মনস্বিনী: সুসান বি অ্যান্টনি। ছবি: গেটি ইমেজেস।
সালটা ১৮৭২। আমেরিকার রচেস্টার থেকে এক মহিলাকে গ্রেফতার করা হল। তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ। ‘ভোটাধিকার প্রয়োগ পুরুষদের একমাত্র অধিকার’, এই দাবি তুড়ি মেরে উড়িয়ে তিনি ভোট দিয়েছেন। এক জন নারী হয়ে এই কাজ বেআইনি এবং সংবিধানবিরুদ্ধ। আদালতে তাঁর মোটা অঙ্কের জরিমানা ধার্য হল। কিন্তু তিনি শুনলেন না। বরং জোরদার সওয়াল করলেন নিজের অধিকারের সপক্ষে। সে যাত্রায় আদালত তাঁকে সতর্ক করে মুক্তি দিল।
এর পর এই নারী, নারীদের ও আফ্রো-আমেরিকানদের ভোটদানের অধিকার নিয়ে জোরদার আন্দোলন শুরু করলেন। প্রকাশ করতে শুরু করলেন একটি নারী-অধিকার সংক্রান্ত সংবাদপত্র। তারও আগে তিনি ‘নিউ ইয়র্ক উইমেন’স স্টেট টেম্পারেন্স সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই প্রতিষ্ঠান আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দাসপ্রথা বিলোপের সমর্থনে প্রায় চার লক্ষ স্বাক্ষর সংগ্রহ করে ফেলেছে। আর তৈরি করেছে ‘আমেরিকান ইকুয়াল রাইটস অ্যাসোসিয়েশন’। কাজেই এই নারী যে আর পাঁচ জনের মতো নয়, তা টের পেলেন নিউ ইয়র্ক-সহ সারা আমেরিকার লোকজন।
তিনি সুসান বি অ্যান্টনি। জন্ম ১৮২০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, বাবা অ্যাডামস ড্যানিয়েল অ্যান্টনি ও মা লুসি রিড অ্যান্টনি। সুসানের পরিবার তাঁর ছ’বছর বয়সে নিউ ইয়র্কে ব্যাটনভিল-এ চলে আসেন। অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে মাত্র সতেরো বছর বয়সেই ছয় ভাই-বোনের দিদি সুসানকে পড়াশোনা ছেড়ে চাকরিতে যোগ দিতে হয়। অমানবিক পরিশ্রম করতে হত, জুটত অসম্মানও। পরিবারে তখন তিনিই একমাত্র উপার্জনশীল।
কিছু দিন পর ভাগ্য একটু প্রসন্ন হল। মায়ের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কিছু সম্পত্তি পেলে তাঁর পরিবার রচেস্টারে চলে এল এবং সমাজ-সংস্কারে মনোনিবেশ করল। অবশ্য এই সময় সুসান সেখানে ছিলেন না। তিনি তখন একটি স্কুলের মহিলা বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন, সেই কাজের সূত্রেই নারী ও পুরুষের বেতনের তারতম্য দেখে বিস্মিত হচ্ছেন। মনে মনে ভাবছেন কী উপায়ে এই বৈষম্য দূর করা যায়। অন্য উপায় না পেয়ে নিজের মতো করে পরিবর্তন আনলেন। তাঁর আগে তাঁদের সম্প্রদায়ের মহিলারা খুবই সাদামাটা হালকা রঙের পোশাক পরতেন। তিনি রঙিন জমকালো পোশাক পরতে শুরু করলেন, যার মধ্যে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা ট্রাউজ়ার্সও ছিল।
এই সময়ই সুসানের বাবা অ্যাডামস রচেস্টারে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। সুসান চেষ্টা করতে লাগলেন, কী ভাবে তিনি এর সঙ্গে যুক্ত হবেন। সেই সুযোগও এসে গেল। বোর্ডিং স্কুলটা বন্ধ হয়ে গেল। তাঁকে ফিরে আসতে হল। তবে এ বার আর তিনি চাকরি নিলেন না কোথাও। বরং বাবাকে সমাজ-সংস্কারে সাহায্য করার কাজে বেশি উংসাহী হলেন।
১৮৫১ সালে সুসানের সঙ্গে নারীবাদী ব্যক্তিত্ব অ্যামেলিয়া ব্লুমারের মাধ্যমে সেনেকা জলপ্রপাত সম্মেলনের অন্যতম আয়োজক, নারীর ভোটাধিকারের সমর্থনের প্রস্তাবকারী এলিজ়াবেথ ক্যাডি স্ট্যান্টনের পরিচয় হল।
সাত সন্তানের জননী এলিজ়াবেথ স্ট্যান্টন তাঁর চিন্তাধারাকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করলেন। সুসান পারিবারিক সূত্রে সাংগঠনিক কাজে যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন, আর স্ট্যান্টন ছিলেন লেখালিখিতে দক্ষ। স্ট্যান্টন নারীদের নিয়ে যা-যা ভাবতেন, লিখতেন, সেগুলোর ভিত্তিতে সুসান বিভিন্ন মানুষের কাছে আবেদনপত্র প্রচার করতেন, নারীর অধিকারের বিষয়ে বক্তব্য রাখতেন। স্ট্যান্টন বললেন, “আমি বজ্র তৈরি করছিলাম, আর সুসান সেগুলো নিক্ষেপ করছিল মানুষের শুভবুদ্ধি জাগানোর জন্য।”
ক্যানাজোহারিতে শিক্ষকতা করার সময়, সুসান ‘ডটারস অব টেম্পারেন্স’-এ যোগ দিয়েছিলেন। ১৮৫২ সালে তিনি রাজ্য টেম্পারেন্স কনভেনশনের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন। এক অধিবেশনে তাঁর বক্তব্য প্রকাশের সময় চেয়ারম্যান তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, মহিলা প্রতিনিধিরা শোনার এবং শেখার জন্য সেখানে আছেন, তাঁদের কথা বলার অধিকার নেই। সুসান তখনই অধিবেশন ছেড়ে বেরিয়ে যান এবং মহিলাদের জন্য মহিলাদের নিয়েই একটি সভা করার কথা ঘোষণা করেন। ৫০০ জন মহিলা নিয়ে এই সম্মেলন রচেস্টারে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এলিজ়াবেথ স্ট্যান্টনকে সভাপতি এবং সুসান অ্যান্টনিকে রাজ্য এজেন্ট করে ‘মহিলা রাজ্য টেম্পারেন্স সোসাইটি’ গঠিত হয়।
এর পর শিক্ষক সম্মেলনে, তিনি পাবলিক স্কুল এবং কলেজে কৃষ্ণাঙ্গদের ভর্তির আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করলেন, কিন্তু ‘এই বিষয় আলোচনার উপযুক্ত নয়’ বলে বাতিল করা হয়। তখন তিনি কলেজ-সহ সকল স্তরে পুরুষ এবং মহিলাদের এক সঙ্গে শিক্ষার অধিকার নিয়ে প্রস্তাব পেশ করলেন। এরও তীব্র বিরোধিতা করে তাঁকে চূড়ান্ত অপমান করা হল। বলা হল, এ সব সমাজকে উচ্ছন্নে নিয়ে যাওয়ার এক বিকৃত দানবীয় প্রচেষ্টা। দমে না গিয়ে সুসান পরের কয়েক বছর শিক্ষক সম্মেলনে জোর দিয়ে বললেন, “মহিলা শিক্ষকদের পুরুষ শিক্ষকদের সমান বেতন পাওয়া উচিত এবং সংগঠনে মেয়েদের থাকার পূর্ণ অধিকার আছে।”
কাজ করতে গিয়ে সুসান অনুভব করছিলেন, নারী আন্দোলনের প্রধান বাধা অর্থ। সেই সময়ে খুব কম মহিলারই স্বাধীন আয়ের ক্ষমতা ছিল। যাঁরা চাকরি করতেন, আমেরিকান আইনে স্বামীদের হাতেই তাঁদের বেতন তুলে দিতে হত। সুসানের লাগাতার আন্দোলনে আংশিক ভাবে নিউ ইয়র্কে একটি আইন পাশ হল, যাতে বলা হল বিবাহিত মহিলারা কিছু অর্থ ও সুবিধা পেতে পারেন। সুসান আবার এই নিয়ে আন্দোলন শুরু করলেন, সঙ্গী মন্ত্রী ও সমাজ-সংস্কারক উইলিয়াম হেনরি চ্যানিং। তিনি যখন নিউ ইয়র্ক স্টেট সেনেট জুডিশিয়ারি কমিটির কাছে বিবাহিত মহিলাদের সম্পত্তির অধিকার-সংক্রান্ত আবেদনপত্র পেশ করলেন, তখন এর সদস্যরা তাঁকে তীব্র ব্যঙ্গবিদ্রুপ করলেন।
যাবতীয় কটূক্তি অগ্রাহ্য করে ধারাবাহিক ভাবে তিনি মেয়েদের অধিকার নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান। ১৮৬০ সালে আইনসভা মেয়েদের সম্পত্তি ও সন্তানের উপর অধিকারের বিল পাশ করে।
এই পর্বে সুসান প্রায় সারা বিশ্বে ও নিউ ইয়র্কের প্রতিটি শহরে তুষারপাত, ঝড়, প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করেই নারীদের অধিকার, শুধু ভোটদানের নয়, সম্পত্তির অধিকার, পেশার অধিকার, সুরক্ষাপ্রাপ্তির অধিকার, অত্যাচারী মাতাল স্বামীকে ডিভোর্স করার অধিকার প্রমুখ বিষয়ে প্রায় শতাধিক বক্তব্য রাখেন। অবশ্য বাফেলো থেকে আলবানি পর্যন্ত প্রতিটি শহরেই জনতার আক্রমণে তাঁর সভা বন্ধ হয়ে যায়। তাঁকে পচা ডিম ছুড়ে মারা, বক্তৃতাস্থলে বেঞ্চ ভাঙার পাশাপাশি ছুরি-পিস্তল দিয়েও তাঁকে আক্রমণের চেষ্টা হয়। পুলিশের সাহায্যে তিনি নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছতে পেরেছিলেন।
এর পর কানসাস প্রদেশে ভোটের প্রচার শুরু হলে সর্বজনীন ভোটাধিকার আন্দোলনের উদারপন্থী নেতা, সংবাদপত্র সম্পাদক হোরেস গ্রিলি, সুসান অ্যান্টনিকে বললেন, “এই ভোট রিপাবলিকান পার্টি এবং আমাদের জাতির জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়... আমি আপনাকে বলছি, এখন ‘নিগ্রোদের সময়’, এবং এখন আপনার প্রথম কর্তব্য বিভিন্ন রাজ্যে গিয়ে তাঁদের দাবির পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা।”
অন্য দুই নেতা ওয়েন্ডেল ফিলিপস এবং থিয়োডোর টিল্টন শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ‘ন্যাশনাল অ্যান্টি-স্লেভারি স্ট্যান্ডার্ড’-এর অফিসে সুসান এবং স্ট্যান্টনের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করলেন, মহিলাদের ভোটাধিকারের সময় এখনও আসেনি। তাঁদের সংশোধিত সংবিধান আফ্রিকান বা আমেরিকান নারীর ভোটাধিকারের জন্য নয়, কেবল কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের অধিকারের জন্য। তাই তাঁদের ভোটাধিকারের দাবিতে প্রচার চালানো দরকার।
সুসান ক্ষুব্ধ হয়ে জানালেন, শুধু কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষের জন্য ভোট চাওয়ার চেয়ে তিনি বরং তাঁর ডান হাত কেটে ফেলবেন, কিন্তু নারীদের জন্য তাঁর অবস্থান একই থাকবে। এর পর সুসান এবং স্ট্যান্টন ‘দ্য রেভলিউশন ইন নিউ ইয়র্ক সিটি’ নামে একটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র শুরু করেন। মূলমন্ত্র— ‘পুরুষ, তাঁদের অধিকার এবং এর বেশি কিছু নয়: নারী, তাঁদের অধিকার এবং এর কম কিছু নয়।’ লক্ষ্য: এর মাধ্যমে এমন একটি ফোরাম গঠন, যেখানে মহিলারা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে নারীর অধিকার, ভোটাধিকার, রাজনীতি, শ্রমিক আন্দোলন এবং অর্থনীতি নিয়ে মতামত বিনিময় করতে পারেন। জর্জ ফ্রান্সিস ট্রেন নামে এক নারীবাদী ব্যবসায়ী, সুসানকে পত্রিকা চালানোর প্রাথমিক অর্থ দিয়েছিলেন। কিন্তু আইরিশ স্বাধীনতা সমর্থন করার জন্য জর্জকে জেলে পাঠানো হলে পত্রিকা ২৯ মাস পর বন্ধ হয়ে গেল।
অবশেষে আমেরিকা গৃহযুদ্ধ শেষ করে রাষ্ট্র হিসাবে একশো বছরে পা রাখল। এই সময় সুসানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ন্যাশনাল উইমেন সাফরেজ’ আন্দোলনে ফিলাডেলফিয়ায় মহিলাদের ভোট দেওয়ার প্রস্তাব আবার নতুন করে উত্থাপিত হল। কিন্তু এ বারও তা বাতিল হয়। সুসান আরও পাঁচ জন নারীকে নিয়ে জনগণের মধ্যে প্রচারপত্র ছড়িয়ে দেন, যাতে সাধারণ মানুষ সরাসরি নিজেদের মত দিতে পারেন। তাঁর উদ্দেশ্য সফল হয়। ১৮৭২-এর মধ্যেই চারটি প্রদেশে মেয়েরা ভোট দিলেন। সুসান ভাবলেন, নারীদের জন্য এমন কিছু লিখতে হবে, যাতে তাঁরা ভবিষ্যতের দিশা পান। এই ভাবনা থেকে মাটিল্ডা জোসলিন-এর সঙ্গে যৌথ ভাবে ছয় খণ্ডে নারী ভোটাধিকারের ইতিহাস নিয়ে বই লিখলেন।
সুসান বার বার একটা কথাই বলেছেন, “মেয়েরা চিরকাল ভাবেন তাঁদের একমাত্র কাজ পুরুষদের সব কিছুতে সঙ্গ দেওয়া। কিন্তু তাঁদের নিজেদের খুশি, ভাল থাকা, উন্নয়ন এবং অধিকার নিয়েও ভাবা দরকার। এবং তাতে জগতেরই ভাল হবে। হয়তো এই লড়াইগুলোর ফলে খানিক স্বীকৃতি পাওয়া গেল, কিন্তু আমাদের মনে রাখা উচিত সামনে আরও অনেক লড়াই অপেক্ষা করছে। এটুকু পেয়েই সব পুরনো ক্ষত ভুলে গেলে চলবে না।”
৮৬ বছর বয়সে ১৯০৬ সালের ১৩ মার্চ সুসান যখন মারা গেলেন, তখন তাঁর নারীর অধিকার নিয়ে আন্দোলনের অনেক দাবিই পূরণ হয়েছিল। ১৯৩৬ সালে ১৯তম সংশোধনী— যা ‘সুসান সংশোধনী’ নামে পরিচিত— তা অনুমোদনের ষোড়শ বার্ষিকীতে আমেরিকান ডাকবিভাগ সুসানের সম্মানে প্রথম ডাকটিকিট প্রকাশ করে। ১৯৭০ সাল থেকে, নিউ ইয়র্ক সিটির নারীদের জীবন উন্নয়নে নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের সম্মান জানাতে ন্যাশনাল অর্গানাইজ়েশন ফর উইমেন-এর নিউ ইয়র্ক সিটি শাখা প্রতি বছর সুসান বি অ্যান্টনি পুরস্কার প্রদান করে।