Avalanche

পা জখম, তবু হামাগুড়ি দিয়ে উঠে এসেছেন মৃত্যুগহ্বর থেকে

তুষারধস কি কারও প্রাণ বাঁচাতে পারে? তা-ও আবার বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে, প্রায় ৬ হাজার মিটার উচ্চতায়? দাওয়া শেরপার জীবনের কঠিনতম মুহূর্তে এই তুষারধসই ছিল ঈশ্বরের আশীর্বাদ। অসম্ভব কিংবা অতিমানবিক-এর মতো বিশেষণগুলিও যথেষ্ট নয় এই প্রত্যাবর্তনের পক্ষে।

স্বাতী মল্লিক
শেষ আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬ ০৭:১৮
মৃত্যুঞ্জয়ী: বেঁচে ফিরে আসার পর দাওয়া শেরপা।

মৃত্যুঞ্জয়ী: বেঁচে ফিরে আসার পর দাওয়া শেরপা। ছবি: মিংমার শেরপা।

এভারেস্টে পঞ্চাশ ফুট গভীর ক্রেভাসের (বরফের গভীর ফাটল) ভিতরে পড়ে গিয়েছিলেন দাওয়া শেরপা। এমন সময় তাঁকে উদ্ধার করে এক তুষারধস। তুষার জমে পূর্ণ হয় সেই গভীর ফাটল, তৈরি করে ফেলে আস্ত তুষার র‌্যাম্প। সেই বরফের স্তূপের উপর দিয়েই হাঁচোড়পাঁচোড় করে মৃত্যুকূপের অতল থেকে উঠে আসেন দাওয়া। পাক্কা আড়াই দিন পরে!

‘জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য’

নেপালের ওখালধুঙ্গা জেলার বাসিন্দা, বছর বাহান্নর দাওয়ার জীবনে বিপদ এই প্রথম নয়। কিন্তু প্রতি বারই নিরাপদে ফিরে এসেছেন তিনি। ২০০৮ সালে মাকালু অভিযানে নীচে নামার সময়ে এক পায়ের ক্র্যাম্পন হারিয়ে যায়। বহু ক্ষণ সেটা তিনি বুঝতেই পারেননি। ফলে এক পায়ে ক্র্যাম্পন নিয়েই বিপজ্জনক মাকালু থেকে বেস ক্যাম্পে নেমে আসেন। এর পর থেকেই তাঁকে ‘হিলারি’ নামে ডাকা শুরু। সেই নামটা আজও রয়ে গিয়েছে। গত বছর, ২০২৫ সালে শীতকালীন চুলু ওয়েস্ট অভিযানে খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে এক নেপালি পোর্টারের সঙ্গে বেস ক্যাম্প থেকে নীচে নামার সময়ে নিখোঁজ হন দাওয়া। সে বারও ছয় দিন নিখোঁজ ছিলেন তাঁরা। যখন উদ্ধারকারী দল খোঁজাখুঁজি শুরু করেছে, দেখা যায়, জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসছেন তাঁরা!

যে রাঁধে, সে...

এ বছর প্রথমে এভারেস্টে রাঁধুনি হিসাবেই ক্যাম্প-২ পর্যন্ত গিয়েছিলেন দাওয়া। নেপালের একটি ছোটখাটো সংস্থা ‘হিমালয়ান ট্রাভার্স অ্যাডভেঞ্চার্স’-এর হয়ে কাজ করছিলেন। কিন্তু বাদ সাধলেন দলেরই এক শেরপা। কোনও কারণবশত তিনি সামিটে যাওয়ার দল থেকে বাদ পড়লেন। হুকুম হল, দলের এক ক্লায়েন্টকে সামিটে নিয়ে যেতে হবে ক্যাম্প-২’এ থাকা দাওয়াকেই। এ দিকে কোনও কিছুতে ‘না’ বলা দাওয়ার ধাতে নেই। ফলে শেষ মুহূর্তে হাতা-খুন্তি ফেলে পোল্যান্ডের মারিউস চিয়েলওস্কিকে সামিটে নিয়ে যাওয়ার গুরুভার তুলে নিলেন নিজের কাঁধে। যদিও মরসুমের অন্তিম লগ্নে, ২৮ মে তাঁরা সামিট পর্যন্ত পৌঁছতে পারেননি। মারিউস খুব আস্তে হাঁটছিলেন। সম্ভবত অ্যাক্লাইমেটাইজ়েশন (অধিক উচ্চতার সঙ্গে শরীরের খাপ খাইয়ে নেওয়া) ঠিক করে হয়নি তাঁর। ফলে শরীর দিচ্ছিল না। তাই সামিট না করেই ফিরে আসেন দু’জনে। দলের অপর ক্লায়েন্ট, প্রাক্তন ব্রিটিশ মেরিন ক্রিস থ্রল ওই দিন বিকেল পাঁচটা নাগাদ এক শেরপার সঙ্গে সামিট করে রাতে নেমে আসেন ক্যাম্প-৪’এ।

‘শেষ’ দেখা

‘ডেথ জ়োন’-এ রাত কাটিয়ে পর দিন, ২৯ মে সকালে উঠে ক্রিস দেখেন, তাঁর শেরপা কোত্থাও নেই! সম্ভবত তিনি রাতেই ক্যাম্প-৩ নেমে গিয়েছেন, ক্রিসকে ফেলে। মারিউসও নীচে নামতে শুরু করেছেন। গোটা ক্যাম্প-৪’এ তখন মাত্র দু’টি প্রাণী— ক্রিস আর দাওয়া। এভারেস্টের মরসুম শেষ হয়ে আসছে। ২৯ মে খুম্বু হিমবাহ থেকে মই খুলে নেওয়ার কথা। অন্য দলের সকলেই ততক্ষণে নীচে নেমে গিয়েছেন। জলদি তল্পিতল্পা গুটিয়ে দু’জনে নামতে শুরু করলেন। কিন্তু ক্যাম্প-৩’এর আগেই ইয়েলো ব্যান্ডের কাছে ভারী ব্যাগটা রেখে বসে পড়লেন দাওয়া। মারিউসের ব্যাগটাও তো তাঁর কাছে। তা দেখে এগিয়ে আসেন ক্রিস— ‘‘দাওয়া ভাই, তুমি ঠিক আছো তো?’’ দাওয়া উত্তর দেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমি নীচে নামতে থাকো।” পাহাড়ে হাঁটার সময়ে কেউ এগিয়ে-পিছিয়ে পড়েই। তাই চিন্তা না করে এগিয়ে যান ক্রিস। পিছনে বসে থাকেন দাওয়া। ৭৬০০ মিটার উচ্চতায়। সেই ‘শেষ’ দেখা।

অল্প কিছু দূর নেমে ক্রিসের সঙ্গে দেখা মারিউসের। ততক্ষণে তাঁর অক্সিজেন ফুরিয়েছে, হাতে ফ্রস্টবাইট শুরু হয়েছে। ক্রিস বুঝলেন, মারিউসের সাহায্য দরকার। পিছনে তাকিয়ে দেখলেন, দূরে দাওয়া তখনও বসে আছেন। প্রাক্তন মেরিন ক্রিস কাউকে পিছনে ফেলে রেখে যাওয়ার শিক্ষা পাননি নিজের কর্মজীবনে। কিন্তু সামনে এখন উভয়সঙ্কট। কী করবেন তিনি? অসুস্থ মারিউসকে নিয়ে নীচে নামার চেষ্টা করবেন? নাকি উঠে গিয়ে দেখবেন, কেন এখনও দাওয়া নামছেন না?

দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভেবে দেখলেন, শেরপারা তো এই পথে অভ্যস্ত! দাওয়া হয়তো বহু বার এই পথে ওঠা-নামা করেছেন। তিনি ঠিকই নেমে আসতে পারবেন। কিন্তু মারিউসকে ছেড়ে গেলে হয়তো তিনি একা নামতে পারবেন না। উল্টে হাইপোথার্মিয়া হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই মারিউসের সঙ্গে নিজের অক্সিজেন মাস্ক ভাগাভাগি করে, নামা শুরু করলেন ক্রিস। হোয়াইট আউটের মধ্যে দিয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ পেরোতে সময় লাগল প্রায় ১১ ঘণ্টা! ক্যাম্প-২’এ পৌঁছে বিশ্রাম নিলেন, খাওয়াদাওয়া করলেন। তখনও দাওয়া ফিরলেন না। ততক্ষণে ক্রিস বুঝে গিয়েছেন, কিছু গোলমাল হয়েছে। ক্যাম্প-২ থেকে দাওয়ার না-ফেরার বার্তা বেস ক্যাম্পে পাঠিয়ে ক্রিস ফের নামতে শুরু করলেন মারিউসকে নিয়ে।

এভারেস্টে, একা!

এদিকে দাওয়াকে রেখে ক্রিস যখন এগিয়ে যান, তখনই শেষ হয়ে গিয়েছিল দাওয়ার অক্সিজেন সিলিন্ডার। বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়েই পড়েছিলেন দাওয়া। কত ক্ষণ, কত ঘণ্টা ঘুমিয়েছিলেন, মনে নেই। এক সময়ে উঠে বুঝতে পারেন, নামতে হবে। হাত-পা সচল না করলে ফ্রস্টবাইট হতে পারে। ক্যাম্প-৩’এ নেমে জল গরম করে, একটু খাবার খেয়ে সুস্থ হন। ফের নামা শুরু। ক্যাম্প-২’এ এসে দেখলেন, জনমনিষ্যি নেই! গোটা ক্যাম্প শুনশান। বুঝলেন, গোটা এভারেস্টে একা পড়ে আছেন তিনি। তাতে কী! মনোবল অটুট।

দেখতে দেখতে একাই পৌঁছে গেলেন খুম্বু হিমবাহের সেই ক্রেভাসের সামনে। এ বারের অভিযানে খানপাঁচেক মই এক সঙ্গে বেঁধে এই বিশাল ক্রেভাস পেরোতে হয়েছে সকলকে। দাওয়া দেখলেন, সেখানে তখনও একটা মইয়ের সেতু অটুট। হয়তো তাঁর আশাতেই। কোনও রকমে একা একা পেরোলেন সেটাও। পিঠে তখনও ভারী ব্যাগ। কিন্তু এর পরের ক্রেভাসটায় মাত্র একটা মই লাগানো। কী ভাবে সেটা টপকানো যায়, সেই পথ খুঁজতে গিয়েই আচমকা ভেঙে পড়ল একটি স্নো-ব্রিজ। সোজা গিয়ে পড়লেন প্রায় ৫০ ফুট ক্রেভাসের গভীরে।

রাখে হরি, মারে কে

এতটা নীচে পড়ার সময়েই দাওয়া গুরুতর চোট পেলেন পায়ে। সম্ভবত পায়ের হাড় ভাঙে তখনই। দু’দিকে খাড়াই হিমশীতল দেওয়াল। সঙ্গী বলতে ভারী ব্যাকপ্যাক, ফাঁকা অক্সিজেন সিলিন্ডার, আর পকেটে থাকা গুটিকয়েক এনার্জি বার।

তবু ভেবেছিলেন, কেউ হয়তো আসবে উদ্ধারে। তাই একটু একটু করে এনার্জি বার খেয়েছেন। শরীরে জলের ঘাটতি মেটাতে সোজা মুখে পুরেছেন বরফ। কিন্তু বৃথা আশা। ক্রেভাসে বসেই এক দিন দেখলেন, উপর দিয়ে উড়ে গেল কপ্টার। হয়তো তাঁর খোঁজেই। হাত নাড়িয়েছিলেন, কারও নজরে আসেনি।

এ ভাবেই কেটেছে আড়াই দিন। বাঁচার আশা কমছে, হাইপোথার্মিয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। ক্রেভাসের অতলে অক্সিজেন কম। নেই খাবার, জল। বাড়িতে বৌ আর কচি মেয়েটার মুখ বোধহয় আর দেখা হল না।

তখনই ‘মির‌্যাকল’। এভারেস্টের বুকে নামল তুষারধস। সেই তুষার জমল ওই ক্রেভাসে। হাড় ভেঙে উঠে দাঁড়ানোর শক্তি হারিয়েছেন, অদম্য মনোবলে হামাগুড়ি দিয়ে সেই বরফের ঢাল বেয়ে উপরে উঠে এলেন দাওয়া। ক্রেভাসে পড়ে রইল ব্যাগ আর খালি সিলিন্ডার। উপরে এসে পেলেন ফিক্সড রোপ। দড়ি ধরে, ঘষটে ঘষটে ফের নীচে নামা শুরু।

প্রত্যাবর্তন

২৯ মে দাওয়াকে শেষ দেখার পরে কেটেছে পাক্কা ছ’দিন। তাঁর ফেরার আশা ছেড়েছে পরিবারও। নিয়মমতো দাওয়ার পারলৌকিক কাজও শুরু করেছিলেন তাঁরা। এমন সময়ে ৪ জুন সকালে খবর আসে, বেস ক্যাম্পের কাছে ক্র্যাম্পন পয়েন্টের কাছে আবর্জনা সাফাই করার সময়ে ‘সাগরমাথা পলিউশন কন্ট্রোল কমিটি’র লোকজন দেখতে পান, বরফের উপর দিয়ে ঘষটে ঘষটে নেমে আসছে একটা মানবশরীর। কাছে গিয়ে দেখা যায়, পাক্কা ছ’দিন পরে ফিরে এসেছেন হিলারি দাওয়া শেরপা! চরম পরিশ্রান্ত, ঠান্ডায় প্রায় অসাড় হাত-পা, হাতের আঙুলে ফ্রস্টবাইট, পায়ে গুরুতর চোট।

পর্বতারোহণের ইতিহাসে আট হাজারি উচ্চতা থেকে নিজেই নিজেকে উদ্ধার করে একা নেমে আসার একমাত্র উদাহরণ। এ যেন এক অবিশ্বাস্য সহনক্ষমতা, অদম্য মনোবলের অতিমানবিক নিদর্শন।

অলৌকিক, নাকি পরিত্যক্ত?

কাঠমান্ডুর হাসপাতালে আইসিইউয়ে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন ‘মির‌্যাকল ম্যান’ দাওয়া। চিকিৎসায় ভাল সাড়া দিয়েছেন এবং শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, সুস্থ হয়ে ছাড়াও পেয়েছেন হাসপাতাল থেকে। কিন্তু এর সঙ্গেই উঠছে প্রশ্ন— এটা কি সত্যিই সম্ভব? মির‌্যাকল? নাকি আট হাজারি বিপজ্জনক পথে একটা মানুষকে পরিত্যাগের নির্মমতা? একা মানুষটি এভারেস্টে বিপদে রয়েছে জেনেও তাঁকে উদ্ধারে ব্যবস্থা না নেওয়ার নিষ্ঠুরতা? ধরেই নেওয়া যে, আর ফিরে আসবেন না তিনি!

জানা যাচ্ছে, দাওয়ার পারমিটের দায়িত্বে ছিল নেপালের ‘৮কে এক্সপিডিশন্স’। কিন্তু এ বারের অভিযানে তিনি কাজ করছিলেন নেপালের খুদে এজেন্সি হিমালয়ান ট্রাভার্স অ্যাডভেঞ্চার্সের হয়ে। খরচ কমাতে নেপালি এজেন্সিগুলির মধ্যে এমন ব্যবস্থা নাকি হয়েই থাকে। কিন্তু তাতে টাকা ও শেরপা ভাগাভাগি হলেও বিপদকালে কার উপরে দায়িত্ব বর্তাবে, সেই গুরুতর প্রশ্নের উত্তর থাকে ধোঁয়াশাতেই।

সে জন্যই ক্যাম্প-২ থেকে ক্রিস যখন দাওয়ার না-ফেরার খবর জানান বেস ক্যাম্পে, তখন কারও হেলদোল ছিল না! এমনকি, প্রথম কয়েক দিন উদ্ধারকাজের ব্যবস্থাই করা হয়নি। দাওয়ার স্ত্রীকেও নাকি এজেন্সি সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, ও-সব উদ্ধারকাজ সম্ভব নয়! ওই এজেন্সির তরফে ব্যবস্থাপনায় বিস্তর গাফিলতির অভিযোগ করেছেন মারিউসও। আরও অভিযোগ, তারা দাওয়ার নিখোঁজ থাকার খবরটুকুও জানায়নি কাউকে। ‘৮কে’-র তরফে দাবি, সংবাদমাধ্যম থেকে জেনে তারাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে উদ্ধারকাজে হেলিকপ্টার পাঠায়। ছোট এজেন্সিটির তরফে দাবি, উদ্ধারকারী দল না পাঠাতে পারলেও তারা খুম্বু হিমবাহ থেকে সরঞ্জাম খুলে নেওয়া দলকে অনুরোধ করেছিল, কিছু মই রেখে দিতে। যদি দাওয়া ফেরত আসেন!

বাস্তব হল, দু’টি এজেন্সি একে অপরের ঘাড়ে দায় ঠেলাঠেলি করেই দায় সেরেছে। এভারেস্টের বুকে একাকী দাওয়ার কী হবে, ভেবে দেখেনি। উল্টে তাঁকে উদ্ধারে শেরপা দল বা কপ্টার পাঠাতে হলে খরচ কে জোগাবে, সেই চিন্তাতেই হাত গুটিয়ে বসে থেকেছে। বসেই থাকত, যদি নেপালের পর্যটন দফতরের তরফে ওই দু’টি এজেন্সির রেজিস্ট্রেশন বাতিলের হুঁশিয়ারি দিয়ে উদ্ধারকাজে হাত লাগানোর নির্দেশ দেওয়া না হত।

বিপদের বন্ধু, কিন্তু তাঁর বিপদে?

এখানেই উঠছে প্রশ্ন। এভারেস্টে কোনও বিদেশি পর্বতারোহী একা পড়ে থাকলেও কী এমনটাই দেখতাম? পারমিট ফি, বিমা বাবদ বিপুল পরিমাণ ডলার জমা দিয়ে পাহাড় চড়তে আসা বিদেশি ‘পর্যটক’ আরোহীদের জন্য এখানে যেমন থাকে এলাহি আয়োজন, তেমনই তাঁদের সামিট করাতে প্রস্তুত থাকবেন এক বা একাধিক শেরপা, এটাই দস্তুর। তাঁদের রুকস্যাক, অক্সিজেন সিলিন্ডার, জলের বোতলটাও বয়ে দেওয়ার লোক থাকে পাহাড়ে। আদতে যেনতেন প্রকারেণ সামিট ছোঁয়াটাই আসল কথা। উপরে গিয়ে সেই সব বিদেশি আরোহী বিপদে পড়লে দ্রুত নড়েচড়ে বসে বেস ক্যাম্প। সচল হয় প্রতিটি স্যাটেলাইট ফোন। দিনের আলো ফুটতেই উড়ে আসে কপ্টার। উঠে আসে শেরপা দল, বিপদে পড়া বিদেশিকে উদ্ধার করতে, অথবা তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত খবর দিতে।

২০২৩ সালে এভারেস্টের ডেথ জ়োনেই মালয়েশিয়ার এক আরোহীকে বিপন্ন অবস্থায় দেখে নিজেদের সামিট পরিকল্পনা বাতিল করেছিলেন গেলজে শেরপা। স্লিপিং ম্যাট দিয়ে অচেনা সেই আরোহীকে পিঠে বেঁধে নামিয়ে এনেছিলেন টানা ছ’ঘণ্টা ধরে! সামিট করার চেয়ে গেলজের কাছে সে দিন একটা প্রাণের দাম অনেক বেশি ছিল। ২০১৭ সালেও এভারেস্টের ডেথ জ়োনে খাবার, ঘুম ছাড়া ২৮ ঘণ্টা কাটিয়েছিলেন উদ্ধারকারী শেরপারা। শুধু এক জন মৃত আরোহীর দেহ নামিয়ে আনতে!

দাওয়া কিন্তু জীবিত ছিলেন! তবু তাঁর জন্য বরাদ্দ মাত্র একটি কপ্টার। তা-ও নিখোঁজ হওয়ার পাঁচ দিন পরে।

পাশে নেই কেউ

পাহাড়ে বিপদে পড়া বিদেশি পর্বতারোহী ও শেরপাদের উদ্ধারে তৎপরতার এই বৈষম্য রীতিমতো দৃষ্টিকটু। বিভিন্ন পাহাড়ে দেখা গিয়েছে, পর্বতারোহীরা বিপদে পড়লে তাঁকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সব পক্ষ— এজেন্সি, বিমা সংস্থা, কপ্টার, তাঁর পরিবার, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। অথচ বিপদের মুখে থাকেন যদি কোনও শেরপা? তখন কারওই হেলদোল থাকে না। প্রথমেই ভেবে নেওয়া হয়, উনি আর বেঁচে নেই। অথবা, শেরপা যখন, উদ্ধার করতে হবে না, নিজেই নেমে আসবেন। আসলে, পাহাড়ি পথে ‘বিপদের বন্ধু’ শেরপারা নিজেদের বিপদে পাশে পান না কাউকে।

শেরপাদের বিপদে পাশে না পাওয়ার এমন নির্মম উদাহরণ আগেও রয়েছে। ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই পাকিস্তানের কে-২ শৃঙ্গের রুট খোলার সময়ে বিপজ্জনক ‘বটলনেক’ অংশে (৮২০০ মিটার) পা পিছলে পড়ে গিয়ে ঝুলতে থাকেন ২৭ বছরের মহম্মদ হাসান নামে এক পাকিস্তানি পোর্টার। ড্রোন ফুটেজ থেকে জানা যায়, সেই অবস্থায় তাঁর পাশ দিয়েই একে একে সামিটের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন পর্বতারোহীরা। এমনকি, রেকর্ড করতে দৌড়নো ক্রিস্টিলা হ্যারিলা ও তাঁর সঙ্গী তেনজ়েন লামা শেরপাও। কেউই হাসানকে সাহায্য করেননি। ঝুলতে ঝুলতেই হাসানের মৃত্যু হলেও কেউ ফিরে তাকাননি বলে অভিযোগ।

‘গ্রিন বুটস’-এর নাম শুনেছেন? ১৯৯৬ সালে চিনের দিক দিয়ে এভারেস্ট অভিযানে যাওয়া ভারতের আইটিবিপি দলের তিন সদস্য— সুবেদার সেওয়াং মানলা, ল্যান্স নায়েক দোরজে মোরুপ আর হেড কনস্টেবল সেওয়াং পালজোর তুষারঝড়ের মধ্যে দিয়েই সামিটে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু কেউই হাই ক্যাম্পে ফিরে আসেননি। জানা যায়, সামিটের পথে অসুস্থ ভারতীয় অভিযাত্রীদের দেখেও সাহায্যের হাত বাড়াননি জাপানি অভিযাত্রীরা। সহ-অভিযাত্রীদের পাশে না পাওয়ার নির্মম সাক্ষী হিসাবে বছরের পর বছর এভারেস্টে পথ দেখিয়েছেন ‘গ্রিন বুটস’ পালজোর। মৃত্যুর পরও তাঁর দেহ পড়েছিল বহু বছর। অভিযাত্রীদের ল্যান্ডমার্ক হিসেবে।

প্রশ্ন অনেক, কিন্তু উত্তর?

হাসানের ঘটনায় ক্রিস্টিলার মতো, দাওয়ার ক্ষেত্রেও কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে ক্রিসকে। কেন তিনি দাওয়াকে পিছনে ফেলে নেমে এলেন— সেই প্রশ্ন তুলে রীতিমতো ভিলেনের তকমা দেওয়া হয়েছে তাঁকে। উঠছে আরও কিছু সঙ্গত প্রশ্ন। কেন এক জন রাঁধুনিকে আচমকা সামিটে যেতে বলা হবে? কেন কোনও আরোহীর অ্যাক্লাইমেটাইজ়েশন হয়নি জেনেও তাঁকে সামিটে যেতে বারণ করা হবে না? কেন কোনও শেরপা নিজের ক্লায়েন্টকে ডেথ জ়োনের ক্যাম্পে ফেলে রেখেই নীচে নেমে যাবেন? কেন দাওয়া নামতে পারেননি জেনেও নির্লিপ্ত থাকবে বেস ক্যাম্প? কেন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা হবে না? দাওয়ার খোঁজে কেন পাঠানো হবে না উদ্ধারকারী দল? কেন কপ্টার পাঠাতে পাঁচ দিন লাগবে? এভারেস্ট অভিযানে লক্ষ লক্ষ ডলার কামানো নেপাল সরকার উদ্ধারকাজে আরও আগে তৎপরতা দেখাবেন না কেন?— শুধু পর্বতারোহণ মহলই নয়, প্রশ্নগুলো তুলছে ক্ষুব্ধ দাওয়ার পরিবারও। প্রশ্ন অনেক। কিন্তু উত্তর মিলছে না এখনই।

আরও পড়ুন