ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানি সঙ্কটে জ্বলছে বিশ্ব। মূল্যবৃদ্ধির আঁচ লাগতে পারে ভারতের গায়েও। এ-হেন কঠিন পরিস্থিতিতে একমাত্র ‘বরাত’ খুলছে পাকিস্তানের! কারণ, তাদের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে সমুদ্র পর্যন্ত রেললাইন নিয়ে যেতে চায় মধ্য এশিয়ার একটা দেশ। সেই মেগা প্রকল্পে সাফল্য এলে ইসলামাবাদের পকেট যে ভরে উঠবে, তা বলাই বাহুল্য। যদিও লক্ষ্যপূরণে একাধিক বাধা টপকাতে হতে পারে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফের প্রশাসনকে।
পাকিস্তানের আর্থিক ভাগ্য বদলে দিতে চলা ওই রাষ্ট্রটি হল উজ়বেকিস্তান। একসময় এই দেশ ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্গত। ১৯৯১ সালে মস্কোর কমিউনিস্ট শাসনের পতন হলে একসঙ্গে আলাদা হয়ে যায় এর নিয়ন্ত্রণে থাকা ১৫টি কনফেডারেশন। তখনই তাসখন্দকে রাজধানী করে স্বাধীন দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে উজ়বেকিস্তান। সোভিয়েতের কবল থেকে বেরিয়ে গেলেও কখনওই রাশিয়া এবং চিনের নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি মধ্য এশিয়ার ওই দেশ।
স্থলবেষ্টিত উজ়বেকিস্তানের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। হয় মস্কো, নয়তো বেজিঙের মাধ্যমেই পণ্য আমদানি-রফতানি করতে হয় তাসখন্দকে। ২১ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত এতে কোনও সমস্যা হয়নি। কিন্তু, পরবর্তী সময়ে ব্যবসা বাড়াতে বিকল্প রাস্তার খোঁজ শুরু করে উজ়বেক প্রশাসন। সেই লক্ষ্যেই বর্তমানে উচ্চকাঙ্ক্ষী একটি প্রকল্প বাস্তবায়িত করতে চাইছে তারা। নাম, ‘ট্রান্স আফগান রেলওয়ে’, যার লেজটা শেষ হবে পাকিস্তানের কোনও সমুদ্রবন্দরে।
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে মোটের উপর ‘ট্রান্স আফগান রেলওয়ে’ প্রকল্পটিকে চূড়ান্ত করে ফেলে তাসখন্দ প্রশাসন। গোড়ায় ঠিক হয়, দক্ষিণ উজ়বেকিস্তানের টার্মেজ় থেকে শুরু হবে লাইন পাতার কাজ। পরে আফগানিস্তানের মাজ়ার-ই-শরিফ, কাবুল, লোগার ও খারলাচি হয়ে ওই রেললাইন প্রবেশ করবে পাকিস্তানে। তোরখাম সীমান্ত ছুঁয়ে লাইনটি চলে যাবে খাইবার-পাখতুনখোয়ার পেশোয়ারে। সব শেষে সেখান থেকে করাচি, গ্বদর বা কাসিম সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে ওই রেলপথ।
কিন্তু শুরুতেই বাধা পায় ‘ট্রান্স আফগান রেলওয়ে’ প্রকল্প। সংশ্লিষ্ট নকশা মেনে নেওয়ার ব্যাপারে আপত্তি তোলে কাবুল ও ইসলামাবাদ। ফলে পরিকল্পনা বদলে ২০২৩ সালে নতুন নকশা তৈরি করে উজ়বেক ইঞ্জিনিয়ারদের দল। সেখানে আবার পাক-আফগান সীমান্তের তোরখামকে এড়িয়ে রেললাইন পাতার কথা বলা হয়েছে। ২০২৩ সালে নতুন নকশাটি দুই দেশের সামনে মেলে ধরে তাসখন্দ প্রশাসন। তার পর থেকে এ ব্যাপারে তিন পক্ষের মধ্যে বেশ কয়েকটা বৈঠক হয়েছে। যদিও কাজ শুরুর সবুজ সঙ্কেত মেলেনি।
উজ়বেক সরকারের বিবৃতি অনুযায়ী, নতুন নকশা মেনে প্রস্তাবিত প্রকল্পের কাজ চালালে বাড়বে নির্মাণখরচ। প্রথমে ‘ট্রান্স আফগান রেলওয়ে’ প্রকল্পের জন্য অনুমানিক ৪৬০ কোটি ডলার ব্যয় হবে বলে জানিয়েছিল তাসখন্দ। কিন্তু পরে সেটা ৬৯০-৭০০ কোটি ডলারে পৌঁছোতে পারে বলে ইঙ্গিত দেয় তারা। গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) সেপ্টেম্বরে এ ব্যাপারে ‘দ্য টাইম্স অফ সেন্ট্রাল এশিয়া’র কাছে মুখ খোলেন এক উজ়বেক ইঞ্জিনিয়ার। সেখানে খরচ বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।
‘দ্য টাইম্স অফ সেন্ট্রাল এশিয়া’কে তাসখন্দের ওই ইঞ্জিনিয়ার বলেছেন, ‘‘ট্রান্স আফগান রেলওয়ে প্রকল্পের সমীক্ষার কাজ এখনও শুরু হয়নি। তার মধ্যেই আমাদের এক বার নকশা বদলাতে হয়েছে। আফগান ভূখণ্ডের বাস্তুতন্ত্র বেশ জটিল। ফলে সমীক্ষার সময় ফের নকশা পরিবর্তন করতে হলে প্রস্তাবিত প্রকল্পটির নির্মাণখরচ যে আরও বাড়বে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।’’ তাঁর দাবি, এখনও পর্যন্ত মোট ৬৪৭ কিলোমিটার লম্বা রেললাইন পাতার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্য দিকে আফগানিস্তানের পাথুরে ভূখণ্ডের জন্য উজ়বেক রেল প্রকল্পের বাস্তবায়ন সম্ভব কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের কথায়, এই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে হিন্দুকুশ পর্বতমালার ৩,৫০০ মিটার উচ্চতায় পাততে হবে রেললাইন। শুধু তা-ই নয়, সালাং গিরিপথ দিয়ে নিয়ে যেতে হবে তাকে। অর্থাৎ, প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ হলে বিশ্বের অন্যতম উঁচু রেললাইন পাবে ‘কাবুলিওয়ালার দেশ’, ভূপ্রাকৃতিক কারণে যা তৈরি করা বেশ কঠিন।
প্রায় একই কথা বলতে শোনা গিয়েছে রুশ বংশোদ্ভূত উজ়বেক সাংবাদিক ইউরি দেরনোগায়েভকে। সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম টেলিগ্রামে ‘পূর্বে সব কিছু যেমনটা মনে হয় ঠিক তেমন নয়’ নামের একটি চ্যানেল চালান তিনি। সেখানে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন লিখেছেন ইউরি। ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘ট্রান্স আফগান রেলপথ’ নির্মাণে লাগবে ১,২০০-র বেশি কাঠামো। এর মধ্যে থাকবে ৩৬০টি সেতু এবং ৭০ কিলোমিটারের বেশি লম্বা বেশ কয়েকটা সুড়ঙ্গ।
টেলিগ্রাম চ্যানেলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের চ্যালেঞ্জের কথা লিখতে গিয়ে ইউরি বলেছেন, ‘‘সালাং গিরিপথে কখনওই রেললাইন পাতা উচিত নয়। কারণ, প্রতি বছর শীতে পুরু বরফের চাদরে ঢেকে যায় ওই এলাকা। তা ছাড়া হিন্দুকুশ যথেষ্ট ভূমিকম্পপ্রবণ। সেই পাহাড়ে ৩,৫০০ মিটার উঁচুতে রেললাইন বিছোনোর ঝুঁকি নেওয়ার কোনও অর্থ নেই।’’ এতে কোটি কোটি ডলার নষ্ট হওয়া ছাড়া আর কিছুই হবে না বলেও দাবি করেন তিনি। যদিও তাঁর এই সতর্কবার্তাকে একেবারেই গুরুত্ব দিচ্ছে না তাসখন্দ।
পরিবেশগত বাধা বাদ দিলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের জন্য সবচেয়ে বড় কাঁটা হল ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত। এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে তালিবানশাসিত আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা করেছে পাকিস্তান। ফলে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্ক এখন তলানিতে। এই পরিস্থিতিতে উজ়বেকিস্তানের কথায় কাবুল কতটা সায় দেবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তা ছাড়া সংঘর্ষরত দু’টি দেশকেই জঙ্গিদের আঁতুড়ঘর বললে অত্যুক্তি হবে না।
দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের অশান্ত প্রদেশগুলির মধ্যে অন্যতম হল খাইবার পাখতুনখোয়া এবং বালোচিস্তান। দু’টি জায়গাতেই রয়েছে একাধিক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দাপাদাপি। এর মধ্যে ‘তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান’ বা টিটিপি এবং ‘বালোচ লিবারেশন আর্মি’ বা বিএলএ অন্যতম। প্রায়ই ইসলামাবাদের সেনা ও পুলিশের উপর হামলা চালিয়ে থাকে তারা। ফলে প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ হলেও পেশোয়ার দিয়ে পণ্য পরিবহণ উজ়বেকরা করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থাকছে।
তৃতীয়ত, আফগানিস্তানের তালিবান সরকারকে এখনও সরকারি ভাবে স্বীকৃতি দেয়নি বিশ্বের বহু দেশ। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অর্থায়নের ক্ষেত্রে সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে তাসখন্দকে। গত বছরের (পড়ুন ২০২৫) নভেম্বরে এ ব্যাপারে একটা বিবৃতি দেয় পাক প্রশাসন। সেখানে ‘ট্রান্স আফগান রেলওয়ে’র জন্য টাকা সংগ্রহের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে ইসলামাবাদ। তবে ওই রেললাইন কখনওই তালিবানের হাতিয়ার আমদানির রাস্তা সহজ করবে না, এই প্রতিশ্রুতি চেয়েছে তারা।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, আগামী দিনে ‘ট্রান্স আফগান রেলওয়ে’ প্রকল্পের ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারে রাশিয়া। কারণ, এর মাধ্যমে হিন্দুকুশের কোলের দেশটিতে প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগ পাবে মস্কো, যেটা দীর্ঘ দিন ধরেই চাইছে ক্রেমলিন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একাধিক এলাকায় ঘাঁটি গেড়ে রয়েছে আমেরিকা। সোভিয়েত আমল থেকেই তা রুশ স্বার্থের পরিপন্থী। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের মাধ্যমে সেই দুর্গে ঘা মারার সুযোগ যে তারা পাবে, তা বলাই বাহুল্য।
পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বাণিজ্য চালাতে ‘আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ বারান্দা’ বা আইএনএসটিসি (ইন্টারন্যাশনাল নর্থ সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডর) নামের একটি বিকল্প রাস্তার স্বপ্ন দীর্ঘ দিন ধরেই দেখে আসছে রাশিয়া। সেই লক্ষ্যে ২০০২ সালে ভারত এবং ইরানের সঙ্গে চুক্তি করে মস্কো। ঠিক হয় এই রুটে মুম্বই থেকে ক্রেমলিন পর্যন্ত চলবে পণ্যের আমদানি ও রফতানি, যার কাজ শেষ করতে রাশত ও আস্তারার মধ্যে রেল যোগাযোগ স্থাপনে উঠেপড়ে লেগেছে রাশিয়া ও ইরান।
কাস্পিয়ান সাগর সংলগ্ন সাবেক পারস্য দেশের এই দুই শহরের কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। জায়গাটায় পৌঁছে একটা গুরুত্বপূর্ণ বাঁক নিয়েছে আইএনএসটিসি। রাশত ও আস্তারার মধ্যে রেলপথে ১৬২ কিলোমিটার লম্বা রাস্তা জুড়ে গেলে ‘আন্তর্জাতিক উত্তর দক্ষিণ পরিবহণ বারান্দা’র কাজ প্রায় শেষ হবে ধরে নেওয়া যেতে পারে। সেই কারণেই সংশ্লিষ্ট ‘মিসিং লিঙ্ক’কে এতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। অন্য দিকে প্রকল্পের কাজ যত এগিয়েছে, ততই কপালের ভাঁজ চওড়া হয়েছে পশ্চিমি দুনিয়ার।
যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলি রাশত ও আস্তারার নির্মীয়মাণ রেলপথটিকে ইস্পাত আর কংক্রিটের চেয়ে অনেক বেশি বলে উল্লেখ করেছে। কারণ, এই ‘মিসিং লিঙ্ক’ জুড়ে গেলে ৭,২০০ কিলোমিটার লম্বা ‘আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ বারান্দা’টিকে মোটের উপর চালু করতে পারবে রাশিয়া-ইরান-ভারত। এতে এশিয়া থেকে ইউরোপ বাণিজ্যের খরচ কমবে ৩০ শতাংশ। পাশাপাশি, ৩৭ দিনের বিপদসঙ্কুল সামুদ্রিক রাস্তা এড়িয়ে মাত্র ১৯ দিনে একে অপরের বাজারে নিয়ে যাওয়া যাবে পণ্য।
এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের জেরে বর্তমানে পুরোপুরি থমকে আছে ‘আন্তর্জাতিক উত্তর দক্ষিণ পরিবহণ বারান্দা’র কাজ। কিন্তু, তার পরেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, ‘ট্রান্স আফগান রেলওয়ে’কে ইরানের দিকে ঘোরানোর জন্য উজ়বেকিস্তানকে অনুরোধ করতে পারে রাশিয়া। কারণ, সোভিয়েতের গর্ভ থেকে জন্ম হওয়া দেশটিতে মস্কোর প্রভাব এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি।
গত বছরের (২০২৫ সাল) জুলাইয়ে ‘উজ়বেকিস্তান ২৪’ নামের টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ‘ট্রান্স আফগান রেলওয়ে’ প্রকল্পের কথা বলেন তাসখন্দের উপ-পরিবহণ মন্ত্রী জাসুরবেক খোরিয়েভ। ওই সময় মাত্র ছ’মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কাজ শুরু হবে বলে দাবি করেন তিনি। বর্তমানে যা বিশ বাঁও জলে চলে গিয়েছে। ফলে ‘ট্রান্স আফগান রেলওয়ে’তে রাশিয়া এবং ভারতের মেগা এন্ট্রি হয় কি না, সেটাই এখন দেখার।
ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।