‘অপারেশন সিঁদুর’-এ দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জের। ভারতের থেকে ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশতির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (এয়ার ডিফেন্স) কিনতে আগ্রহী সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। সেই লক্ষ্যে চুক্তি চূড়ান্ত করতে নয়াদিল্লি ও আবু ধাবির মধ্যে চলছে আলোচনা। পশ্চিম এশিয়ার আরব রাষ্ট্রটির এ-হেন পদক্ষেপে আলোচনায় একটাই প্রশ্ন। তবে কি এ বার ওই এলাকায় প্রাধান্য খোয়াচ্ছে আমেরিকা?
পশ্চিম এশিয়ার আরব রাষ্ট্রগুলির হাতিয়ারের বাজার দীর্ঘ দিন ধরেই সম্পূর্ণ ভাবে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দখলে। পর্যবেক্ষক মহলের দাবি, ভারতের সঙ্গে আমিরশাহি ব্রহ্মস ও আকাশতিরের চুক্তি করলে বদলাবে সেই পরিস্থিতি। ইরান যুদ্ধে আমেরিকার ভূমিকা নিয়ে যথেষ্ট ‘বিরক্ত’ আবু ধাবি। সংঘর্ষ চলাকালীন তেহরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সর্বাধিক আঘাত তাদেরকেই সহ্য করতে হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে গত ২২ জুন ভারতের ব্রহ্মস এবং আকাশতির নিয়ে সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসতেই দুনিয়া জুড়ে পড়ে যায় শোরগোল। জানা যায়, নয়াদিল্লির এই দুই হাতিয়ার কেনার ব্যাপারে আলোচনা চালাচ্ছে আমিরশাহি। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ওই দিনই ব্রিকস-ভুক্ত দেশগুলির সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠকে করেন অজিত ডোভাল। এর সদস্যপদ রয়েছে আবু ধাবির।
এ বছরের জানুয়ারিতে নয়াদিল্লি সফরে আসেন আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক হয় তাঁর। সূত্রের খবর, সেই সময় থেকেই ব্রহ্মস ও আকাশতির কেনার ব্যাপারে দু’পক্ষের মধ্যে শুরু হয় আলোচনা। এর পর ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ বাধলে কিছুটা থমকে যায় সেই প্রক্রিয়া। এপ্রিলে আবু ধাবি সফর করেন ডোভাল। তাতেই ফের গতি পায় সংশ্লিষ্ট আলোচনা।
রয়টার্স জানিয়েছে, একসময় লড়াকু জেট, ক্ষেপণাস্ত্র, রেডার বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার (এয়ার ডিফেন্স) ক্ষেত্রে পুরোপুরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল ছিল পশ্চিম এশিয়ার সমস্ত আরব রাষ্ট্র। ২০২১-’২৫ সালের মধ্যে রফতানি করা হাতিয়ারের ৫৪ শতাংশই সৌদি আরব, আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত, বাহরিনের মতো দেশগুলিকে বিক্রি করে আমেরিকা। আবু ধাবির সেই প্রথা ভাঙতে চাওয়ার নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ।
কয়েকটা উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টা বুঝে নেওয়া যেতে পারে। ২০২১ সাল থেকে পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ প্রযুক্তির মার্কিন লড়াকু জেট এফ-৩৫ কেনার চেষ্টা চালাচ্ছে আমিরশাহি। কিন্তু, ভূ-রাজনৈতিক কারণে ওই যুদ্ধবিমান আবু ধাবিকে সরবরাহ করতে নারাজ যুক্তরাষ্ট্র। পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার স্বার্থ অনেকাংশেই ইজ়রায়েলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ওই ছোট্ট ইহুদি রাষ্ট্রটির স্বার্থ বিঘ্নিত করে কোনও অস্ত্র চুক্তি করতে নারাজ ওয়াশিংটন।
২০২০ সালে আব্রাহাম চুক্তিতে সই করার মধ্য দিয়ে ইজ়রায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে আমিরশাহি। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্রের থেকে এফ-৩৫ লড়াকু জেট পেতে কোনও সমস্যা হবে না বলেই মনে করছিল আবু ধাবি। কিন্তু, বাস্তবে তা হয়নি। গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সারে সৌদি আরব। সেখানে বলা হয়, এই দুইয়ের মধ্যে কোনও একটি দেশ তৃতীয় কোনও শক্তি দ্বারা আক্রান্ত বা আগ্রাসনের শিকার হলে, তাকে উভয় দেশের উপর আঘাত বা যুদ্ধ হিসাবে বিবেচনা করা হবে।
খনিজ তেল বিক্রি-সহ নানা ইস্যুতে সৌদি আরবের সঙ্গে আমিরশাহির সম্পর্ক বর্তমানে ‘সাপে নেউলে’ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। আর তাই রিয়াধ-ইসলামাবাদ সামরিক সমঝোতাকে সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে আবু ধাবি। এই দুই রাষ্ট্রের উপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রশ্নাতীত প্রভাব রয়েছে। কিন্তু, তা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে ওয়াশিংটন চুপ করে থাকায় আমিরশাহির সঙ্গে ফাটল ধরে তাদের ‘বন্ধুত্ব’-এর।
এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ বাধলে আরও বিপদে পড়েন প্রেসিডেন্ট নাহিয়ান। লড়াইয়ের গোড়াতেই আমিরশাহির ভিতরের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে নিশানা করে তেহরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। তাদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আছড়ে পড়ে দুবাই, আবু ধাবি ও শারজার মতো ঝাঁ চকচকে শহরে। এতে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সে দেশের বিলাসবহুল হোটেল, কৃত্রিম মেধার তথ্যভান্ডার (এআই ডেটা সেন্টার) ও বিমানবন্দর।
সাবেক সেনাকর্তাদের দাবি, ইরানি হামলায় দু’ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমিরশাহি। এত দিন অন্যতম নিরাপদ শহর হওয়ার কারণে বিশ্বের ধনকুবেরদের একাংশ বসবাসের জন্য দুবাই বা আবু ধাবিকে বেছে নিচ্ছিলেন। তাঁরা থাকার ফলে আর্থিক সমৃদ্ধি পেতে সমস্যা হয়নি সংশ্লিষ্ট আরব রাষ্ট্রের। কিন্তু, তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ঝাঁক ছুটে আসতেই রাতারাতি বদলে যায় সমস্ত হিসাব। তখন উপসাগরীয় দেশ ছাড়তে বিদেশিদের মধ্যে পড়ে যায় হুড়োহুড়ি।
তা ছাড়া ইরান যুদ্ধের জেরে পরিকাঠামোগত সর্বাধিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন নাহিয়ান। সেই লোকসান মেরামতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে টাকা চেয়েও পাননি তিনি। ফলে আমেরিকার ‘নিরাপত্তা ছাতা’ নিয়ে আমিরশাহি প্রশাসনের অন্দরেই ওঠে প্রশ্ন। তবে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঠেকাতে মার্কিন ফৌজ ও আবু ধাবির স্থানীয় বাহিনী যে একেবারে চেষ্টা করেনি, তা কিন্তু নয়। যদিও সেখানে ওয়াশিংটনের হাতিয়ারগুলির সীমাবদ্ধতা বেআব্রু হয়ে যায়।
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে আমিরশাহির সামরিক ঘাঁটিগুলিতে মোতায়েন করা হয় থাড (টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স) এবং প্যাট্রিয়ট নামের দু’টি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, দু’টি কারণে তেহরানের আক্রমণ ঠেকাতে ব্যর্থ হয় তারা। প্রথমত, দুবাই ও আবু ধাবির কৌশলগত এলাকাগুলিকে নিশানা করতে অত্যন্ত সস্তার ড্রোন ব্যবহার করছিল আইআরজিসি।
অন্য দিকে থাড ও প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষার ইন্টারসেপ্টর রকেটের দাম কয়েক কোটি। ফলে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসা ইরানি ড্রোন আটকাতে গিয়ে গোড়াতেই কয়েকশো কোটি ডলার খরচ করে ফেলে আমিরশাহি ও মার্কিন ফৌজ। শুধু তা-ই নয়, দ্রুত ফুরিয়ে যায় তাদের ইন্টারসেপ্টর রকেটের ভান্ডার। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আরব রাষ্ট্রটির পরিকাঠামোগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিকে নিশানা করে আইআরজিসি।
দ্বিতীয়ত, থাড ও প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে ছিল না কোনও বোঝাপড়া। ফলে বহু ক্ষেত্রে মাঝ-আকাশে নিজেদের এফ-১৫ ইগল লড়াকু জেটকেই উড়িয়ে দেয় মার্কিন ফৌজ। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে তেহরানে বড়সড় হামলার প্রস্তুতি নেয় আবু ধাবি। কিন্তু, ওই সময় নতুন কোনও মোর্চা বা ফ্রন্ট খুলুক, তা একেবারেই চায়নি আমেরিকা। ফলে আক্রমণের সিদ্ধান্ত থেকে সরতে হয় নাহিয়ানকে।
এই পরিস্থিতিতে আমিরশাহির পাশে দাঁড়ায় ইজ়রায়েল। ইরান যুদ্ধের মধ্যেই আয়রন ডোমের মতো ‘সেরা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’ আবু ধাবির হাতে তুলে দেয় তেল আভিভ। সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, তার পরও আমিরশাহির এয়ার ডিফেন্সগুলির মধ্যে নেই কোনও বোঝাপড়া। সেই কারণেই ভারতের আকাশতিরকে বেছে নিতে চাইছেন প্রেসিডেন্ট নাহিয়ান।
ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিআরডিও-র (ডিফেন্স রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজ়েশন) নকশায় তৈরি আকাশতিরের নির্মাণকারী সংস্থা হল ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড। এর পাল্লা ২৫ থেকে ৮০ কিলোমিটার। দামের দিক থেকে থাড বা প্যাট্রিয়টের তুলনায় এটি অনেক সস্তা। দ্বিতীয়ত, মাঝ-আকাশে শত্রুর ছোড়া ড্রোন ধ্বংস করতে এর জুড়ি মেলা ভার। গত বছর অপারেশন সিঁদুরে নিজের জাত চেনায় আকাশতির।
২০২৫ সালে ভারত-পাক ‘যুদ্ধে’র সময় ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন পাঠিয়ে এ দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে ইসলামাবাদ। কিন্তু, তাদের ছোড়া পাইলটবিহীন যানের ঝাঁক আটকে দেয় আকাশতির। হাতিয়ারটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল স্বয়ংক্রিয় কমান্ড ও কন্ট্রোল সিস্টেম। সেটা ৩০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে নজরদারির পাশাপাশি বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, সেই কারণেই আকাশতির কিনতে চাইছে আবু ধাবি। এর সাহায্যে থাড, প্যাট্রিয়ট ও আয়রন ডোমের মধ্যে একটা বোঝাপড়া গড়ে তুলতে পারবে তারা। পাশাপাশি, এড়ানো যাবে নিজেদের জেট উড়িয়ে দেওয়ার মতো ভুলও। অন্য দিকে সৌদি আরব ও ইরানের উপর চাপ বজায় রাখতে ব্রহ্মস হাতে পেতে চাইছে আমিরশাহি। রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে দুনিয়ার দ্রুততম ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রটি তৈরি করেছে ভারত।
‘অপারেশন সিঁদুর’-এ ইসলামাবাদের বিমানবাহিনীর ১১টি ঘাঁটি ধ্বংস করে এ দেশের বায়ুসেনা। লড়াই থামলে এ ব্যাপারে মুখ খোলেন পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তিনি বলেন, ‘‘ব্রহ্মসের সাহায্যে আমাদের বায়ুসেনা ছাউনিতে হামলা চালিয়েছে ভারত। আমরা ওই ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর সময়টুকুও পাইনি।’’ তাঁর ওই মন্তব্যের পরই দুনিয়ার অস্ত্রবাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারের চাহিদা।
ইতিমধ্যেই ফিলিপিন্সকে ব্রহ্মস বিক্রি করেছে ভারত। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রটির চুক্তি সেরেছে নয়াদিল্লি। সেই তালিকায় এ বার যুক্ত হতে পারে আমিরশাহির নামও। স্থল, রণতরী এবং লড়াকু জেটের সাহায্যে এটি ছোড়া যায়। এর মধ্যে কোনটি পেতে আবু ধাবি আলোচনা চালাচ্ছে, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, ইরান যুদ্ধে পশ্চিম এশিয়ার কোনও আরব রাষ্ট্রকেই তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আঘাত থেকে বাঁচাতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। ফলে আমিরশাহির সঙ্গে ভারতের অস্ত্র চুক্তি হলে আগামী দিনে একই রাস্তায় হাঁটতে পারে ওমান, কুয়েত বা বাহারিনের মতো রাষ্ট্র। তখন ওই এলাকায় আমেরিকার সামরিক প্রভাব যে হ্রাস পাবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।