বিহারের ভূমিপুত্র। নিজেকে ‘বিহারিবাবু’ বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। তাঁর হাত ধরেই শিল্পাঞ্চলের উপনির্বাচনে লোকসভার আসন ছিনিয়ে আনতে পেরেছিল তৃণমূল। বাবুল সুপ্রিয় বিজেপি থেকে তৃণমূলে আসার পর আসানসোলে যে উপনির্বাচন হয়, সেখানে শত্রুঘ্ন সিন্হাকে প্রার্থী করেছিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সদ্য দলে যোগ দেওয়া শত্রুঘ্ন হতাশ করেননি দলকে।
তিন লক্ষের বেশি ভোটের ব্যবধানে আসানসোলে জয় পেয়েছিলেন ‘বহিরাগত’ শত্রুঘ্ন। উপনির্বাচনে শত্রুঘ্নের বিপরীতে বিজেপি প্রার্থী করেছিল ‘আসানসোলের ঘরের মেয়ে’ অগ্নিমিত্রা পালকে। উপনির্বাচনে প্রচার পর্বের শুরু থেকেই শত্রুঘ্নকে ‘বহিরাগত’ বলে দাগিয়ে দিয়েছিল বিজেপি। সে সমস্ত প্রচার উড়িয়ে আসানসোলবাসী দু’হাত ভরে ভোট দিয়েছিলেন পড়শি রাজ্যের বাসিন্দাকে।
আসানসোলের বিস্তীর্ণ এলাকায় কয়লাখনির শ্রমিকেরা রয়েছেন। সেই শহরই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ২০২২ সালে আসানসোল উপনির্বাচনে শত্রুঘ্ন জিতেছিলেন বিপুল ভোটে। ২০২৪ সালে তাই তাঁকে আবার মনোনয়ন দিতে দু’বার ভাবেননি মমতা। দ্বিতীয় বারও হতাশ করেননি শত্রুঘ্ন। যুযুধান সমস্ত দলকে আবার ‘খামোশ’ করে দিয়েছিলেন বলিউড তারকা। তবে জয়ের ব্যবধান প্রথম বারের তুলনায় কমেছিল। তিন লক্ষ থেকে কমে এক লক্ষের কিছু বেশি ব্যবধানে বিজয়ী হন তিনি।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির পর বিধায়ক থেকে সাংসদ, অনেকেই মুখ খুলেছেন দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। অনেকেই পদত্যাগ করছেন। তৃণমূল সুপ্রিমোর একদা ছায়াসঙ্গীরাই ভোল বদলে বিদ্রোহী শিবিরের দিকে পা বাড়িয়েছেন। বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর শত্রুঘ্নের মুখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সুখ্যাতি শুনে জল্পনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
সাংসদ তাঁর এক্স পোস্টে লিখেছিলেন, “আমাদের বন্ধু এবং সমাজ ও জাতির পথপ্রদর্শক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে তাঁর ১২ বছর পূর্তি উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি, যা সম্ভবত এযাবৎকালের দীর্ঘতম কার্যকাল। আপনার দীর্ঘ, সুস্থ ও সমৃদ্ধ জীবন কামনা করি। জয় হিন্দ!’’
‘দীর্ঘতম’ সময় ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার জন্য মোদীকে অভিনন্দন জানিয়ে তাঁর এই পোস্টটি এই জল্পনাকে উস্কে দিয়েছে। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি জল্পনা। শোনা গিয়েছিল লোকসভার স্পিকারের কাছে তৃণমূল বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ‘জমা দেওয়া’ চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছে বিহারিবাবুর নাম। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবিরে নাম লিখিয়েছেন শত্রুঘ্নও, এমনটাই খবর ছড়িয়েছে দিল্লির বাতাসে।
বিরোধী সূত্রের খবর, লোকসভার বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের মঞ্চে সব মিলিয়ে গত কয়েক দিনে, ১৯ জনের সই-সহ চিঠি স্পিকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। বিদ্রোহী শিবির থেকে জানানো তথ্য অনুযায়ী, চিঠিতে এখনও পর্যন্ত সই করেছেন ইউসুফ পাঠান, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়েরা। সই করেছেন সায়নীও। এর আগে সই ছিল মালা রায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায়, জুন মালিয়াদের। ১৯ জন আছেনই, সংখ্যা নাকি বাড়তেও পারে।
তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙনের জল্পনার মধ্যেই আসানসোলের সাংসদ শত্রুঘ্ন সিন্হা অবশ্য স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে এবং তৃণমূলের সঙ্গেই আছেন। তিনি জানান, ২০১৯ সালে কঠিন সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এবং তাঁর নির্দেশেই তিনি আসানসোল থেকে নির্বাচন লড়ে দু’বার জয়ী হন। তাই বর্তমানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কঠিন সময়ে ‘দিদি’কে ছেড়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
দলের কঠিন সময়ে তাঁকে নিয়ে নানা জল্পনা ও গুজব ছড়ানো হচ্ছে। কেউ কেউ দাবি করেছিলেন, শত্রুঘ্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, তিনি সব সময় সত্য কথা বলেন। তৃণমূলের ‘জোড়া ফুল’ প্রতীকে নির্বাচিত হওয়ায় দল ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থাকা তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য। তিনি আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গ ও আসানসোলের মানুষের জন্য তিনি আগের মতোই কাজ করে যাবেন।
এক জাতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বর্ষীয়ান এই সাংসদ সমস্ত জল্পনা ও দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানান, তিনি এমন কোনও চিঠিতে স্বাক্ষর করেননি। তৃণমূলে এ বিষয়ে বিদ্রোহী শিবির থেকেও কেউ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তিনি এই ব্যাপারে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘‘কেউ কেউ আমাকে বিদ্রোহী মনে করতে পারেন। সত্য বলা যদি বিদ্রোহ হয়, তা হলে আমি একজন বিদ্রোহী। তবে, এই গোষ্ঠীর সঙ্গে আমার নাম জড়ানো উচিত নয়। আমি কোনও কিছুতে স্বাক্ষর করিনি, আর কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগও করেননি।’’
রাজনৈতিক জীবনের বড় অংশ বিজেপিতে কাটিয়ে আসা এই প্রবীণ নেতা নিশ্চিত করেছেন যে তিনি মমতাকে এই অবস্থায় পরিত্যাগ করবেন না। কারণ তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন কিছু পর্যায়ে পাশে পেয়েছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমোকে। মমতাই তাঁর একমাত্র নেতা এবং এই ভূমিকায় তিনি অন্য কাউকে স্বীকৃতি দেন না।
শত্রুঘ্নের সংসদীয় রাজনীতিতে হাতেখড়ি ১৯৯৬ সালে। বিজেপির হাত ধরেই উত্থান। রাজনীতির ময়দানে পা রেখেই সাংসদপদ লাভ। ২০০৮ সাল পর্যন্ত রাজ্যসভার সাংসদ। সেই পর্বেই বাজপেয়ী মন্ত্রিসভার সদস্য। চলচ্চিত্রের মতো রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও শত্রুঘ্নের ইতিহাস রঙিন।
২০০৯ সালে পটনার ভূমিপুত্র ফিরে আসেন জনতার রায়ে নির্বাচিত হওয়ার জেদ নিয়ে। জনতা সেখানেও হতাশ করেনি বলিউডের বিহারিবাবুকে। পটনা সাহিব লোকসভা কেন্দ্রে লড়াই করেন বিজেপির টিকিটে। লড়েন সহ-অভিনেতা শেখর সুমনের বিরুদ্ধে। জয়লাভও করেছিলেন।
২০১৪ সালেও জিতেছিলেন তিনি। কিন্তু কেন্দ্রে মন্ত্রিত্বের শিকে ছেঁড়েনি। মন্ত্রিত্ব না পেতেই দল বদলে কংগ্রেসের হাত ধরেন বিহারিবাবু। আদর্শগত মতপার্থক্যের কারণেই বিজেপির সংশ্রব ত্যাগ বলে জানিয়েছিলেন তিনি। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে কংগ্রেসের টিকিটে দাঁড়িয়ে বিজেপির রবিশঙ্কর প্রসাদের কাছে শোচনীয় ভাবে হারেন শত্রুঘ্ন। কংগ্রেসের ‘হাত’ ধরে থাকার মোহভঙ্গ হয়ে অচিরেই।
কংগ্রেস শিবির ত্যাগ করে তৃণমূলে যোগ দেন বিহারের ভূমিপূত্র। ২০২২ সালে আসানসোল উপনির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব পেয়ে কংগ্রেস ছাড়েন ‘বিহারিবাবু’। জিতে যান আসানসোলে। বাবুল সুপ্রিয় বিজেপি থেকে তৃণমূলে আসার পর আসানসোলে যে উপনির্বাচন হয়, সেখানে শত্রুঘ্নকে প্রার্থী করেছিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উপনির্বাচনে বিজেপির দু’বারের জেতা আসন ছিনিয়ে নেয় তৃণমূল। তার আগে কখনও আসানসোলে তৃণমূল জেতেনি।
আড়াই দশকের বেশি সময় বিজেপি করেছেন শত্রুঘ্ন। ছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের মন্ত্রীও। কিন্তু মোদী-শাহের বিজেপির সঙ্গে তাঁর গোড়া থেকেই সংঘাত তৈরি হয়েছিল। শেষমেশ তৃণমূলে যোগ দিয়ে সাংসদ হন শত্রুঘ্ন।
অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে টালমাটাল অবস্থা তৃণমূল কংগ্রেসের। ভাঙন রুখতে বিদ্রোহী সাংসদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল, বোঝানোর চেষ্টাও করা হয়েছিল। বিদ্রোহীদের একাংশের বক্তব্য, বোঝানোর বিষয়টি আগে করলে ভাল হত। এখন হাত থেকে তির বেরিয়ে গিয়েছে। এক সাংসদ জানিয়েছেন, কী ঘটছে চারপাশে, তা দলনেত্রী বুঝতে পারেননি। মানুষ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর কাজকর্ম সম্পর্কে কী ভাবছে, ধরতে পারেননি মমতা।
তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্য, যে চেষ্টা করছেন বিদ্রোহীরা, তা বেআইনি। ধোপে টিকবে না। দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদের প্রয়োজন হয় অন্য দলে সরাসরি যোগ দেওয়ার জন্য। অথবা যে কেউ দল থেকে পদত্যাগ করে আবার অন্য দলের টিকিটে লড়তে পারেন। কিন্তু একটি পরিষদীয় দল ভেঙে নতুন কোনও ব্লক তৈরি হতে পারে না লোকসভায়।
এই অবস্থায় তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন শত্রঘ্ন। তাঁর মতে প্রতিটি রাজনৈতিক দলেই মতপার্থক্য থাকে এবং এটিকে স্বয়ংক্রিয় ভাবে দল বিভাজনের লক্ষণ হিসাবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। দল যে অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগছে এমন ধারণাও উড়িয়ে দিয়েছেন আসানসোলের সাংসদ। তৃণমূলনেত্রীকে অদম্য যোদ্ধা হিসাবে উল্লেখ করে ‘বিহারিবাবু’র বিশ্বাস, এ বারও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে সফল হবেন মমতা।
সব ছবি: সংগৃহীত।