কৃত্রিম মেধা এবং সেমিকন্ডাক্টর চিপের শিল্পের মতো ক্ষেত্রগুলির উপর ভর করে টালমাটাল পরিস্থিতিতেও নিজেদের দেশের শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রণ হারায়নি দক্ষিণ কোরিয়া (রিপাবলিক অফ কোরিয়া) ও তাইওয়ানের মতো দেশ। বাজারে ছাড়া শেয়ারের মোট মূল্যের (মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন) নিরিখেও ভারতকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছে এই দু’টি দেশ।
বিশ্ব জুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির চাহিদা বাড়ার ফলে চিপনির্মাতা সংস্থাগুলির শেয়ারের দাম দ্রুত বেড়েছে। এর জেরে দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারও বড় ধরনের উত্থান দেখেছে। এই উত্থানের কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারমূল্য বেড়ে গিয়ে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম শেয়ারবাজার হিসাবে ভারতকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার মোট বাজার মূলধন ৮৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫ লক্ষ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যেখানে ভারতের বাজার মূলধন কমে ৪.৮ লক্ষ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের আবহে ভাল ফল করলেও সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক কেওএসপিআই বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। এক দিনের মধ্যেই বাজার থেকে উধাও হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। গত ২৩ জুন দেশটির প্রধান বেঞ্চমার্ক সূচক এক দিনে প্রায় ১০ শতাংশ কমে যায়। গত কয়েক মাসের মধ্যে সবচেয়ে পতন দেখা গিয়েছে মাত্র এক দিনের সেশনেই।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারের বড় দুই প্রযুক্তি সংস্থা স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স এবং এসকে হাইনিক্সের শেয়ারের দামে তীব্র পতন দেখা যায়। দুই সংস্থার শেয়ারই ১২ শতাংশের বেশি কমে যায়। এর ফলে বাজার থেকে কয়েকশো কোটি ডলার মুছে যায়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ৫ লক্ষ কোটি ওন (দক্ষিণ কোরিয়ার মুদ্রা) মূল্যের শেয়ার বিক্রি করেছেন, যা প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার সমতুল্য।
এই দু’টি চিপনির্মাতা প্রতিষ্ঠান একত্রে কোস্পির মোট শেয়ারের প্রায় ৬০ শতাংশের অধিকারী। ফলে, তাদের শেয়ারের দামে বড় ধরনের পতন এই বেঞ্চমার্ক সূচকের উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ এই দু’টি সংস্থার শেয়ার বেচার হিড়িক পড়তেই বড়সড় ধস নামে কোস্পিতে।
অতিরিক্ত শেয়ার বিক্রির ফলে চাপ তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্টক এক্সচেঞ্জের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু হয়। এর ফলে বিকেলে প্রায় ২০ মিনিটের জন্য লেনদেন সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হন কোস্পি কর্তৃপক্ষ। এই স্টকগুলোর দুর্বলতা ভারত-সহ এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাজারের এই তীব্র পতনের নেপথ্যে মূল কারণ ছিল লিভারেজড ইটিএফ ফান্ড নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সতর্কতা। এটি এমন এক ধরনের বিনিয়োগ ফান্ড, যা কোনও শেয়ার সূচক বা সম্পদের দৈনিক ওঠানামাকে বহু গুণ বাড়িয়ে দেখানোর চেষ্টা করে। লিভারেজড ইটিএফ ফান্ডে বিনিয়োগের ঝুঁকি বেশি হওয়ায় নিয়ন্ত্রকেরা বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছিলেন। এর পরেই অনেক বিনিয়োগকারী আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত শেয়ার বিক্রি শুরু করেন।
এই ধরনের ইটিএফ ফান্ড সাধারণ ইটিএফের তুলনায় বাজারের ওঠানামার প্রভাবকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ, বাজার বাড়লে লাভ বেশি হতে পারে, কিন্তু বাজার পড়লে ক্ষতিও অনেক বেশি হয়। নিয়ন্ত্রকদের আশঙ্কা ছিল, অনেক ছোট বিনিয়োগকারী ঝুঁকি পুরোপুরি না বুঝেই এই ধরনের পণ্যে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করছেন।
সাধারণ ইটিএফ কোনও সূচক বা সম্পদের গতিপথ অনুসরণ করে। কিন্তু লিভারেজড ইটিএফ ধার করা অর্থ বা আর্থিক কৌশল ব্যবহার করে সূচকের দৈনিক পরিবর্তনকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেখানোর চেষ্টা করে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী বিশেষ করে প্রযুক্তি ও চিপ খাতের উপর ভিত্তি করে লিভারেজড ইটিএফে বিনিয়োগ করেছিলেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সতর্কতার পর যখন বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমানোর পথে হাঁটতে শুরু করেন, তখন এই ফান্ডটির শেয়ারে ব্যাপক বিক্রি শুরু হয়। ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে চাপ বেড়ে যায়।
বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার বড় প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর সংস্থাগুলির শেয়ারে ব্যাপক বিক্রি দেখা যায়। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির চাহিদা বৃদ্ধির কারণে গত কয়েক মাসে চিপ প্রস্তুতকারক সংস্থার শেয়ারের দাম চড়চড় করে বেড়েছিল। ফলে বাজারের এই পতনকে অনেকেই অতিরিক্ত মূল্যায়নের পর একটি বড় সংশোধন হিসাবেও দেখছেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান লি চ্যান-জিনকে উদ্ধৃত করে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, লিভারেজড ফান্ড অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকার হয়তো খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এই ফান্ডগুলো দেশের কয়েকটি বড় চিপ সংস্থার শেয়ারের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং গত মাসেই চালু করা হয়েছিল।
তাঁর মতে, এ সব লিভারেজড ফান্ড বাজারের ওঠানামাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হলে শেয়ার বিক্রির চাপ বেড়ে যায় এবং বাজারের অস্থিরতা আরও বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ খাতের শেয়ারে এই প্রভাব বেশি দেখা যায়। নিয়ন্ত্রকদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ লিভারেজড পণ্য ছোট বিনিয়োগকারীদের বড় ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে এবং বাজার হঠাৎ করেই বড় ধরনের উত্থান-পতনের সাক্ষী থাকতে পারে।
দেশের আর্থিক বৃদ্ধির গতি অনেকটাই নির্ভর করে শিল্পের অগ্রগতির উপরে। বর্তমানে সারা বিশ্বেই শিল্পের অগ্রগতিতে কৃত্রিম মেধা এবং সেমিকন্ডাক্টর চিপের মতো ক্ষেত্র বড় ভূমিকা পালন করছে। এই দুই ক্ষেত্রেই এশিয়ার প্রথম সারির দেশ হিসাবে তালিকা করে নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। তাই পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের দরুন তেলের দাম বৃদ্ধির পরও সে ভাবে লোকসানের মুখ দেখেনি দেশটির বাজার।
দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান-সহ এশিয়ার অন্য বেশ কিছু দেশ এবং আমেরিকার বাজার থেকে সে ভাবে মুখ ফেরায়নি ওই সব চিপ প্রস্তুতকারক সংস্থা। বরং ভারত থেকে পুঁজি তুলে দক্ষিণ কোরিয়া-সহ জাপান বা তাইওয়ানের মতো দেশে ঢেলেছে তারা। ফলে তাদের সূচকের পতনের হারও ভারতের তুলনায় থেকে কম ছিল। চিন, ভারত, জাপান ছাড়াও শেয়ারবাজারের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি বিদেশি লগ্নিকারী সংস্থাগুলির বিনিয়োগের জোয়ার এসেছিল দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা ঘিরে আশাবাদের কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারটি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, লগ্নিকারীদের স্বার্থে এত উঁচু বাজারের জমি মজবুত রাখার জন্য সূচকের পতন অত্যন্ত জরুরি। শুধু দক্ষিণ কোরিয়া নয়, বিশ্ব জুড়েই সূচকের অধোগতির নজির রয়েছে জুনের তৃতীয় সপ্তাহে।
সাম্প্রতিক শেয়ার বিক্রির চাপে ইলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্সের বাজারমূল্যে রেকর্ড পতন দেখা দিয়েছে। সংস্থাটির শেয়ারের দাম এক সপ্তাহ আগে ২২৫ ডলারের রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। কিন্তু এর পর আচমকাই শেয়ার বিক্রির হিড়িক পড়ে যাওয়ায় সংস্থার সম্পদ ৯১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারেরও বেশি কমে গিয়েছে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, এক দিনের মধ্যেই স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম প্রায় ১৭ শতাংশ কমে যায়। এই পতনের নেপথ্যে মূল কারণ ছিল বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক শেয়ার বিক্রি, সংস্থার মূল্যায়ন নিয়ে উদ্বেগ এবং লভ্যাংশ বৃদ্ধির পর বাজারে মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা।
ছবি: এআই সহায়তায় তৈরি ও সংগৃহীত।