এমন একটি ক্লাব যেখানে সদস্যপদ পাওয়ার অপেক্ষমান তালিকা ৩৭ বছরের। কেবল প্রভাবশালী মানুষ, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্তা এবং বিত্তশালীরাই জায়গা পেতে পারেন সেই ক্লাবে। ক্লাবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইংরেজ শাসন এবং ভারতীয় প্রভাবশালীদের ইতিহাস। এমন ক্লাব যার সদস্যপদ পাওয়ার কথা সাধারণ মানুষের কল্পনাতেও আসবে না। দিল্লির সেই জিমখানা ক্লাবই এখন পরিণত হয়েছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
দিল্লির জিমখানা ক্লাবকে আগামী ৫ জুনের মধ্যে লুটিয়েন্স দিল্লির ২৭.৩ একর জমি ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। ২২ মে আবাসন ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রকের অধীনস্থ ভূমি ও উন্নয়ন দফতর (এল অ্যান্ড ডিও)-এর তরফে জিমখানা ক্লাবকে নির্দেশিকা পাঠানো হয়।
সেই নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে, দেশের রাজধানীর সংবেদনশীল এবং কৌশলগত এলাকার মধ্যে ওই ক্লাবটি রয়েছে। জনগণের নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে ওই জমির প্রয়োজন রয়েছে। লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের কাছেই বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে দিল্লির ওই অভিজাত ক্লাব। চারপাশে রয়েছে সরকারি এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন দফতর, ভবন।
জিমখানা ক্লাবের ইতিহাস ১১৩ বছরের পুরনো। ব্রিটিশ আমলে তৈরি হয়েছিল এই ক্লাব। ১৯১১ সালে কলকাতা থেকে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সরানোর কথা ঘোষণা করেন ইংল্যান্ডের রাজা পঞ্চম জর্জ। নতুন রাজধানীতে ব্রিটিশ কর্তাদের আমোদ-প্রমোদের জন্য তাই প্রয়োজন হয়েছিল একটি ক্লাবের। ১৯১৩ সালে চালু হয় জিমখানা ক্লাব। তখন নাম ছিল ইম্পেরিয়াল দিল্লি জিমখানা ক্লাব। ১৯৩০-এর দশকে ক্লাবের ভবনের নির্মাণ শেষ হয়। নকশা করেছিলেন ব্রিটিশ স্থপতি রবার্ট টি রাসেল। কনট প্লেসের নকশাও করেছিলেন তিনি। সেই সঙ্গে কমান্ডার ইন-চিফ’স রেসিডেন্সের নকশা তাঁর হাতেই।
ক্লাবটিতে ইংরেজ সরকারের উচ্চপদস্থ সরকারি এবং সেনা আধিকারিকেরা গোপন বৈঠক, খেলাধুলো, খানাপিনা করতেন। চলত দিনভর আড্ডাও। ব্রিটিশদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজা-মহারাজা এবং প্রভাবশালী ভারতীয়দেরও প্রবেশাধিকার ছিল ইম্পেরিয়াল দিল্লি জিমখানা ক্লাবে। তবে ভারতীয়দের ওই ক্লাবের মূল ভবনে ঢোকার অনুমতি ছিল না। কেবলমাত্র মূল ভবন সংলগ্ন বাগানে বসতে পারতেন তাঁরা।
ক্লাবের বিখ্যাত সুইমিং পুল তৈরির জন্য ১৯৩০-এর দশকে ২১ হাজার টাকা দিয়েছিলেন খোদ ভাইসরয়ের স্ত্রী লেডি উইলিংটন। কারণ তাঁর সুইমিং পুলের শখ ছিল। স্বাধীনতার পরে ইম্পেরিয়াল দিল্লি জিমখানা ক্লাবের নাম হয় জিমখানা ক্লাব। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় এই ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়েই সুরাপাত্রে চুমুক দিয়ে একে অন্যকে বিদায় জানিয়েছিলেন শিখ, হিন্দু, মুসলিম বাহিনীর অফিসারেরা। জিমখানা ক্লাবের নকশায় আজও কোনও বদল ঘটানো হয়নি।
ইংরেজ চলে যাওয়ার পরেও জিমখানা ক্লাবের ঐতিহ্য এবং মুনশিয়ানা অপরিবর্তিত থেকেছে। ক্লাবের সংস্কৃতি এবং সদস্যপদের অধিকার স্থানান্তরিত হয়েছে আমলা, উচ্চপদস্থ সেনা আধিকারিক, শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ এবং বিত্তশালীদের মধ্যে।
১১৩ বছরের পুরনো এবং আভিজাত্যের প্রতীক জিমখানা ক্লাব এখন ভারতীয় বিশিষ্টদের বিনোদনের জায়গা। সামাজিক মেলামেশা এবং খেলাধুলারও জায়গা। ক্লাবটিতে খাবার, মদ সবই পাওয়া যায়। কিন্তু জিমখানা ক্লাবের সদস্য হওয়া মুখের কথা নয়। সদস্যপদ পেতে হলে খসাতে হয় ৫-২০ লক্ষ টাকা। আবার ২০ লক্ষ টাকা থাকলেই যে জিমখানা ক্লাবের সদস্য হওয়া যায়, তেমনটা নয়।
ওই ক্লাবের সদস্যের ৪০ শতাংশ আমলাদের জন্য সংরক্ষিত। ৪০ শতাংশ সংরক্ষিত সেনা আধিকারিকদের জন্য। বাকি ২০ শতাংশ সমাজের বিশিষ্ট বা ‘ভিআইপি’দের জন্য রাখা, যার মধ্যে নামী শিল্পপতি, বিত্তশালী, রাজনীতিবিদ, চিকিৎসক, আইনজীবী রয়েছেন।
জিমখানা ক্লাবে সদস্য হওয়ার অপেক্ষমান তালিকা বর্তমানে ৩৭ বছরের। ওই ক্লাবের সদস্যসংখ্যা বাড়ানো হয় না। পুরনো কোনও সদস্য মারা গেলে বা কেউ সদস্যপদ ছাড়লে তবেই নতুন কেউ জায়গা পান। সেই হিসাবে ওই ক্লাবে প্রতি বছর গড়ে ৬০-৯০ জন নতুন সদস্যপদ পান।
দিল্লির লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের কাছে ২৭.৩ একর (প্রায় ৮৭৩ কাঠা) জমি জুড়ে রয়েছে অভিজাত জিমখানা ক্লাব, যা আমেরিকার প্রেসিডেন্টের বাসভবন হোয়াইট হাউসের জমির থেকেও বড়। কাজ করেন ৬০০ কর্মী। সেই জিমখানা ক্লাবই এ বার খালি করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার।
লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের কাছেই বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে দিল্লির ওই অভিজাত ক্লাব। চারপাশে রয়েছে সরকারি এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন দফতর, ভবন। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত পরিকাঠামো মজবুত এবং সুরক্ষিত করার জন্য ২৭.৩ একর (প্রায় ৮৭৩ কাঠা) জমিটির প্রয়োজন। আবাসন এবং নগরোন্নয়ন সংক্রান্ত মন্ত্রকের অধীনে জমি এবং উন্নয়ন দফতর (এল অ্যান্ড ডিও)-এর তরফে জিমখানা ক্লাবকে নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে।
সেই নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে, দেশের রাজধানীর সংবেদনশীল এবং কৌশলগত এলাকার মধ্যে ওই ক্লাবটি রয়েছে। ২, সফদরজঙ রোডের ওই জমি ১৯১৮ সালে আদতে ইজারা দেওয়া হয়েছিল ইম্পেরিয়াল দিল্লি জিমখানা ক্লাব লিমিটেডকে। এখন তা হয়েছে দিল্লি জিমখানা ক্লাব। সামাজিক মেলামেশা, খেলাধুলার জন্যই সেই জমি দেওয়া হয়েছিল। এখন জনস্বার্থ এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত প্রকল্পের কারণে সেই জমির প্রয়োজন হয়েছে।
ইজারার চুক্তির চার নম্বর ধারা অনুসারে এখন ভারতের রাষ্ট্রপতি জমি এবং উন্নয়ন দফতরের মাধ্যমে সেই চুক্তিতে ইতি টানছেন। ২৭.৩ একর জমিতে যে ভবন, পরিকাঠামো, বাগান রয়েছে, তার সবেরই আইনি মালিকানা এ বার দফতরের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির হাতে অর্পিত হবে।
আগামী ৫ জুন সেই মালিকানা গ্রহণ করবে জমি এবং উন্নয়ন দফতর। ওই দিন শান্তিপূর্ণ ভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে মালিকানা হস্তান্তর করতে বলা হয়েছে ক্লাব কর্তৃপক্ষকে। তা না হলে আইনি পদক্ষেপ করা হবে বলেও জানানো হয়েছে নির্দেশিকায়।
এই নির্দেশের বিরুদ্ধে দিল্লি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে ক্লাবটি। পাশাপাশি কেন্দ্রের কাছেও আবেদন জানানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় আবাসন এবং নগরোন্নয়ন মন্ত্রকের সঙ্গে দ্রুত বৈঠকে বসতে চেয়ে আর্জি জানিয়েছে দিল্লি জিমখানা ক্লাব। শনিবার সদস্যদের বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে সে কথা জানিয়েছেন ক্লাব কর্তৃপক্ষ। তাঁদের তরফে বিবৃতি দিয়ে আরও জানানো হয়েছে যে, লুটিয়েন্স দিল্লির ওই জায়গাতেই যাতে ক্লাব চালানো যায়, তা নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
দিল্লি জিমখানা ক্লাবের তরফে জারি করা বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশিকা পাওয়ার পরেই পরিচালন সমিতি বৈঠকে বসেছিল। ভূমি এবং উন্নয়ন দফতর (এল অ্যান্ড ডিও)-কে দ্রুত চিঠিও পাঠানো হয়েছে। সদস্য এবং ক্লাবের কর্মীদের স্বার্থে কিছু বিষয় স্পষ্ট করতে বলা হয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের অধীনে থাকা ওই দফতরকে। দফতরের আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলার জন্য সময় চেয়ে আর্জিও জানানো হয়েছে।
দিল্লির শতাব্দীপ্রাচীন জিমখানা ক্লাবে উচ্ছেদের নোটিস পেয়ে দিশাহারা ক্লাবের কর্মীরা। ওই ক্লাবে প্রায় ৬০০ কর্মীর অধিকাংশই পুরনো, দুই বা তিন দশক ধরে কাজ করছেন। আচমকা কেন্দ্রের নোটিসে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাঁদের ভবিষ্যৎ। চাকরির বিষয়ে কেন্দ্রের কাছে নিশ্চয়তা চেয়েছেন জিমখানা ক্লাবের কর্মীরা। ক্লাব কর্তৃপক্ষের তরফেও এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে কেন্দ্রকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে খবর।
ওই কর্মীদের বক্তব্য, ক্লাবকে নোটিস দেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু তাঁদের সঙ্গে কেউ কোনও কথা বলেননি। তাঁদের কেবল জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ৫ জুন থেকে ক্লাব বন্ধ হয়ে যাবে। তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন জিমখানার কর্মীরা। ক্লাবের ইউনিয়ন প্রধান নন্দন নেগী বলেন, ‘‘আমার কাছে ফোনের পর ফোন আসছে। কর্মচারীরা ফোন করছেন। জিজ্ঞাসা করছেন, তাঁরা এ বার কোথায় যাবেন? কী করবেন? আমরা খবরটা পাওয়ার পর থেকেই থমকে রয়েছি। এ বার আমাদের পরিবারের কী হবে?’’ ক্লাবের এক কর্মীর কথায়, ‘‘আমাদের মধ্যে অনেকে এই ক্লাবে তিন দশক ধরে কাজ করেছি। কেউ ১৫ বছর ধরে আছি, কেউ ২০ বছরের বেশি, কেউ আবার ৩৫-৪০ বছর ধরে। জানি না কী ভাবে সংসার চালাব।’’
অন্য দিকে, ক্লাবটির সম্পত্তির পরিমাণও প্রকাশ্যে এসেছে। নিউজ় ১৮-এর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের তথ্য অনুযায়ী ২৭.৩ একর (প্রায় ৮৭৩ কাঠা) জমি জুড়ে ওই অভিজাত জিমখানার নামে ১৬২ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ এবং প্রায় ১২৯ কোটি টাকার মোট সম্পত্তি রয়েছে।
২০২৪ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ক্লাবটির মিউচুয়াল ফান্ড পোর্টফোলিয়োর বাজারমূল্য ছিল প্রায় ২১৭ কোটি টাকা। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে— আদিত্য বিড়লা সান লাইফ কর্পোরেট বন্ড ফান্ড (১৮.৭ কোটি টাকা), কোটাক কর্পোরেট বন্ড ফান্ড (১৪.২ কোটি টাকা), আইসিআইসিআই প্রুডেনশিয়াল কর্পোরেট বন্ড ফান্ড (১৩.৫ কোটি টাকা) এবং আইসিআইসিআই প্রুডেনশিয়াল ব্যাঙ্কিং অ্যান্ড পিএসইউ ডেব্ট ফান্ডে (প্রায় ১১ কোটি টাকা)। মিউচুয়াল ফান্ড ছাড়াও, ১২ মাসের বেশি মেয়াদে ২৪ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছিল। ওই অর্থবর্ষের শেষে ক্লাবের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ২ কোটির বেশি টাকা ছিল।
নথিপত্র থেকে জানা গিয়েছে, ক্লাবটির মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১২৯ কোটি টাকা। আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস— রেস্তরাঁ, বার এবং ব্যাঙ্কোয়েট, যা থেকে এই বছরে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা আয় হয়েছে। মোট ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ৬৬.১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬৯.২ কোটি টাকা হয়েছে।
অতীতে বিতর্কেও জড়িয়েছে জিমখানা ক্লাব। ২০২২ সালে পরিদর্শনের পর কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রক দিল্লি জিমখানা ক্লাবের বেশ কিছু বেআইনি কার্যকলাপের কথা তুলে ধরেছিল। এর মধ্যে ৫০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ, আর্থিক অনিয়ম থেকে শুরু করে অবৈধ নিয়োগ এবং জাতীয় নিরাপত্তা লঙ্ঘনের মতো গুরুতর বিষয় রয়েছে।
পুরো বিষয়টি নিয়ে আসরে নেমেছে বিরোধী কংগ্রেস শিবিরও। বিরোধী কংগ্রেসের অভিযোগ, রাহুল গান্ধী ওই ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্যই ক্লাবটিকে উচ্ছেদের নোটিস দেওয়া হয়েছে।
সব ছবি: সংগৃহীত।