Rabindranath Tagore and Harry Timbers

কবির নির্দেশনায় ‘শাপমোচন’-এ অভিনয় করেন এই আমেরিকান

শ্রীনিকেতনের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিভাগকে নিজে হাতে গড়ে তুলেছিলেন এই চিকিৎসক। সারা বিশ্বে কাজ করলেও, কবির শিক্ষাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শান্তিনিকেতনকেই বেছে নিয়েছিলেন কাজের জায়গা হিসেবে। আশপাশের গ্রামে হিন্দু, মুসলমান ও জনজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধে নিরন্তর কাজ করে গেছেন হ্যারি টিম্বার্স। 

সিদ্ধার্থ মজুমদার
শেষ আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৪০
ছবি: রৌদ্র মিত্র।

ছবি: রৌদ্র মিত্র।

১৯৩১ সাল। রবীন্দ্রনাথের সত্তরতম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শান্তিনিকেতনে ‘শাপমোচন’ নৃত্যনাট্য প্রথম বার মঞ্চস্থ হবে, কমলিকার ভূমিকায় অভিনয় করবেন অমিতা সেন (খুকু) এবং অরুণেশ্বরের ভূমিকায় শান্তিদেব ঘোষ। দিন কয়েক মহড়া হয়ে যাওয়ার পরে, শান্তিদেব ঘোষ হামে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ঠিক হল, অসুস্থ শান্তিদেবের জায়গায় অভিনয় করবেন আমেরিকান ডাক্তার হ্যারি টিম্বার্স। অমিতা সেনের বন্ধু রমা চক্রবর্তীর ‘ভরা থাক স্মৃতিসুধায়’ রচনায় এই প্রসঙ্গে উল্লেখ আছে, “আমেরিকান হ্যারি টিম্বার্স বাংলা না জানলেও তিনি রাশিয়ান লোকনৃত্যে পারদর্শী ছিলেন। হ্যারিকে বেশ কয়েকটি দিন গানের শব্দগুলিরঅর্থ ও ভাব সম্পর্কে ইংরেজিতে বুঝিয়ে দেওয়া এবং সেই সঙ্গে অভিনয় ও নৃত্যে স্বয়ং কবি নিজে তালিম দিয়েছিলেন।”

‘রাশিয়ার চিঠি’তেও ডা. হ্যারি টিম্বার্সের কথা আছে , “…আমার আমেরিকান সঙ্গী ডাক্তার হ্যারি টিম্বর্স এখানকার স্বাস্থ্যবিধানের ব্যবস্থা আলোচনা করছে— তাঁর প্রকৃষ্টতা দেখলে চমক লাগে…” ১৯৩০ সালে কবির রাশিয়া ও আমেরিকা ভ্রমণের সময় কবির ব্যক্তিগত সেক্রেটারি এবং দোভাষী হিসেবে অন্যতম সঙ্গী ছিলেন হ্যারি টিম্বার্স।

শ্রীনিকেতনের গঠনমূলক কাজে, কিংবা সেখানকার স্বাস্থ্য বিভাগকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নতুন করে সাজানো কিংবা ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণায় হ্যারি টিম্বার্সের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও, এ কথা অস্বীকার করা যাবে না, তাঁর কথা সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনের বর্ষীয়ান মানুষজনও অনেকেই আজ হ্যারি টিম্বার্সের কথা জানেন না। প্রায় পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে এই প্রসঙ্গে প্রয়াত রবীন্দ্র-গবেষক নেপাল মজুমদার তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথ ও হ্যারি টিম্বার্স’ গ্রন্থে (দে’জ় পাবলিশিং, প্রথম প্রকাশ: অক্টোবর ১৯৯০) লিখে গেছেন— “লজ্জা ও পরিতাপের কথা, শ্রীনিকেতনের এবং আশেপাশের দু’-চারজন বৃদ্ধ গ্রামবাসী ছাড়া আজ আর ডাঃ হ্যারি টিম্বার্সের কেউ নামই জানে না। ‘বিশ্বভারতী’ কর্তৃপক্ষও হ্যারির স্মৃতিকে শান্তিনিকেতন তথা ভারতবাসীর চিত্তে জাগরূক রাখার জন্য আজ পর্যন্ত কোনও উদ্যোগ নিলেন না।”

আমেরিকার মিসৌরির অন্তর্গত হার্টফিল্ডে এক কৃষক পরিবারে জন্ম হ্যারি গারল্যান্ড টিম্বার্সের (১৮৯৯-১৯৩৭)। সারা পৃথিবী জুড়েই তাঁর কাজের ক্ষেত্র ছিল। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শান্তিনিকেতনকে তাঁর কর্মসাধনার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন একটা সময়। শ্রীনিকেতনের স্বাস্থ্য বিভাগকে বিজ্ঞানভিত্তিক রূপ দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বভারতীর গঠনতন্ত্র সংশোধন এবং বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথকে নানা ভাবে সাহায্য করেছেন হ্যারি। উল্লেখ্য যে, শ্রীনিকেতন উন্নয়ন কর্মসূচির একটি অপরিহার্য অঙ্গ ছিল স্বাস্থ্য-শিক্ষা। শ্রীনিকেতন সংলগ্ন গ্রামগুলির হিন্দু, মুসলমান ও জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধে করণীয় কর্তব্য বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করে তুলতে নিরন্তর কাজ করে গেছেন হ্যারি টিম্বার্স। বিশ্বভারতীর সব বিভাগের খবরাখবর নিয়ে ‘বিশ্বভারতী নিউজ়’ নামে একটি মাসিক বুলেটিন প্রকাশের ভাবনাটি ছিল হ্যারিরই। ‘আমেরিকান টেগোর অ্যাসোসিয়েশন’-এর মূল উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি।

হ্যারির স্ত্রী রেবেকা ছিলেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স। শ্রীনিকেতন, রাশিয়া-সহ বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা ও সেবার কাজে হ্যারিকে যোগ্য সহায়তা করেছেন রেবেকা। শ্রীনিকেতনের কর্মসূচিতে রেবেকার ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য। সেখানকার গ্রামগুলির বেশ কিছু মহিলাকে ধাত্রীবিদ্যা শিক্ষা দেন তিনি।

নেপাল মজুমদার তাঁর বইয়ে এক জায়গায় লিখেছেন, “বিশ্বভারতীর অত্যন্ত দুর্যোগ মুহূর্তে যেভাবে তার সংকট-মোচনে তিনি এগিয়ে এসেছিলেন— তার জন্য যে বৈষয়িক ক্ষয়-ক্ষতি ও শারীরিক ক্লেশ সহ্য করেছিলেন তাতে এন্ড্রুজ-পিয়ার্সন-এলমহার্স্টের সঙ্গে তাঁর নামটিও যুক্ত করে উচ্চারিত হওয়া উচিত।” উদ্ধৃত এই বক্তব্য থেকে, বিশ্বভারতীর সঙ্গে হ্যারি টিম্বার্সের গভীর সংযোগ, তাঁর অবদান ও আত্মত্যাগ সম্পর্কে সহজেই আঁচ পাওয়া যায়।

হ্যারি ছিলেন ম্যালেরিয়া-বিশেষজ্ঞ মার্কিন চিকিৎসক। চিকিৎসাবিদ্যা, বিশেষত ট্রপিক্যাল ডিজ়িজ় ও মেডিসিন বিষয়ে তিনি জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটি ফ্যাকাল্টি অব মেডিসিন থেকে এমডি ডিগ্রি পান। লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন এবং রয়্যাল কলেজ অব সার্জেনস অব ইংল্যান্ড থেকে সার্টিফিকেট ডিগ্রি এবং সেখানকার ফেলো নির্বাচিত হন। জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটি-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আকর্ষণীয় মাইনে এবং ভাল পদে যোগ দেওয়ার জন্যে প্রস্তাব পেয়েছিলেন, কিন্তু অর্থ, ধনদৌলত, খ্যাতি-প্রতিপত্তি, সম্মান— এ-সব কিছু হ্যারির কাছে আদৌ গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

মনেপ্রাণে যুদ্ধবিরোধী হ্যারি মার্কিন কোয়েকার সঙ্ঘের সেবার কাজে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের আর্ত, মুমূর্ষু ও নিপীড়িত মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। অনাথ শিশু, সন্তান ও স্বামীহারা হতভাগ্য মানুষের সেবা ও চিকিৎসার কাজ করেছেন পোল্যান্ডে, কাজ করেছেন দুর্ভিক্ষপীড়িত সোভিয়েট রাশিয়ায়। সেখানে চাষিদের সঙ্গে জমি চাষের কাজেও হাত লাগিয়েছেন। লিগ অব নেশনস-এর ফেলোশিপ নিয়ে প্রথমে তৎকালীন যুগোস্লাভাকিয়া এবং পরে ভারতবর্ষে, শান্তিনিকেতনে আসেন। প্রায় পাঁচ বছর এখানে ম্যালেরিয়া নিবারণ অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন হ্যারি। বিশ্বভারতী সংলগ্ন বেশ কয়েকটি গ্রামে রোগজীর্ণ দুঃস্থ অধিবাসীদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। এই কাজ করতে গিয়ে নিজে অসুস্থ ও মরণাপন্নহয়ে পড়েছিলেন।

ওই অঞ্চলের ম্যালেরিয়া নিবারণ অভিযানে তাঁর ভূমিকা ও গবেষণা সে সময় দেশে-বিদেশে প্রশংসা অর্জন করেছিল। গবেষণার কাজে দু’জন সহকারীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রায় এক লক্ষ মশা ব্যবচ্ছেদ করেন। ম্যালেরিয়া-বাহক মশা সম্পর্কে একাধিক কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য তুলে ধরেন হ্যারি, যা তৎকালীন ম্যালেরিয়া-বিশেষজ্ঞ মহলে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শুধু ম্যালেরিয়া-বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসাবিদ হিসেবেই নয়, সামগ্রিক ভাবে বিশ্বভারতীর স্বার্থ-সংরক্ষণ ও তার উন্নতিকল্পে তিনি সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। তাঁর লেখা ‘স্টাডিজ় অন ম্যালেরিয়া ইন ভিলেজেস অব ওয়েস্ট বেঙ্গল’ শীর্ষক গবেষণা-নিবন্ধের সঙ্কলনগ্রন্থে বিস্তারিত তথ্য ধরা আছে। উল্লেখ্য যে, উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী শ্রীনিকেতনে হ্যারির গবেষণাকাজ দেখে খুব প্রশংসা করেন, তৎকালীন বিশ্বভারতী নিউজ় বুলেটিনে যার উল্লেখ আছে। এ ছাড়াও, কলকাতার স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন-এর কয়েক জন বিশিষ্ট চিকিৎসাবিদ শ্রীনিকেতনে হ্যারির কাজ ও গবেষণা দেখে তারিফ করেন এবং মূল্যবান পরামর্শ-সহ সহায়তা প্রদান করেন।

শান্তিনিকেতনে কাজের শেষ পর্যায়ে হ্যারি অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরে যান। কিছুটা সুস্থ হয়েই আবার যান সোভিয়েট রাশিয়ায়। সেখানে একটি ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকায় কাগজ কলের মজুরদের চিকিৎসা ও সেবা করতে গিয়ে নিজেই ভয়াবহ ‘টাইফাস’ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। এই রোগেই মাত্র আটত্রিশ বছর বয়সে মারা যান হ্যারি। সারা বিশ্বের পীড়িত মানুষের সেবায় একটু একটু করে নিজের শরীর বিপন্ন করে শেষে এই প্রাণত্যাগ বিস্ময় জাগায়। মহান আদর্শ ও লক্ষ্যের জন্যে তাঁর আত্মত্যাগের কথা গভীর শ্রদ্ধা ও বেদনার সঙ্গে স্মরণ করেছেন কবি।

রবীন্দ্রনাথ তখন আলমোড়ায় ছিলেন, সংবাদপত্রে হ্যারির মৃত্যুসংবাদ পড়ে মর্মান্তিক মানসিক আঘাত পান। হ্যারি-পত্নী রেবেকার কথা ভেবে বিচলিত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। রেবেকাকে তার পরই শোক ও সমবেদনা জানিয়ে আলমোড়া থেকে চিঠি লেখেন কবি। ভারত থেকে স্বদেশে ফিরে যাওয়ার পর কবির সঙ্গে চিঠিতে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল হ্যারির। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে লিখেছিলেন, শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ হলে এবং ওদিকের কাজ শেষ করে তিনি যেন আবার সস্ত্রীক শান্তিনিকেতনে ফিরে আসেন। দুজনের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালবাসা কত গভীর ছিল, তা তাঁদের মধ্যে আদানপ্রদান হওয়া চিঠিপত্র থেকেই বুঝতে পারা যায়।

নেপাল মজুমদারের বইয়ে উল্লেখ আছে যে, ১৯৭৪ সাল নাগাদ শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে হ্যারি টিম্বার্স সম্পর্কে বেশ কিছু মূল্যবান তথ্যের সন্ধান পান তিনি। তার পর অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ নেপালবাবুর অনেক চিঠিপত্রের আদানপ্রদান হয়। পরবর্তী সময়ে রেবেকা টিম্বার্সের সঙ্গে নেপালবাবুর যোগাযোগ হয় অমিয় চক্রবর্তীর মাধ্যমে। রেবেকা টিম্বার্স সে সময় ছিলেন আমেরিকায়। হ্যারির বহু মূল্যবান তথ্য, চিঠিপত্র, লেখা, ভাষণ, ছবি ইত্যাদি রেবেকা সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন এবং পরে সঙ্কলিত করেন, তাঁর ‘উই ডিডন’ট আস্ক ইউটোপিয়া: আ কোয়েকার ফ্যামিলি ইন সোভিয়েট রাশিয়া’ গ্রন্থে। নেপালবাবু লিখেছেন, সেই গ্রন্থের একটি কপি নেপালবাবুকে পাঠান রেবেকা।

ডা. হ্যারি টিম্বার্সের জন্মের একশো পঁচিশ বছর পেরিয়েছে, খুব বেশি দিন নয়। প্রতি বছর রবীন্দ্রজন্মোৎসব উপলক্ষে শত শত রচনা প্রকাশিত হলেও, হ্যারি টিম্বার্সের কথা কি আমাদের চোখে পড়ে না তেমন।

নেপালবাবুর লেখা ‘রবীন্দ্রনাথ ও হ্যারি টিম্বার্স’ নামের গ্রন্থটি ছাড়া সম্ভবত হ্যারিকে নিয়ে বাংলায় আর কোনও বই নেই। নিজের জীবন বিপন্ন করেও যে ভাবে বিশ্বভারতী ও তার পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলির দুঃস্থ ও রোগাক্রান্ত মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছেন হ্যারি, তা আজও বিস্ময়ের উদ্রেক করে। এমন এক জন দরদি মানবপ্রেমিক চিকিৎসকের অবদান ভুলে যাওয়া আমাদের পক্ষে লজ্জার।


আরও পড়ুন