১০ বছর আগেও দেশটির তেলসম্পদের পরিমাণ বিশ্বের কাছে প্রকাশ্যে আসেনি। পাঁচ বছর আগে তরল সোনার প্রতিযোগিতার বাজারে ‘কেষ্টবিষ্টুদের’ তালিকায় নাম খুঁজে পাওয়া যেত না দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পূর্ব উপকূলের রাষ্ট্রটির। পরে জানা যায়, সেই অখ্যাত রাষ্ট্রে লুকিয়ে রয়েছে বিশাল সম্পদ। তা করায়ত্ত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন পড়শি দেশের সাবেক প্রেসিডেন্টও।
ছবির মতো সাজানো দক্ষিণ আমেরিকার ছোট্ট দেশ গায়ানা। ব্রাজ়িল লাগোয়া ক্যারিবিয়ান রাষ্ট্র গায়ানা কয়েক বছর আগে খনিজ তেলের বিশাল ভান্ডার খুঁজে পায়। এর ফলে সেখানকার অর্থনীতি দুরন্ত গতিতে ছুটতে শুরু করে। মাত্র ১১ বছর আগে গায়ানার উপকূলীয় জলসীমায় উচ্চমানের অপরিশোধিত তেলের বিশাল ভান্ডারের সন্ধান পাওয়া যায়।
গত বছরেই বিশেষজ্ঞেরা দাবি করেছিলেন, ২০২৬ সালের মধ্যে ‘তরল সোনা’ উৎপাদনের নিরিখে ভেনেজ়ুয়েলাকে ছাপিয়ে যাবে গায়ানা। শুধু তা-ই নয়, বলা হয়, বিশ্ববাজারে খনিজ তেলের সরবরাহের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে ব্রাজ়িলের এই প্রতিবেশী রাষ্ট্র। তেল উত্তোলক দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার সব রকমের সম্ভাবনা গায়ানার মধ্যে রয়েছে। গত দু’-তিন বছরে অস্বাভাবিক উচ্চতায় এর জিডিপি উঠতে দেখা গিয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং তেল উত্তোলনকারী সংস্থার পাশাপাশি হঠাৎ তেলসম্পদে ধনী হওয়া দেশটির প্রতি নজর পড়ে প্রতিবেশী দেশ ভেনেজ়ুয়েলারও। সামরিক ক্ষমতায় দুর্বল দেশটিকে চোখ রাঙিয়ে তেলের ভান্ডার দখলের ছক কষতে শুরু করেন কারাকাসের কর্তা ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশটির ফৌজিশক্তি ভেনেজ়ুয়েলার ধারেকাছে নেই।
কারাকাসের পরিকল্পনা ছিল যেনতেনপ্রকারেণ কয়েক লক্ষ কোটি টাকার তেলসম্পদ তাদের অধিকারে নিয়ে আসা। শুধু তেল নয়, গায়ানার খনিজসমৃদ্ধ অ়ঞ্চল এসেকুইবোকে ভেনেজ়ুয়েলার অংশ বলে দাবি তুলতে শুরু করেছিলেন মাদুরো। গায়নার দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত এই এসেকুইবো। এখানেই রয়েছে আমেরিকার অন্যতম বৃহত্তম এবং শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক তেলসংস্থা এক্সনমোবিলের অধিকৃত তৈলক্ষেত্র স্ট্যাব্রোক ব্লক।
২০১৫ সালে তেল আবিষ্কারের পর থেকেই মাদুরো গায়ানার বিরুদ্ধে বৈরিতা ক্রমশ বাড়িয়ে তুলেছিলেন। ইংরেজি-ভাষী প্রতিবেশী দেশটিতে ভেনেজুয়েলার ৩ লক্ষ শক্তিশালী ফৌজের তুলনায় মাত্র ৪ হাজার সামরিক বাহিনী রয়েছে। সামান্য সামরিক শক্তি নিয়ে ভেনেজ়ুয়েলার বিরুদ্ধে লড়াই করা যে আত্মহত্যার নামান্তর তা বুঝেই আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হয় গায়ানা।
৮ লক্ষ ৩০ হাজার জনসংখ্যার লাটিন আমেরিকার এই ছোট দেশটি বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি এবং একটি প্রধান জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে। গায়ানার উপকূলীয় অঞ্চলে, বিশেষ করে স্টাব্রোক ব্লকে ১ হাজার ১০০ কোটি ব্যারেলেরও বেশি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। ২০১৯ সালে উৎপাদন শুরু হওয়ার পর এই তৈলক্ষেত্রটি বর্তমানে প্রতি দিন ন’লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদনে সক্ষম।
বিশ্বব্যাপী খনিজ তেলের ১৮ শতাংশের মালিক গায়ানা সরকার। ২০২১ সাল থেকে লাফিয়ে বেড়েছে এর তেল রফতানি। ওই বছর দিনে এক লক্ষ ব্যারেল করে অপরিশোধিত তেল বিক্রি করেছিল দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশ। গায়ানার তেল রফতানির পরিমাণ তিন থেকে চার বছরের মধ্যে প্রায় ন’গুণ বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, ২০২৭ সালে দেশটির দৈনিক ‘তরল সোনা’ বিক্রির পরিমাণ দাঁড়াবে ন’লক্ষ ব্যারেল।
এখানে তেল উত্তোলনের জন্য গড়ে প্রতি ব্যারেলে খরচ পড়ে প্রায় ৩০ ডলার। তেল অনুসন্ধানের জন্য সবচেয়ে সস্তা এবং সবচেয়ে লাভজনক দেশগুলির মধ্যে একটিতে পরিণত হয়েছে গায়ানা। মার্কিন তেল টাইকুন এক্সন মবিল এবং শেভরনের সঙ্গে চিনের তেল উত্তোলনকারী সংস্থা সিএনওওসির অংশীদারিতে গায়ানা তেলসম্পদ আহরণ করার কাজ চালিয়ে আসছে।
প্রাকৃতিক তেলসম্পদ, সোনা, বক্সাইট এবং ম্যাঙ্গানিজ়সমৃদ্ধ এসেকুইবো নিয়ে বিরোধ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে। ব্রিটিশ অধিকৃত গায়ানার সীমান্ত নির্ধারণ নিয়ে উনিশ শতকে থেকেই ভেনেজুয়েলা এবং গ্রেট ব্রিটেনের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত।
৮৯৯ সালের ‘আরবিট্রাল অ্যাওয়ার্ডে’ ব্রিটেনকে এসেকুইবোর উপর সার্বভৌমত্ব দেওয়া হয়। পরে ১৯৬৬ সালে উপনিবেশের স্বাধীনতার পর গায়ানায় হাতে সেই অধিকার স্থানান্তরিত হয়। ১৯৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে ভেনেজ়ুয়েলার গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রোমুলো বেতানকোর্ট এই বিরোধের পুনরুত্থান ঘটান। গায়ানা স্বাধীন হওয়ার পর কারাকাস এসেকুইবোর অধিকারকে অবৈধ বলে ঘোষণা করে।
প্রভূত পরিমাণ তেলসম্পদ আবিষ্কার হওয়ার পর এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের দ্রুত ভোল বদলাতে শুরু করে। ভেনেজ়ুয়েলা ও গায়ানার মধ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে। ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’কে কুক্ষিগত করার সব রকম চেষ্টা করতে শুরু করে কারাকাস। ঐতিহাসিক সীমান্তবিরোধ রূপ বদলে জটিল ভূ-রাজনৈতিক বিরোধের আকার নিতে থাকে।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরের গোড়ার দিকে, ব্রাজ়িলের গোয়েন্দা সংস্থা ভেনেজ়ুয়েলা আক্রমণের আশঙ্কা সম্পর্কে সতর্ক করে গায়ানাকে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ ছিল ভেনেজুয়েলার সীমান্তে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয় ব্রাসিলিয়া। ব্রাজ়িলের প্রেসিডেন্ট লুইজ় ইনাসিও লুলা দা সিলভা মাদুরোকে একতরফা পদক্ষেপ করার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, লাটিন আমেরিকার দুই যুযুধানকে সামলাতে আসরে নামে ওয়াশিংটন। উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তারা গায়ানা-ভেনেজ়ুয়েলা বিরোধকে শুধুমাত্র আইনি মতবিরোধ হিসাবে গণ্য করতে রাজি ছিলেন না। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গায়ানায় হাজির হন মার্কিন বিদেশমন্ত্রী মার্কো রুবিয়ো। গায়ানার নেতাদের পাশে দাঁড়িয়ে, রুবিয়ো কারাকাসকে একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। গায়ানা বা এক্সনমোবিলের তেল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ভেনেজুয়েলার যে কোনও আগ্রাসনকে হালকা ভাবে নেবে না মার্কিন প্রশাসন, কড়া বার্তা ছিল মার্কিন বিদেশমন্ত্রীর।
গায়ানাকে আক্রমণ করার আগেই অবশ্য ঘটে যায় প্রেসিডেন্ট মাদুরো-হরণ পর্ব। কারাকাসে অভিযান চালিয়ে প্রাসাদে ঢুকে প্রেসিডেন্ট পদে থাকা সস্ত্রীক নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায় মার্কিন সেনা। তাঁদের বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাসের ষড়যন্ত্র, কোকেন আমদানির চক্রান্ত, মেশিনগান ও অন্যান্য ধ্বংসাত্মক যন্ত্র সঙ্গে রাখার মতো অভিযোগ আনেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ভেনে়জ়ুয়েলা আক্রমণ এবং প্রেসিডেন্ট মাদুরোর অপহরণের নেপথ্যে অন্য কারণ দেখিয়েছে আমেরিকা। দাবি, ভেনেজ়ুয়েলা থেকে অপরাধীরা অবৈধ ভাবে আমেরিকায় প্রবেশ করে। তাই জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য মাদুরোকে সরানো প্রয়োজন ছিল। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, শুধু ভেনেজ়ুয়েলা নয় প্রতিবেশী দেশটিতেও যাতে মার্কিন তেল সংস্থার নিরঙ্কুশ ব্যবসা মসৃণ ভাবে চলে, মাদুরোকে সরিয়ে তার ব্যবস্থা করে দিয়েছে ট্রাম্প সরকার।
ভেনেজ়ুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের পর পরই মার্কো রুবিয়ো মার্কিন-গায়ানা দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে কথা বলেন গায়ানার প্রেসিডেন্ট ইরফান আলির সঙ্গে। গায়নার প্রেসিডেন্টও ওই অঞ্চলে কৌশলগত নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য মার্কিন বাহিনীকে সমস্ত রকম সাহায্য করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন। অনেকেই মনে করছেন, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের ফলে এসেকুইবোর উপর ভেনেজ়ুয়েলার আঞ্চলিক দাবি আপাতত স্থগিত রইল।
সব ছবি: সংগৃহীত।