ধারাবাহিক উপন্যাস ।। পর্ব ১৬
Bengali Literature

দেখা হবে

হাত তুলে জিনাকে থামাল মনোতোষ। ইশারায় জানালাটা বন্ধ করে দিতে বলল। জিনা গিয়ে জানালাটা সাবধানে বন্ধ করল। ঠান্ডা বাতাস আসছিল খোলা মাঠের দিক থেকে।

বিপুল দাস
শেষ আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬ ০৬:৫৬

ছবি: কুনাল বর্মণ।

পূর্বানুবৃত্তি: অ্যাক্সিডেন্টে ভালই চট পেয়েছিল মনোতোষ। ছিটকে পড়েছিল খানিকটা দূরে। ভারী জ্যাকেট পরা ছিল বলে পাঁজরের হাড় ভাঙেনি। মাথায় ব্লাড ক্লট হয়েছিল, তবে তার জন্য অপারেশনের দরকার হবে না বলে চিকিৎসক জানিয়েছিলেন। অ্যাক্সিডেন্টের দু’দিন পরে খবর পেয়েছিল নন্দা। কী একটা দরকারে বারবার ফোন করছিল মনোতোষকে। সে ফোন ধরতে পারছিল না। হসপিটালেরই কোনও নার্স ফোন ধরে নন্দাকে জানিয়েছিল মনোতোষের অ্যাক্সিডেন্ট আর হসপিটালে ভর্তি থাকার কথা। নার্সের নাম জিনা তামাং। কাজের ফাঁকে ফাঁকে সে নানা গল্প করে মনোতোষের সঙ্গে। ফোনে খবর পাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নন্দা হাজির হল হসপিটালে। খুঁজে বার করল মনোতোষের কেবিন। তাকে বেডের পাশে বসার টুলটা দেখিয়ে বসতে বলে মনোতোষ।

নন্দা বসল না। দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। ভুরুতে ভাঁজ।

মনোতোষ জিজ্ঞেস করল, “কোথায় খবর পেলি?”

“যমের কাছে! যম আমাকে জানিয়েছে, তার একটা কাস্টমার পালিয়েছে। তুই... তুই একটা ইনকরিজিবল শয়তান!একটা... একটা...”

“পেরিপ্লাস অব দি ইরিথ্রিয়ান সি। নয়তো হিবিস্কাস রোসা-সাইনেনসিস। চলবে? কী করে জানলি আমি এখানে? তোকে কে বলল?”

জিনা এগিয়ে এসেছে, “স্যর, আপনার কিন্তু বেশি কথা বলা মানা আছে। এক্সাইটমেন্ট হলে কিন্তু ক্ষতি হোবে। ম্যাম...”

হাত তুলে জিনাকে থামাল মনোতোষ। ইশারায় জানালাটা বন্ধ করে দিতে বলল। জিনা গিয়ে জানালাটা সাবধানে বন্ধ করল। ঠান্ডা বাতাস আসছিল খোলা মাঠের দিক থেকে।

“ঠিক আছে জিনা, বেশি কথা বলব না। তুমি কি আমার গেস্টের জন্য এক কাপ চায়ের ব্যবস্থাকরতে পারবে? ভয় নেই, আমার বিলের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে দেব। প্লিজ়, দেখো না! যদি কোনও অসুবিধে না হয়...”

“আপনার বিলের সোঙ্গে অ্যাডজাস্ট কোরবেন? না স্যর, অনেক পড়ে যাবে। তার চেয়ে, আপনার গেস্টকে আজ আমার তরফ থেকে চা খাওয়াচ্ছি।”

কে জানে কেন, কথা শেষ করে মুচকি হাসল সিস্টার। ভুরু কুঁচকে তার দিকে তাকাল নন্দা।

মনোতোষ নন্দাকে বলল, “টুলটায় বোস, এখনও দাঁড়িয়েই আছিস। খুব ভাল মেয়েটা। কালিম্পঙের মেয়ে। আমার সঙ্গে খুব গল্প করে। ওর দাদা কালিম্পঙের টিচার। আর এক দাদা একটা গানের ব্যান্ড বানিয়েছে। সে নিজে বাজায় বেস গিটার। হিলে নাকি খুব পপুলার ওদের ব্যান্ড ‘গুরসকলি’। গুরসকলি মানে জানিস? রডোডেনড্রন। আমি জানতাম না। আমার সঙ্গেখুব গল্প করে মেয়েটা। ওর বাড়ির সব গল্প করাহয়ে গেছে।”

“সে তো বুঝতেই পারছি। নইলে তুই এত গল্প করার সময় পাস, অথচ আমাকে একটা খবর দেওয়ার সময় হয় না তোর। কেন দিবি, আমি তোর কে! তোর শিবুকাকার বৌ ছাড়া আর কী সম্পর্ক তোর সঙ্গে আমার!... কী করে হল এ-সব? স্কুটার?”

“হুঁ, খুব কুয়াশা ছিল, ভিজ়িবিলিটি খুব কম। একটা গাড়ি পাশ থেকে মেরে দিয়ে বেরিয়ে গেল।”

টুলে নয়, মনোতোষের মাথার পাশে বেডে বসল নন্দা। হাত বাড়িয়ে মনোতোষের মাথায় হাত রাখল। ডান পায়ের থাই থেকে একটা শিরশিরে অনুভূতি নীচের দিকে নেমে গেল মনোতোষের।

“আঃ, নন্দা... ভাল লাগছে আমার। আমার মাথায় কত দিন পর কেউ হাত রাখল। কিন্তুআমি টের পাচ্ছি, তোর হাত মৃদু কাঁপছে। দেখিতোর হাত।”

হাত বাড়িয়ে নন্দার হাত ছুঁল মনোতোষ। তার পর মুঠোয় ধরল। হাত নামিয়ে বিছানার উপর রাখল নন্দা। তখনও মনোতোষ মুঠোয় ধরে রাখল নন্দার হাত। তার হাত ভীষণ ঠান্ডা, কিন্তু নন্দার হাত গরম। নন্দার হাত থেকে উষ্ণতা প্রবাহিত হতে থাকল শীতল হাতের দিকে। এক সময় দু’দিকের উষ্ণতা সমান হলে এই তাপ-বিনিময় প্রক্রিয়া বন্ধ হবে— তাপবিজ্ঞান তাই বলে— মনোতোষ ভাবল। কোনও দিন কি হবে!

“তোকে ফোন করার আমার ভীষণ দরকার ছিল। বেজে যাচ্ছিল তোর সেই রিংটোন।কেউ ধরছিল না। শেষে এক জন ধরে বলল মনোতোষ লাহিড়ী এখানে আছে। অ্যাক্সিডেন্ট কেস। তখনই দৌড়েছি।”

“কেন? তখনই দৌড়নোর কী হয়েছে। নন্দা সান্যাল মনোতোষ লাহিড়ীর কে হয়! শিবুকাকার বৌ। আইনত কাকিমা।”

“শয়তান, কোনও দিন আমাকে কাকিমা বলে ডেকেছিস? নন্দা, নন্দা বলে তো হেদিয়ে মরিস! কাকিমা বলে ডাকলে তোকে আমি মেরে একদম...”

“পেরিপ্লানেটা আমেরিকানা করে দিবি,তাই তো?”

“একদম!... মানে, কী বললি?”

“পরিপাটি করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দিবি। তুই কিন্তু আমার সঙ্গে যাবি। আমি শিবুকাকাকে জানিয়ে দেব, তোমার বৌকে নিয়ে আমি পালালাম।”

“সে মুরোদ তোর নেই। সব এক ছাঁচের তোরা। সব ভিতুর ডিম। এদিকে কুলোপানা চক্কর আছে। খুব শখ, না? আমাকে নিয়ে আমেরিকায় যাবে। আগে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠ।”

একটা ট্রে-র উপর দু’কাপ কফি এনেছেজিনা। দারুণ গন্ধ ছেড়েছে কফিটা। টুলের উপর ট্রে রাখল জিনা।

“ম্যাম, নিন কফি। স্যর, আপনার জন্য কিন্তু চা। লিকার টি। স্যর, আর কোথা না বললে ভাল হোয়। আপনাকে কিন্তু এখন ওনেক ফ্রেশ দেখাচ্ছে। ম্যাম, প্লিজ় নো মোর টক। স্যরের খুব রেস্ট দোরকার। আপনি তো আবার আসবেন, একটা ভিজ়িটিং কার্ড দিচ্ছি আপনাকে।”

বেরিয়ে যাওয়ার সময় নন্দা বলে গেছে স্কুটার বিক্রি করে দেওয়ার কথা। চুপচাপ অনেকক্ষণ শুয়ে রইল মনোতোষ। বেশি কথা বলা হয়ে গেছে। ক্লান্ত লাগছে এখন। নন্দাকে ঠিক বুঝতে পারছে না সে। নন্দা কী বিপজ্জনক ভাবে কাছে আসার চেষ্টা করছে! এত সহজেই কি ভালবাসা তৈরি হয়! শিবুকাকার সঙ্গে মনে হয় দূরত্ব আরও বেড়েছে। এই যাঃ, নন্দার কী একটা জরুরি দরকার ছিল তাকে ফোন করার, সেটাই তো শোনা হল না।

১০

বিশাল একটা মিছিল বেরিয়েছে। তার মাথা রামবাবুদের রাইস মিলের সামনে, আর ল্যাজা শ্যামল রেডিয়ো কর্নারে এসে শেষ হয়েছে। তাসাপার্টির বাজনা, আবির আর অল্পবয়সি ছেলেমেয়েদের নাচ— পথের দু’পাশে, দোকানের সামনে, দোতলার বারান্দা থেকে লোকজন দেখছে। অনেকে বাতাসে আবির উড়িয়ে দিচ্ছে, অনেকে পতাকা নাড়ছে। কারও চোখেমুখে আনন্দ জ্বলজ্বল করছে, কেউ গম্ভীর।

মিছিলের একদম সামনে একটা খোলা জিপে বিভূতি লস্কর দাঁড়িয়ে আছে। আবির লেগে জামাকাপড়ের রং পাল্টে গেছে। চোখে কালোচশমা, গলায় আর মালা পরানোর জায়গা নেই। তবুও লোকজন মালা নিয়ে আসছে তাকে পরাবে বলে। বিভূতি লস্কর সেগুলো পরার ভঙ্গি করে সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে মালাটা পিছনে পাঠিয়ে দিচ্ছে। মিছিল কন্ট্রোল করছে তারক শীল। সামনে বিরাট ফেস্টুনে লেখা ‘নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বিভূতি লস্করকে জানাই সংগ্রামী অভিনন্দন’।

প্রথমে একটা বোমা ফাটল প্রচণ্ড শব্দে, তার পর কনভয়ের মতো ছোট ছোট বোমার সিরিজ়। ধোঁয়ায় ভরে গেল বকুলডাঙার মুকুন্দদাস রোড। ধোঁয়ায় ভরে যাচ্ছে বিজয়মিছিল। ধোঁয়ার ভিতর দিয়ে দেখা যায় অগণিত মানুষের মুখ। ওরাও ধোঁয়ার ভিতর দিয়ে দেখে জনপ্রতিনিধিদের মুখ। অস্পষ্ট। খোলা জিপে হাওয়ায় ওড়ে পার্টির নিশান। পাবলিক এই সমারোহ দেখে যে যা বোঝার বুঝে নেয়।

বিভু সমাদ্দারের অফিসের সামনে বিভূতি লস্করের কনভয় থামাল তারক শীল। এখানে একটু জলুস হবে। তাসাপার্টিকে ইশারা করতে ওরা মেতে উঠল উদ্দাম ছন্দে। ছেলেমেয়েগুলো ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে আবার নাচতে শুরু করল। বিভূতি লস্করের মুখে মৃদু হাসি। অনেক কাটাকুটি খেলার পর চেয়ারম্যানের চেয়ার তাকে অর্জন করতে হয়েছে। একত্রিশ আর সতেরো নম্বর ওয়ার্ড তার মুখরক্ষা করেছে। তার পর ভিতরের খেলা। শিউরতন অবশ্য বলেছিল, বিভূতি লস্করই চেয়ারম্যান হচ্ছে।

এ-সব অবশ্য ভিতরের খবর। পাবলিকের জানার কথা নয়। পাবলিক চাইছিল টোটো স্ট্যান্ড সরে যাক। পাবলিক চাইছিল ফুটপাত পরিষ্কার হোক, পাবলিক চেয়েছিল রাস্তা চওড়া করার অজুহাতে গাছ কাটা হলে পরিবর্তে নতুন প্লান্টেশন হোক। বিভূতি লস্কর কথা দিয়েছে, পলাশগুড়ির সমস্যা মেটাতে না পারলে সে রাজনীতি ছেড়ে দেবে। পলাশগুড়ি মিউনিসিপালিটিকে সে অন্যতম সেরা মিউনিসিপালিটি করে তুলবে। বিভু সমাদ্দার তার অফিসঘর থেকে বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল। নীচে তাকিয়ে দেখল তারক শীল তার অফিসের দিকেই তাকিয়ে আছে।

ওদের লাস্ট প্রোগ্রামে দুটো গাড়ি আর পঞ্চাশ হাজার ক্যাশ চেয়েছিল ওরা। বিভু পঁচিশ হাজার পর্যন্ত দিতে চেয়েছিল। ওরা নেয়নি। বিভূতি লস্কর খুব নিস্পৃহ ভঙ্গিতে বলেছিল, দিলে ওই পঞ্চাশই দিতে হবে। রাজি থাকলে বিভু যেন ফোন করে দেয়, তারক এসে টাকা নিয়ে যাবে। বিভু এক বার ভেবেছিল দিয়ে দেবে। ওদের সঙ্গে ঝামেলায় গেলে তার ব্যবসার ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু তারক শীলের উদ্ধত ভঙ্গিতে ‘আপনাকে দিতেই হবে’ কথাটা তার গায়ে খুব লেগেছিল। শুধু বকুলডাঙা বলে নয়, পুরো পলাশগুড়িতে ওভাবে কেউ কোনও দিন তার সঙ্গে কথা বলার সাহস দেখায়নি। মাঝে মাঝে কথাটা মনে পড়লেই মুখের ভিতর তেতো স্বাদে ভরে যেত। ছেলেটার কথা বলার ভঙ্গি দেখে বিভু অবাক হয়েছিল। বিভূতি লস্করের বডিগার্ড, অথচ ভাবখানা যেন আর্মির কম্যান্ডার-ইন-চিফ। কানেকশন বিভুরও কিছু কম নেই। তা সে নবান্নে হোক, বা দিল্লিতে।

জিপের সামনে গিয়ে বিভূতি লস্করকে কী যেন বলছে তারক। একটু ঝুঁকে বিভূতি শুনছে। তার পর তারককে কিছু বলল। মিছিলের সামনে ফিরে এল তারক। ইচ্ছে করেই ওরা ঠিক তার অফিসের সামনে বিজয়মিছিল থামিয়েছে। ব্যান্ড বাজিয়েই যাচ্ছে। তার সঙ্গে মাইকে এলাকাবাসীকে অভিনন্দন। পাড়া কেঁপে উঠছে বোমপটকার আওয়াজে। রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে ছেলেরা।

ঝুঁকে দাঁড়িয়ে মিছিল দেখছিল বিভু। হঠাৎ তারক উপরে তাকাল। একটু দূরে হলেও চোখে চোখ পড়ল দু’জনের। একটু সময় বেশি তাকিয়ে রইল তারক। বিভু চোখ সরিয়ে নিল। বারান্দা ছেড়ে ঘরের ভিতরে ফিরে এল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বিকট শব্দে একটা বোমা ফাটল একেবারে তার অফিসের সামনে। তার পর পটকার চেন ফাটল এক মিনিট ধরে। একটু একটু করে মাইকের আওয়াজ দূরে সরে যাচ্ছে। মিছিলটা এগিয়ে যাচ্ছে। যাচ্ছেই। স্লোগান শুনে বিভু বুঝতে পারছিল, এ পথ ধরেই এগিয়ে চলেছে। বকুলডাঙায় এত বড় মিছিল আগে হয়নি।

এর ঠিক পনেরো দিন বাদে বিভুর দু’জন ক্যারিয়ার একদম বাতাসে মিলিয়ে গেল। পরে ‘অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ী দ্বারা নিহত’ দু’টি বিকৃত বডি পাওয়া গিয়েছিল নতুন পথে ফরেস্টের ভিতরে। হতে পারে তারক আর তার দলের কাজ। হতে পারে সাধন ঘোষের দলের কাজ। বর্ডারের কাজে সাধন অনেকটা জায়গা খুব দ্রুত দখল করে নিয়েছে। খুব বড় কাজ অবশ্য সে এখনও করতে শুরু করেনি। কিন্তু দলটাকে বেশ গুছিয়ে নিয়েছে। ইলেকট্রনিক্স, কসমেটিক্স আর গারমেন্টসের কাজ সবটাই দখলে নিয়ে নিয়েছে। আবার সাধারণ কোনও চুরি-ছিনতাই বা ওদের কোনও পার্সোনাল ঝামেলা থেকেও এটা ঘটতে পারে। সন্দেহ একটা লেগেই রইল বিভুর মনে। সে তার নিজস্ব নেটওয়ার্ক চালু করল।

তার ক্যারিয়ার উদয় সিং আর ভোলা দাস মাল নিয়ে নতুন রাস্তায় শিলিগুড়ির দিকে যাচ্ছিল। কথা ছিল তেনজিং নোরগে স্ট্যান্ডে পার্টি থাকবে। তাদের হাতে মাল পৌঁছে দিলেই ওদের দায়িত্ব শেষ। তার পর পার্টি মাল নিয়ে কোথায় কী ভাবে যাবে, সে সব ওরা জানে না। জানার দরকারও নেই। এই পথটুকু পার করে বাসস্ট্যান্ডে মাল পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত ওদের কাজ। ছোট ভ্যানে ওরা রওনা হয়েছিল। উদয় গাড়ি চালাচ্ছিল, আর ভোলা যেন গাড়ির খালাসি— এভাবেই সেজেগুজে নিয়েছিল। পলাশগুড়ি পেরিয়ে ফরেস্ট এরিয়া শুরু হতেই গাড়ি বিগড়ে গেল। বিগড়োনোর কথা নয়। তেল যা ছিল, শিলিগুড়ি পৌঁছনো পর্যন্ত যথেষ্ট, দরকার পড়লে ফেরার পথে আবার ভরে নেওয়ার কথা। রওনা হওয়ার পর মনে হচ্ছিল গাড়ি একটু বাঁ দিকে টানছে। মনে হচ্ছে পিছনের চাকায় হাওয়া কমে গেছে। চেক করে নিয়ে রওনা হওয়া উচিত ছিল। নতুন রাস্তায় একটা গ্যারাজ খুলেছে, সেখানে হাওয়া ভরতে হবে। এটা ভোলার কাজ, দেখেইনি।

“ভোলা, হাওয়া চেক করিসনি? আমাকে বলবি তো হাওয়া কম আছে। এখন যদি গ্যারাজ বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকে...”

“স্টার্ট করার আগে সব চাকা আমি নিজে দেখে নিয়েছি। একদম টনটনে ছিল। বুঝতে পারছি না।”

গ্যারাজ খোলা ছিল। একটা বাচ্চা ছেলে সব চাকার বাতাস চেক করে দরকার মতো হাওয়া ভরে দিল। দাড়িওয়ালা বুড়োমতো এক জন ঘুরে ঘুরে গাড়িটা দেখছিল। এই মডেলের ভ্যান মার্কেটে নতুন এসেছে। সব কিছু খুঁটিয়ে দেখছিল লোকটা। ওরা দু’জন একটু সরে গিয়ে সিগারেট ধরিয়েছে। পয়সা দিয়ে ওরা স্টার্ট করেছিল।

কলকব্জা সব ঠিক আছে। নইলে এত দূর আসত না গাড়ি। নেমে ইঞ্জিনের ঢাকনা খুলল উদয়। গাড়ি সে চালায় বটে, কিন্তু যন্ত্রপাতি খুব যে বোঝে, এমন নয়। ভোলা তার মোবাইলের আলো ফেলল, উদয় টুকটাক ব্যাটারি টার্মিনাল, পাম্প, তারফার এদিক-ওদিক টানাটানি করল। কিছু হল না।

পিছনে দেখার কিছু নেই, তবু ভোলা গাড়ির পিছনে গিয়েই চিৎকার করে উঠল।

“এদিকে আয় উদয়। দেখ...”

রাস্তা জুড়ে তেল পড়ে আছে। অন্ধকার পিচরাস্তার উপর আলো পড়তেই রামধনুর মতো সাতরং ঝিকমিক করে উঠল। মোবাইলের আলো ফেলে ফেলে অনেকটা দূর পিছিয়ে গেল ওরা দু’জন। তেলের দাগ রয়েছে। সব তেল বেরিয়ে গেছে। তেল হয়তো জোগাড় করা যাবে। ছোট ছোট দোকানগুলোর সামনে প্লাস্টিকের বোতলে তেল পাওয়া যায়। কিন্তু ট্যাঙ্কি ফুটো হয়ে থাকলে তেল ভরে কী লাভ!

গাড়ি গ্যারাজে নিয়ে যেতে হবে। সে কাল সকালের আগে কোনও ভাবেই সম্ভব নয়। গাড়ি এখানে ফেলে রেখে ওরা দু’জন যে পলাশগুড়ি ফিরে যাবে, সে প্রশ্নই ওঠে না। মাল রয়েছে গাড়িতে। গাড়ি পাহারার জন্য তাদের এখানেই থাকতে হবে। গাড়ির ভিতরেই রাত কাটাতে হবে। এখন পর্যন্ত পথে কোনও গাড়ির দেখা পায়নি উদয় আর ভোলা।

ক্রমশ

আরও পড়ুন