ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ২৭
Bengali Literature

কেয়ার গন্ধ

কথায় কথায় এল অযোধ্যার রাজবাড়িতে রামায়ণের পালার কথা, তার পর সেই সূত্রে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপুজোয় ষষ্ঠীর দিনে যাত্রার কথা।

অভিজিৎ চৌধুরী
শেষ আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:০১
ছবি: সৌমেন দাস।

ছবি: সৌমেন দাস।

পূর্বানুবৃত্তি: পল্লবীর মৃত্যু সংবাদ পাওয়া মাত্রই ছেলেকে নিয়ে ফেরার ব্যবস্থা করেন দীপঙ্করবাবু। ফোনে সব কথা জানান জ্যোৎস্নাদেবীকে। তিনি সাধন ড্রাইভারকে ডেকে নিয়ে এসে পৌঁছন সোদপুর থানায়। সেখানে দেবলের স্ত্রী সুবর্ণার সঙ্গে কথা হয় তাঁর। তিনি বুঝতে পারেন, যা হয়েছে তার জন্য কোনও অনুশোচনা নেই সুবর্ণার। দীপঙ্করকেই পল্লবীর মুখাগ্নি এবং দাহ-সংস্কার সেরে নিতে বলেন জ্যোৎস্নাদেবী। অন্য দিকে মোটের উপর ভাল করেই উতরে গিয়েছে জনমেজয়দের অভিনয়। পানসদা ধরিয়ে দিচ্ছিলেন কার কী ভুলভ্রান্তি হয়েছে। দীপঙ্করবাবুর খোঁজ নেওয়ার জন্য তাঁকে ফোন করেন জনমেজয়। ফোনে পল্লবীর দুঃসংবাদটা পেয়ে অবাক হয়ে যান।

মুনিকেশবাবু আর কিছু বলার আগে শরদিন্দুবাবু বলে উঠলেন, “গান হলে ভাল হয়!”

তবলচি সুব্রতবাবুকে বললেন,“সুব্রতদা, মুকুন্দরাম দাশেরগানই হোক।”

সুব্রত শুরু করলেন, “বল ভাই মেতে যাই বন্দে মাতরম্/ কত ঘুমে রবেরে/ বল সবে হয়ে একমন/ বন্দে মাতরম্।”

দোহার ধরল মেয়েরা, বেশ জমে গেল সন্ধেটা।

শরদিন্দুবাবু বললেন, “চা হলে ভাল হয়।”

সঞ্চিতাদি চা পাঠিয়ে দিলেন। চায়ে চুমুক দিতে দিতে শরদিন্দুবাবু বললেন, “বাবার মুখে শুনেছি, বাবা তখন হিন্দু কলেজের ছাত্র। কলকাতায় চা নিয়ে এসেছেন অ্যান্ড্রু ইউল কোম্পানি। কিন্তু চা তো তখন এই দেশে প্রচলিত নয়। ব্যবসা মার খাচ্ছে। এ বার কোম্পানি কলকাতা শহরে কয়েকটি চায়ের দোকান খুলল। মানুষকে চা পান করাতে শুরু করল একদম বিনে পয়সায়। এ ছাড়াও চা পানের পর ছোট ছোট মোড়কে পানের দক্ষিণা হিসেবে চায়ের পাতা উপহার দেওয়া হল। মানুষ তো বিনে পয়সায় পেলে বিষও খায়। হিন্দু হস্টেলের ছেলেরাও দলে দলে চা পান করতে থাকল। আর উপহার হিসেবে নিয়ে এল চা পাতার মোড়ক। ফলে শহর জুড়ে চায়ের নেশা সংক্রমিত হল। যখন নেশা জমে উঠেছে, চা ছাড়া আর নাগরিকদের চলে না, কোম্পানি দাতব্য চা-সেবা তুলে দিলেন। আর বিনে পয়সায় নয়। আর তখন চা-পানাসক্তের দল টাকা দিয়ে কিনতে থাকলেন অ্যান্ড্রু ইউল কোম্পানির চা... দারুণ ব্যবসায়িক বুদ্ধি!”

একটু চুপ করে থেকে শরদিন্দু বলতে শুরু করলেন, “আমরা তখন যুবক। বিষ্ণুপুর আমার দেশের বাড়ি। গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রচার করতে থাকলাম, ‘না জাগিলে সব ভারতললনা/ এ ভারত আর জাগে না, জাগে না’। এ দিকে চণ্ডীমণ্ডপে ঝড় উঠল, আর জাত-ধর্ম থাকে না। হিন্দুয়ানি লোপ পেল। মেয়েরা লেখাপড়া শিখলে বিধবা হবে। আমরা দমলাম না, বললাম, কোন শাস্ত্রে এ সব লেখা আছে! বরং লেখা আছে, কন্যাকেও যত্নপূর্বক শিক্ষা দিতে হবে। লীলাবতী প্রভৃতির উদাহরণ দিলাম। আমার বিয়ে হয়েছে যখন, আমার বৌ আই এ পাশ। বাবা উদারপন্থী ছিলেন। তিনি শিক্ষিতা মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেকালে খনা, লীলাবতীর উদাহরণ দেখালেও বৃদ্ধরা বললেন, শিক্ষা নিয়াতি যত্নতঃ। এই কথার অর্থ, যত্ন করে গৃহস্থালির কাজ শেখাতে হবে। তার পর আমরা স্কুল খুললাম। ছাত্রী পেলাম তিন জন। আমার বৌ পড়াতে শুরু করলেন। চার দিকে ছিছিক্কার। পাপ স্কুল তুলে দিতে হবে। আমরা মানলাম না। আমরা যাত্রাপালা করলাম মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে। যাত্রা ঘরের মেয়েরাও দেখতে আসে। কাহিনি বিদ্যাসাগর মশাইকে নিয়ে। কাজ হল বিস্তর। মেয়েরা যাত্রা দেখে পড়াশোনা করতে উন্মুখ হয়ে উঠল।”

কথায় কথায় এল অযোধ্যার রাজবাড়িতে রামায়ণের পালার কথা, তার পর সেই সূত্রে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপুজোয় ষষ্ঠীর দিনে যাত্রার কথা।

শরদিন্দুবাবু বললেন, “এ বার দ্বিতীয়ায় আমার জন্য করছেন। জনমেজয়বাবুকে চেনেন? তাঁর বিশেষ অনুরোধ।”

২৮

‘ইউরেশীয় ড্রোজু গত হইলেন মৌলালির বাটীতে।’— লিখল সম্বাদ প্রভাকর।

“ড্রোজু কে ঠাম্মা?”

“হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজ়িয়ো। নামটা জানো তো দীপ?”

“হ্যাঁ ঠাম্মা। শুনেছি তাঁর অনুগামীদের বলা হত ইয়ং বেঙ্গল।”

“ঠিক বলেছ। তিনি মৃত্যুর মুহূর্তেও বলেছিলেন, ‘আই অ্যাম নট কনফিডেন্ট অ্যাবাউট ক্রিশ্চানিটি, আই অ্যাম স্টিল সার্চিং।’”

এমন সময় এলেন দীপঙ্কর, বললেন, “মা, ছুটি পেয়েছি সপ্তাহখানেক।”

“এখানেই থাকো। দীপ, তোমার স্কুলের ক্ষতি হবে না তো?”

“না, ঠাম্মা। স্কুল তো ছুটি। পুজোও এসে গেল।”

জ্যোৎস্নাদেবী বললেন, “পল্লবীর কাজকর্ম সবটা হয়ে গেল তো?”

“হ্যাঁ মা। ওর হবিষ্যি আমি রান্না করে দেব।”

“তোমাকে করতে হবে না। আমি করব।”

সারা দিন ঠাম্মার সঙ্গে নানা গল্প করল দীপ। গল্পের মতো করে ঠাম্মা বলেন সেকালের কলকাতা শহরের কথা। ঈশ্বর গুপ্ত ইয়ং বেঙ্গলদের নিয়ে লিখলেন, “এঁরা না হিঁদু না মোছলমান/ ধর্মাধর্মের ধার ধারে না।/ নয় মগ ফিরিঙ্গি বিষম ধিঙ্গি/ ভিতর বাহির যায় না জানা...” ডিরোজ়িয়ো সাহেব ছাত্রদের কাছে মুক্তচিন্তার জগৎ খুলে দিচ্ছিলেন।

“তুমি কত কিছু জানো ঠাম্মা!”

“আমি অত কিছু জানি না। আমাকে জানিয়েছিলেন তোমার ঠাকুরদা।... হবিষ্যি খেতে কষ্ট হচ্ছে, সোনা?”

“না ঠাম্মা, তুমি তো কত যত্ন করে রান্না করছ।”

“মায়ের কথা খুব মনে পড়ে, তাই না?”

“হ্যাঁ, ঠাম্মা।”

চোখ দুটো জলে ভরে উঠল দীপের। আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দিলেন জ্যোৎস্নাদেবী।

“দাদুর ঘরে যাবে?”

“গেছিলাম। কত বই, আর একটা তক্তপোশ।”

“বলতেন, সাধারণ ভাবে থাকতে হয় আর অসাধারণ চিন্তা করতে হয়। তুমি শেক্সপিয়রের নাটক পড়েছ?”

“কিছু কিছু।”

“কমেডি না ট্র্যাজেডি?”

“আমি তো বাংলায় লেখা গল্প পড়েছি।”

“বেশ। কমেডি হচ্ছে যেখানে শেষে মিল হয়ে যাবে, মাঝে দুঃখ থাকলেও শেষে সুখ থাকবে। বা হয়তো খুব হাসির।”

“আর ট্র্যাজেডি খুব দুঃখের, তাই না ঠাম্মা?”

“হ্যাঁ, দুঃখের। তবু আমরা ভালবাসি বিয়োগান্ত নাটক। কেন বলো তো?”

“কেন, ঠাম্মা?”

“আসলে সেখানে মানুষের লড়াইয়ের জয় হয় হারার মধ্যেও। ‘ম্যাকবেথ’ পড়েছ?”

“সে ভাবে পড়িনি ঠাম্মা, গল্পটা একটু জানি।”

“কেমন জানো দীপ, একটু বলো...”

“এক জন ভাল রাজার দু’জন সেনাপতি ছিলেন। রাজার নাম ডানকান, আর দুই সেনাপতির নাম ম্যাকবেথ আর ব্যাঙ্কো।”

“খুব সুন্দর। তার পর?”

“তিন ডাইনির সঙ্গে দেখা হল ম্যাকবেথ আর ব্যাঙ্কোর। ওরা বলল, ম্যাকবেথ রাজা হবে। আর ব্যাঙ্কোকে বলল, ব্যাঙ্কোর ছেলে রাজা হবে।”

“বাহ্‌ দাদুভাই! তার পর?”

“উচ্চাশায় পাগল হয়ে ম্যাকবেথ খুন করেন রাজাকে, যে রাজা তাঁকে এত ভালবেসেছিলেন।”

“লেডি ম্যাকবেথ, মনে পড়ে দাদুভাই?”

“উনিই তো ম্যাকবেথকে উত্ত্যক্ত করতেন রাজাকে খুন করার জন্য।”

“বাহ্‌, সুন্দর বললে। রাজা খুন হওয়ার পর লেডি ম্যাকবেথ উন্মাদিনী হয়ে গেছিলেন!”

“হ্যাঁ ঠাম্মা। একটা ইংরেজি লাইন সেখানে ছিল, মানে গল্পটায়।”

“কী বলো তো দাদুভাই, মনে করতে পারবে?”

“অল দ্য পারফিউমস অব অ্যারাবিয়া উইল নট সুইটেন দিস লিটল হ্যান্ড।”

“ঠিক দাদুভাই! সমস্ত আরবের আতরও আমার অশুদ্ধ রক্তমাখা হাত পরিচ্ছন্ন করতে পারবে না।”

“লোভ খুব খারাপ, তাই না ঠাম্মা?”

“খুব খারাপ। লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।”

“আমার মা কত ভাল ছিল, কত আদর করত আমায়, শুধু লোভই আমার মাকে শেষ করে দিল, তাই না ঠাম্মা?”

এই সময় দীপঙ্কর এলেন। জ্যোৎস্নাদেবী বললেন, “তোর শ্বশুরবাড়ির লোকজন এসেছিল।”

“পল্লবীর দাদা এসেছিলেন, খুব ভাল মানুষ। দুঃখ করলেন বোনের এই পরিণতির জন্য।”

দীপঙ্কর বলল, “ওর কাজ তো তিন দিনে হবে, অপঘাতে মৃত্যু যখন।”

“হ্যাঁ, সে ঠিক আছে। আমি ব্রাহ্মণ ডেকেছি, কথা বলে নেব। আজ বোধহয় ঘাটের কাজ করতে হবে। ক্ষৌরকার্য করার জন্যও ডেকেছি।”

“দাদুভাই, তোমাকে মাথা নেড়া করাতে হবে। অসুবিধে নেই তো?”

দীপ বলল, “না ঠাম্মা। তোমরা যেমন বলবে।”

মায়ের মৃত্যু সন্তানকে খানিকটা অসহায়ত্ব এনে দেয়। দীপ আগেও বাধ্য ছিল, কিন্তু মায়ের মৃত্যু হয়তো তাকে সকলের প্রতি আরও বেশি অনুগত করে তুলবে।

দীপঙ্করের এ সব ছিল না, মা চলে যাওয়ার পর আর কোনও খোঁজ নেননি। নতুন সংসার করে তিনি দিব্যি ছিলেন। পল্লবী সংসার ভাঙতে চাইত না। তার যাবতীয় ব্যভিচারে কেউ কোনও বাধা দিত না। দীপঙ্কর পল্লবীর অনেক কথা জেনেও শাসন করেননি। শাসন করলেও পল্লবী শুনত না।

সংক্ষেপে হলেও পল্লবীর কাজ সুসম্পন্ন হল।

২৯

অফিসে যাওয়ার জন্য ট্রেনে উঠে জমিয়ে দিল জনমেজয়। রফিককে ডেকে নিয়ে বললেন, “এখানে এসে বোসো রফিকভাই। তোমাকে গল্প শোনাব।”

সে বলল, “স্যর শুনব, আপনি ভাল লোক।”

জনমেজয় বললেন, “ওরাও ভাল, তোমায় ভালবাসে সকলে।”

রফিক বলল, “না স্যর, আমি বড়সাহেবের কাছে গেছলাম। বললাম, স্যর, আমার সব পাওনা টাকা নাজিরবাবু টি আর সেভেন না কিসেদিয়ে দিচ্ছে।”

“বড়সাহেব কী বললেন?”

“শুনে হাসলেন। বললেন, ও সব বাজে কথা।”

“তা হলে তো ঠিক আছে।”

রফিক বলল, “না, কিন্তু তা হলে আমার পয়সাগুলান গেল কোথায়!”

জনমেজয় হেসে বললেন, “নাটক করে কেউ কি পয়সা পায়! ও সব শখে করা। ছাড়ো ও সব, একটা গল্প বলি শোনো।”

দেবা এসে বলল, “আমরাও শুনব। রফিকদা একা কেন শুনবে!”

রফিক জুতো তুলে বলল, “যাবি তুই? অসভ্য ইতর কোথাকার!”

এর মধ্যে সুদীপ বলে এক নতুন ছোকরাও আজ এসেছে। বলল, “রফিকদা, নাইট ডিউটি করবে?”

“না, করব না। আমি এক দিন বলেছি না তোদের, আমি নাইট করব না।”

দেবা বলল, “সাহেবের হুকুম, সবাইকে ঘুরেফিরে নাইট করতে হবে।”

রফিক গুম হয়ে রইল।

সুদীপ বলল, “রফিকদা, মোষের দুধের চা খাওয়াব রাতে।”

রফিক উত্তর দিল না।

দেবা ঠেলা দিয়ে বলল, “আজ নাইট করবে?”

রফিক পুরো খেপে গেল। বলল, “স্যর, অফিসটা গোল্লায় গেছে। দু’নম্বরিতে ছেয়ে গেছে!”

দেবা বলল, “সব নাজিরবাবু করাচ্ছে। আজিজও দলে আছে।”

জনমেজয় শুরু করলেন ওঁর সার্ভেয়ার জীবনের গল্প, “সন্ন্যাসীকাটা মৌজায় এক মিস পিটিশনের ইনকোয়ারিতে গেছি, সঙ্গে কানুনগো সাহেব...”

দেবা বলল, “জনাদা, সন্ন্যাসীকাটার গল্প তো আগেও শুনেছি।”

“এই গল্পটা অন্য রকম। মজা আছে।”

“আচ্ছা, বলো তা হলে।”

রফিক বলল, “সব সময় ফোড়ন কাটবি না, শান্তি করে শুনতে দে।”

দেবা বলল, “আচ্ছা রফিকদা, তুমি কখনও সার্ভেতে গেছ?”

রফিক চুপ করে থাকে, হয়তো এ বার একটা বোম ফাটবে।

দেবা আবার বলে, “গেছ তুমি?”

“আমি তোর বাপের বয়সি! হাতিঘোড়া গেল তল, মশা বলে কত জল!”

সুদীপ বলল, “রফিকদা, তোমার ঘোড়া, হাতি সব আছে?”

জনমেজয় বলেন, “তোরা চুপ করবি!”

দেবা বলে, “তুমি বলো, বলো। আসলে রফিকদাই যত ডিস্টার্ব করছে।”

“দূর ছাই! নিকুচি করেছে গল্পের। আমি অন্য কামরায় যাব...” রফিক ওঠার উপক্রম করতেই জামা টেনে ধরল দেবা, সুদীপ পা চেপে ধরল। ফলে রফিকের যাওয়া হল না, আসলে সে যেতও না।

জনমেজয় বললেন, “এ বার বলি। ইনকোয়ারি মানে নতুন করে জরিপ করা আর কী! শুরু হল জরিপ। এই সময় আমাদের কেজিও সাহেবের প্রকৃতির ডাক পেল। দূরে মাঠের ধারে বাঁশের ঝাড় দেখা যাচ্ছিল। ওঁকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হল। আমিও সঙ্গে গেলাম। দেখলাম, দুটো বাস চলেছে দূরের পথে। যাই হোক, ওঁর কাজ শেষ হওয়ার পর ফিরে এলাম। গ্রামের লোকেরা বলল, ‘জানেন স্যর, আপনারা কোথায় গেছিলেন?’ আমি বললাম, কোথায়! ওরা বলল, ‘ওটা অন্য দেশ, বাংলাদেশ! আমরা হামেশাই যাচ্ছি। আজ আপনারাও গেলেন।’ কেজিও সাহেব অবাক হয়ে গেলেন। এই আর কী!”

রফিক বলল, “দারুণ জনাদা।” রফিক কখনও স্যর বলেন, কখনও দাদা বলেন।

দেবা বলল, “গল্পটা জমল না। এখানেই শেষ?”

“আছে আর একটু। সেই মৌজার সব মানুষই ছিল মুসলমান, কিন্তু গরিব, অত্যন্ত ভাল। অনেকের জীবিকা ছিল মাছ ধরা। আমাদের কাজ শেষ হয়ে আসছে, কেজিও সাহেব গ্রামের এক জনকে ৫০ টাকা দিয়ে বললেন, ‘পদ্মার ইলিশ আমরা যাওয়ার আগে যদি দিতে পারেন...’ শুনে মানুষটি বললে, ‘স্যর, আমি সময়মতো দিয়ে যাব।’ কিন্তু আমরা চলে এলাম, মাছ আর এল না। পরে এক দিন কাছাকাছি শহরে হলকা অফিসে রয়েছি, সেই মানুষটি কাজের জন্য এসেছিলেন। কেজিও সাহেবকে দেখতে পেয়ে বললেন, ‘স্যর, মাছটা কেমন ছিল?’ উনি অবাক হয়ে বললেন, ‘মাছ তো পাইনি!’ তখন সেই মানুষটি বললেন, ‘গ্রামের চৌকিদারকে দিয়ে পাঠিয়েছিলাম আপনার জন্য। সে তো বলল, দিয়ে যাবে।’ আমিও পাশে ছিলাম, বললাম, আমরা পাইনি। গরিব মানুষটি খুব লজ্জা পেয়ে গেল। এই আর কী!”

“গ্রামের চৌকিদার হাপিশ করে দিল!”

“হ্যাঁ, তাই তো দেখলাম।”

রফিক বলল, “দুনিয়াটা ঠগে ছেয়ে গেছে।”

দেবা বলল, “তখন নাজিরবাবু তো দায়িত্বে ছিলেন না। এ বার কাকে গালিগালাজ করবে!”

“আমি শিক্ষা পাওয়ানোর জন্য গালি দিই। উল্লুক, মগের মুল্লুক করে তুললি দেশটা!”

ক্রমশ

আরও পড়ুন