Legendary Mathametician

এক বিস্মৃতপ্রায় গণিত শিক্ষক

সাধারণ মানুষ যাতে সহজে হিসাব করতে পারে, কেউ যাতে কারচুপি করে তাদের না ঠকায়, তার জন্য সহজ ছড়ার মাধ্যমে গণনা করার পদ্ধতি শিখিয়েছিলেন গ্রাম বাংলার গণিতজ্ঞ শুভঙ্কর। উদ্ভাবকের নামানুসারে তা ‘শুভঙ্করী আর্যা’ নামে প্রচলিত হয়। কিন্তু কে ছিলেন এই শুভঙ্কর?

সুব্রত মুখোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ২১ জুন ২০২৬ ০৬:২০
স্মৃতিসাক্ষ্য: রামপুর শুভঙ্কর গবেষণা ও স্মৃতিরক্ষা কেন্দ্রের স্মৃতিস্তম্ভ এবং তার গায়ে উৎকীর্ণ শুভঙ্করী আর্যা।

স্মৃতিসাক্ষ্য: রামপুর শুভঙ্কর গবেষণা ও স্মৃতিরক্ষা কেন্দ্রের স্মৃতিস্তম্ভ এবং তার গায়ে উৎকীর্ণ শুভঙ্করী আর্যা। (ছবি সৌজন্য: নব মালাকার)

গুজরাতের পাটনে অবস্থিত হেমচন্দ্রাচার্য জৈন জ্ঞান মন্দিরের নাম পর্যটন দফতরের ওয়েবসাইট বা টুরিস্ট লিস্টে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। পাটন ইউনেস্কো হেরিটেজ তকমা-প্রাপ্ত ‘রানি-কি-ভাব’-এর জন্য বিখ্যাত। হেমচন্দ্রাচার্য জৈন জ্ঞান মন্দিরের নাম শোনাই যায় না। এই জৈন মন্দির আসলে প্রাচীন পুঁথির সংরক্ষণশালা। এখানে রাখা আছে ‘পাটন পাণ্ডুলিপি’ নামে একজোড়া অমূল্য পুঁথি। দেবনাগরী অক্ষরে লেখা পাণ্ডুলিপির বিষয় প্রাচীন ভারতীয় গণিতের নিয়মকানুন। পাণ্ডুলিপির বয়স আনুমানিক বারোশো বছর। সরল ভাষায় গণিতের মূলসূত্রগুলি বর্ণনা করা রয়েছে দু’টি প্রাচীন পাণ্ডুলিপিতে, যা সে আমলে ছাত্রদের অধ্যয়নের কাজে আসত। ১৯৮৫ সালে প্রকাশ্যে আসার আগে এগুলির অস্তিত্ব জানা ছিল না।

এই গণিতবিধির নিয়মাবলির বেশ কিছু, প্রায় এক হাজার বছর পর, পুনরায় মেলে প্রায় দু’হাজার কিলোমিটার দূরে বাংলার গণ্ডগ্রামের এক অখ্যাত বাঙালি গণিতজ্ঞের রচনায়। তাঁর রচনার সঙ্গে অদ্ভুত মিল রয়েছে ‘গণিতবিধি’র। হয়তো লোককথা-লোকগাথার মাধ্যমে মুখে মুখে ফেরা গাণিতিক সূত্রগুলি পৌঁছে যায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। একেই হয়তো বলা চলে, লোকগণিত।

ইংরেজ শাসনকালে ব্রিটিশ পরিমাপ পদ্ধতি চালু হওয়ার আগে বাংলায় প্রচলিত ছিল প্রাচীন হিসাব পদ্ধতি— গণ্ডাকিয়া শতকিয়া কড়াকিয়া। পয়সার হিসাব গণ্ডাকিয়া, চার কড়ায় এক গণ্ডা। জমির হিসাব কাঠাকিয়া, ২০ কাঠায় এক বিঘা। ওজনের ক্ষেত্রে সেরকিয়া, ৪০ সেরে এক মন হয়। মেট্রিক পদ্ধতি আসার আগে দেশীয় গণনা পদ্ধতি, পরে চালু হওয়া ব্রিটিশ পদ্ধতিও ছিল জটিল। যেমন, বারো ইঞ্চিতে এক ফুট, আবার তিন ফুটে এক গজ। গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষ সের-ছটাক-গণ্ডার সূক্ষ্ম হিসাব কষতে নাস্তানাবুদ হত। ধূর্ত জমিদার প্রজাদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে জমির হিসাবে জল মিশিয়ে বা রাজস্ব আদায়ে তাদের ঠকাত।

সে-সব সমস্যার সমাধান করেছিলেন গ্রামবাংলার এক গণিতজ্ঞ। সাধারণ মানুষ যাতে সহজে হিসাব করতে পারে, কেউ যাতে কারচুপি করে তাদের না ঠকায়, তার জন্য তিনি সহজ ছড়ার মাধ্যমে মুখে মুখে গণনা করার পদ্ধতি শিখিয়েছিলেন। সেই গণনা পদ্ধতি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে, দ্রুত লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে বাংলার সর্বত্র। উদ্ভাবকের নামানুসারে তা ‘শুভঙ্করী আর্যা’ নামে প্রচলিত হয়।

যেমন, ওজনে মন থেকে সেরে দাম হিসাব করার শুভঙ্করী আর্যা—

মণ প্রতি যত তঙ্কা হইবেক দর।

তা প্রতি অষ্ট গণ্ডা সের প্রতি ধর॥

কিন্তু কে এই শুভঙ্কর? সে নিয়ে বিস্তর মতবিরোধ আছে। শুভঙ্কর নামটি আসল নাম নয়, উপাধিবিশেষ। যেমন ‘রায়বাহাদুর’ বা ‘চক্রবর্তী’। সে কালে রাজা বা জমিদাররা বিশেষ কৃতিত্বের জন্য নানা রকম উপাধি দিতেন। বিষ্ণুপুরের মল্লরাজারা যেমন হিসাবপত্র বা গণনায় বিশেষ পারদর্শীদের ‘শুভঙ্কর’ উপাধিতে ভূষিত করতেন। অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বাঁকুড়া জেলার পুরাকীর্তি’তে লিখছেন, “তখন শুভঙ্কর কারও ব্যক্তিগত নাম ছিল না। সেকালে গণিতে অসাধারণ ব্যুৎপত্তি অর্জন করলে মল্লরাজদরবারের পক্ষ থেকে সেই উপাধি দেওয়া হত।” সে কারণে ইতিহাসে গণিতজ্ঞ অনেকগুলি শুভঙ্করের নাম মেলে। অনেকটা মন্দার বোসের কথায় ‘হাজার হাজার ডক্টর হাজরা’র মতো। তবে কোনও শুভঙ্করই নকল নয়।

শুভঙ্করী আর্যার প্রবর্তক শুভঙ্কর ছিলেন বর্তমান বাঁকুড়া জেলার বাসিন্দা। ১৮৮৩ সালে প্রকাশিত পঞ্চানন ঘোষের ‘শুভঙ্করী’ নামে গণিত বইয়ে শুভঙ্করের পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, “প্রাচীন ভারতের গণিতজ্ঞ ভাস্করাচার্য কৃত লীলাবতী নামক সংস্কৃত পাটিগণিত ভারতবর্ষের সর্বত্র পণ্ডিতগণের মধ্যে প্রচলিত ছিল। কিন্তু উহা সংস্কৃত ভাষায় লিখিত বলিয়া সর্বসাধারণলোকের ব্যবহারে আসিত না। এই অভাব দূর করিবার নিমিত্ত একজন অঙ্কশাস্ত্রের পণ্ডিত অঙ্ক করিবার কতগুলি নিয়ম পদাবলীতে প্রস্তুত করেন; তাঁহার রচিত এ নিয়মগুলি ব্যবসায়ী প্রভৃতি সর্ব্বসাধারণ লোকের বিশেষ উপকারী বলিয়া তাঁহাকে সকলে শুভঙ্কর বলে। ঐ পদাবলী গুলিকে শুভঙ্করের আর্য্যা বলে। শুভঙ্করের আর্য্যার সাহায্যে অঙ্ক করিবার প্রণালীকে শুভঙ্করী বলে।”

পীতাম্বর চৌধুরী ছিলেন বিষ্ণুপুরের মল্লরাজা গোপাল সিংহের রাজদরবারের এক সাধারণ কর্মচারী। বাঁকুড়া জেলার পাত্রসায়ের রামপুর গ্রামের বাসিন্দা পীতাম্বরের সন্তান ছিলেন ‘শুভঙ্কর’। তিনি ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। মল্লরাজাদের কুলপুরোহিত পীতাম্বরের পুত্রের নাম রাখেন জগন্নাথ। ছেলেবেলা থেকেই জগন্নাথ খুব মেধাবী ছিলেন। এগারো বছর বয়সে তাঁর পিতৃবিয়োগ হয়। সে কারণে পড়াশোনায় বাধা আসে। নিরুপায় হয়ে নাবালক সন্তানকে নিয়ে পীতাম্বরের বিধবা স্ত্রী বিষ্ণুপুরের রাজদরবারে উপস্থিত হলে বিষ্ণুপুররাজ তাঁর বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হন। তাঁর বিধবা মায়ের ভরণ-পোষণের জন্য বিষ্ণুপুররাজ একটি বৃত্তিও মঞ্জুর করেন। পনেরো বৎসর বয়সেই জগন্নাথ বাংলা-সহ ফারসি ভাষা আয়ত্ত করেন এবং গণিতশাস্ত্রে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। তিনি গণিতের জটিল সমস্যা মুখে মুখে সমাধানের ক্ষমতা রাখতেন। গণিতশিক্ষার জন্য সরল পদ্ধতি, সূত্র এবং তা ছড়ায় মুখস্থ করার উপায় উদ্ভাবন করেন। সে জন্য বিষ্ণুপুররাজ গোপাল সিংহ দেব তাঁকে ‘শুভঙ্কর রায়’ উপাধিতে ভূষিত করেন। জগন্নাথ থেকে তিনি হয়ে যান শুভঙ্কর রায়। যদিও শুভঙ্করের প্রকৃত নাম নিয়ে মতভেদ আছে। তাঁর নাম কোথাও জগন্নাথ, কোথাও সুরেন্দ্রনারায়ণ, কোথাও ভৃগুরাম।

শুভঙ্কর তাঁর প্রতিভাবলে বিষ্ণুপুররাজ গোপাল সিংহের অনুগ্রহভাজন হয়ে বিষ্ণুপুর রাজদরবারে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তিনি চৈতন্য সিংহের রাজসভাতেও ছিলেন। শুভঙ্কর ছিলেন রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্বপ্রাপ্ত। সেকালে কৃষকদের কাছ থেকে শস্য রাজস্ব হিসেবে নেওয়া হত। নিরক্ষর কৃষকেরা যাতে সহজে হিসাব করতে পারে, কেউ যাতে তাঁদের না ঠকায়, সে জন্যই তিনি আর্যা বা শ্লোকের মাধ্যমে সহজ গণনা শিখিয়েছিলেন।

যদিও আর্যা বা শ্লোকে গণিতের রচনারীতি নতুন নয়— প্রাচীন ভারতে আর্যভট্ট, ব্রহ্মগুপ্ত, ভাস্করাচার্য প্রমুখ গণিতজ্ঞরা আর্যা রীতিতেই রচনা করেছেন তাঁদের কীর্তি। তবে সে-সব ছিল সংস্কৃত ভাষায় জটিল রচনা। সাধারণত তেরোটি পয়ারবদ্ধ গণিত সূত্রগুলোকে আর্যা বলা হয়। আর্যা হল প্রাকৃত কবিতার বিশিষ্ট ছন্দের নাম। নবাবি যুগে বাংলায় শুভঙ্কর রীতি চালু হয়। তখন অবশ্য কাগজে ছাপা বই হয়ে আসেনি। মুখেমুখে ফেরা পদগুলি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে থাকে। শুভঙ্কর যে ভাষায় আর্যা রচনা করেছিলেন, এখন তার মূলরূপগুলি আর সহজে পাওয়া যায় না। যেমন— সের প্রতি এক ছটাক পোয়ায় তোলা হয়, / ছটাকেতে এক সিকি শুভঙ্করে কয়।

এক সময় শুভঙ্করী আর্যার ব্যবহার ছিল বাংলার ঘরে ঘরে। ছন্দে লেখা বাংলায় শুভঙ্করী আর্যাগুলি তখন ছাত্র-ছাত্রীদের সুললিত কণ্ঠে আবৃত্ত হত। শুভঙ্কর এক কথায় বাংলার অদ্বিতীয় লোকশিক্ষক। সেকালের হাট-বাজারের মুদি, ব্যবসায়ী, মহাজন সকলেই শুভঙ্করের দৌলতে তাঁদের হিসাবের কাজগুলি সমাধা করতেন। জমিদারি সেরেস্তাতেও শুভঙ্কর ছাড়া কাজ চলত না। জমির আয়তন, মাসমাইনের হিসাব, পাইকারি বা খুচরো দাম, ইট পাঁজার ইট গোনা, নৌকার বোঝাই মালের পরিমাণ, চাল-ডাল-তেল-নুনের হিসাব— সেযুগের বাঙালির নিত্যজীবনের সব ব্যাপারেই শুভঙ্করের প্রয়োজন হত।

শুভঙ্করের একটি জনপ্রিয় আর্যা জমির মাপের জন্য বহু বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

কুড়বা কুড়বা কুড়বা লিহ্যে/ কাঠায় কুড়বা কাঠায় লিহ্যে… আর্যাটির অর্থ, কুড়বা দিয়ে কুড়বাকে গুণ করলে হবে বর্গ কুড়বা, কাঠাকে কুড়বা দিয়ে গুণ করলে বর্গ কাঠা।

বাংলাদেশে মুখে মুখে অঙ্ক শেখানোর প্রাচীন রেওয়াজকে শুভঙ্কর সুগঠিত রূপ দিয়েছিলেন। শুভঙ্করী আর্যা হল মানসাঙ্ক গণিত অর্থাৎ, যা কিনা মনে মনে হিসাব করে মুখে বলে দেওয়া যায়। শুভঙ্কর প্রবর্তিত শুভঙ্করী গণিতরীতি বহু বছর ধরে, স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত বাংলায় গণিতশিক্ষায় প্রেরণা জুগিয়েছে। শুভঙ্কর রচিত দু’টি গ্রন্থ হল, ‘কাগজসার’ ও ‘ছত্রিশ কারখানা’। নবাবি আমলে বিভিন্ন রাজকীয় বিভাগে কেমন বন্দোবস্ত ছিল এবং কী নিয়মে নবাব সরকারের কাজকর্ম পরিচালিত হত, তা শুভঙ্কর তাঁর লেখা ‘ছত্রিশ কারখানা’ নামক পুস্তকে বিবৃত করেছেন। ‘ছত্রিশ কারখানা’ বইটিতে ছিল দুই হাজারেরও বেশি গণিতসূত্র শ্লোক। অতীতে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের বিষ্ণুপুর শাখা গ্রন্থাগারে শুভঙ্করের চারটি পুঁথি সংরক্ষিত ছিল।

আঠারো-উনিশ শতকে সমগ্র বঙ্গদেশ, ওড়িশা ও অসমে শুভঙ্করের ব্যাপক প্রভাব ছিল। কটকের র‌্যাভেন’শ কলেজিয়েট স্কুলে শুভঙ্করের গণিত প্রচলিত ছিল। ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে ‘স্কুল বুক সোসাইটি’ প্রবর্তনের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চুঁচুড়ার ধর্মযাজক রেভারেন্ড মে দেশীয় পদ্ধতি অবলম্বন করে ছাত্রছাত্রীদের জন্য একটি গণিত পুস্তক প্রণয়ন করেছিলেন। সেই পুস্তকে শুভঙ্করের পদ্ধতিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল।

‘মাসিক বসুমতী’তে প্রকাশিত ‘শুভঙ্কর’ নামক প্রবন্ধে মতিলাল দাস লিখছেন, “অশিক্ষিত মুদি শুভঙ্করের কল্যাণে সের ছটাকের সূক্ষ্ম হিসেবে মনে মনে সমাধান করিয়া লয়।” এখানে শুভঙ্করী আর্যার সাফল্য।

শুভঙ্কর ছিলেন আপনভোলা এক গণিতপ্রতিভা। নিজের খেয়ালে সারা দিন আঁক কষতেন। এক বার সভাসদদের কুটিল চক্রান্তের শিকার হয়ে শুভঙ্কর মল্লরাজার দরবার ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। মল্লরাজ বিষয়টি জানতেন না। এক দিন মহারাজ চৈতন্য সিংহ সভাসদ-সহ বেরিয়েছিলেন নগর পরিক্রমায়। পথে একটি প্রকাণ্ড লম্বা তালগাছ দেখতে পেয়ে, গাছটির উচ্চতা বিষয়ে কৌতূহলী হন। কিন্তু তাঁর সভাসদদের মধ্যে সকলেই সেদিন পরিমাপের ফিতে ছাড়া এবং গাছের মাথায় না চড়ে রাজার কৌতূহল পূরণ করতে অপারগ হন। ডাক পড়ে শুভঙ্করের। খোঁজ করতে গিয়ে মহারাজ রাজদরবার থেকে শুভঙ্করের বিতাড়নের সম্পর্কে অবগত হন। বিরক্ত মল্লরাজ তাঁর অনুসন্ধানের জন্য নির্দেশ দেন। বহু অনুসন্ধানের পর অভিমানী শুভঙ্করের সন্ধান পাওয়া যায়। মল্লরাজের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে তিনি রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। শুভঙ্কর ওই তালগাছের ছায়া মেপে গাছের উচ্চতা বার করে মহারাজের প্রভূত প্রশংসা লাভ করেছিলেন।

১৮৮০-৮১ সালে ‘এডুকেশন রিপোর্ট অব বেঙ্গল’-এ বাংলাদেশে উপযুক্ত গণিত বইয়ের অভাবের কথা উল্লেখ করা হয়। সেকালের প্রসিদ্ধ শিক্ষাবিদ ভূদেব মুখোপাধ্যায় ও এ ডব্লিউ ক্রফট সাহেবের উদ্যোগে পঞ্চানন ঘোষ প্রকাশ করেন ‘শুভঙ্করী’ নামে গণিতের একটি বই।

সেকালের প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাটিগণিতের প্রশ্নমালায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯১০ সাল থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত এবং ঢাকা বোর্ডের ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত শুভঙ্করী আর্যার উল্লেখ দেখা যায়।

দামোদর নদ থেকে ১১ মাইল দূরে বাঁকুড়ার হাট আশুলিয়ার গ্রাম এক কালে ছিল ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ। নদের দিকে জঙ্গল থেকে জমা জলের স্রোত গড়িয়ে আসত। যখন জনবসতি ও গ্রাম গড়ে উঠল, তখন সেই প্রাকৃতিক গতিপথ রুদ্ধ হয়, ফলে প্রতি বর্ষায় জঙ্গল থেকে বয়ে আসা জল এই জনপদগুলোর উপর বন্যার সৃষ্টি করত। গণিতবিদ শুভঙ্কর জঙ্গল থেকে নদ পর্যন্ত আসা প্রাকৃতিক ঢালের নিখুঁত হিসাব করে একটি নালা বা দাঁড়ার পথ নির্ণয় করেন এবং প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট সেই নালার সংস্কারের জন্য পরামর্শ দেন। সংস্কারের পর তার নাম হয় ‘শুভঙ্করের দাঁড়া’। এই দাঁড়া ২০ মাইল লম্বা। একটি অংশ বড়জোড়া থানার মুক্তাতোড় গ্রামের পশ্চিম প্রান্ত ধরে সোনামুখী, পাত্রসায়র হয়ে পড়েছে দামোদরের শাখা নদীতে। অন্য অংশ উত্তর দিকে পলাশপুরের গা ছুঁয়ে পড়েছে দামোদরে। এই দাঁড়ার জল থেকেই বিঘার পর বিঘায় চাষ হত। সেকালে শুভঙ্করের দাঁড়া-র জল সঞ্চিত থাকত এক বিরাট পুকুরে, আবার বর্ষাকালে অতিরিক্ত জল বেরিয়ে যেত দামোদর নদের বুকে। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে দুর্ভিক্ষ ও জলকষ্টের সময় খালটির সংস্কার করা হয়।

১৯৫৭ সালে দেশে মেট্রিক বা দশমিক পদ্ধতির প্রচলন হ‌ওয়ায় টাকা-আনা-পয়সা-পাই, গজ-ফুট-ইঞ্চি বা ছটাক-সের হিসাবের আর প্রয়োজন থাকল না। আর সেই সঙ্গে শুভঙ্করী আর্যাও তার গুরুত্ব হারাল।

এখনও বাঁকুড়ার রামপুর গ্রামে রয়েছে শুভঙ্করের ভিটা। গড়ে উঠেছে শুভঙ্কর পাঠাগার এবং সংগ্রহশালা। কিন্তু তার অবস্থা খুব খারাপ। ২০০৭ সালে রাজ্য সরকারের হেরিটেজ কমিশন শুভঙ্করের যাবতীয় সম্পত্তি অধিগ্রহণ করলেও উন্নতি হয়নি। শুভঙ্করের বাস্তুভিটায় তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ, কুলদেবতার ভগ্নমন্দির ছাড়া সবই ধ্বংসপ্রাপ্ত। বাস্তুভিটার স্থানে ‘রামপুর শুভঙ্কর গবেষণা ও স্মৃতিরক্ষা কেন্দ্র’-এর গৃহটি নির্মিত হয়েছে।

আরও পড়ুন