বিহারের পটনায় দুই কোচিং সেন্টারের মধ্যে অশান্তির ছ’দিন পরেও বিতর্ক প্রশমিত হওয়ার কোনও লক্ষণই নেই। খান স্যরের কোচিং সেন্টার খান গ্লোবাল স্টাডিজ় ও পার্শ্ববর্তী জ্ঞান বিন্দু জিএস অ্যাকাডেমি কোচিং সেন্টারের বিবাদের ঘটনার জল বহু দূর গড়িয়েছে। সেই ঘটনায় আপাতত গ্রেফতারি এড়াতে পেরেছেন খান স্যর।
গ্রেফতারি এড়াতে আগাম জামিনের আবেদন করেছিলেন খান স্যর। তাতেই আপাতত স্বস্তিতে এই ইউটিউবার ও জনপ্রিয় শিক্ষক। জেলা জজের আদালতে জামিনের আবেদনের শুনানির পর অন্তবর্তিকালীন সুরক্ষা পেয়েছেন খান স্যর। আদালতের নির্দেশ, পুলিশ তদন্ত চালানোর জন্য খান স্যর ওরফে ফয়জ়ল খানকে জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত তাঁকে গ্রেফতার করা যাবে না।
খান স্যরের মাথার উপর থেকে গ্রেফতারির খাঁড়া আপাতত সরলেও এই মামলায় এখনও জেলের গরাদের পিছনে রয়েছেন জ্ঞান বিন্দু কোচিং সেন্টারের পরিচালক রোশন আনন্দ। একের পর এক ঘটনা প্রকাশ্যে আসছে এই দুই যুযুধানকে কেন্দ্র করে। পটনার মুসল্লপুর কোচিং হাবে অবস্থিত দু’টি নামকরা কোচিং সেন্টারের এই বিবাদ অবশ্য আজকের নয়। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জেরে একাধিক বার সংঘাতের নজির রয়েছে।
পটনার মুসল্লপুরের কিসান কোল্ড স্টোরেজ নামের একটি এলাকা জুড়ে রয়েছে একাধিক ছোট-বড় কোচিং সেন্টার। কিসান কোল্ড স্টোরেজ দীর্ঘ দিন ধরেই একটি কোচিং হাব হিসাবে পরিচিত। আর এই কোচিং হাবকে ঘিরেই যত বিবাদ। দেশজোড়া বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে এই এলাকাটি।
২০১৮-১৯ সাল পর্যন্ত এই ক্যাম্পাসে বিভিন্ন আকারের প্রায় ২০টি কোচিং সেন্টার ছিল। জ্ঞান বিন্দু কোচিং সেন্টার এবং খান গ্লোবাল স্টাডিজ়ও সেখান থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করত। কোভিড অতিমারির পর অনেক কোচিং সেন্টারই পাততাড়ি গোটাতে বাধ্য হয়। তত দিনে খান স্যর অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে ফেলেছিলেন।
ক্যাম্পাসে ভবন নির্মাণ করে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কোচিং সেন্টারগুলি হল ও অফিস ভাড়া নিয়ে তাঁর কোচিং সেন্টারের কাজকর্মের পরিধি প্রসারিত করতে শুরু করেন খান স্যর। ফলে বর্তমানে অন্যান্য কোচিং সেন্টারের তুলনায় কিসান কোল্ড স্টোরেজের অধিকাংশ শ্রেণিকক্ষ ও হলে এখন খান গ্লোবাল স্টাডিজ়ের নিয়ন্ত্রণ।
অন্য দিকে ২০১৭ সালে রোশন আনুষ্ঠানিক ভাবে জ্ঞান বিন্দু জিএস অ্যাকাডেমি চালু করেন, যা এখন জ্ঞান বিন্দু কোচিং নামে পরিচিত। শুরুটা ছিল সাদামাঠা। তাঁর প্রথম ক্লাসে মাত্র চার জন ছাত্র উপস্থিত ছিলেন। অল্প সংখ্যক শিক্ষার্থী দেখে হতাশ না হয়ে, ধীরে ধীরে ছাত্রছাত্রীদের আস্থা জিতে নেন খান স্যর এবং প্রথম দিকের শিক্ষার্থীদের ভাল ফলাফল পরবর্তী কালে জ্ঞান বিন্দুকে খান গ্লোবাল স্টাডিজ়ের প্রতিদ্বন্দ্বীর আসনে বসিয়ে দেয়।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, খান স্যর ও রোশনের মধ্যে বিবাদের সূত্রপাত বিহার পুলিশ নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফলকে ঘিরে। দু’টি কোচিং সেন্টারই বিপুল সংখ্যক সফল প্রার্থীর কৃতিত্ব দাবি করেছিল। একটি সেন্টার দাবি করে ১২,০০০ পরীক্ষার্থী সফল এবং অন্যটি ১০,০০০ পরীক্ষার্থী। উভয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা একে অপরের পোস্টার ছিঁড়ে ফেললে উত্তেজনা চরমে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত হাতাহাতিতে গড়ায়।
তারও আগে ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসারের ২৪টি পদের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছিল ফেব্রুয়ারি মাসে। অভিষেক কুমার ওরফে অভিষেক পটেল নামের এক তরুণ সেই তালিকার শীর্ষে ছিলেন। ফলাফল ঘোষণার পর, দু’টি কোচিং সেন্টারই তাঁকে তাদের ছাত্র বলে দাবি করে। দু’পক্ষই নিজের নিজের দাবিতে অনড় ছিল এবং প্রমাণস্বরূপ নথিপত্রও পেশ করে।
২৮ মার্চ অভিষেককে একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ডাকেন খান স্যর। সেখানে উপস্থিত হন অভিষেক। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হন জ্ঞান বিন্দুর রোশন। হাটে হাঁড়ি ভাঙার জন্য অভিষেকের সঙ্গে তাঁর হোয়াট্সঅ্যাপ জনসমক্ষে ফাঁস করে দেন। খান স্যারের বিরুদ্ধে ১০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে টপারকে কিনে নেওয়ার অভিযোগ তোলেন রোশন। সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন অভিষেক।
জ্ঞান বিন্দু কোচিংয়ের শিক্ষক আদর্শের দাবি, খান স্যর চান এই কোচিং ক্যাম্পাসের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকুক তাঁর হাতে। বর্তমানে ক্যাম্পাসে মাত্র ছ’টি কোচিং সেন্টার রয়েছে। বাজার সমিতি, মহেন্দ্রু এবং মুসল্লপুর হাট এলাকা জুড়ে কোচিং ইনস্টিটিউট চালানোর মতো ভাল জায়গা খুব কমই আছে বলে দাবি স্থানীয়দের। তাই এমন এক ‘সোনা ফলানো’ মাটিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এমনটাই মনে করছেন স্থানীয়দের একাংশ।
জ্ঞান বিন্দুর শিক্ষক ও কর্মীদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসের মালিককেও টাকা ও ক্ষমতার জোরে বশ করে রেখেছেন খান স্যর। তবে স্থানীয়দের দাবি, খান স্যর তাঁদের মোটা অঙ্কের ভাড়া দেন এবং ক্যাম্পাসটি সম্প্রসারিত করেছেন। সে কারণে ক্যাম্পাসের মালিকের তাঁর প্রতি পক্ষপাত রয়েছে। নিন্দকদের সমস্ত অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছেন ক্যাম্পাসের মালিক আরবি প্রসাদ। তিনি বলেন, ‘‘আমরা শুধু চাই এই জায়গাটি থেকে সর্বাধিক সংখ্যক সফল প্রার্থী তৈরি হোক। কারও সঙ্গে আমাদের কোনও শত্রুতা নেই। আমরা কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সমর্থনও করি না।’’
পটনার এই কোচিং হাবটিতে স্বাভাবিক ভাবেই প্রচুর ছাত্রাবাস ও হস্টেল রয়েছে। জ্ঞান বিন্দুর পক্ষ থেকে বার বার অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, খান স্যর নির্দিষ্ট এক হস্টেলের কিছু বাসিন্দাকে ব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেন। তাদের অভিযোগ, ২০২৩ সালে জ্ঞান বিন্দু কোচিং সেন্টারে হামলা চালানো হয়। ডিসপ্লে স্ক্রিন থেকে শুরু করে অফিসের আসবাবপত্র পর্যন্ত সমস্ত কিছু ভাঙচুর করা হয়েছিল।
এই ঘটনায় রোশন অভিযোগের আঙুল তোলেন খান স্যরের বিরুদ্ধেই। তিনি দাবি করেন যে, হামলাকারীরা সেই হস্টেলেই ছিলেন এবং খান স্যরের অফিস থেকে তাঁদের হকি স্টিক ও লাঠি সরবরাহ করা হয়েছিল। এই ছাত্রাবাসগুলিকে ঘিরেও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ কম নয়। অভিযান চালিয়ে প্রায়ই এগুলোর চত্বর থেকে বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয় বলে অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে খান স্যারেরও। রোশনের বিরুদ্ধে অন্য হস্টেলের ছাত্রদের দিয়ে হামলা ও তাঁর কর্মীদের উপর হামলায় উস্কানি দেওয়ার অভিযোগও তুলেছিলেন তিনি। ২০২১ সালের মার্চ মাসে রোশন, তাঁর ভাই প্রিন্স এবং অন্যদের বিরুদ্ধে খান স্যরের শ্রেণিকক্ষে জোর করে ঢুকে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে পুলিশের কাছে একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। ২০১৯ সালে খান স্যরের কোচিং সেন্টারে বোমাও ছোড়া হয়েছিল।
একে অপরের বিরুদ্ধে লাগাতার কাদা ছোড়াছুড়ি করতেও কেউ কম যান না। রোশনের কোচিং ক্লাসকে ‘দারোগা ফ্যাক্টরি’ বলে আখ্যা দেওয়ার পর পাল্টা পাটকেল মেরেছিলেন জ্ঞান বিন্দুর পরিচালক। খান স্যরকে ‘রিল টিচার’ বলে আখ্যা দেন। তাঁর ছাত্রেরাও খান স্যরকে ওই নামেই ডাকেন।
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন রৌনক (নাম পরিবর্তিত)। তিনি বলেন, ‘‘অনলাইন কোচিংয়ের ক্ষেত্রে খান গ্লোবাল একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে রয়েছে। অপর দিকে অফলাইন কোচিংয়ের ক্ষেত্রে খান গ্লোবাল স্টাডিজ়ের চেয়ে জ্ঞান বিন্দুর ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেশি।’’ ঠিক এই কারণেই হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী রোশনের সমর্থনে সমাবেশ করেছিলেন।
দু’টি কোচিং সেন্টারই ২০১৭ সাল থেকে একই ক্যাম্পাসে থেকে ব্যবসা করে আসছে। উভয়েই সেই বিভাগে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায় যেখানে অন্য জনের প্রভাব রয়েছে। ক্যাম্পাসের এক কর্মী জানান, দু’টি কোচিং সেন্টারের কর্মীদের মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষ বাধে। বেশির ভাগ অতি তুচ্ছ কারণে। যদিও এর নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘ ব্যবসায়িক প্রেক্ষাপট, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হল পুরো কোচিং বাজারের উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
সব ছবি: সংগৃহীত।