিকে এগোনোর সংবাদ শুনে চুপ করে বসে থাকেনি তেহরানও।
পাল্টা বিবৃতি দিয়ে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরঘচি জানিয়েছেন, ছোট-ব়ড় যে হামলাই হোক না কেন, হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না ইরানি সেনা। বন্দুকের ট্রিগারে আঙুল রেখে তারা তৈরি বলে আমেরিকার নাম না করেই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে তেহরান। এর দিন কয়েক আগেই একটি বড় নৌবহর পশ্চিম এশিয়ায় পাঠানোর কথা ঘোষণা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সেইমতো রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনও টহলদারির কাজ শুরু করে দিয়েছে।
১৯৭৯ সালে ‘ইসলামীয় বিপ্লব’-এর আগে পর্যন্ত ইরান-আমেরিকার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত মধুর। তেহরানের তৎকালীন শাহ মহম্মদ রেজ়া পহলভী ছিলেন পশ্চিমি সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক। তাঁকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন কট্টরপন্থী শিয়া ধর্মগুরু আয়াতোল্লা রুহুল্লা খোমেইনি। এর পর থেকেই সাবেক পারস্য দেশটির সঙ্গে চরম শত্রুতা শুরু হয় আমেরিকার। গত বছর ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের বিরুদ্ধে আমেরিকা সরাসরি হামলা চালিয়েছিল।
৯০-এর দশকের শেষের দিকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া শুরু করে ইরান। তেহরানের দাবি ছিল, পরমাণু বিদ্যুৎ তৈরির লক্ষ্যেই এই কাজ। পড়শি দেশগুলি, বিশেষ করে ইজ়রায়েলের অভিযোগ ছিল, আণবিক অস্ত্রভান্ডার তৈরির লক্ষ্য রয়েছে তেহরানের পরমাণু বিজ্ঞানীদের। পরে সেই দাবিতে সিলমোহর দেয় রাষ্ট্রপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণাধীন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএও। আন্তর্জাতিক মঞ্চে হইচই হওয়ার পর ন়ড়েচড়ে বসে আমেরিকা।
পরিস্থিতি যে দিকে এগোতে শুরু করেছে, তাতে সম্ভাব্য যুদ্ধের আশঙ্কার কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে সমরকৌশল বিশেষজ্ঞদের মনে। কারণ সূত্রের খবর, ইরান প্রস্তুত হচ্ছে যুদ্ধের জন্যই। সে দেশের এক আধিকারিকের কথায় অন্তত তেমনটাই আভাস। যে কোনও হামলা, তা সে লঘু বা গুরু যা-ই হোক না কেন, অনিয়ন্ত্রিত হোক বা সার্জিক্যাল, সম্পূর্ণ যুদ্ধ হিসাবেই বিবেচনা করবে তেহরান।
এই ঘোষণার পর থেকে ইরানের সামরিক শক্তির সঙ্গে আমেরিকার ফৌজের তুল্যমূল্য বিচারের চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। ট্রাম্প এবং খামেইনির শক্তি মুখোমুখি হলে জিতবে কে?
আমেরিকার হাতে আছে বিশ্বের সর্বাধিক উন্নত সামরিক বাহিনী। রণসজ্জায় প্রযুক্তিগত ভাবে আমেরিকা বিশ্বের পয়লা নম্বরে। অন্য দিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের ভান্ডার কিছু কম নয়। প্রক্সি নেটওয়ার্ক ব্যবহারেও ইরানের জুড়ি মেলা ভার। মার্কিন হামলা হলে ইরান মদতপুষ্ট সশস্ত্রগোষ্ঠীরা (হামাস, হিজ়বুল্লা, হুথি) চুপ করে বসে থাকবে না। সংগঠনগুলির অস্ত্র, অর্থ, গোপন তথ্য এবং সামরিক প্রশিক্ষণের সহায়তা পেতে পারে খামেনেই সরকার।
দু’দশক আগে ২০০৫ সাল থেকে বিশ্বের তাবড় শক্তিশালী দেশগুলির ফৌজিশক্তি সংক্রান্ত তালিকা তৈরি করে ‘গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স’। শুরুর দিন থেকেই সেখানে ‘ফার্স্ট বয়ের’ তকমা ধরে রেখেছে আমেরিকা। এ বারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে সমীক্ষক সংস্থা জানিয়েছে, আমেরিকার হাতে রয়েছে ২১ লক্ষ ২৭ হাজার ৫০০ সৈনিক। দেশের বাইরে অন্তত ১০০টি সেনাঘাঁটি তৈরি করে রেখেছে ওয়াশিংটন। সেখান থেকে বিশ্বের যে কোনও জায়গায় আক্রমণ শানানোর ক্ষমতা রয়েছে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের পারের ‘সুপার পাওয়ারের’।
গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইনডেক্সের সাম্প্রতিকতম তথ্য অনুসারে ১৪৫টি দেশের সামরিক শক্তির নিরিখে ইরানের স্থান ষোড়শ। তেহরানের ফৌজিশক্তি ১১ লক্ষ ৮০ হাজার। এ ছা়ড়াও আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ইরানের সুদক্ষ আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। দূরপাল্লার ব্যালেস্টিক এবং হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের বহর নিয়ন্ত্রণ করেন এর ফৌজি জেনারেলরা।
আমেরিকার সংবাদমাধ্যম ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের ইসলামিক আইআরজিসি পশ্চিম এশিয়ার সবচেয়ে বড় সৈন্যবাহিনী, যাতে রয়েছে ৫ লক্ষ ৮০ হাজার সৈনিক। এ ছাড়াও দু’লক্ষ রিজার্ভ বাহিনী রয়েছে তেহরানের হাতে। খামেনেইয়ের নির্দেশে দেশ ও জাতির স্বার্থে যে কোনও রকমের ঝুঁকি নিতে সর্বদা প্রস্তুত থাকেন তাঁরা।
২০২৫ সালে প্রতিরক্ষা খাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বরাদ্দ বাড়িয়ে ৮৯ হাজার ৫০০ কোটি ডলার খরচ করেছে। ২০২৩-’২৪ অর্থবর্ষে তা ছিল ৭৫ হাজার কোটি ডলার। তালিকার প্রথম পাঁচে থাকা দেশগুলির মোট প্রতিরক্ষা বরাদ্দের মধ্যে আমেরিকা একাই ৬২.৩ শতাংশ ব্যয় করে থাকে। এই পরিমাণ খরচের ধারেপাশে কোনও দেশই পৌঁছোতে পারেনি। ইরানের অবস্থান শত যোজন দূরে। সমীক্ষা অনুসারে ৩৬তম স্থানে রয়েছে পারস্য উপসাগরের কোলঘেঁষা দেশটি। প্রতিরক্ষা বাজেটে ৯ হাজার ২০০ কোটি ডলার ধার্য করেছে সাবেক পারস্য দেশ।
বর্তমানে ১৩ হাজার ৪৩টি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করছে আমেরিকান বায়ুসেনা। এর মধ্যে বোমারু বিমান ও লড়াকু জেটের সংখ্যা ১,৭৯০। আর ইরানের কাছে মোট সামরিক বিমান রয়েছে ৫৫১টি। যুদ্ধবিমান রয়েছে ১১৬টি। পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ ফাইটার জেটও রয়েছে পেন্টাগনের বায়ুসেনার হাতে। ইরানের কাছে রয়েছে ১২৯টি হেলিকপ্টার। এর মধ্যে মাত্র ১৩টি হামলার কাজে ব্যবহার করে তেহরান। যুদ্ধ বিশেষজ্ঞদের মতে সেগুলি বেশ পুরনো। যুদ্ধ বাধলে আমেরিকার বায়ুসেনার বিরুদ্ধে এগুলি কত ক্ষণ টিকতে পারবে তা নিয়ে সন্দিহান তাঁরা।
তবে আমেরিকাকে ইরানের মতো ক্ষুদ্র দেশও ঘোল খাইয়ে ছেড়েছিল। ১৯৭৯ সালে পণবন্দিদের তেহরান থেকে বার করে আনার জন্য ‘অপারেশন ইগল ক্ল’ নামের একটি সামরিক অভিযান চালায় আমেরিকা। সেই অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল। অভিযানের জন্য পাঠানো আটটি হেলিকপ্টারের মধ্যে দু’টিতে ত্রুটি ধরা পড়ে এলাকায় পৌঁছোনোর আগেই। অন্য একটি ঘটনাস্থলেই বিকল হয়ে পড়ে। অবশিষ্ট হেলিকপ্টারগুলির মধ্যে একটির সংঘর্ষ হয় বিমানের সঙ্গে। এতে আট জন মার্কিন সেনা নিহত হন।
ইরানের হাতে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ়, দু’ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রই রয়েছে। ৫৫১টি ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত ইরানের ভান্ডার। তবে সব ক’টিই মাঝারি ও কম পাল্লার। সেই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সুপার পাওয়ার শত্রু সংহার কতটা সম্ভব তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। অন্য দিকে আমেরিকার হাতে রয়েছে বিশ্বের উন্নত সমস্ত ক্ষেপণাস্ত্র। আমেরিকার অস্ত্রভান্ডারে নানা ধরনের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে।
পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের ঠিক মাঝের অংশটিই হরমুজ় প্রণালী। বিশ্ববাণিজ্যে এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সারা বিশ্বের বাণিজ্যিক তেল ও গ্যাসের পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ় প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে। সামুদ্রিক রাস্তা দিয়ে প্রতি দিন ৩৩০ কোটি লিটার অপরিশোধিত তেল পরিবহণ করে পণ্যবাহী জাহাজে। আর তাই জলপথে সব সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণ চায় আমেরিকা। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিবাদের সূত্রপাত এখানেই।
সম্মুখসমরের পরিস্থিতি তৈরি হলে পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীকে বেগ দিতে পারে শিয়া ফৌজ। মার্কিন নৌবাহিনীর নেভি সিল (সমুদ্র, বায়ু ও ভূমি এই তিন পরিবেশেই অত্যন্ত সুকৌশলে যুদ্ধ অভিযানে পারদর্শী) ইরানের অনন্য নৌ-কৌশলের মুখোমুখি হবে। সিলের অভিজ্ঞ বাহিনী সামুদ্রিক অভিযানে পারঙ্গম হলেও ইরান স্পিডবোট এবং সামুদ্রিক মাইন ব্যবহার করে তাদের নাস্তানাবুদ করতে পারে, বিশেষ করে সঙ্কীর্ণ হরমুজ়ে।
২০২৫ সালে ইরানের পরমাণুকেন্দ্রগুলিতে বোমাবর্ষণ করে মার্কিন বিমানবাহিনী। সেই অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্পিরিট বোমারু বিমানকে আটকাতে পারেনি তেহরান। পাল্টা পশ্চিম এশিয়ায় থাকা আমেরিকার বেশ কয়েকটি ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল শিয়া ফৌজ। সেগুলিকে অবশ্য মাঝ-আকাশেই ধ্বংস করে ওয়াশিংটনের এয়ার ডিফেন্স।
আমেরিকা হামলা করলে ইরান একক বলে এঁটে উঠতে না পারলে ইসলামীয় দেশগুলির সমর্থন পেতে চাইবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞেরা। শিয়া মনোভাবাপন্ন মুসলিম দেশগুলিকে কাছে টেনে জোট করার চেষ্টা করতে পারে শিয়ামুলুক। তবে শেষ পর্যন্ত তেহরান তা জোগাড় করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান তাঁরা।
সব ছবি: সংগৃহীত।