Job Charnock Home

জোব চার্নকের বাড়ির খোঁজে

কলকাতা নয়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমে উলুবেড়িয়ায় হুগলি নদীর ধারেই বন্দর ও নগরী গড়তে চেয়েছিল। সে সময় উলুবেড়িয়ায় থাকতেন জোব চার্নক। কিন্তু ঠিক কোথায়? সন্ধানে উঠে এল নানা আশ্চর্য তথ্য।

নুরুল আবসার
শেষ আপডেট: ১০ মে ২০২৬ ০৭:৩৭
ঐতিহাসিক: উত্তর জগদীশপুরের সেই ধ্বংসাবশেষ। এখানে জোব চার্নক থাকতেন বলে অনেকে মনে করেন।

ঐতিহাসিক: উত্তর জগদীশপুরের সেই ধ্বংসাবশেষ। এখানে জোব চার্নক থাকতেন বলে অনেকে মনে করেন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একটি চিঠিই বদলে দিল উলুবেড়িয়ার ভাগ্য। সূর্যোদয় ঘটল হুগলি নদীর পশ্চিম পাড়ে। জন্ম হল কলকাতা শহরের। অস্তমিত হল উলুবেড়িয়ার সম্ভাবনা। তা নিয়ে আফসোসের অন্ত নেই উলুবেড়িয়াবাসীর। কী সেই চিঠি, যা বদলে দিল উলুবেড়িয়ার ভাগ্য? ১৯৭২ সালে প্রকাশিত ‘বেঙ্গল গেজ়েটিয়ার’ এবং ‘হাওড়া ডিস্ট্রিক্ট গেজ়েটিয়ার’-এ উল্লেখ আছে সেই চিঠির। আজ থেকে প্রায় ৩৪০ বছর আগে উলুবেড়িয়ায় অবস্থান করেছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পদস্থ আধিকারিক জোব চার্নক। কোম্পানির নির্দেশেই তিনি এখানে এসেছিলেন হুগলি নদীর ধারে একটি বন্দর ও বাণিজ্যনগরী গঠন করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখতে। কিন্তু পরে কোম্পানির তরফে চিঠি লিখে জোব চার্নককে বলা হয়, উলুবেড়িয়া টাউনে হুগলি নদীর নাব্যতা বন্দর করার উপযুক্ত নয়। তিনি যেন পত্রপাঠ উলুবেড়িয়া টাউন থেকে চলে আসেন। সেখান থেকে তাঁবু গুটিয়ে তিনি ঘাঁটি গাড়েন কলকাতায়। তার পরের ঘটনা সবার জানা। বেহালার সাবর্ণ রায়চৌধুরীর কাছ থেকে লিজ় নেন কলকাতার সঙ্গে গোবিন্দপুর ও সুতানুটি— মোট তিনটি গ্রাম। এখান থেকেই সূচনা কলকাতা মহানগরের।

‘বেঙ্গল গেজ়েটিয়ার’ এবং ‘হাওড়া ডিস্ট্রিক্ট গেজ়েটিয়ার’ ছাড়াও ইতিহাসবিদ স্যর যদুনাথ সরকারের লেখায় জোব চার্নকের সঙ্গে উলুবেড়িয়ার সম্পর্কের কথা উল্লেখ আছে। জানা যায়, জোব চার্নক প্রথমে হুগলি নদীর ধারে হুগলি জেলায় কয়েকটি বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ার উদ্যোগ নেন। কাজ শুরুও করেন। কিন্তু মোগলদের তাড়া খেয়ে নদীপথেই পালিয়ে যান হিজলিতে (অধুনা পশ্চিম মেদিনীপুর)। সেখানে থাকাকালীন কোম্পানির মাদ্রাজ সদর দফতরের কর্তারা মোগলদের সঙ্গে বাংলায় বাণিজ্য কী ভাবে করা যায় তা নিয়ে আলোচনা চালান। সেই আলোচনার ভিত্তিতেই মোগলরা উলুবেড়িয়ায় একটি বন্দর তৈরি করে সেখান থেকে কোম্পানিকে বাণিজ্য চালানোর অনুমতি দেয়। অনুমতি পাওয়ার পরে জোব চার্নক উলুবেড়িয়ায় আসেন। তবে তাঁর উলুবেড়িয়ায় বসবাসের সময়কাল ছিল স্বল্প। উলুবেড়িয়া টাউনের হুগলি নদীতীরবর্তী এলাকা বন্দর তৈরির উপযুক্ত নয়, কোম্পানির কাছ থেকে সেই বার্তা পেয়ে উলুবেড়িয়া ছেড়ে চলে যান তিনি। কিন্তু তিনি উলুবেড়িয়ার ঠিক কোথায় ছিলেন, পাকা বাড়িতে না মাটির ঘরে, তার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে উলুবেড়িয়ার উত্তর জগদীশপুর থেকে লকগেট পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা বেশ প্রাচীন জনপদ। এই এলাকায় অনেক পুরনো বাড়ি। এই এলাকার কোথাও জোব চার্নক ঘাঁটি গেড়েছিলেন বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ মনে করেন। রঞ্জিত সাহা নামে উত্তর জগদীশপুরের সাতাশি বছর বয়সি এক বাসিন্দা দাবি করেন, তাঁদের বসতভিটেতেই ছিল জোব চার্নকের বাড়ি। হুগলি নদী থেকে পাঁচশো মিটার দূরে রঞ্জিতবাবুর বাড়ির কাছাকাছি বেশ কয়েকটি পুরনো ভবন। মোটা ইটের দেওয়াল খিলান এই সব বাড়ির প্রাচীনত্বের সাক্ষী। বার্ধক্যজনিত কারণে রঞ্জিতবাবু শয্যাশায়ী। তবে স্মৃতিশক্তি প্রখর। শহরের অন্যতম বড় ব্যবসায়ী রঞ্জিতবাবু গড়গড় করে বলে যেতে পারেন পুরনো দিনের অনেক কথা। তিনি বলেন, “বংশপরম্পরায় শুনে আসছি আমাদের এই বসতবাটিতেই ছিল জোব চার্নকের বাড়ি। এলাকাটি ছিল পরিখা দিয়ে ঘেরা। এখন বাড়ি তৈরি হওয়ার ফলে সেগুলি বুজে গিয়েছে। আমার ছেলেবেলায় পরিখাগুলি দেখেছি। এমনকি একটি ভবনের ধংসাবশেষ দেখেছি। সেটিকেই সবাই বলতেন জোব চার্নকের বাড়ি।”

শহরের বাসিন্দা, অবসরপ্রাপ্ত ইতিহাস-শিক্ষক মহম্মদ আবদুল্লা হাওড়ার আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চার সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, “জোব চার্নকের উলুবেড়িয়ায় বসবাস নিয়ে আমি এক সময় গবেষণা চালিয়েছিলাম। ১৯৭২ সালের ‘বেঙ্গল গেজ়েটিয়ার’ এবং ‘হাওড়া ডিস্ট্রিক্ট গেজ়েটিয়ার’ এবং স্যর যদুনাথ সরকারের ‘হিস্ট্রি অব বেঙ্গল’-এর দ্বিতীয় খণ্ডে জোব চার্নকের উলুবেড়িয়ায় বসবাসের স্পষ্ট উল্লেখ আছে। কিন্তু স্থানীয় ভাবে তাঁর উলুবেড়িয়ায় বসবাসের বিস্তারিত বিবরণ কিছুই পাইনি।” একই সঙ্গে তিনি জানান, উত্তর জগদীশপুর থেকে লকগেট পর্যন্ত এলাকাতেই তাঁর থাকার সম্ভাবনা। টাউন হিসাবে ইস্ট ইন্ডিয়ার চিঠিতে উলুবেড়িয়াকে উল্লেখ করা হয়েছিল। টাউনের কথা ধরলে উত্তর জগদীশপুর থেকে লকগেট পর্যন্ত এলাকাকেই বোঝায়। এই এলাকা খুব প্রাচীন জনপদ, এবং পুরনো শহরের কিছু নিদর্শন এই এলাকাতেই আছে। রঞ্জিতবাবু যে দাবি করেছেন, সেই প্রসঙ্গে আবদুল্লা বলেন, “ছেলেবেলা থেকে আমিও শুনে আসছি জোব চার্নক রঞ্জিতবাবুদের ভিটেতে থাকতেন। কিন্তু তারও কোনও প্রামাণ্য তথ্য আমি গবেষণা করার সময় পাইনি। তা ছাড়া মাত্র কয়েক মাস তিনি উলুবেড়িয়ায় ছিলেন। তাই এখানে তিনি পাকা ভবন নির্মাণ করেছিলেন কি না, তা নিয়েও সংশয় আছে। বহু বছর আগে এই এলাকাতেই হুগলি নদীর পাড় বেশ কয়েকটি দোকান-সহ নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। আবদুল্লার বক্তব্য, “জোব চার্নক যেখানে থাকতেন, তা নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়।”

জোব চার্নকের সঙ্গে সম্পর্ক টানতে অনেকেই একাধিক তথ্য তুলে ধরেন। শহরের অদূরেই নদীর চর আছে। তা ‘বিবির চড়া’ নামে পরিচিত। অনেকের দাবি, জোব চার্নক স্ত্রীকে নিয়ে ওই চরে বেড়াতে যেতেন। সেই কারণেই এই চরের নাম হয়েছে ‘বিবির চড়া’। যদিও এই দাবি উড়িয়ে দেন আবদুল্লা। তিনি বলেন, “জোব চার্নক উলুবেড়িয়ায় এসেছিলেন বলে এই সব কথা রটেছে। এর কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।”

চার্নককে নিয়ে আফসোসও আছে উলুবেড়িয়াবাসীর মনে। শহরের নাট্যকমী শ্যামল দত্ত বলেন, “ভাবুন তো, জোব চার্নক যদি উলুবেড়িয়াতেই থাকতেন, তা হলে এই এলাকার চেহারা কী হত?”

জোব চার্নক যে উলুবেড়িয়ায় এসেছিলেন, তা ঐতিহাসিক সত্য। তিনি কোথায় থাকতেন, তা নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আগ্রহের অভাব নেই। তিনি উলুবেড়িয়া ছেড়ে না গেলে হয়তো এই শহরও হয়ে উঠত কলকাতা মহানগরীর মতো সমুজ্জ্বল। সেটা না হওয়ায় উলুবেড়িয়াবাসীর মধ্যে আফসোসের অন্ত নেই।

আরও পড়ুন