প্রয়াত মুলায়ম সিংহ যাদবের কনিষ্ঠ পুত্র প্রতীক যাদব। বুধবার ভোরে তাঁকে অচৈতন্য অবস্থায় লখনউয়ের সিভিল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৮।
স্বাস্থ্যসচেতন প্রতীক কী ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন, এত কম বয়সে কী ভাবে মৃত্যু হল তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে আসতে শুরু করেছে। এখনও স্পষ্ট নয় মৃত্যুর কারণ। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে প্রতীকের মৃত্যু নিয়ে। সঠিক কারণ জানতে ময়নাতদন্ত করা হচ্ছে।
তবে জানা গিয়েছে, প্রতীক দীর্ঘ দিন ধরে ফুসফুস সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছিলেন। ফুসফুসে রক্ত জমাট বাঁধার জন্য তাঁর চিকিৎসা চলছিল। কয়েক সপ্তাহ আগে তাঁকে লখনউয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল।
সেই সময় তাঁকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন সমাজবাদী পার্টি (এসপি)-র নেতা তথা মুলায়মের জ্যেষ্ঠ পুত্র অখিলেশ যাদব। প্রতীকের শারীরিক অবস্থার সামান্য উন্নতি হলে তাঁকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।
এর পর মঙ্গলবার রাতে প্রতীকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। লখনউয়ের সিভিল হাসপাতালের একটি দল ভোর ৫টা নাগাদ মুলায়ম-পুত্রকে দেখতে তাঁর বাড়িতে যান। পরিস্থিতি সঙ্কটজনক হওয়ায় দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় প্রতীককে। কিন্তু লাভ হয়নি। বুধবার ভোর ৫টা ৫৫ মিনিটে মৃত্যু হয় প্রতীকের।
প্রতীকের মৃত্যুর পরেই তাঁকে নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে জনমানসে। তিনি কে ছিলেন, কী করতেন তা নিয়েও খোঁজখবর শুরু করেছেন অনেকে। প্রয়াত মুলায়ম সিংহ যাদবের দ্বিতীয় স্ত্রী সাধনা গুপ্তের পুত্র ছিলেন প্রতীক। সেই হিসাবে প্রতীক হলেন অখিলেশের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা বা সৎভাই।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতীকের জন্ম ১৯৮৮ সালের ৭ জুলাই। প্রাথমিক পড়াশোনা দেশে করলেও উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডের লিডস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ-র ডিগ্রি ছিল তাঁর।
প্রতীক ছিলেন এক জন ‘ফিটনেস’ অনুরাগী। শরীরচর্চা করতেন নিয়মিত। জিমের ছবি এবং তাঁর রুটিন সংক্রান্ত বিভিন্ন পোস্ট প্রায়শই ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করতেন প্রতীক।
আগে শরীর সচেতন ছিলেন না প্রতীক। পরে শরীরচর্চায় মন দেন। শরীরচর্চার জন্য ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক ভাবে প্রশংসিত ‘বডিবিল্ডিং’ ওয়েবসাইটে জায়গা করে নিয়েছিলেন প্রতীক।
তবে শারীরিক রূপান্তরের কৃতিত্ব প্রয়াত পিতা মুলায়মকেই দিয়েছিলেন প্রতীক। জানিয়েছিলেন, এক দশকেরও বেশি আগে মুলায়মের কথাতেই উৎসাহিত হয়ে শরীরচর্চায় মন দিয়েছিলেন তিনি।
দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ৩৮ বছর বয়সি প্রতীক রাজনীতি থেকে দূরেই ছিলেন। পুরোদস্তুর রাজনৈতিক পরিবারে বড় হলেও রাজনীতিতে কোনও দিনই খুব বেশি সক্রিয় হননি তিনি। তাঁর রিয়্যাল এস্টেট এবং ফিটনেসের ব্যবসা ছিল।
লখনউয়ে ‘দ্য ফিটনেস প্ল্যানেট’ নামে একটি জিম ছিল প্রতীকের। রিয়্যাল এস্টেট এবং জিম ব্যবসার পাশাপাশি গৃহহীনদের জন্য একটি অসরকারি সংস্থাও চালাতেন তিনি।
প্রতীক পশু কল্যাণের বিষয়েও সোচ্চার ছিলেন। পশু কল্যাণমূলক অনেক কাজে ব্রতী ছিলেন তিনি। ‘জীব আশ্রয়’ নামে একটি সংস্থাও চালাতেন। লখনউয়ের ওই অসরকারি সংস্থা পশুদের চিকিৎসা, যত্ন, খাদ্য এবং উদ্ধারের ব্যবস্থা করত।
প্রতীক রাজনীতির পরিবর্তে ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত জীবনযাপন করতেন। তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ আনুষ্ঠানিক ভাবে জানা না গেলেও অনেকের অনুমান, কোটি কোটি টাকার মালিক ছিলেন তিনি।
২০১১ সালে অপর্ণা বিস্ত (অধুনা যাদব)-কে বিবাহ করেন প্রতীক। তাঁদের বিয়েতে রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক এবং বিনোদন জগতের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। দুই সন্তানও রয়েছে দম্পতির।
প্রতীকের স্ত্রী অপর্ণা অবশ্য বরাবরই রাজনীতিতে বেশ সক্রিয়। অপর্ণা ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সদস্য তথা নেত্রী। তিনি সমাজবাদী পার্টিতে তাঁর কর্মজীবন শুরু করলেও ২০২২ সালে বিজেপিতে যোগ দেন।
২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচনে লখনউ ক্যান্টনমেন্ট আসন থেকে সমাজবাদী পার্টির টিকিটে লড়েছিলেন অপর্ণা। কিন্তু বিজেপির রীতা বহুগুণা জোশীর কাছে হেরে যান তিনি। ২০২২ সালে সমাজবাদী পার্টি ছেড়ে অপর্ণা বিজেপিতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি উত্তরপ্রদেশের রাজ্য মহিলা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান।
সম্প্রতি স্ত্রী অপর্ণার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ করতে চেয়ে সংবাদ শিরোনামে এসেছিলেন প্রতীক। জানুয়ারিতে সমাজমাধ্যমে ওই নিয়ে একটি পোস্টও করেন অখিলেশের ভাই। সেখানে অপর্ণাকে ‘স্বার্থপর’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে এই পোস্ট নিয়ে সন্দেহপ্রকাশ করেন অপর্ণার ভাই। তিনি দাবি করেছিলেন, প্রতীকের অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক’ করে ওই পোস্ট করা হয়েছে। প্রতীকও প্রকাশ্যে এই বিষয়ে কিছু বলেননি। ফলে প্রতীকের ব্যক্তিগত জীবনকে কেন্দ্র করে রহস্য তৈরি হয়েছিল সে সময়ে।
বুধবার ভোরে মুলায়ম-পুত্র প্রতীকের মৃত্যু হয়েছে। জানা গিয়েছে, তাঁর দেহের ময়নাতদন্ত করা হবে বুধবারই। প্রতীকের মৃত্যুর পরেই হাসপাতাল চত্বরে যাদব পরিবারের সদস্যেরা পৌঁছে যান। পুলিশি নিরাপত্তা আঁটোসাঁটো করা হয় সেখানে। ময়নাতদন্তের পর প্রতীকের শেষকৃত্য করা হবে বলেও খবর।
সব ছবি: ইনস্টাগ্রাম এবং সংগৃহীত।