Tiangong space center

অপমান হজম করে মহাকাশের চৌকাঠে ‘স্বর্গীয় প্রাসাদ’! আমেরিকার ‘নাকের ডগায়’ কোন গোপন গবেষণা চালাচ্ছে বেজিং?

আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র গড়ার দলে শামিল হতে না পেরেও দমে যায়নি চিন। নিজেদের মতো করেই মহাকাশ গবেষণায় এক পা-দু’পা করে এগোচ্ছিল চিন। আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র (ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন বা আইএসএস)-এর আদলে পৃথিবীর কক্ষপথে নিজস্ব একটি ‘স্পেস স্টেশন’ তৈরি করে গোটা দুনিয়াকে (বিশেষ করে আমেরিকা) মুখের উপর জবাব দিয়ে দিয়েছে চিন।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২১ জুন ২০২৬ ১২:৩২
০১ ১৮
Tiangong space center

আন্তর্জাতিক স্তরে বহু দিন ধরে মহাকাশ অভিযানে ‘একঘরে’ বেজিং। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন তৈরির পরিকল্পনায় বাদ দেওয়া হয়েছিল চিনকে। এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ছিল ২০১১ সালে প্রণীত একটি মার্কিন আইন। চিন সরকার বা চিন-সংশ্লিষ্ট কোনও সংস্থার সঙ্গে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতায় সরকারি তহবিল ব্যবহার করায় নিষেধাজ্ঞা ছিল আমেরিকার কোনও সংস্থার।

০২ ১৮
Tiangong space center

মহাকাশ গবেষণায় বিশ্বের নেতৃত্ব ছিল মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার হাতে। ১৯৮০ সালে মহাকাশ গবেষণায় ওয়াশিংটন একটি বড় আকারের মহাকাশ স্টেশন তৈরির পরিকল্পনা করে। সেই সময় মার্কিন মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র, নাসা পৃথিবীর কক্ষপথে একটি স্থায়ী গবেষণাগারের রূপরেখা তৈরি করে। এই কেন্দ্রটি স্থাপনের মূল লক্ষ্য ছিল দীর্ঘ দিন ধরে মানুষকে মহাকাশে পাঠিয়ে গবেষণা চালু রাখা।

০৩ ১৮
Tiangong space center

এই প্রকল্পে রাশিয়া, ইউরোপ, জাপান ও কানাডা যুক্ত হয়। ধীরে ধীরে ১৬টি দেশ মহাকাশ গবেষণার এই প্রকল্পে যোগ দিয়েছিল। বিশ্বের অন্যতম রাষ্ট্রশক্তিগুলি এতে যোগ দিলেও ব্রাত্য করে রাখা হয় চিনকে। যদিও চিনের মহাকাশ কর্মসূচির সূচনা হয় ’৫০ ও ’৬০-এর দশকে। ঠান্ডাযুদ্ধের সময় মহাকাশ প্রযুক্তি ছিল জাতীয় শক্তির অন্যতম প্রতীক। চিন প্রথমে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি উন্নয়নে মনোযোগ দেয় এবং পরে সেই প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে মহাকাশ কর্মসূচি গড়ে তোলে।

Advertisement
০৪ ১৮
Tiangong space center

১৯৭০ সালে চিন সফল ভাবে প্রথম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে। এটি ছিল চিনের মহাকাশ যুগের সূচনা। এর পর দেশটি ধীরে ধীরে নিজস্ব রকেট, উপগ্রহ এবং মহাকাশ প্রযুক্তি উন্নয়নে এগিয়ে যায়। চিনকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্রের কর্মসূচিতে অপাঙ্‌ক্তেয় করে রাখার একাধিক কারণ ছিল। রাজনৈতিক অবিশ্বাস, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং প্রযুক্তি ভাগাভাগি নিয়ে সীমাবদ্ধতার মতো কারণ লুকিয়ে ছিল। এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নীতিনির্ধারক চিনের সঙ্গে উন্নত মহাকাশ প্রযুক্তি আদানপ্রদানে আগ্রহী ছিলেন না।

০৫ ১৮
Tiangong space center

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন (আইএসএস) প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো। স্নায়ুযুদ্ধের পর রাশিয়াকে এই প্রকল্পে যুক্ত করা হয়েছিল, কারণ মস্কোর কাছে দীর্ঘ মহাকাশ অভিজ্ঞতার পুঁজি ছিল। কিন্তু সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অংশীদার রাষ্ট্র চিনকে একটি সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে দেখতে শুরু করেছিল। ফলে মহাকাশ সহযোগিতায় চিনকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে রাজনৈতিক সমর্থন তৈরি হয়নি।

Advertisement
০৬ ১৮
Tiangong space center

তবে চিনকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সব দেশ একমত হয়নি। বিশেষ করে রাশিয়া এবং ইউরোপের একাধিক দেশ চিনের সঙ্গে মহাকাশ সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু আইএসএস প্রকল্পের মূল কাঠামোয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভূমিকা এবং প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের কারণে চিন পূর্ণ অংশীদার হতে পারেনি।

০৭ ১৮
Tiangong space center

১৯৯০ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র চিনের সঙ্গে মহাকাশ প্রযুক্তি সহযোগিতায় বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করে। বিশেষ করে মার্কিন আইনের কারণে অনেক মহাকাশ প্রযুক্তি চিনের কাছে সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ২০১১ সালের সংশোধনী আইনের ফলে নাসার সঙ্গে চিনের সরাসরি সহযোগিতার পথ আরও সীমিত হয়ে ওঠে।

Advertisement
০৮ ১৮
Tiangong space center

আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র গড়ার দলে শামিল হতে না পেরেও দমে যায়নি চিন। আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণায় অংশ নেওয়ার সুযোগ সীমিত হওয়ায় চিন পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে ‘স্বর্গীয় প্রাসাদ’ তৈরির কাজে হাত দেয়। চিনের নিজস্ব মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্রটি হল তিয়াংগং স্পেস সেন্টার। ২০২২ সালের অক্টোবরে সম্পূর্ণ ভাবে চালু হয় ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উপরে পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা চিনের মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্রটি।

০৯ ১৮
Tiangong space center

মহাকাশ স্টেশনটি দেখতে ইংরেজি ‘টি’ বর্ণের মতো। চিনা মহাকাশ স্টেশনের তিনটি মডিউলের মধ্যে দু’টির ওজন ২০ হাজার কিলোগ্রাম বা ৪৪ হাজার ১০০ পাউন্ড। আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্রের তুলনায় তিয়াংগং অনেকটাই হালকা। তিয়াংগং স্টেশনে মাইক্রোগ্র্যাভিটি বা অতি-কম মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশে নানা ধরনের পরীক্ষা চালানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে জীববিজ্ঞান ও মানবদেহের উপর মহাকাশের প্রভাব সংক্রান্ত গবেষণা। মহাকাশে উদ্ভিদ বৃদ্ধি ও খাদ্য উৎপাদনের প্রযুক্তি, নতুন ধরনের পদার্থ তৈরির গবেষণা ও পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে এই কেন্দ্রে।

১০ ১৮
Tiangong space center

তিন জন তাইকোনট বা মহাকাশচারী এখানে থেকে গবেষণা চালান। দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেন বিশেষজ্ঞেরা। ভবিষ্যতের চন্দ্রাভিযান ও মঙ্গলে অভিযানের প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য তাঁদের রেখে দেওয়া হয়েছে এখানে। গবেষণাকে উন্নত মানের করে তুলতে ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যেতে নিয়মিত ব্যবধানে তিন জন করে মহাকাশচারীকে সেখানে পাঠানো হয়।

১১ ১৮
Tiangong space center

চিন বিভিন্ন দেশের গবেষকদের জন্য তিয়াংগংয়ে পরীক্ষা চালানোর সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। যদিও এটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের মতো বহু দেশের যৌথ প্রকল্প নয়। চিনের লক্ষ্য হল তিয়াংগংকে দীর্ঘ দিন সচল রাখা এবং ভবিষ্যতে এটিকে চন্দ্র অভিযান-সহ আরও বড় মহাকাশ প্রকল্পের প্রস্তুতির ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহার করা। এরই মধ্যে তিয়াংগংয়ে চলা এমন কয়েকটি গবেষণার কথা প্রকাশ্যে এসেছে যা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নাসারও।

১২ ১৮
Tiangong space center

চিনের মহাকাশ কর্মসূচি পুরোপুরি ভাবে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত। তাই গবেষণার পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করা হয় না। মহাকাশকেন্দ্রটির তথ্যের সুরক্ষা এতটাই আঁটোসাঁটো যে প্রতিরক্ষা দফতরের নজর এড়িয়ে পৃথিবীর অন্য দেশের হাতে পৌঁছোনোর সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। মহাকাশ গবেষণা সংস্থা চায়না ন্যাশনাল স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মারফত সমস্ত তথ্যই হাতে আসে চিনের। প্রয়োজন ও গুরুত্ব মেপে সেই তথ্য চাইলে বাইরের বিশ্বের কাছে পাঠায় চিন।

১৩ ১৮
Tiangong space center

চিনা মহাকাশ স্টেশনে রয়েছে তিনটি মডিউল বা অংশ। মহাকাশ স্টেশনটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে ধাপে ধাপে অভিযানে তিনটি অংশকে পাঠানো হয়েছে কক্ষপথে। তিনটি মডিউলের মধ্যে একটিতে হয় গবেষণা, নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এই মডিউলের নাম ‘ওয়েনতিয়ান’। মূল নিয়ন্ত্রণ ও বাসস্থান মডিউলের নাম ‘তিয়ানহে’। পদার্থবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত পরীক্ষার ল্যাবরেটরি রয়েছে মেংতিয়ান মডিউলটিতে।

১৪ ১৮
Tiangong space center

মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অভাবে প্রজনন পদ্ধতির মধ্যে কোনও পরিবর্তন আসে কি না, তা দেখার জন্য পৃথিবী থেকে প্রাণীদের মহাকাশে পাঠিয়ে গবেষণা করা হয় তিয়াংগংয়ে। মাইক্রোগ্র্যাভিটি-সহ মহাকাশের অন্যান্য পরিবেশের সঙ্গে কোনও জীব কী ভাবে মানিয়ে নেবে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা আনতেই এই পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছেন চিনা মহাকাশ গবেষকেরা। দাবি, সেই ফলাফল ভবিষ্যতে কাজে দেবে চাঁদে বা মঙ্গলে কলোনি তৈরির সময়।

১৫ ১৮
Tiangong space center

একই ভাবে চাঁদের মাটির উপাদান দিয়ে তৈরি ইটের সাহায্যে পরবর্তী অভিযানের প্রস্তুতি সেরে রাখতে চাইছে চিন। ‘অপার্থিব’ উপাদানে তৈরি সেই ইট রেখে আসা হয়েছে মহাকাশে। সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি বা মহাজাগতিক রশ্মিতে সেই উপাদানে কী কী পরিবর্তন আসে তা দেখার জন্য এই পরীক্ষা, যাতে চাঁদে বা মঙ্গলে দীর্ঘস্থায়ী আস্তানা গড়তে পৃথিবী থেকে সরঞ্জাম বয়ে নিয়ে যাওয়ার খরচ বা হ্যাপা এড়ানো যায় তাই এই পরীক্ষা বলে জানিয়েছেন চিনা গবেষকেরা।

১৬ ১৮
Tiangong space center

নিজেদের মতো করেই মহাকাশ গবেষণায় এক পা-দু’পা করে এগোচ্ছিল চিন। আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র (ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন বা আইএসএস)-এর আদলে পৃথিবীর কক্ষপথে নিজস্ব একটি ‘স্পেস স্টেশন’ তৈরি করে গোটা দুনিয়াকে (বিশেষ করে আমেরিকা) মুখের উপর জবাব দিয়ে দিয়েছে চিন।

১৭ ১৮
Tiangong space center

২০০০ সাল থেকে একটানা ২৬ বছর কাজ করে চলেছে আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র। ২০৩০ সালে অবসরের গ্রহে যেতে চলেছে এই গবেষণাকেন্দ্রটি। এর বদলে মহাকাশে থাকবে ছোট ছোট বেসরকারি মহাকাশ গবেষণা ক্যাপসুল। আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্রের জায়গাটি নিতে পারে তিয়াংগং। চিনা মহাকাশ গবেষণাগার নিয়ে উৎসাহ রয়েছে বহু দেশেরই।

১৮ ১৮
Tiangong space center

চিনের মহাকাশকেন্দ্র তৈরি করার গল্প আসলে কয়েক দশকের পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক বিনিয়োগের ফল। উপগ্রহ উৎক্ষেপণ থেকে শুরু করে মানব মহাকাশ অভিযান, পরীক্ষামূলক গবেষণাগার এবং শেষ পর্যন্ত তিয়াংগং— প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে চিন বর্তমান অবস্থানে এসেছে। ভবিষ্যতে চাঁদ ও গভীর মহাকাশ অভিযানে তিয়াংগং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেই মনে করছেন মহাকাশবিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন গবেষক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।

সব ছবি: এআই সহায়তায় তৈরি ও সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
আরও গ্যালারি