সম্রাটের অনুমতি ছাড়া এই প্রাসাদে সাধারণ মানুষ বা প্রজা তো দূর অস্ত, কোনও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারও প্রবেশের অধিকার ছিল না। নিয়ম লঙ্ঘন করে অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা করার শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এই কঠোর গোপনীয়তার কারণেই এর নাম হয় ‘ফরবিডেন সিটি’ বা ‘নিষিদ্ধ নগরী’।
রাজধানীর অন্দরেই আরও একটি নগরী। ইগলের চোখে নিষিদ্ধ নগরীটি যেন একটি নিখুঁত জ্যামিতিক নকশা, স্বয়ংসম্পূর্ণ এক দুর্গ-শহরের মতো। মান্দারিনভাষীদের দেশেই রয়েছে এই গোপন নগর। চিনের রাজধানী বেজিঙের কেন্দ্রস্থলে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন এই নগরী।
প্রাচীর এবং জলবেষ্টিত নিষিদ্ধ নগরীর নকশাটি উপর উপর দেখলে মনে হবে সুশৃঙ্খল, পরিমিতিবোধের ছাপ সুস্পষ্ট। তবে ভাল ভাবে খুঁটিয়ে লক্ষ করলে বোঝা যাবে আদতে এর গঠনশৈলী বেশ জটিল। বিশাল পরিসরের মধ্যে ক্ষমতা, পারিবারিক জীবন, আচার-অনুষ্ঠান এবং শাসনব্যবস্থাকে সংগঠিত করার জন্য পরিকল্পিত হয়েছিল এটি।
‘ফরবিডেন সিটি’ কেবল রাজপ্রাসাদ ছিল না, এটি ছিল একটি ছোটখাটো শহর। সম্রাটের পরিবার, উপপত্নী, মন্ত্রী, রাজবৈদ্য, সৈন্য এবং পরিচারক মিলিয়ে একসময় এই প্রাচীরের ভিতর হাজার হাজার মানুষ বসবাস করতেন। এর ভিতরে নিজস্ব রান্নাঘর, কাপড়ের কারখানা, গ্রন্থাগার, থিয়েটার, উপাসনালয় এবং বিশাল উদ্যান ছিল। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগ না করেই দিন কাটত এখানকার বাসিন্দাদের।
এটি বিশ্বের বৃহত্তম প্রাসাদ চত্বর, যা ৭৭.৫ লক্ষ বর্গফুটেরও (৭ লক্ষ ২০ হাজার বর্গমিটার) বেশি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। প্রাসাদটিকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে ৫২ মিটার চওড়া এবং ৬ মিটার গভীর একটি কৃত্রিম নদী বা পরিখা। রাজকীয় নিরাপত্তার প্রথম স্তর এটি।
প্রবেশপথগুলি পাহারা দেওয়ার জন্য ছিল তোরণ-মিনার। ছিল একটি ৩৩ ফুট উঁচু (১০ মিটার) প্রাচীরও। নগরকে বেষ্টন করে থাকা সেই প্রাচীর এতই চওড়া যে এর উপর দিয়ে একসঙ্গে কয়েকটি ঘোড়া যাতায়াত করতে পারত।
পুরো বেজিং শহরটিই এই নিষিদ্ধ নগরীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শহরের উত্তর-দক্ষিণ অক্ষ। প্রধান প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে সম্রাটের বসার সিংহাসন— সব কিছু এই অক্ষ বরাবর নিখুঁত সমান্তরালে অবস্থিত ছিল।
নগরীটিকে দু’টি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। সামনের অংশ ছিল রাষ্ট্রীয় কাজকর্ম ও রাজকীয় জাঁকজমকের জন্য। আর পিছনের অংশ সম্রাটের একান্ত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের জন্য নির্ধারিত ছিল। যদিও গত কয়েক শতাব্দী এই নিষিদ্ধ নগরীতে প্রবেশাধিকার সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই নিষিদ্ধ নগরীর জন্ম কোনও শান্ত বা স্বাভাবিক সময়ে হয়নি। বরং এর পিছনে রয়েছে মিং রাজবংশের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী এবং নাটকীয় এক সিংহাসন দখলের যুদ্ধ। ৬০০ বছর আগে তৈরি হওয়া নিষিদ্ধ নগরীর উৎপত্তি মিং রাজবংশের অন্যতম উত্তাল একটি অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িত। পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরুতে, ক্ষমতার এক দ্বন্দ্ব সাম্রাজ্যবাদী চিনের গতিপথ নতুন করে নির্ধারণ করে দেয়।
মিং রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট হংউ মোঙ্গলদের তাড়িয়ে যখন চিনের ক্ষমতা দখল করেন, তখন সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল নানজিং শহর। বড় ছেলের অকালপ্রয়াণের কারণে নাতি জিয়ানওয়েনকে পরবর্তী সম্রাট ঘোষণা করে যান তিনি। তাতে খুশি হননি জিয়ানওয়েনের কাকা ঝু দি। সম্মুখসমরে নেমে পর্যুদস্ত করেন ভাইপো জিয়ানওয়েনকে।
১৪০২ সালে ঝু দি’র সেনাবাহিনী রাজধানী নানজিং দখল করে নেয়। রাজপ্রাসাদে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঝু দি নিজেকে মিং রাজবংশের নতুন সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেন এবং নতুন নাম নেন সম্রাট ইয়ংলি। ক্ষমতাকে সুরক্ষিত করতে এবং নিজের শক্তির ঘাঁটিতে ফিরে যেতে, ১৪০৬ সালে সম্রাট ইয়ংলি রাজধানী নানজিং থেকে বেজিঙে স্থানান্তরের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন।
অপার ক্ষমতার অধিকারী, বৈধ সম্রাট এবং স্বর্গের সন্তান হিসাবে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য সম্রাট ইয়ংলি এমন এক প্রাসাদের পরিকল্পনা করেন যা পৃথিবীর কেউ কখনও চাক্ষুষ করেননি।
নিষিদ্ধ নগরীর বিশাল প্রাচীর আর দুর্ভেদ্য ফটকের ওপারে যে জীবন চলত, তা ছিল সাধারণ মানুষের কল্পনার অতীত এক মায়াবী, জটিল এবং অত্যন্ত কঠোর নিয়মে বাঁধা জগৎ। সেখানে যেমন ছিল অপরিসীম বিলাসিতা, তেমনই প্রতি পদে ছিল নির্মমতা, একাকিত্ব আর মৃত্যুর ভয়। সম্রাটকে প্রতি দিন ভোর ৪টে বা তারও আগে ঘুম থেকে উঠতে হত। এর পর স্নান ও ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করে ঠিক ভোর ৫টায় শুরু হত রাজকীয় সভা।
কেন্দ্রীয় অক্ষ বরাবর বেশ কয়েকটি প্রধান প্রাসাদ ছিল। একটি ছিল সম্রাটের, অন্যটি সম্রাজ্ঞীর এবং তাদের মাঝখানে অবস্থিত একটি ছোট কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলি অনুষ্ঠিত হত। এই নগরীর ছাদে, দেওয়ালে ও বিভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত ফিনিক্স, ড্রাগন ও অন্যান্য পৌরাণিক জীবজন্তুর প্রতিকৃতি বা ভাস্কর্যের ব্যবহার নিয়েও রহস্য রয়েছে।
প্রাসাদের পিছনের অংশ বা ‘ইনার কোর্ট’-এ বাস করতেন সম্রাটের শত শত উপপত্নী। তাদের জীবন ছিল একাধারে চরম বিলাসবহুল এবং অত্যন্ত করুণ। সম্রাটের পরিবার ছাড়া অন্য কোনও পুরুষের রাতে প্রাসাদে থাকার অধিকার ছিল না। বাইরে থেকে সম্রাটকে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মানুষ মনে হলেও, ভিতরে তিনি কার্যত বন্দিজীবনই কাটাতেন।
সম্রাটকে ‘স্বর্গের সন্তান’ বলে মনে করার কারণে সমমর্যাদার কেউ না থাকায় সম্রাটের কোনও বন্ধু থাকতেন না। এমনকি মা বা রানির সঙ্গে দেখা করার জন্যও বিশেষ নিয়ম ও সময় মেনে চলতে হত। ফলে, এক বিশাল প্রাসাদে হাজার হাজার মানুষের মাঝেও সম্রাট চরম একাকিত্বে ভুগতেন।
৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে বাস করেছে চিনের রাজপরিবার। নগরীর আনাচকানাচে ঘুরে বেড়ায় অজস্র রহস্যকাহিনি। গুঞ্জন রয়েছে অশুভ শক্তি দূর করার জন্য প্রতি বছর ছ’লক্ষ টন শূকরের রক্ত ব্যবহার করা হত এই নগরীতে। প্রাসাদের এক কোণে ‘উপপত্নী ঝেন কূপ’ নামে একটি ছোট কুয়ো ছিল। ১৯০০ সালে সম্রাজ্ঞী সিজির আদেশে উপপত্নী ঝেন-কে সেই কুয়োতে ফেলে হত্যা করা হয়েছিল।
নিষিদ্ধ নগরীর এই আবাসিক চত্বরগুলি বাইরে থেকে দেখতে যতই সুশৃঙ্খল আর পরিমিত মনে হোক না কেন, এর ভিতরের দেওয়ালগুলি সাক্ষী ছিল হাজার নারীর দীর্ঘশ্বাস, ক্ষমতার লোভ, হিংসা আর কঠোর নিয়মের বেড়াজালে বন্দি এক জীবনের। প্রাচীনকালের সেই নিষিদ্ধ শহরটি এখন ‘দ্য প্যালেস মিউজ়িয়াম’।
প্রতি দিন হাজার হাজার পর্যটক চিনা রাজপরিবারের জীবনযাত্রা দেখতে আসেন এখানে। এর প্রায় ৮০ শতাংশ অংশ জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হলেও, বাকি ২০ শতাংশ এখনও সাধারণ মানুষের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
সব ছবি: সংগৃহীত।